সকাল ১১:৪৮ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও তার ঋণ || অমিতাভ ঘোষ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ভূমিকা ও অনুবাদ : ফাহমিদ আল জায়িদ 

[সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। ২০০১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশ পত্রিকায় কথাসাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষ সম্পর্কে বলেন “ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় লেখদের মধ্যে অমিতাভ ঘোষের লেখাই আমার বেশি পচ্ছন্দ। অমিতাভ ঘোষের সব লেখাই বুদ্ধিদীপ্ত ও চিত্তাকর্ষক– তার মধ্যে বিশেষত একটি গ্রন্থ ইন অ্যান অ্যানটিক ল্যান্ড  পড়ে সাহেবী ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে “হ্যাটস অফ”– শুধু পটভূমিকা বা গবেষণার জন্য নয়, দৃষ্টিভঙ্গির জন্যও। এ রকম একটি কাহিনি বাংলা ভাষায় কেউ লিখলে বাংলা সাহিত্য সেই লেখকের জন্য গর্ববোধ করত।” 
সেই অমিতাভ ঘোষ যখন তার প্রিয় লেখক সুনীলদার মৃত্যু সংবাদ শোনেন, তখন স্বভাবতই কিছু না লিখে থাকতে পারবেন না, সেটিই স্বাভাবিক। তাই সেই দিনই অমিতাভ ঘোষ নিজের ওয়েবসাইটে এই শ্রদ্ধাঞ্জলিটি পোস্ট করেন। আজ ৭ সেপ্টেম্বর (জন্ম : ১৯৩৪) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিনে সেই লেখাটির বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করা হল।]

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন একজন অসাধারণ লেখক, ছিলেন দয়ালু ও উষ্ণ হৃদয়ের মানুষ। আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে তিনি আর নেই।
আমাদের দুজনের আগ্রহের জায়গাগুলির ছিল আশ্চর্যজনকভাবে মিল। যেমন– সুনীল’দা ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত খুব পচ্ছন্দ করতেন। খ্যাতিমান গায়ক আমির খানকে নিয়ে তিনি একটি উপন্যাসিকা লিখেছিলেন যেটি পড়ার মাধ্যমেই আমি প্রথম সুনীলদা’র কাজের সাথে পরিচিত হই। সুন্দরবনের মরিচাঝাঁপিতে উদ্বাস্তুদের বসবাস নিয়েই তিনি প্রথম কলম ধরেছিলেন (আমার উপন্যাস “দ্যা হাংরি টাইড”–এ এই বিষয়গুলি পাওয়া যাবে)। আমি বিশেষভাবে তার ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি খুব পচ্ছন্দ করতাম, যেমন– সেই সময় (এটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল “দ্যোজ ডে” নামে)। উনিশ শতকের কলকাতা নিয়ে আমাদের দু’জনেরই আগ্রহ ছিল লক্ষ্য করার মতো।
আমি আর সুনীল’দা বন্ধু হবার বহু আগে থেকেই একে অপরের কাজের ব্যাপারে সমর্থন জুগিয়ে গেছি। বাঙলার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘দেশ’–এ তিনি আমার বইয়ের প্রায়ই সমালোচনা লিখতেন। তিনি প্রায়ই আমাকে বলতেন– “তুমি ইংরেজি ভাষায় বাংলা উপন্যাস লিখো”–কথাগুলি আমি আজও স্মরণ করি।
সুনীল’দা বাংলা ভাষাকে গভীরভাবে অনুভব করলেও বই-পুস্তকের ব্যাপারে তিনি যেটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন সেটি হল লেখার গুণকে, কোন ভাষায় বইটি লেখা হচ্ছে, সেটিকে তিনি বেশি পাত্তা দিতেন না। অ্যালেন গিন্সবার্গের চেয়ে আর কোনো লেখক তাকে বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি। 

একজন মানুষ এবং লেখক হিসাবে সুনীল’দার সব থেকে বড় গুণ হল তিনি সব কিছু গ্রহণ করতে এবং স্বীকৃতি দিতে পারতেন। পাশাপাশি একটি ভাষা অন্য একটি ভাষাকে কিভাবে প্রভাবিত করছেন, সেটিকে দেখাতেও তিনি খুব উৎসাহ দিতেন। “ইন্ডিয়ান রাইটিং ইন ইংলিশ, রেজিওন্যাল রাইটিং, ইউরোপীয়ান লিটারেচার”–এই ধরনের লেবেলিং-এ তিনি মোটেও বিশ্বাস করতেন না। তিনি জানতেন যে সাহিত্য জীবন আসলে একটি ঘূর্ণিস্রোতের ভেতরে বসবাস করে যেটি প্রকৃতপক্ষে কয়েকটি নদীর মিলিত স্রোতে তৈরি হয়। 
কলকাতাকে সুনীল’দা অনেক কিছু দিলেও সবচেয়ে মূল্যবান যেটি দিয়েছেন সেটি ছিল– তিনি এমন ধরনের কসমোপলিটন সাহিত্যিক সংস্কৃতিকে লালন করেছিলেন যেখান থেকে কারোরই বাদ যাবার সুযোগ ছিল না। এটি আমার মধ্যে বিশেষ ধরনের অগ্রাধিকার বোধের জন্ম দিত যখন আমি দিল্লী, লন্ডন, নিউওয়ার্ক বা যেখানেই থাকি না কেনো। কেননা এই সকল স্থানে সেই সকল লেখককে নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয় যারা বিভিন্ন ভাষায় লিখে থাকেন। আমি এই রকম একটি সাহিত্যিক সংস্কৃতির অংশ হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যেখানে বিভিন্ন ভাষা একটি অপরটি থেকে গ্রহণ করে এবং সম্মৃদ্ধ হয়।
২০০৪ সালে কলকাতায় সুনীল’দা আমার উপন্যাস “দি হাংরি টাইড”–এর মোড়ক উন্মোচন করেন। সেখানে আমার আরেক বন্ধু ও প্রকাশক প্রয়াত রবি দেয়ালও উপস্থিত ছিলেন।

 

ছবি ও ইলাস্ট্রেশন ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।