রাত ০৯:৪৪ ; রবিবার ;  ০৫ এপ্রিল, ২০২০  

‘ইন্টারনেট হোক উন্নয়নের পাসওয়ার্ড’

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

শফিউল আলম।।

বিশ্বকে এক সুতোয় সংযুক্ত করেছে শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার ইন্টারনেট, তথ্য ও যোগাযোগ বিপ্লবের মাধ্যমে আমাদের সামগ্রিক আর্থসামাজিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। উন্নয়ন, শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসা, যোগাযোগে কোথায় নেই প্রযুক্তি, ইন্টারনেটের ছোঁয়া। বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে।

গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ ৫ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহক সংখা পূর্ণ করল। নিঃসন্দেহে এই সংখাটি বা অর্জনটি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক । আমাদের জনসংখার আধিক্যই ইন্টারনেট ইকোনমির মুল চালিকাশক্তি হবে । বাংলাদেশকে আজ ফ্রনটিয়ার ফাইভ বা নেক্সট ইলেভেন অথবা এমারজিং ইকোনমি ক্লাসিফাইড করার অন্যতম প্যারামিটার এই বিশাল যুবশক্তি এবং তার সঠিক উৎপাদনশীলতায় সংযুক্তি। কৃষি, সেবা অথবা পোশাক শিল্পের পাশাপাশি অতিদ্রুত জ্ঞানশিল্পের উন্নয়ন এবং বিকাশ আমাদের জন্য প্রয়োজন। আর এই বিকাশের একমাত্র মাধ্যম ইন্টারনেটে সংযুক্তি এবং এর সহজলভ্যতা ।

সফটওয়্যার ও তথ্যসেবা ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বেসিস, মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন এবং বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে দেশব্যাপী ৫- ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক- ২০১৫। দেশের প্রধান ৩টি নগরীতে প্রদর্শনী এবং ৪৮৭টি উপজেলায় ডিজিটাল মেলারও আয়োজন করা হয়েছে। তাছাড়া থাকছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষামূলক এবং ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠান। এছাড়া উৎসবে থাকছে ওয়েব পোর্টাল, ই-কমার্স, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং স্থানীয় আইটি উদ্যোগগুলোর প্রদর্শনী, পাশাপাশি থাকছে পলিসি ডায়ালগ । সাধারণ মানুষকে ইন্টারনেটের প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা এবং পণ্য দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া, পাশাপাশি প্রতিবছর ১ কোটি করে গ্রাহক সংখা বৃদ্ধি করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।

বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক ২০১৫ -কে শুধু একটি শোকেস ইভেন্ট হিসেবে দেখা উচিত হবে না। শিক্ষা, বিনোদন এবং সচেতনতার পাশাপাশি ৫ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহকের প্রত্যাশাগুলোকে অর্থবহভাবে রূপান্তর করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত । আমাদের সামগ্রিক ইন্টারনেট অবকাঠামো, মূল্য, ইউজেস ফ্রেমওয়ার্ক, স্থানীয় কনটেন্ট, নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতা এবং পলিসি রিফর্ম বা উত্তরেণের চেষ্টা করা, আমাদের এক একটি পলিসি ডায়ালগ থেকে এক একটি সমস্যার সমাধান আনার চেষ্টা করায় শ্রেয় । আমাদের মূল উপাদানগুলো চিহ্নিত করা উচিত, যেখানে ইনক্লুসিভ প্ল্যানের দিকে এগুতে হবে। স্টেক-হোল্ডারদের একযোগে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে সর্বশেষ ডিজিটাল টাস্বফর্সের আনিত প্রস্তাবনার অন্যতম ইন্টারনেটের দামের একটি যুতসই সমাধান প্রত্যাশিত।

ইন্টারনেট অবকাঠামো, গ্রাহক ও ব্যবহার:  

গতবছর ২০১৪ সালের নভেম্বরে আইটিইউ (ইন্টারনেশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন) -এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বনিম্ন র‌্যাংকিং করেছে। ২০১৩ সালে আইডিআইতে (আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স) এশিয়া প্যাসিফিকে বাংলাদেশকে ২৭তম র‌্যাংকিং করেছে ২৯টি দেশের মাঝে, যেখানে বাংলাদেশ শুধু মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের উপরে।

আমাদের দেশের ৫ কোটির কিছু অধিক ব্যবহারকারীর মাঝে ৪ কোটি ৯০ লাখই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যাবহারকারী। দুঃখজনক হলো আমাদের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যাবহারকারীর মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হয় ফেসবুক ব্যবহারে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যান্ডইউথ রয়েছে বর্তমানে ২০০ গিগা। এর মধ্যে ব্যবহার হয় মাত্র ৩০ গিগা। আগামী বছর আরও যুক্ত হবে ১ হাজার ৩০০ গিগা।গতমাসে ব্যান্ডউইথের দাম ৬২৫ মেগা করা হলেও গ্রাহক পর্যায়ে এর সুফল আসবে না, কারণ এটি ‘স্লট বেজড’ চার্জ কমানো হয়েছে, যেমন ৫ গিগা, ১০ গিগা। একক কোনও আইআইজির ( ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) এত বড় ভলিয়ুম নেওয়া সম্ভব নয়। ইন্টারনেটের দাম না কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে অবকাঠামো বা ন্যাশনাল ইন্টারনেট ব্যাকবোনের কাজ এখনও সম্পন্ন না হওয়া।

ইন্টারনেটের দাম:

ওইয়াম্যাক্স, ৩জি বা ৪জি প্রযুক্তি অনেক ব্যয়বহুল তাই এর দাম কখনও গ্রাহক পর্যায়ে অতি সুলভে পৌঁছানো কঠিন। তাই হয়ত সারা পৃথিবীতে এর অধিক দাম আমাদের প্রকৃত ইন্টারনেটের উপকারিতা পেতে হলে অবশ্যই ফাইবার ক্যাবল বেজড ব্রডব্যন্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকেই প্রাধান্য দিতে হবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে এর দাম প্রয়োজনে সাবসিডি দিয়ে হলেও সুলভে আনতে হবে। আরেকভাবে ইন্টারনেটের গতি ভালো পাওয়া   যেতে পারে, আমাদের বিডিআইএক্স সার্ভার ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে হোস্ট করে যারা আইএসপির টরেন্ট ব্যবহার করেন দেখবেন তাদের ফাইল ট্রান্সফার গতি অনেক বেশি। কারণ কনটেন্টগুলো স্থানীয়ভাবে হোস্ট করা। প্রায় সব আইএসপি বিডিআইএক্সে সংযুক্ত । আমাদের নিজস্ব ন্যাশনাল ডেটা সেন্টারও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের স্টেক-হোল্ডারদের সমন্বিত উদ্যোগের কোনও বিকল্প নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও আইএসপি এবং মোবাইলফোন অপারেটরগুলোকে নির্দেশনা  দিয়েছেন ইন্টারনেটের দাম কমানোর।

ডিজিটাল কনটেন্ট এবং স্বাক্ষরতা:

আমরা সাধারণত সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক খবর, প্রোপাগান্ডা, গসিপ ছাড়া কার্যকরি বা উপকারী কনটেন্ট খুব কমই দেখতে পেয়েছি। আমাদের ছোট পরিসরে হলেও এখনই কিছু কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় কনটেন্ট বাড়াতে হবে,প্রয়োজনে লোকাল সার্ভারে সরকারি সহযোগিতায় হোস্ট করার প্ল্যাটফর্ম দিতে হবে যাতে করে ভিডিও ,অডিও, টেক্স কনটেন্ট রাখতে পারে। প্রয়োজনে হ্যাকাথন আয়োজন করা যেতে পারে, যেভাবে গুগল ট্রান্সলেটরের কন্টেন্ট করা হয়েছে।

ইন্টারনেটভিত্তিক স্থানীয় সেবা বা পণ্য:

উদ্যোক্তা বলতে আমরা অনেক সময় নতুন কিছু উদ্ভাবনকে বা উপযোগী ব্যবসাকেই বুঝি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হওয়া উচিত কোনও সমস্যাকে শনাক্ত করে তা সমাধান করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার সমস্যা স্টার্টাআপ কোম্পানি তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাধান করেছে যুব উদ্যোক্তারা। যা আমাদের দেশের যুবকরাও করতে পারে, আমাদের নীতি নির্ধারকদের বিবেচনায় নেয়া উচিত শুধু তথ্যভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়ন না করে জনস্বার্থে ইউটিলিটি সেবা বা পণ্য তৈরিতে সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত।

ইলেকট্রনিক মানি ই-মানি বা ইলেকট্রনিক অর্থ হচ্ছে ই-কমার্সের প্রধান উপাদান। বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক পেমেন্ট মেথড সবার আগে সমাধান করার প্রচেষ্টা করা। সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সংস্থা একযোগ সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করে সম্ভাব্য সব সেবা জিজিটালি বা অনলাইনে প্রদান করা।

ইন্টারনেট হোক উন্নয়েনের পাসওয়ার্ড এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার ।

লেখক: দেশীয় মার্কেটপ্লেস বিল্যান্সারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী

/এইচএএইচ/  

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।