রাত ১১:২৪ ; বুধবার ;  ১৫ আগস্ট, ২০১৮  

একইসঙ্গে মেধাবী ও সৃজনশীল মারুফা

প্রকাশিত:

তারুণ্য ডেস্ক।।

মেধাবী ও সৃজনশীলতা। দুটি বৈশিষ্ট্যের সম্মিলন যদি পাওয়া যায় কোন একক ব্যক্তির মধ্যে তাহলে তিনি হয়ে ওঠেন বড় সম্পদ। আর আমাদের সেই ‍সৃজনশীল মেধাবী ব্যক্তিত্বটি হচ্ছেন মারুফা ইসহাক। শিক্ষায়, গবেষণায়, উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, সাহিত্য, ভাষান্তর থেকে সংগীত চর্চা।এক কথায় বলা চলে হেন কোন ঘরানা নেই যেখানে স্পর্শ নেই মারুফার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক করার পর স্নাতকোত্তর করছেন সমুদ্র বিজ্ঞান থেকে। এখন ভারতে অবস্থান করছেন গবেষণা কাজের জন্য

 তরুণ হিসেবে এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছেন উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক আর্ন্তজাতিক সম্মেলনে।আর  দিনকে দিন বাড়ছে এই ইর্ষণীয় মেধাবীর কর্মক্ষেত্রের বিশালতা। সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে  অনলাইন সাক্ষাতকারে জানালেন তার বর্তমান কাজকর্ম ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা

প্রশ্ন:যেহতু এই মুহূর্তে ভারতে রয়েছেন গবেষণা কাজের জন্য তাহলে সেটা নিয়েই প্রথমে কথা বলি। আপনি কি নিয়ে গবেষণা করছেন বর্তমানে?

বর্তমানে আমি ভারতের গোয়া শহরে আছি। এক মাসের বেশি হয়ে গেছে এখানে এসেছি। এখানকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ওশনোগ্রাফিতে (এনআইও) বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রস্রোত নিয়ে গবেষণা করছি। ফ্রান্স দূতাবাস এবং এনআইও এর যৌথ ফেলোশিপ পাওয়ার মাধ্যমে আমি এখানে এসে বড় বড় সমুদ্রবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।   

সব সময় হাসিখুশি মারুফা ক্যাম্পাসের প্রিয় মুখ

প্রশ্ন:এ গবেষণা কাজের প্রয়োজনীয়তা বা প্রয়োগ সর্ম্পকে বিস্তারিত বলবেন।

যদিও বলতে কষ্ট হয়, তবুও বলতে হয়-সমুদ্র নিয়ে গবেষণা ও পড়াশোনাতে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে আছে। এ কথাটা আগে কেবল শুনতাম, তবে এবারে বেশ ভালোভাবে টের পাচ্ছি। এ পর্যন্ত ভারত বঙ্গোপসাগর নিয়ে যত কাজ করেছে, আমার ধারণা এর অর্ধেক কাজও আমাদের দেশে হয়নি। আমাদের সমুদ্র জয় হয়েছে। বিশাল এক অংশ ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে বুঝে পেয়েছি। তাই সমুদ্র নিয়ে কাজের ক্ষেত্রও অনেক বেশি। ধরুন, কারও হাতে একটা হাজার টাকার নোট দেওয়া হলো। কেউ যদি সেটা না বোঝে যে এটা হাজার টাকার নোট, তবে সেটা তো তার কাছে একটা ফালতু কাগজ মাত্র। তেমনি আমাদের বিশাল বঙ্গোপসাগর আছে। আমরা তো এখনো এই সাগরকে বুঝেই উঠতে পারিনি। তাই আগে একে জানতে হবে, এরপর আসবে সমুদ্রসম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার বিষয়। আমি আশা করছি, আমার গবেষণার মাধ্যমে কিছুটা হলেও নানা ধরনের জিজ্ঞাসার জবাব মিলবে।

প্রশ্ন: আমরা জানি আপনি নিয়মিত পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশের পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী কোন কাজ করার পরিকল্পনা?

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ থেকে অনার্স করেছি। এখন মাস্টার্স করছি সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে। ইদানিং সমুদ্র ও সামুদ্রিক পরিবেশ আমাকে খুব টানছে।তাই আপাতত কাজের মনোযোগটা এদিকেই রয়েছে। তবে পরিবেশের তো অনেক ক্ষেত্র আছে। তাই যখনই মনে হয়, পরিবেশের কোনও বিষয়ে আমার কিছু করার রয়েছে -আমি চেষ্টা করি এবং ভবিষ্যতেও করব। 

প্রশ্ন: ভাষান্তর করছেন, লিখছেন ছোট গল্প, সাহিত্যের নানা অঙ্গনে পদচারণা, বিস্তারিত কোনও পরিকল্পনা আছে কি?

না, এ ব্যাপারে কোনও পরিকল্পনা নেই। সাহিত্যের জগতটা আমার কাছে একটা হুটহাট হারিয়ে যাবার জগত। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই যে বইটা খুললাম, আমি আর নেই, আমি আরেকজন হয়ে গেছি।অন্য একটা সকাল-সন্ধ্যার জীবনে গিয়ে আমি হাসছি, কাঁদছি, আনন্দ করছি। আবার, যখন কিছু লিখতে বসি, মনে হয়- সময়ের একটা অংশকে আমি আটকে রেখে দিচ্ছি। হয়তো আধঘন্টা পর অথবা বহু বহু বছর পর যখন কেউ আমার লেখাটা পড়বে, তখন আমার এই আটকে রাখা সময়টুকুর মধ্যে সে দুম করে ঢুকে পরবে। তাই সাহিত্য আমার ভীষণ রকম আনন্দ আর ভালোবাসার জগত। আমি অন্যদের লেখা পড়ে মুগ্ধ হই, আর কিভাবে নিজের লেখালিখি আরো ভালো করতে পারবো-সে চেষ্টা করি।  

প্রশ্ন:দেশের বাইরে বেশ কয়েকটি পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন, কোথায় কোথায় এবং সে অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন মজার স্মৃতি?

দেশের বাইরে বেশ অনেকগুলো পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনে অংশ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ছিল নেপালে, চীনে, ভারতে। আবার, কাতারে গিয়েছিলাম এশিয়া-প্যাসিফিক ইয়োথ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন কোপ-১৮ তে অংশ নিতে। প্রত্যেক সম্মেলনেই সিরিয়াস অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কিছু মজার অভিজ্ঞতাও থাকে। চীনের অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়।সম্মেলন চলাকালীন বহু চীনা তরুণ-তরুনী আমাকে প্রশ্ন করেছে যে আমি কোন দেশ থেকে এসেছি। যেই না আমি বলি, "ফ্রম বাংলাদেশ", তারা এমনভাবে তাকায় যেন আমি একটা এলিয়ন, টুপ করে দুনিয়াতে এসেছি। শেষমেষ এক চীনা প্রতিনিধিকে জোর করে ধরে ভূগোল বিশ্লেষণ করে বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে, আমি কোন দেশ থেকে এসেছি। আমাকে অবাক করে দিয়ে হঠাত চিতকার দিয়ে সে বললো, ওহহো, ইউ আর ফ্রম ম্যাংচিয়ালাকো? উফ! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তখন বুঝলাম, বাংলাদেশেকেও তারা একটা চীনা নাম দিয়ে রেখেছে, আর তাতেই আমার যত ভোগান্তি।এরপর চীনা ভাষা শেখার চেষ্টা চলেছে অনেকদিন। কিন্তু এখনো পুরোপুরি শিখে উঠতে পারিনি।

কাতারে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে

প্রশ্ন: পড়াশোনা,  লেখালেখি, গবেষণ তাহলে নিজের জন্য সময় বের করেন কি করে?

নিজের জন্য আলাদা ভাবে সময় বের করতে হবে এমনভাবে কখনও ভেবে দেখিনি। যতদিন বেঁচে আছি-সবটা তো আমারই সময়। একবার স্কুলে থাকতে ইংরেজী হোমওয়ার্ক ঠিক মতন করিনি। ম্যাডাম যেই জিজ্ঞেস করলেন, আমি বললাম-অনেক ব্যস্ত ছিলাম।তাই সময় করতে পারিনি। তখন ম্যাডাম বললেন, আমি ব্যস্ত-এই কথাটা কাজ না করার একটা অজুহাত মাত্র।এটা অলস মানুষের কথা। কোনও  কিছু করার জন্য তোমার ইচ্ছা আর পরিকল্পনাই যথেষ্ট। ম্যাডামের সেদিনকার এই কথাটা আমার প্রায়ই মনে হয়।এরপর থেকে 'আমি ব্যস্ত' এই কথাটা কাওকে বলতে আমার ভীষণ লজ্জা করে।    

প্রশ্ন: সৃজনশীলতা ও বিজ্ঞান, দুয়ের সমন্বয়ে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন, তরুণদের জন্য বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আমরা তরুণরা তো বিজ্ঞানের সঙ্গে একেবারেই জড়াজড়ি করে আছি। তবে আমার মনে হয়, যেখানে সৃজনশীলতা নেই, সেখানে আনন্দের ঘাটতি আছে-সেটা সাহিত্যে হোক, বিজ্ঞানে হোক বা পাস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই হোক। কবিতার মধ্যেও বিজ্ঞান থাকতে পারে, আবার বিজ্ঞানের মধ্যেও সাহিত্য থাকতে পারে। আমাদের সবার মধ্যেই সৃজনশীলতা আছে। কিন্তু আমাদের কি নেই তা নিয়ে আমরা এত বেশি হাহাকার করি যে, কি আছে সেটার দিকে প্রায় সময়ই নজর দিতে পারি না। আমি বিশ্বাস করি-আমরা তরুণরা যদি  বিজ্ঞান, দূরদৃষ্টি আর সৃজনশীলতার সমন্বয়ে পরিকল্পনা ও কাজ করতে পারি, তবে আমাদের দেশ অবশ্যই বিশ্বের সেরা দেশ হবে।

/এআই/এফএএন/  

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।