রাত ১০:১৯ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

আহ হাজাছড়া!

প্রকাশিত:

ফারুখ আহমেদ।।

এ বছর আগষ্টের শুরুর দিকে সাজেক উপত্যকা গিয়েছিলাম। সাজেক পৌঁছে সেখানকার ঘরবাড়ি, হেলিপ্যাড, মানুষজন, নৃগোষ্ঠীর জীবনযাপন আর প্রবল নিসর্গ দেখে মুগ্ধ আমরা! পরদিন সেই অসাধারণকে পেছনে ফেলে ফিরে চলি খাগড়াছড়ির দিকে। সাজেক থেকে ফেরার পথে আরও কত যে বিস্ময় অপেক্ষা করছিল কল্পনাও করিনি। সাজেককে বিদায় জানিয়ে খাগড়াছড়ির পথে রওনা হতেই মোবাইল ফোনে সুমনের ডাক- ‘ভাই হাজাছড়া ঝর্ণা দেখে আসবেন অবশ্যই।’ ঝর্ণার কথা শুনে সঙ্গীদের পাশাপাশি আমিও কেমন যেন একটা পুলক অনুভব করলাম। সামনে তাকাতেই দেখি চোখ জুড়ানো সবুজ জুম। অনেক দূরে পাহাড়ের শরীরে আটকানো ছোট ছোট ঘরবাড়ি। ছবির মত সে দৃশ্য সঙ্গে নিয়ে এবার আমাদের গন্তব্য হল না দেখা হাজাছড়া ঝর্ণা।

বর্ষা শেষে শরৎ শুরু হলেও টানা বৃষ্টিতে বর্ষার কথাই মনে হচ্ছিলো প্রতিদিন। সেদিনের সকালটাও শুরু হয়েছিল অঝোর বৃষ্টিতে। রোদবৃষ্টির যুগলবন্দীর সেই দুপুরে আমাদের মাইক্রোবাস ছুটে চলল বাঘাইহাটের হাজাছড়ার দিকে। পাহাড় ঘেরা সবুজ বনপথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। পথ চলছি ক্যামেরা সঙ্গে নিয়ে। এরই মাঝে বাইরে দৃষ্টি পড়তে দেখি বিচ্ছিন্ন বসতির অনেক পাহাড়ি শিশুরা আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। কেউ কেউ গাড়ির আওয়াজ পেয়ে ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে বিদায় বলার সুযোগটুকু ছাড়তে চাচ্ছে না। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথ চলতে চলতে একসময় পৌঁছে গেলাম বাঘইহাটের কাছে হাজাছড়া। পথের পাশেই ছোট্ট করে লেখা শুকনাছড়া ঝর্ণা। নাম শুকনাছড়া ঝর্ণা হলেও এলাকার নাম হাজাছড়া হওয়ার কারণে ঝর্ণার নামও লোকমুখে হাজাছড়া হয়ে গেছে। আমরা মাইক্রোবাস থেকে যেখানে নামলাম তার পাশেই একটি মনিহারি দোকান। দোকানির বউ বসে দাবা টানছে। পাশে দোকানি দা দিয়ে মুলি বাঁশ কাটছে। এখানে বলে রাখি দাবা হচ্ছে হুকোর পাহাড়ি রূপ। লম্বা বাঁশের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে বাঁশে মুখ লাগিয়ে দম দিলেই ধোঁয়া বের হয়। এখানে ছোটবড় সবাই দাবা টানে। আমাদের সম্রাট, প্লাবন আর শরীফকেও দেখলাম দাবা টানার চেষ্টা করতে। এভাবেই দাবার সেই টান পেছনে ফেলে এগিয়ে চললাম শুকনাছড়া বা হাজাছড়া ঝর্ণার দিকে।  

হাজাছড়া ঝর্ণাটি বেশ জনপ্রিয়। কারণ অবশ্য আছে। পথের ধারে এমন চমৎকার একটি ঝর্ণা জনপ্রিয় না হয়ে পারেই না। মনিহারি দোকানির বউয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ঝর্ণা কতদূর। তিনি জানিয়েছিলেন ১৫ মিনিট হাঁটো, ঝর্ণা পেয়ে যাবে। আমরা তার কথা অনুযায়ী পা বাড়ালাম। এবার সবুজ জংলার পথ। পথের সৌন্দর্য এক কথায় অসাধারণ।

দুপাশে নাম না জানা গাছের সমাহার। বহু দুষ্প্রাপ্য ঔষধি গাছের পাশাপাশি দেখা পেলাম অতি পরিচিত নিশিন্দার। বৃষ্টির ছোঁয়ায় অসাধারণ সবুজ যেন ফিরে পেয়েছে প্রাণ। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। এমন সবুজকে সঙ্গী করে আমরা আঁকাবাঁকা ঝিরি পথ ধরে এগিয়ে চলি। সে পথেই দেখা হলো দুই স্কুল ফেরত বালিকার। তারা ঝিরির কোমর পানি পার হচ্ছিলো। আমরা ছায়াঘেরা সে ঝিরিপথ পেরিয়েই শুনি ঝর্ণার শব্দ।

শব্দের সঙ্গে ছুটে আসে ঝর্ণা জলের ঝাঁপটা। এর মধ্যে শুরু হয়েছে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আমরা বৃষ্টি আর ঝর্ণার কলকল ধ্বনির সঙ্গে মাটির সোঁদা গন্ধ নিয়ে আরও সামনে এগিয়ে যাই। ঝর্ণার সৌন্দর্য দেখে আমাদের চোখ ছানাবড়া! কী অপরূপ উচ্ছ্বাস! ফারাবী ‘ঐ তো ঝরনা’- বলেই ছুট লাগায়। তার সঙ্গ নেয় প্লাবন আর শরীফ। সম্রাট এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ঝর্ণার দিকে। একসময় অস্ফুটে বলে ওঠে, ‘আহ, হাজাছড়া!’


প্রয়োজনীয় তথ্য
হাজাছড়া ঝর্ণা খাগড়াছড়ির বাঘাইহাটের হাজাছড়ায় অবস্থিত। অবশ্য হাজাছড়া পৌঁছলে সাইনবোর্ডে লেখা পাবেন শুকনাছড়া। নামে বিভ্রান্ত হবেন না, শুকনাছড়াই হাজাছড়া। হাজাছড়া দেখার এখনই মোক্ষম সময়। বছরের মে মাস থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বরের শেষ অবধি হাজাছড়া ঝর্ণা থাকে উচ্ছ্বসিত। এ ঝর্ণা দেখতে হলে  অপনাকে খাগড়াছড়ি যেতে হবে। ঢাকা থেকে খাড়গড়াছড়ি যাওয়ার সরাসরি বাস সার্ভিস আছে। খাগড়াছড়ি নেমে মটর সাইকেল, চান্দের গাড়িতে কিংবা দলবেঁধে গেলে নিজস্ব পরিবহনে চলে আসুন বাঘাইহাটের হাজাছড়া। হাজাছড়া গেলে সাজেক ঘুরে আসতে ভুলবেন না। সবচেয়ে ভালো সাজেক হয়ে তারপর চলে আসুন হাজাছড়া ঝর্ণার কাছে।

ছবি: লেখক

/এনএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।