সকাল ১১:৪২ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

দ্রোহভাষ্য নির্মাণে এডওয়ার্ড সাঈদ ও একবাল আহমদ || শরীফ আতিক-উজ-জামান

2

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

একবালকে নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রে তাঁর অতীতকে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জিটি রোড ধরে হাঁটছেন, জন্মভূমি বিহারে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে যাচ্ছেন যেখানে কংগ্রেস সমর্থক তার বাবা প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছিলেন, মুসলিম লিগ সমর্থক তার ভাইয়েরা পাকিস্তানে অভিবাসী হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন, কিন্তু তার মা দেশত্যাগে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন 

উত্তর-ঔপনিবেশিক পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে বিশ্বের যে ক’জন বুদ্ধিজীবী প্রতিবাদের মাধ্যমে শোষণের পালটে যাওয়া চেহারা মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে চিনিয়ে তাদের সচেতন করে তুলতে চেয়েছেন তাদের মধ্যে বিহারী (দেশবিভাগ পরবর্তীকালে পাকিস্তানী) বুদ্ধিজীবী একবাল আহমদ ও ফিলিস্তিনী জ্ঞানতাপস এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ অন্যতম। একবাল আহমদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে অবদান রেখেছিলেন তা অনেকের কাছেই অজানা। বিহারী নিধন নিয়ে পাকিস্তানী সংবাদপত্রের অতিরঞ্জনকে যেমন যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেছেন আবার আমেরিকায় পাকিস্তানী কূটনীতিকের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার অধিকারকে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পত্র লিখেছেন। এদেশের পীড়িত মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রাচ্যবাদ প্রতর্কের নির্মাতা হিসেবে যিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত তিনি এডওয়ার্ড সাঈদ। দুজনই আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে পাঠদান করেছেন। তাদের কাছে এই সভ্যতা নানাভাবে ঋণী।  যখন ডেভিড বার্সামিয়ান একাধিকবার একবাল আহমদের কাছে সাঈদের বুদ্ধিবুত্তিক অবদান সম্পর্কে প্রশ্ন রেখেছেন, তখন তিনি বলেছেন: ‘আমার মতে প্রাচ্যবাদের প্রবক্তারূপে আবির্ভূত হওয়ার পর সাহিত্য সমালোচক হিসেবে সাঈদের একক কৃতিত্ব হলো সাম্রাজ্যবাদ বিতর্ককে পাশ্চাত্য সভ্যতার একেবারে কেন্দ্রে টেনে নিয়ে আসা। তিনি সমগ্র প্রতীচ্যের বিস্তার, দুনিয়াব্যাপী মোড়লীপনা এবং সাম্রাজ্যবাদকে বর্তমান সভ্যতার প্রধান নেতিবাচক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।’ একজন সৎ ও কৃতি বুদ্ধিজীবীই পারেন এভাবে আরেকজন সত্যিকার প্রাজ্ঞজনের নির্মোহ মূল্যায়ন করতে। আর সেই কারণেই বোধহয় সাঈদ একবালকে তার গুরু মানতেন। তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে My Guru নামে তিনি নিবন্ধও লিখেছেন এবং তার ‘কালচার ও ইম্পেরিয়াইজম’ বইটি তাকে উৎসর্গ করেছেন। তার সম্পর্কে লিখেছেন: ‘জীবন, কর্ম ও চিন্তায় একবাল শুধুমাত্র সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে ধারণ করেন নি বরং তার সমগ্র অভিজ্ঞতার বুননে অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও লঘুকরণ সূত্রের চেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের জীবন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অভিজ্ঞতায় তিনি তার দাপট উপলব্ধি করার পাশাপাশি তাকে প্রতিহত করতে মানুষের সৃষ্টিশীলতা, মৌলিকত্ব ও স্বপ্নকে অনুধাবন করেছেন। আর এই ৩টি শব্দ― সৃষ্টিশীলতা, মৌলিকত্ব ও স্বপ্ন তার রাজনীতি ও ইতিহাস চেতনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে।’ এই দুই কৃতি বুদ্ধিজীবী জ্ঞান, ক্ষমতা ও প্রতিবাদের মধ্যকার সম্পর্কের স্বরূপটি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মোকাবিলা করার জন্য তারা তাদের লেখনীতে আগামি প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশনা রেখে গেছেন।

একবাল আহমদ

তাঁরা প্রায় সমবয়সী। একবালের জন্ম ১৯৩৩ কিংবা ১৯৩৪ সালে আর এডওয়ার্ড সাঈদের ১৯৩৫ সালে। দুজনেই জন্মেছিলেন তৎকালিন বৃটিশ উপনিবেশে― প্রথমজন ভারতে আর দ্বিতীয়জন প্যালেস্টাইনে।  শৈশব থেকেই উভয়ের রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। একবালকে নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রে তাঁর অতীতকে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জিটি রোড ধরে হাঁটছেন, জন্মভূমি বিহারে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে যাচ্ছেন যেখানে কংগ্রেস সমর্থক তার বাবা প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছিলেন, মুসলিম লিগ সমর্থক তার ভাইয়েরা পাকিস্তানে অভিবাসী হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন, কিন্তু তার মা দেশত্যাগে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন ইত্যাদি বিষয়গুলো এসেছে। তারপরও তারা দেশভাগের পর পাকিস্তানে চলে যান ৩০ মিলিয়ন উদ্বাস্তুর সঙ্গে। আধুনিক সময়ে এই বাস্তুত্যাগকে সবচেয়ে বড় উন্মূলন হিসেবে দেখা হয়। 
সাঈদেরও ইসরায়েল থেকে বিতাড়িত হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি জেরুজালেম থেকে মিশরে, সেখান থেকে একাকী আমেরিকা আর তার পরিবার লেবাননে যান। শরীরে কর্কট রোগের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর তিনি Out of Place নামে স্মৃতিকথা রচনা করেছেন যা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কিত নয়। এখানে ইতিহাস ঘেঁটে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে অন্যত্র মানুষ ভিটেছাড়া হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ঔপনিবেশিক শোষণ, সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উৎসাহিত হয়েছেন। ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার ১৯৬৯ সালে যখন ঘোষণা করলেন যে এখানে কোনো ফিলিস্তিনী নেই তখন সাঈদ প্রতি মুহূর্তে হারানোর বেদনা উপলব্ধির সাথে সাথে একটি মহাশক্তিধর বিশ্বের স্বরূপ দেখতে পেলেন। 
১৯৬৭ সালের যুদ্ধ সাঈদকে ফিলিস্তিনী রাজনীতির সংস্পর্শে নিয়ে আসে। তখন আরেক ফিলিস্তিনী বুদ্ধিজীবী ইব্রাহিম আবু লুগদ তাঁকে এই বিষয় নিয়ে কিছু লিখতে বলেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি লিখলেন The Arab Portrayed যা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Orientalism (1978)―এর শুরু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই নিবন্ধ একবাল আহমদকে এতটাই মুগ্ধ করে যে তিনি আবু লুগদকে তার হয়ে শুভেচ্ছা পৌঁছে দিতে বলেন। তাদের প্রথম দেখা হয় ১৯৬৮ সালে আমেরিকায় আরব সম্পর্কিত এক সেমিনারে যেখানে একবাল আহমদ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি তখন আলজেরিয়ায় ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট-এর হয়ে ফরাসি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। ভিয়েতনামে আমেরিকান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। তাঁর ভাষণে তিনি বলেন যে আলজেরিয়ার গেরিলা যুদ্ধ থেকে তার অভিজ্ঞতা হয়েছে সশস্ত্র বিপ্লব শত্রুতা নির্মূল করতে পারে না বরং যৌক্তিক দাবিকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। তিনি যুক্তি তুলে ধরেন যে সশস্ত্র সংগ্রাম ফিলিস্তিনীদের দাবিকে যৌক্তিক ভিত্তি দেওয়ার বদলে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের দাবিকে জোরালো করবে এবং ইহুদিরা আরব সহিংসতার বলি হচ্ছে― এমন প্রচারণায় সারাবিশ্ব ছেয়ে যাবে। যদিও সেখানে উপস্থিত ফিলিস্তিনীরা খুব নাখোশ হলেও সাঈদ খুব খুশি হয়েছিলেন। সেই প্রথম দেখার পর থেকেই তারা পরস্পরের বন্ধু হয়ে ওঠেন।
পরবর্তী বছরগুলোতে তারা হয়ে ওঠেন পরস্পরের সহমর্মী ও সহযোদ্ধা। সাঈদ ফিলিস্তিনী সংকট মোকাবেলায় একবালের পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং সত্তর দশকের শেষ দিকে যখন তিনি প্রবাসী প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল কাউন্সিল, ‘প্যালেস্টাইন জাতীয় পরিষদ’-এর সদস্যপদ গ্রহণ করেন তখন তিনি একবাল আহমদকে ইয়াসির আরাফাতের সাথে সাক্ষাতের জন্য বৈরুত আমন্ত্রণ জানান। তারা বুঝেছিলেন যে এই সংগ্রামে একবাল হতে পারেন তাদের প্রকৃত বন্ধু, কারণ তার একাগ্রতা, প্রতিশ্রুতিবদ্ধতাকে অবজ্ঞা করা ঠিক হবে না যদিও তিনি ফিলিস্তিনী নন। একবাল আহমদ জানাচ্ছেন যে সাঈদ তাকে বারংবার গান্ধী বা মার্টিন লুথার কিং-এর ধারায় অহিংস আন্দোলন করতে বলতেন, আরাফাত টুকে নিতেন, কিন্তু তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পথেই গেলেন। দুজনই পিএলও’র সহিংসতা ও পরবর্তীসময়ের অসলো চুক্তির কট্টর সমালোচক ছিলেন।  
বামপন্থী পাকিস্তানি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের Dawn of Freedom কবিতাটি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি-পরবর্তী সময়কালের বেদনা ধারণ করেছে। মানবতাবাদী এই মানুষটির সাথে ১৯৮০ সালে একবাল আহমেদ সাঈদের পরিচয় করিয়ে দেন। সাঈদ তখন বৈরুতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। সেই সন্ধ্যায় যে কবিতাগুচ্ছ আবৃত্তি করা হয়েছিল তা থেকে তিনি The Mind of Winter: Reflections on Life in Exile প্রবন্ধটি লেখার রসদ পেয়েছিলেন। কবিতা ও রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ক বিষয়ে সাঈদের নতুন প্রতীতী জন্মেছিল। 
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক সাঈদ সাহিত্য সমালোচনা, সঙ্গীত, মধ্যপ্রাচ্য, ফিলিস্তিন নিয়ে অনেক জ্ঞানগর্ভ রচনা উপহার দিয়েছেন। তার Orientalism-এর বৈশ্বিক প্রভাবই উত্তর-ঔপনিবেশিক পঠনপাঠনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল বলে মনে করা হয়। তিনি সংবাদপত্রে রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত কলাম লিখতেন যেখানে মধ্যপ্রাচ্য, ফিলিস্তিন, ইসলাম প্রাধান্য পেয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্কে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন, তার কলমই ছিল তার অস্ত্র। অন্যদিকে একবাল আহমদ নিউ হ্যাম্পশায়ার কলেজে রাজনীতির অধ্যাপক ছিলেন। শুধু তাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণসংগ্রামে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। তার অবদানকে সাঈদ স্বীকৃতি দিয়েছেন ‘essentially performative achievements’ হিসেবে। অবসর গ্রহণের পর সাঈদ বন্ধুকে তার লেখনী প্রকাশের তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার লেখালেখিকে এভাবে বাতাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে দিতে পার না, সেগুলো জড়ো করে কয়েকটি খণ্ডে প্রকাশ করা দরকার যাতে সবাই পড়তে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কাজটি শেষ করার আগেই ১৯৯৯ সালে একবাল আহমদ মৃত্যুবরণ করেন। The Selected Writings of Eqbal Ahmad নামে তার লেখনীর একটি বড় সংকলন পাওয়া যায় তবে তাতে তার সব লেখনী সংকলিত হয় নি। 
একবাল আহমদ মনে করতেন যে দুই সময়ের সাহিত্য সমালোচনা রয়েছে: Orientalism লেখার আগে ও পরে। তিনি ওই লেখনীর প্রভাব স্বীকার করতেন যদিও তা মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক, কিন্তু ইসলাম সম্পর্কিত পঠনপাঠনে এর তেমন কোনো প্রভাব নেই। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেছেন যে বিশ্বের অন্য অংশের ইতিহাস, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক বিস্তার সম্পর্কে ওই বইটির গুরুত্ব অনেক বেশি। আর বার্নাড লুইস ও হ্যারল্ড ব্লুমের মতো প্রতিষ্ঠিত প্রাচ্যবাদীদের ধারণার বিপ্রতীপে তিনি মত প্রকাশ করেছিলেন যারা ইসলাম ও মুসলিমদের পাশব শক্তি ও দানব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রাণাতিপাত করছিলেন। সমগ্র মানবজাতির ইতিহাস যারা নির্মাণ করেছেন তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তা উপলব্ধির জন্য সাঈদ ব্লুম প্রমুখদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। মুসলিম জগৎকে আলাদা করে দেখার কোনো কারণ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। মুসলিম জগতের ভিন্ন মতাদর্শিক গোষ্ঠীগুলোকে মানবিক ও একত্রীকরণে সাঈদের ভূমিকা পালন করার মতো লোক তেমন আর দেখা যাচ্ছে না। 

এডওয়ার্ড সাঈদ

জোসেফ কনরাডের উপন্যাসের সমালোচনা করতে গিয়ে সাঈদ আমাদের দেখিয়েছেন যে সভ্য লন্ডন ও অন্ধকারের কেন্দ্র (Heart of Darkness) একইসাথে ভেঙে পড়বে এবং ইয়োরোপীয় সভ্যতার উত্তুঙ্গ শৃঙ্গ বর্বর আচরণের মাধ্যমে ধুলোয় মিশে যাবে। একবাল আহমদও তার Culture of Imperialism শিরোনামের বক্তৃতায় বলেছেন যে একদা বিশ্বজয়ের অর্থ ছিল ভিন্ন চেহারা বা থেবড়া নাকের মানুষের কাছ থেকে পৃথিবীকে কেড়ে নেওয়া। তিনি যৌক্তিক প্রশ্ন করেছেন, ‘একটি আলোকিত সভ্যতা কদর্য জিনিসের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকে কেন?’ সাঈদকে তার সমালোচকরা সবসময় আক্রমণ করতেন এই বলে যে তিনি পাশ্চাত্য-জ্ঞানের ত্রুটিবিচ্যুতির দিকে আঙুল তুলে মুসলিমদের জন্য পলায়নের সহজ পথ বাতলে দিয়েছেন যারা তাদের সব সমস্যার দায় পাশ্চাত্যের কাঁধে চাপিয়ে দিতে অভ্যস্ত। 
সাঈদ মিশরের সাপ্তাহিক আল-আহরাম আর একবাল পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন যেখানে তারা মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করেছেন যারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে বারংবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ঠাণ্ডা লড়াই শেষ হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বক্তৃতায় তিনি মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চায় অনীহা এবং সৃষ্টিশীল ও মানবিক ভাবনাকে এগিয়ে নিতে না পারার ব্যর্থতার জন্য হতাশা ব্যক্ত করেছেন। ‘এটা মুসলিমদের অন্ধকার যুগ,’ তিনি পাকিস্তানীদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘আত্মসমর্পন ও দালালি বারংবার পাগলামির কারণে ঘটে চলেছে। আমাদের অধঃপতন শুরু হয়েছে ১৮ শতকে যখন বুদ্ধিজীবীরা গোঁড়ামিকে আলিঙ্গন করেছেন এবং আলোকিত যুগ ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারসমূহ অবজ্ঞা করেছেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পাদে তারা তাদের জ্ঞান, বাগ্মিতা, ভাবনা-চিন্তা বিশেষ মতাদর্শের মানুষের উদ্দেশে প্রয়োগ করেছেন।’ Orientalism-এর সিলভার জুবিলিতে সাঈদ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিরোধ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘সমস্ত বৃহৎ সভ্যতা হলো বহুজাতিক সভ্যতা। ‘প্রাচ্য’ ও ‘প্রতীচ্য’ পদের তত্ত্ববিদ্যাগত কোনো স্থায়িত্ব নেই।’ ইয়োরোপ বিশ্বকে দুইভাগে ভাগ করেছে: প্রাচ্য ও প্রতীচ্য বা অসভ্য ও সভ্য: ওদের ও আমাদের শব্দবন্ধে। ইয়োরোপীয়রা প্রাচ্যবাদ শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের গৌরব জাহির করতে। নিজেদের তারা উৎকৃষ্ট জাতিসত্তার মানুষ হিসেবে ভেবে গর্ব বোধ করে। তার মনে করে যে বিশ্বে তাদের দায়িত্ব হলো অসভ্য জাতিকে সভ্য করে তোলা। সমস্যা হলো তারা সবকিছুকে সরলীকরণ করে ফেলে। সমস্ত বাজে বৈশিষ্ট্যের ধারক প্রাচ্য― এমন একটি ধারণা তারা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, সাহিত্য, গণমাধ্যম ইত্যাদির সাহায্যে সবসময়ই দিয়ে আসছে। এর মাধ্যমে তারা প্রাচ্যের যে নেতিবাচক চিত্রকল্প তৈরি করেছে তা সমগ্র ইয়োরোপীয়রা বিশ্বাস করে। প্রাচ্যের যে সমস্ত  বৈজ্ঞানিক প্রতীচ্যে গবেষণা করেন তারাও অভিন্ন ধারণা পোষণ করেন। তাদের সমস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। সাঈদের এই প্রভাববিস্তারী রচনা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। বস্তুত একবাল আহমদ ও এডওয়ার্ড সাঈদ বৈশ্বিক বুদ্ধিবাদিতার খোলনলচে পাল্টে মানুষকে নতুন এক ভাবনার দুয়ারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, যেখান দিয়ে প্রবেশ করলে তার আলো আমাদের গায়ে লাগতে বাধ্য।  

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।