রাত ০৮:১৯ ; বুধবার ;  ২৫ এপ্রিল, ২০১৮  

মঈনুস সুলতানের কবিতা

প্রকাশিত:

...আজ আমি কবিতা থেকে অনেক অনেক দূরে। তারপরও কবিতার প্রসঙ্গ ভাবলেই মনে উঁকি দেয় স্মৃতিপট। মনে হয় ‘পার্ট অব মি’, আমারই অবচেতনের একটি অংশ থেকে গেছে ‘আনস্পোকেন’, এ না বলা বিষয়টিকে অনুভব করি, মনে হয় বিমূর্ত, কখনো স্বতস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে তা শব্দে, রূপকল্পে, প্রকাশিত হয় ভাবে, ভালোবাসায় ও গল্পে

 

 

আঁধারের রূপালি ঝাড় 

হয়তো আমার চাই বল্গা হরিণ
নতুবা কেন যে পথ চলি ভলগা উপত্যকায়,
পায়ের নিচে তুহিন তুষার, ফারের টুপি
শ্বেত ভালুকের চামড়ার বিশাল চাপকান,
হাতে চকচকে বর্শা–
হিমেল নিঃসঙ্গতায় পিছনে একাকী অনুসরণ করে
কৃষ্ণ লোমশ আফগান হাউন্ড!

অথবা যেন বসে আছি অনন্তকাল স্প্যানিশ প্রস্তরে
মুঢ় রূপসীর মতো চপল ঊর্বশী ঝর্ণায়
গহীন রজনীতে তৃষ্ণার্ত হরিণের মতো দল বেঁধে নেমে আসে–
নক্ষত্রের সুবর্ণনীল কমলালেবু রঙ ছায়াপথ
আমি বসে থাকি প্রস্তরবৎ!

কেথায় যেন ফেরাউনের কফিন ঘিরে
কোলাহল করে কথা কয় কতিপয়
প্রত্নতাত্ত্বিক বাদুড়।

অই মমির মিশরী স্মৃতি, অই কুহক কল্পনা
আমার চোখের শিশিরে আঁকে–
জেব্রার মতো নকশাকাটা স্বপ্ন!

পৌরাণিক নিঃসঙ্গতায় আমার চাই বল্গাহরিণ
অথচ আফগান হাউন্ডের জ্বলজ্বলে সবুজ চোখ
চেতনার সৌরলোকে জ্বালিয়ে রাখে
আঁধারের রূপালি ঝাড়!


আবির মাখা কবুতর

পৈঠায় পা রেখে...খুব ধীরে...উঠে বসো 
জাফরানি রঙের পানসিতে–
খুঁজেছো যা...অনন্তের নক্ষত্রবীথি
আকুল হয়ে সারা দিনমান
বুনেছি বস্ত্র সুইসুতাহীন নিরস্ত্র...
পারি নি দিতে;

পাটাতনে বনঘুঘুর ডিম–
বাগিচায় খুঁড়ে পাওয়া কাঠবিড়ালীর জীবাষ্ম,
ভালোবাসায় নিরঙ্কুশ 
            সন্ন্যাসীর জটাজুটের মুখোশ...
তন্দুলে মাখানো ছাইভষ্ম;

হালে হাত রেখে তাকাও... 
দূরে– দেখতে কী পাও
হৃদয়ে নীলাভ হয়ে আসা সংযত দিগন্ত,
হাঁসছানা ধান...
কুয়াশায় অধীর 
         হারিয়ে যাচ্ছে দস্তা-মদির অনন্ত...

কথা বলার কিছু নেই
চুপচাপ থাকাটাই ভালো,
গলুই ছুঁয়ে পানকৌড়ির পাখায় ওড়ে 
রূপার আলো,
এ সময় আমাদের অতল নির্জন
বলা চলে তুমুল নির্বাক,
কান পেতে শোনো–
মাস্তুলের ওপর গুঞ্জন করে পোষা মৌচাক;

ভাসছে না–
চলছে দনকলস সর্ষের শুভ্রহরিৎ মাড়িয়ে
তালকুঞ্জের ওপর দিয়ে আশ্চর্য এ জলযান,
এ যাত্রায় বাহন আমাদের এমফিবিয়ান;

এসে তো পড়েছি–
সোনাঝরা সবুজ সায়র...ঘাসের গাঢ় বীজে
সুপারির স্মৃতিময় সারি,
ভবেরহাটে মননের মন্দ্র মনসিজে–

নাও...এগিয়ে দিচ্ছি পানদান...হাত বাড়াও
দেখতে কী পাও–
তবকে মোড়া রূপালি 
সৌরভ ছড়ানো জোড়া সরোবর,
জলে ভাসে আবির মাখা দুটি কাজলা কবুতর।


হীরক চূর্ণের নীল দ্রবণ

জানি তোমার এ ঘুম ভাঙিবে না–
                        ভাঙিবে না আর কোনো দিন।

শিলালিপির মতো স্থবির তোমার স্মৃতি
দ্যাখো কেমন সবুজ সজীব আজো
মানুষ মুখর ঊর্মির মতো বিস্মৃতি ভালোবাসে বড়ো বেশি–
অথচ তুমি ভুলো নি
মনে হয় ভুলিবে না কোনো দিন–
           সেই বৃষ্টিভেজা কাঠের বাড়ি
           টালির ছাদে গিরিবাজ কবুতরের গল্প;
সে কার জড়োয়া কাঁকন রিমঝিম শব্দে চন্দ্রাহত বিধুর,
প্রত্যাশার আবলুস আন্ধারে আরশিতে আরতির দ্বীপ জ্বালে!

তোমার পদ যুগল পর্যটনে ব্যস্ত
ধমনীতে লাফাচ্ছে রক্তিম উচ্ছ্বাস–
গতি এবং উষ্ণতা যদি জীবনের মর্মকথা হয়
তথাপি হতাহত মৃত তোমার হৃদয়;
তুমি পান করেছ চন্দ্রাহত হীরক চূর্ণের নীল দ্রবণ–
মর্মান্তিক গোধূলির অন্তিম আবেগে স্তব্ধ তোমার ভ্রমণ!

জোনাকি, শিশির, শঙ্খে চিত্রিত পৃথিবী অনেক...অনেক দূর
স্নায়ুতে শুক্লপক্ষের প্রগাঢ় তিমির
করতলে পতঙ্গের হরিৎ পাপড়ি, গোলাপের বিষণ্ন ডানা–
তুমি কোথায় যাবে?
কারা আলেয়ার মতো ডাকছে তোমাকে গভীর নিশীথে!
তুমি পান করেছ চন্দ্রাহত হীরক চূর্ণের নীল দ্রবণ...

তোমার করোটিতে কষ্টের হিম স্পর্শ
ঝাউবনের মতো নেশায় গভীর নিসর্গ
মেঘালোকে ডোবা সবুজ পত্ররাজি–
যেন কার দীর্ঘশ্বাসের মতো করুণ বাতাস!

মর্মর পাথরের চোখে নক্ষত্র অগ্নিতে জ্বলে অশ্রুর লাবণ্য
মনে হয় বুঝিবা পাষাণেরও প্রাণ আছে হর্ষ বিধুর...
তুমি শ্মশানচারীর মতো নিদ্রাবিমুখ...ঘোর অমানিশায়
জানি তোমার এ ঘুম ভাঙিবে না
                       ভাঙিবে না আর কোনো দিন!

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।