সকাল ১১:৩৯ ; বুধবার ;  ২০ জুন, ২০১৮  

ক্লিক করলেই যদি ছবি হতো!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এহতেশাম ইমাম।।

বলা হয়ে থাকে, পেশাদার আলোকচিত্রীরা একটু ভিন্নভাবে কাজ করেন বিয়ের ছবি নিয়ে। তারা বিয়েকে উপস্থাপন করেন গল্পের মতো করে। ছবিগুলো পরপর গল্পের মতো সাজিয়ে তৈরি করা হয় ব্রাইডাল স্টোরিবুক। আর সেরকম একটি কাজ সম্প্রতি দেখা গেছে সঙ্গীতশিল্পী এলিটা করিম ও নির্মাতা আশফাক নিপুণ বিয়েতে। প্রিয়মুখ এ দম্পতির জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে আয়োজনের ভিডিওচিত্রটি ছাড়া হয়েছিল ইউটিউবে, যেটি বেশ আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছিল।বিয়ের পুরো আয়োজনকে মাত্র আড়াই মিনিটে সুন্দর করে উপস্থাপনের দায়িত্বে ছিল দেশের প্রথম সারির ওয়েডিং ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠান 'ব্রাইডাল মোমেন্ট'। আর বিশেষ এ কাজটির নির্দেশনা থেকে চিত্রগ্রহণ, সিনেমাটোগ্রাফি সবই করেছেন ব্রাইডাল মোমেন্টের কর্ণধার সজীব পাল।

দেশে ওয়েডিং ফটোগ্রাফির খাতটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে দিতে যে মানুষগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে সজীব পালের নাম উল্লেখযোগ্য। ২০০৬ সালে ‘সজীব পাল ফটোগ্রাফি’ নামে যাত্রা শুরু করলেও, পরে নাম পরবির্তন করে রাখা হয় ’ব্রাইডাল মোমেন্ট’। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরের পথচলায় যুক্ত হয়েছে কয়েক হাজার ক্লায়েন্টের তালিকা আর তাদের জয় করে নেওয়া বিশ্বাস।

চিত্রগ্রাহক নয়, ক্যামেরাম্যান

বতর্মানে বাজারে যখন একটি শ্রেণি ওয়েডিং ফটোগ্রাফির মধ্যে খুঁজছে আরও বেশি সৃজনশীলতার ছোঁয়া, সেখানে অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও আটকে আছে সেই পাড়ার ক্যামেরাম্যানের দিকে। এ বিষয়ে বলতে গিয়ে সজীব বলেন, ‘ফটোগ্রাফার বলতে এখনও আমাদের দেশের অনেকেই বুঝে সেই পুরনো দিনের ক্যামেরাম্যানের কথা। আর তারাই এ পেশা বেছে নেয়, যারা পড়ালেখায় ফেল করে কিংবা অন্য কিছু করতে না পারে। অথচ ছবি তোলার জন্য অনেকের আলাদা ঝোঁক থাকতে পারে, নেশা থাকতে পারে, কিংবা এটাই তার মূল পেশা হতে পারে এটা সবাই মানতে নারাজ। ’

অপেশাদার আচরণ ধ্বংস করেত পারে পুরো ইন্ড্রাস্ট্রি

বর্তমানে ওয়েডিং ফটোগ্রাফিকে তরুণরা বেছে নিচ্ছেন পেশা হিসেবে। অনেকেই পার্টটাইম তো অনেকে পুরোপুরি পেশা হিসেবে। তবে অনেকের অপেশাদারিত্ব দেশের সম্ভাবনাময় এ খাতটিকে ঝামেলায় ফেলে দিচ্ছেন বলে জানান সজীব। তিনি বলেন, ‘ছাত্র, ডাক্তার, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে অনেকেই পার্টটাইম উর্পাজনের একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন ওয়েডিং ফটোগ্রাফিকে। কিন্তু, মাঝে মাঝেই অভিযোগ আসে তাদের পেশাদারিত্ব নিয়ে। কারণ অসংখ্য অভিযোগের মধ্যে আছে প্রতি অসচতেন আচরণ থেকে শুরু করে পেশাগত বিভিন্ন ধরনের সখ্যতার অভাব। আর এটি সরাসরি প্রভাব ফেলছে পুরোপুরি পেশাদার ফটোগ্রাফারদের ওপর।’

যাদের জন্য ওয়েডিং ফটোগ্রাফি একটি পার্টটাইম পেশা তাদের প্রতি সজীব আহ্বান করেন, শুধু ক্ষণিক সময়ের জন্য উপার্জনের জন্য নয়, দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে আসা উচিৎ এ পেশায়। আর এ জন্য প্রয়োজন মানসম্পন্ন কাজ নিশ্চিত করতে সঠিক মূল্য নির্ধারণ। সেটি না হলে বিষয়টি সস্তা মনে হতে পারে।’

যাদের জন্য ওয়েডিং ফটোগ্রাফি একটি পার্টটাইম পেশা তাদের প্রতি সজীব আহ্বান করেন, শুধু ক্ষণিক সময়ের জন্য উপার্জনের জন্য নয়, দীর্ঘস্থায়ি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে আসা উচিৎ এ পেশায়। আর এ জন্য প্রয়োজন মান সম্পন্ন কাজ নিশ্চিত করতে সঠিক মূল্য নির্ধারণ। সেটি না হলে বিষয়টি সস্তা মনে হতে পারে।’

ক্লিক করলেই যদি ছবি হতো

অনেকেই ভাবেন দামি ক্যামেরা মানেই ভালো ফটোগ্রাফার। আর ক্যামেরায় ক্লিক করলেই ছবি উঠে যায়, তো এত টাকা নেওয়ার মানে কি! ফলে ফটোগ্রাফি সস্তা খরচ।আর যে কোন প্রোগ্রামে অনেক কিছু অনেক টাকা খরচ হলেও ফটোগ্রাফিতে বাজেট থাকবে সবচেয়ে কম। অথচ ছবি চাওয়ার বেলায় সেরা ছবি চাই সবারই। বেশিরভাগ মানুষই সাধ আর সাধ্যের মেলবন্ধন ঘটাতে যেন অপ্রস্তুত।

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিময় মুহূর্তগুলো ধরে রাখার মতো গুরত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালন করেন ফটোগ্রাফাররা। কিন্তু, অনেকেই দেখা যায় এই কাজটির সঙ্গে সম্পৃক্তদের কিছুটা ছোট দেখতেই পছন্দ করেন অনেকে। এ বিষয়ে সজীব বলেন, ‘পুরো কাজটি যখন ক্লায়েন্ট নির্ভর, সে ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে অনুষ্ঠানের কর্ম পরিকল্পনা সর্ম্পকে আগে থেকে গঠনমূলক পরিকল্পনা করে নেওয়া ভালো।’

নৃবিজ্ঞান গবেষক থেকে চিত্রগ্রাহক

২০০৩-০৪ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে পাস করেছেন সজীব। তবে ভিন্ন কিছু করার তাগিদ থেকে শুরু করেন ফটোগ্রাফি।এর মধ্যে কয়েকটি ফটোক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আর সেই পথচলার অংশ হিসেবে আজকের সজীব পাল আর তার প্রতিষ্ঠান ‘ব্রাইডাল মোমেন্ট’। যেখানে বর্তমানে কাজ করছেন স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক ৩০ চিত্রগ্রাহক ও সিনেম্যাটোগ্রাফার। তবে শুধু ভালো কাজগুলো নিজের মধ্যে রাখাকে অনেকটা কৃপণতা ভাবেন সজীব। সে কারণে তিন বছর আগে শুরু করেন ‘ফটো অপারচুনিটি স্কুলের’। ফলে এ পেশায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা সুযোগ পান একটি নির্ধারিত মূল্যে ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণের।

প্রদশর্নী বড় অর্জন

এক দশকের পথ চলায় অভিজ্ঞতার ঝুলিতে সজীব পাল অর্জন করেছেন অনেক কিছুই। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ সালে দেশের শ্রেষ্ঠ ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে জিতেছেন মিরর বিজনেস এ্যাওয়ার্ড। এছাড়া একমাত্র বাংলাদেশি ফটোগ্রাফার হিসেবে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছে মালয়েশিয়ার খ্যাতনামা শাদী ডট কমে সাক্ষাৎকার। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিজের পথচলার গল্প শোনাবার অভিজ্ঞতা তো আছেই।

ব্রাইডাল মোমেন্ট দিয়ে বাংলাদেশ সজীবকে চিনলেও, বাংলাদেশকে সজীব বিশ্বের কাছে চিনিয়েছেন আরো আগে। এর মধ্যে ২০০৫ সালে কোপেনহেগেন এ জলবায়ু সম্মেলনে প্রথম প্রদর্শনী হয় সজিবের তোলা ছবির। এছাড়া, ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে বিয়ে কেন্দ্রিক তোলা ছবির প্রদর্শনীতে। আর ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় সজীবের তোলা ছবির একক প্রদর্শনী।

দেশ পেরিয়ে বিদেশ…

বাংলাদেশের ফটোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি হচ্ছে ‘সহজলভ্য’। সজীব বলেন, বিভিন্ন দেশে ফটোগ্রাফারেরা পারিশ্রমিক হিসেবে বড় অঙ্কের অর্থ নিলেও, বাংলাদেশে এটি কম। তবে কাজের মানের দিক থেকে বিবেচনা করলে, অনেক ক্ষেত্রে দেশি অনেক ফটোগ্রাফার এগিয়ে আছেন। এরই মধ্যে মালয়েশিয়া, দিল্লি আর মুম্বাইয়ে ব্রাইডাল মোমেন্ট টিম নিয়ে বেশ কয়েকটি ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করেছেন সজীব। তবে, শুধু এশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে নারাজ নিজেদের। সে লক্ষ্যে ক্লায়েন্টদের আগ্রহে সম্মতি জানিয়ে ইউরোপ ট্যুরে বের হবার পরিকল্পনা করছেন সজীব। যেখানে ব্রাইডাল মোমেন্টে টিম নিয়ে পুরো ইউরোপ ঘোরার পরিকল্পনা করছেন বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।

কাভার ছবি: সাজ্জাদ হোসেন, অন্যান্য ছবি - ব্রাইডাল মোমেন্ট।

/এফএএন/

 

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।