রাত ১১:১২ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

হারাতে বসা ফলের গল্প

প্রকাশিত:

কুঞ্জ বিহারী।।

ফল খেতে কে না ভালোবাসে। সারা বছরই দেশে অনেক রকম সুস্বাদু ফল উৎপাদিত হয়। তবে এর অনেক ফল রয়ে যায় আমাদের ধাতব্যের বাইরে। অথচ এসব ফল যেমন সুস্বাদু তেমনি নানা ধরনের খাদ্য উপাদান সমৃদ্ধ। উৎপাদনহীনতা এবং নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার কারণে আমাদের ঐতিহ্যবাহী অনেক ফলই এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। জেনে নেওয়া যাক এমন কয়েকটি দেশীয় দুর্লভ ও সুস্বাদু ফলের কথা।

বেত ফল

ছোট ছোট গুটির মতো দেখতে, আঁশ দিয়ে ঢাকা থোকায় ধরা দারুণ এক ফলের নাম বেত ফল। অনেক অঞ্চলে একে বেতুইন বা বেতগুলাও বলে। এটি যেমন পুষ্টিকর তেমনি সুস্বাদু ও ঔষধিগুণ সমৃদ্ধ। মূলত মাটির অবস্থা ভেদে এই ফল খুব মিষ্টি হয়। অবার স্থান ভেদে একটু টকও হয়। বেত ফল মরিচ দিয়ে চাটনি করে খেতে খুব মজা । বাংলা মাসের চৈত্র,বৈশাখ এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে বেত ফল পাকে। পাকা বেতফল এমনি খেতেও খুব মজা। গ্রামে বেত গাছ হারিয়ে যাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে বেতফলও এখন হারিয়ে যাচ্ছে।

বেত ফল

ডেউয়া

গ্রাম বাংলায় প্রচলিত আরেকটি দুর্দান্ত স্বাদের ফলের নাম ডেউয়া। অনেক অঞ্চলে একে ঢেউয়া, বত্তা বা ডেফল বলেও চেনে। গ্রামাঞ্চলে একসময় প্রচুর ডেউয়া গাছ দেখা যেত। কিন্তু এখন তা অত্যন্ত বিরল হয়ে উঠেছে।

নরম এবরোথেবরো চামড়ার নিচে কাঁঠালের মতো কোয়াযুক্ত টক-মিষ্টি স্বাদের ডেউয়াতে রয়েছে ভিটামিন সি ও ক্যালসিয়াম। কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাসের কারণে পেটব্যথা কমাতে এই ফল দারুণ  সাহায্য করে। এছাড়া যকৃতের নানা অসুখ নিরাময়ে অব্যর্থ কাজ করে ফলটি। ফলের মধ্যে থাকা পটাশিয়াম রক্ত চলাচলে সহায়তা করে,রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে আনে,হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে থাকে ডেউয়া ফল।  

ডেউয়া 

 

কাউ

দেশীয় আরেকটি সুস্বাদু ফল কাউ। অনেকেই একে কাগলিচু বা কাউগোলা হিসেবেও ডাকে। ফলটি দেখতে অনেকটা লটকনের মতো হলেও আকারে খানিকটা বড়। পাকা ফল হলুদ বা কমলা রঙের হয়। যার ভিতরে থাকে টক-মিষ্টি স্বাদের ৪ থেকে ৫টি দানা।

দুর্দান্ত এই ফলটির মধ্যে রয়েছে ভিটামিন সি। সর্দিজ্বর ও ঠাণ্ডা প্রশমনে কাউফল উপকারী। এছাড়া এটি অরুচি দূর করে।

কাউ ফল

 

ফলসা

ফলসা বাংলাদেশের একটি অপ্রচলিত ফল। যদিও শহরের মানুষের কাছে অপরিচিত হলেও গ্রামাঞ্চলে এখনো টুকটাক এর দেখা মেলে। পাকা ফলসার রং খয়রি। ভেতরের শাঁস বেশ মিষ্টি। অনেকটা বেত ফলের মতো দেখতে ফলসাও ধরে থোকায়। এই ফলের রস গরমে ক্লান্তিনাশক। তাছাড়া স্কোয়াশ ও অন্য কোমল পানীয় তৈরিতেও এটি কাজে লাগে।

ফলসা

বেলুম্ব

বাংলার আরেক দুর্লভ ফল বেলুম্ব। অনেক অঞ্চলে একে বেলুম্বি ফলও বলে। সবুজ রঙের তীব্র টক স্বাদের এই ফলটি মেয়েদের অত্যন্ত প্রিয়। মাঝারি আকৃতির বেলুম্ব গাছ দেখতে অনেকটা কামরাঙ্গা গাছের মতো। এর পাতা,  ফুল ও ফল দেখতে খুবই সুন্দর। অনেক অঞ্চলে এই ফল ছোট মাছ ও ডালের সঙ্গে রান্না করেও খায়।

দারুণ এই ফলটিতে আমিষ, শ্বেতসার, চর্বি, খনিজ, ভিটামিন, কারোটিন, ক্যালোরি সবই আছে। এটি রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে।

বেলুম্ব

বৈচি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার গানে লিখেছিলেন-চলিতে পৈঁচি কি হাতের বাঁধিল বৈচি–কাঁটাতে, ছাড়াতে কাঁচুলির কাঁটা বিঁধিল হিয়ার ফলকে। কথা শুনেই বোঝা যায় বাংলার এর বিস্মরিত ফলের নাম বৈচি। আগে জৈষ্ঠের মধুমাসে দল বেঁধে ছেলে-মেয়েরা বৈচি ফল কুড়াতে যেত। বৈচির ডাল সূঁচালো কাঁটায় ভরা। ফল মটর ডালের আকারের এবং দেখতে গোল। কাঁচা খাওয়া গেলেও পাকা ফলই বেশি স্বাদের। পাকলে এর রং বেগুনি লালচে হয়ে ওঠে। রয়েছে প্রচুর এতে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম। যা দাঁতের বিভিন্ন অসুখ ও জন্ডিস সারাতে সাহায্য করে।

বৈচি

অড়বরই

একেবারেই আমাদের দেশীয় ফল অড়বরই। অনেকটা আমলকির মতো দেখতে টক স্বাদের এই ছোট ফলটিও থোকা থোকা ধরে। দেশের বিভিন্ন স্থানে একে নলতা, লেবইর, ফরফরি, নইল, নোয়েল, রয়েল, আলবরইসহ নানা নামে ডাকে। অড়বরই দিয়ে আচার, জুস, জেলি, চাটনি ইত্যাদিও তৈরি করা যায়। অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা লবণ দিয়ে খুব মজা করে এটি খায়। অড়বরইয়ের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন সি। এর বীজ দিয়ে লিভারের অসুখের টনিক বানানো হয়। এছাড়া পেটের অসুখ ও কৃমিনাশকে এর বীজ সহায়ক। এর রস চুলের গোড়ায় লাগালে চুল মজবুত হয়। তাছাড়া মৌসুমি জ্বর প্রতিরোধে ও মুখের রুচি ফিরিয়ে আনতে ফলটি বেশ কাজ করে।

অড়বরই

মাখনা

জলে জন্মানো গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ফল মাখনা। বিশেষ করে হাওড় বা বিল অঞ্চলে মাখনা বেশি পাওয়া যায়। ফলটির আকার অনেকটা লাটিমের মত। এর রঙ গাঢ় সবুজ। ফলটির গাছ অনেকটা শাপলা ফুলের গাছের মতো হলেও অজস্র তীক্ষ্ণ সুঁচলো কাঁটাযুক্ত। দারুণ সুস্বাদু খেতে মাখনার মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ফসফরাস। বর্তমানে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে মাখনার বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে।

মাখনা

চুকাই

খেতে দুর্দান্ত অথচ অনেকের কাছেই অিপরিচিত এক ফলের নাম চুকাই। টক স্বাদযুক্ত গাঢ় লাল রঙের ফলটি এখন বাংলাদেশে কম দেখা যায়। অথচ একসময় বাংলাদেশের সর্বত্রই এর দেখা মিলতো। বিভিন্ন অঞ্চলে একে চুকাই ছাড়াও চুকুল, হইলফা, মেডশ, মেট্টস বা মেষ্টা ইত্যাদি নামে ডাকে। এর পাতা ও ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, কেরোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান। চুকাইয়ের বীজ থেকে ২০ শতাংশ খাবার তৈল উৎপাদন হয়। অনেক অঞ্চলে এই ফল রান্না করেও খায়।

চুকাই 

 

আরএফ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।