সকাল ০৮:৫৭ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

শৃঙ্খলিত সুরমণ্ডলে এক জীবন...

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

ফেরদৌসী রহমান। নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান সঙ্গীত আর সম্ভারের। ষাটের দশক থেকে অস্তিত্বের প্রতিটি বুনটে জমিয়ে রেখেছেন সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা। তার বংশের ডালপালা যেদিকে অাছে, সেদিকেই বয়ে গেছে সঙ্গীতের ধারা। নিয়তই তার প্রশস্থতায় সমৃদ্ধ হচ্ছে সঙ্গীতাঙ্গন। সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে কিংবদন্তি এই শিল্পীর মুখোমুখি হয়েছিলেন গুণী সঙ্গীতশিল্পী ফাহমিদা নবী।

ফাহমিদা নবী: আপনাকে প্রশ্ন করতে চাইতে না। এই মুখোমুখি হওয়াটাকে অামি বলবো ভাবনা বিনিময়...। আপনি জীবনকে খুব সুন্দরভাবে দেখেন। আপনার দেখার সেই দৃষ্টি অন্যদের চেয়ে আলাদা। সাধারণের চেয়ে একটু বেশি গভীর। খুব সহজ জীবন আপনার। পাশাপাশি আপনার জীবনকে সঙ্গীত এমনভাবে ঘিরে থাকে, যে ওটা ভেদ করে ব্যক্তি ফেরদৌসী রহমানের জীবনে কেউ অনুপ্রবেশ করতে পারে না। বিষয়টি আমি আপনার কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করি...

ফেরদৌসী রহমান: আমি আসলে এতটা কোনওদিন ভাবিনি। তোমরা যে আমাকে নিয়ে এতটা ভাবো, তা শুনে ভালো লাগছে। হ্যাঁ, হয়তোবা কিছুটা বলয় ছিল। কাজ করতে গেলে অনেক সুবিধা-অসুবিধা চলার পথে আসে। তবে চেষ্টা করেছি, নিজের লক্ষ্যকে একটা নির্দিষ্ট বলয়ে রেখেই এগিয়ে চলতে। যাতে করে সেই লক্ষ্যের জায়গায় কোনও ধরনের নেতিবাচক ছায়া না পড়তে পারে। এটা এক ধরনের স্বাধীন বেড়াজাল। চাওয়াগুলোকে মানুষের চাওয়ার আদর্শ আর্শি বলতে পারো।

ফাহমিদা নবী: শুধু তাই না, আপনার প্রতিটি কাজেই থাকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। একদম অগোছালো নয়। যেটা শিল্পীদের বেলায় বলা যায়-- একটু বেশি থাকে। আপনার জীবনযাপন, শিক্ষাগ্রহণ- সবকিছুতেই বলতে হয় পূর্ণতা রয়েছে...

ফেরদৌসী রহমান: আমার এমনটা মনে হয় না। এখনও অনেক অপূর্ণতা আছে আমার। এখনও মনে হয় অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে। তবে একদিক থেকে পূর্ণ বলা যেতে পারে। কারণ এখন পর্যন্ত জীবনে যা-ই করেছি, তা পুরো আন্তরিকতার সঙ্গে এবং ভালোবাসা থেকে করেছি। কোনও খাদ রাখার চেষ্টা করিনি। অধ্যাবসায়ের এই শিক্ষাটা এসেছে পরিবার থেকে। আব্বা-আম্মা সবসময়ই কাজের প্রতি একাগ্রতার জন্য তাগিদ দিতেন। নিয়ম আর সময় মেনে চলার অনুশাসন তাদের কাছ ‌‌থেকেই শিখেছি। সেই শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দিনের সব কাজ এবং এ সংক্রান্ত দেওয়া প্রতিশ্রুতি টুকে রাখি ডায়েরিতে। আমিও অগোছালো, তবে এই নিয়ম-অনুশাসনগুলোর কারণে জীবনকে অনেকটাই সহজ করে সাজাতে পেরেছি।

ferdausi-rahman-ok-.JPG-22 ফাহমিদা নবী: একটা পর্যায়ের পর শিল্পী তো আর গাইতে পারে না। তখন তার অবসরের সময় হয়। এ কথাটা সত্যি, নাকি একজন শিল্পী সবসময়ই তার কাজের পূর্ণতার জায়গাকে অাগলে ধরে রাখতে চায়? তাহলে কি পুরো জীবন শিল্পীদের অবসর বলে কিছু নেই?

ফেরদৌসী রহমান: একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত শিল্পীদের কোনও অবসর নেই, এর সঙ্গে আমি কিছুটা একমত। তবে একটা সময় পরে অবশ্যই শিল্পীকে থামতে হবে। তখন আর শিল্পী গাইবে না, তবে সম্মানের জায়গা থেকে তিনি এক তিলও বিচ্যুত হবেন না। প্রত্যেক মানুষকেই তার কর্মের পর্যায়কে কাজে লাগাতে হয়, সেই পর্যায়ক্রমে আমি এই মুহূর্তেও ব্যস্ত গানের আণুষাঙ্গিক কাজ নিয়ে। যা আমাকে মৃত্যুর পরও বাঁচিয়ে রাখবে। এ ব্যাপারে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দায়িত্ব আমাকে সেই পথে এগিয়ে নেওয়া। এক সময় আমি নিজের কাজ দিয়ে এই অঙ্গনকে করেছি প্রাচুর্যময়। আজ এই অঙ্গন আমার জন্য তা করতে বাধ্য। এই বাধ্যতা কোনো অনুশাসন নয়। এই বাধ্যতা ভালোবাসার, শ্রদ্ধার...

ফাহমিদা নবী: আমি এই সম্মান আর শ্রদ্ধার জায়গা নিয়েই জানতে চাইছিলাম। আমরা কি আদৌ বর্ষীয়ানদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারছি?

ফেরদৌসী রহমান: আমাদের দেশে আসলে এই প্রথা প্রচলিত নয়। পাশের দেশ ভারতে গেলে দেখবে, সেখানে লতাজিকে (লতা মুঙ্গেশকর) কিভাবে পূজনীয় করে রাখে। আমাদের দেশে আসলে এখনও এ বিষয়ে শিক্ষার বিরাট একটা ঘাটতি রয়ে গেছে। তাই শিল্পীদের যথার্থ সম্মানটুকু আমরা দিতে পারি না। সম্মানের এই ঘাটতি যে শ্রোতাদের রয়েছে, এমনটা নয়। আমাদের নিজেদের পরিমণ্ডলেই বর্ষীয়ানরা আদরনীয় বা সম্মানীয় নন। অনেক আয়োজকই বলে থাকেন, ‌'এদের পরামর্শ কেন নেব? তাদের সময়কার কাজের চেয়ে আমাদের কাজের ধরন ভিন্ন।' এ ধরনের মনোভাবের মূল কারণ হিসেবে আমি বলবো ভীষণ শিক্ষার অভাব এবং যথার্থ ব্যক্তির যথার্থ জায়গায় না থাকা।

আমাকে কেউ সেলিব্রেটি বলে সম্বোধন করলে আমার কাছে অস্বস্তি লাগে। আমরা শিল্পী। আমাদের মূল পরিচয় এটাই হওয়া উচিত। কিন্তু ইদানীং দেখা যায় সবাই স্টার হওয়ার জন্য ছুটছে।

ফাহমিদা নবী: আপনার ব্যাপারে তো সবারই জানা। তবুও আপনার কাছে জানতে চাইবো আপনার শিক্ষাজীবন নিয়ে।

ফেরদৌসী রহমান: আমি সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার'স কনভেন্ট স্কুলে পড়তাম। তবে মেট্রিক দিয়েছি বাংলাবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। কারণ পরীক্ষার ছয় মাস আগে সিদ্ধান্ত হয় যে কনভেন্ট স্কুলে মেট্রিক পরীক্ষা হবে না। তখন আব্বা বললেন, কনভেন্টের পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই ছয় মাস বাংলাবাজারে পড়েই মেট্রিক পরীক্ষা দিলাম। এরপর ইডেন থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করলাম। স্নাতক আর স্নাতকোত্তর করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। স্নাতোকত্তোর শেষে লন্ডন ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকে ছয় মাসের জন্য পড়তে যাই। সেখানে পড়তে যাবার আগেও অনেক ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমে কথা ছিল আমি বোম্বে গিয়ে সঙ্গীতের ওপর উচ্চশিক্ষা নেব। গান শিখবো ওস্তাদ আমি খাঁ সাহেবের কাছে। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। টিকিটও চলে এসেছিল। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে চিঠি আসে যে, আমি ভারতে গিয়ে পড়তে পারবো না। তাই পরে লন্ডনে গিয়ে পড়তে যাবার অনুমতি চেয়ে আবেদন করি। এবং এর পরপরই সে সময়কার সরকার আমার আবেদন গ্রহণ করে। তারপর লন্ডনে যাওয়া। মজার বিষয় হলো, সেখানে আমি ছয় মাসের কোর্স চার মাসেই শেষ করে ফেলি। বাকি দুই মাস আমি কম্পোজিশন শিখছিলাম। কিন্তু কোর্স শেষ হবার এক মাস আগেই আবারো পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে চিঠি পাই আমি। তাতে লেখা ছিল যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে ডেলিগেশন টিম যাবে। তাই লন্ডন থেকে আমাকে তারা ডেকে পাঠালো।

Ferdousi rahman ফাহমিদা নবী: এখানে আমি একটু যোগ করতে চাই, অাপনার সঙ্গীতশিক্ষার পরের ধাপটি ছিল একটু আলাদা। আপনি সফলতার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম নারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। বিষয়টি কতোটা চ্যালেঞ্জিং ছিল আপনার কাছে? অার এখনতো কেউই এক্ষেত্রে অাসছেও না!

ফেরদৌসী রহমান: আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে, আমি এমন একটি সুযোগ পেয়েছিলাম এবং একে কাজে লাগাতে পেরেছি। প্রথম ছবি মেঘের অনেক রঙ। এটা করতে গিয়ে, কাজটিকে চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে এবং খুব উপভোগ করেছি। ছবির মূল বিষয় ছিল এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। সবচেয়ে মজার বিষয় কী জানো? সেখানে গল্পটায় যে উপকরণগুলো ছিল, সেগুলোর যথার্থ ব্যবহার না হলে দর্শক ঠিক সে বিষয়টার সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। যেমন, গাড়ির দরজা খোলার একটা শব্দ, দরজা বন্ধ করার আলাদা শব্দ। প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শব্দও আবহসঙ্গীতের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমি যেমন চেষ্টা করেছি প্রতিটি চরিত্র ও দৃশ্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সুর সৃষ্টি করতে। যেমন আমি একটা কষ্টের দৃশ্যে সুরমণ্ডলের সুর দিয়ে একটু ভিন্নতা আনার চেষ্টা করেছি। কিছু দৃশ্যে এসরাজ ব্যবহার করেছি। এভাবেই বেশ আনন্দ আর উত্তেজনার সঙ্গেই করলাম কাজটা। মেঘের অনেক রঙ ছবির আগেও কয়েকটা ছবিতে সুরকার হিসেবে কাজ করেছি। তবে সেটা পূর্ণাঙ্গভাবে বলা চলে না। শিবলী সাদিক একদিন এসে বললেন, 'আপা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি ছবি করছি। এর মূল আকর্ষণ থাকবে আবহসঙ্গীত।' আমি এ কথা শুনেই তাতে রাজী হলাম। আর এরপরই প্রথম ছবির জন্য জাতীয় পুরষ্কারও পেয়ে গেলাম।

ফাহমিদা নবী: আপনি কি তখন এফডিসিতে গিয়ে কাজ করতেন?

ফেরদৌসী রহমান: হ্যাঁ। শুধু আমি না, স্কুল শেষে আমার বড় ছেলে রুবাইয়াতও স্টুডিওতে চলে যেত। আমার চেয়ে সে বেশি উপভোগ করতো বিষয়টা। যে তার মা মিউজিক করছে! এমনকি আমার মা-ও থাকতেন আমার সঙ্গে সে সময়। কারণ আব্বা তখন আর ছিলেন না। তাই সবখানে মা-ই আমার সঙ্গে থাকতেন। লন্ডনে যখন পড়তে গিয়েছিলাম, তখনও তিনি তার সংসার ফেলে আমার সঙ্গে সেখানে গেছেন। মায়ের ত্যাগ কোনোভাবেই বলে শেষ করা যাবে না। বেঁচে থাকতে সবসময় আব্বাই আমার সঙ্গে থাকতেন। কিন্তু তিনি যাবার পর মা আমাকে কখনও একা ছাড়েননি। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন তো, খুব ভালোবাসায় বন্দি থাকতাম। এখনও যেমন দুই ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি-নাতনীদের ভালোবাসায় সবসময় বন্দি হয়ে থাকি!

ফাহমিদা নবী: শিল্পী আব্বাসউদ্দীন, বাবা আব্বাসউদ্দীন- কেমন ছিলেন তিনি?

ফেরদৌসী রহমান: বন্ধু পেতে হলে বন্ধু হতে হয়- বাবার এই আদর্শ আমাকে চরম সত্যে এবং খোলা আকাশের মতো জীবন যাপনে সমৃদ্ধ করেছে। আব্বার সঙ্গে মঞ্চে বহুবার গান করেছি। তার সঙ্গে আমার কোনো রেকর্ড না থাকলেও, আব্বা আমাকে অনেক রেকর্ড এনে দিতেন। আমাকে বেশি বেশি গান শুনতে বলতেন। শুধু গানই নয়, আব্বার সঙ্গে এমন কোনো কথা ছিল না, যা বলতাম না। তিনি ছিলেন আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তিনি তার সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন, আজও আব্বার মতো ভালো বন্ধু আর হয়নি আমাদের। আর শিল্পী আব্বাসউদ্দীন? তিনি সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতেন তার গান দিয়ে, ধর্মীয় অনুশাসন দিয়ে। দেখা যেত তিনি যখন গান করছেন, সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতো। আবার ধরো অনুষ্ঠানের মাঝখানেই আযান পড়লো। তখন তিনি নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন। সেই সঙ্গে সবাইকে আহ্বানও করতেন। সে সময় তার ডাকে সাড়া দিয়ে কেউ আসতো, কেউ আবার লজ্জায় আসতো, আবার কেউ আসতো না। কিন্তু তিনি ঠিকই তার প্রতিটি দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। এ বিষয়টা থেকেই বুঝতে পারি যে, তিনি তার দায়বদ্ধতা থেকেই নিজের ভাবনাকে পরিবার থেকে শুরু করে গোটা সমাজের কাছেই তুলে ধরতেন। তাই বাবা এবং শিল্পী আব্বাসউদ্দীনকে আমরা আলাদা করতে পারতাম না।

ferdousi and Fahmida

ফাহমিদা নবী: কখনও অভিনয় করতে ইচ্ছে হয়নি?

ফেরদৌসী রহমান: ছোটবেলায় তো অভিনয় করেছিই। আমাদের বাড়িতে প্রায়ই নানান ধরনের অনুষ্ঠান হতো। সেখানে আমরা ভাই বোনেরা মিলে গান, আবৃত্তি, নাটক করতাম। অভিনয়ও আমরা ভাই বোনরা মিলে করতাম। দেশ বিভাগের সময় আমাদের পুরান ঢাকার বাড়িতেও আয়োজন হতো। তাছাড়া কার্জন হলে 'ছেঁড়া তার' নামে একটি মঞ্চনাটকেও অভিনয় করেছিলাম। সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাবও পেয়েছিলাম, তবে করিনি। আমি সবসময়ই গান নিয়ে থাকতে চেয়েছি।

একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত শিল্পীদের কোনও অবসর নেই, এর সঙ্গে আমি কিছুটা একমত। তবে একটা সময় পরে অবশ্যই শিল্পীকে থামতে হবে। তখন আর শিল্পী গাইবে না, তবে সম্মানের জায়গা থেকে তিনি এক তিলও বিচ্যুত হবেন না।

ফাহমিদা নবী: এবার একটু বদলে যাওয়ায় আসি। একটা সময় দেখা যেত সুরকাররা সবসময় নিজেদের চেয়ে নিজের সৃষ্টিকে চেনাতে চাইতেন। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে ফিচারিং শব্দটা সঙ্গীত জগতে খুব প্রচলিত। এটা আসলে কতোখানি যুক্তিযুক্ত?

ফেরদৌসী রহমান: আমি তো এই 'ফিচারিং' শব্দটির সঙ্গেই পরিচিত নই। তোমাকে আর এটা নিয়ে কী বলবো। তবে একজন সঙ্গীতশিল্পী এবং সুরকার হিসেবে এটা বলতে পারি যে, সুর সৃষ্টি হলো টিম ওয়ার্ক। যেখানে সুরকার সবসময় সব বিষয়কে সংগঠিত করবে। চেষ্টা করবে একটি গান যেন শ্রোতার কাছে পূর্ণতা পায় সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মানুষের যথার্থ অংশগ্রহণে। আমাদের সময় দেখা যেত একটা গান করার সময় শিল্পী, সুরকার, গীতিকার সবাই একসঙ্গে বসে অনেক আলাপ-আলোচনা করতাম। আমরা এতে অপরকে বোঝার চেষ্টা করতাম। তখন দেখতাম, একজন সুরকার শিল্পীর প্রতিটি মতের প্রাধান্য দিত। যে শিল্পী বা গীতিকার তার সৃষ্টির সঙ্গে 'ন্যায়' করতে পারবেন, সুরকার তার কথারই প্রাধান্য দিত। তখন তাদের সবার সামনে আসার প্রবণতা তেমন ছিল না। এখন তো সবার ভেতরই সেলিব্রেটি হবার একটা প্রবণতা দেখা যায়। সুরকার থাকবে পেছনে। শিল্পীর কণ্ঠের গান তাকে শ্রোতার কাছে পরিচিত করবে। যেমন সিনেমার নায়ক-নায়িকা অভিনয় করে সার্থক করে পরিচালকে। সবার কাছে তার পরিচিতি পৌঁছে দেয়। যুগে যুগে তাই দেখেছি। ফিচারিং কথাটা বড়ই অশোভন।

ফাহমিদা নবী: সেলিব্রেটি শব্দটা আমাদের শিল্পীদের সঙ্গে যায় কি?

ফেরদৌসী রহমান: আমি তো সেলিব্রেটি কথাটাই নিতে পারি না। আমাকে কেউ সেলিব্রেটি বলে সম্বোধন করলে আমার কাছে অস্বস্তি লাগে। আমরা শিল্পী। আমাদের মূল পরিচয় এটাই হওয়া উচিত। কিন্তু ইদানীং দেখা যায় সবাই স্টার হওয়ার জন্য ছুটছে। আগে এ চর্চাটা ছিল না। আগে আমরা সব সময় নি‌‌জেদের শিক্ষার্থী মনে করতাম। শিল্পী হওয়ার চর্চাতেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতাম সবসময়।

ফাহমিদা নবী: নিজেকে এক রঙে রেখেছেন। একই সাজে সেই আগের ফেরদৌসী রহমানকেই এখনও শ্রোতারা দেখতে পায়। দারুণ লাগে বিষয়টা।

ফেরদৌসী রহমান: হ্যাঁ। আমি নিজেকে সব সময় একই সাজে একই ধরনে রাখতে চেয়েছি আর দর্শক সেভাবেই আমাকে গ্রহণ করেছে। এটাই তো স্বাভাবিক। রং বদলানো শিল্পীর ধরন হতে পারে না। নানা রকম গান কণ্ঠে ধারণ করবো কিন্তু জীবন চলন হবে এক ধরনের। তাতেই তো স্বার্থকতা। (একটু হেসে)

ফাহমিদা নবী: সময়ের সঙ্গে এক জীবনে অনেক জীবন দেখেছেন। কোনও চাওয়া, অতৃপ্তি কিংবা অনুশোচনা?

ফেরদৌসী রহমান: আমি কখনোই শৃঙ্খলার বেড়াজালকে ছিঁড়তে চাইনি। ভুল করার আগেই ভুলকে ধরে ফেলেছি। কারণ আমি শিল্পী। শ্রদ্ধার আসনে থাকতে চেয়েছি সবসময়। তাই কোনো অনুশোচনা নেই। অতৃপ্তি আছে। সবধরনের গান সিডিতে রেখে যেতে চেয়েছিলাম। চাওয়া আছে, সবার বন্ধু থাকার। এখনও আমি প্রাণ খুঁজে পাই যে কোনো কাজে। কারণ জীবন তো খোলা বই... পড়তে কে করেছে মানা...। তুমি তো অনেক ভালো সুর করো। মন দিয়ে গাও। গানের গল্প বলো। আমি তোমার সার্থক জীবন কামনা করছি। অনেক ভালো থেকো। সুরে সুরে থেকো।

ছবি তুলেছেন: সাজ্জাদ হোসেন

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।