রাত ১২:২২ ; রবিবার ;  ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

সুইটনেস|| মূল : টনি মরিসন || অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর

2

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

দোষ আমার নয়। তাহলে আমাকে দোষ দিতে পারো না তোমরা। এতে আমার হাত ছিল না। কী করে এমনটি হলো আমি জানিও না। আমার দু পায়ের সংযোগস্থল থেকে অন্যরা ওকে টেনে বের করে। তার এক ঘণ্টার মধ্যেই আমি বুঝতে পারি কোথাও একটা গোলমাল হয়ে গেছে। সত্যিই গোলমাল হয়ে গেছে। ওর গায়ের রং এতটাই কালো, আমি দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সিটিয়ে যাই। মাঝরাতের মতো কালো। সুদানের মানুষের মতো কালো। আমার ত্বক মোটামুটি ফর্সা; মাথার চুলের রংও ভালো; আমরা এরকম রংকে বলি উজ্জ্বল হলুদ। লুলা অ্যানের বাবার রংও এ রকমই। আমার পরিবারের লোকেরা যে যেখানে আছে তাদের কারো গায়ের রং ওর গায়ের রংয়ের ধারে কাছে নয়। ওর গায়ের রংয়ের সবচেয়ে কাছের তুলনা চলে আলকাতরার সাথে। তবে ওর চুলের রং গায়ের সঙ্গে খাপ খায় না। হালকা কোঁকড়ানো হলেও বেশ সোজা। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাংটা প্রজাতির লোকদের চুলের মতো। তোমাদের মনে হতে পারে আমাদের সুদূর কোনো পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য ওর মধ্য দিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু কার কাছ থেকে ওর আবির্ভাব হয়েছে কার কাছে? আমার নানিকে তোমরা দেখেছ নিশ্চয়ই। তাকে শ্বেতাঙ্গ বলেই তো মনে করা হতো; তার বিয়েও হয়েছিল শ্বেতাঙ্গের সাথে। তার সন্তানদের সম্পর্কে একটা কথাও তিনি বলেননি কাউকে। আমার মায়ের কিংবা খালাদের কাছ থেকে কোনো চিঠি পেলে না খুলে, না পড়েই ফেরত পাঠিয়ে দিতেন। শেষে তারা আর কোনো খবর পেলেন না। তাকে তার মতো থাকতে দিলেন। তখনকার দিনে প্রায় সব বর্ণসংকর এবং সংকরদের সংকর সন্তানদের প্রায় সবাই এরকমই করতেন, বিশেষ করে তাদের চুল মনের মতো হয়ে থাকলে। কল্পনা করতে পারো কতজন শ্বেতাঙ্গের শরীরের অভ্যন্তরে কৃষ্ণাঙ্গের রক্ত বয়ে চলেছে? অনুমান করে দ্যাখো। আমি শুনেছি এরকম শ্বেতাঙ্গের সংখ্যা শতকরা বিশজন। আমার নিজের মা লুলা মে নিজেকে শ্বেতাঙ্গের বংশধর বলে চালিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ থাকতেই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এর জন্য অবশ্য তাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। নিজেদের বিয়ের সময় বাবা আর মা গিয়েছিলেন আদালত ভবনে। সেখানে দুটো বাইবেল রাখা ছিল। একটার ওপরে হাত রেখে কৃষ্ণাঙ্গরা শপথ নিতেন। আরেকটা রাখা ছিল শ্বেতাঙ্গদের জন্য। তাদেরকে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য রাখা বাইবেলে হাত রাখতে দেয়া হয়েছিল। বাইবেল বলে কথা! বাইবেল নিয়ে কি প্রতারণা করা যায়? এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতির বাড়িতে হাউসকিপার হিসেবে কাজ করতেন আমার মা। আমার মায়ের হাতের রান্নাই তারা প্রতিবেলা খেতেন। গোসলের সময় বাথটাবে বসে আমার মাকে পিঠ কচলে দিতে বলতেন তারা। তাকে আরো কত গোপন কাজকর্ম করতে বলতেন খোদা মালুম। কিন্তু কখনোই তাদের বাইবেল ছুঁতে দিতেন না।  
তোমরা কেউ কেউ হয়তো মনে করতে পারো গায়ের রং নিয়ে আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা খারাপ কাজ; ত্বক যত হালকা ততই ভালো। সামাজিক ক্লাবে, পাড়া প্রতিবেশে, গির্জায়, মহিলা সমিতিতে এমনকি কৃষ্ণাঙ্গদের স্কুলে পর্যন্ত এরকম বিভাজন দেখা যায়। না হলে সামান্য একটু মর্যাদাই বা রাখা যায় কী করে? ওষুধের দোকানে গিয়ে অন্যের থুথু থেকে বাঁচার আর অন্য কী উপায় থাকতে পারে? বাসস্টপে কোণঠাসা হয়ে ছিটকে পড়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে, শ্বেতাঙ্গদের জন্য পুরো ফুটপাতটা ছেড়ে দিয়ে নালার ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে, মুদির দোকানে শ্বেতাঙ্গ ক্রেতাদের জন্য বিনামূল্যের একটা কাগজের ব্যাগের জন্য যখন আমাদের পাঁচ সেন্ট ধরা হয় তখন আর কী-ই বা করার থাকে? নামের সঙ্গে আরো কত কিছু জুড়ে দেয়ার কথা তো বাদ দিলেও আরো অনেক, অনেক কিছু শুনেছি। গায়ের রং একটু উজ্জ্বল হওয়াতে বিভাগীয় বিপণীতে হ্যাট কেনার আগে মাথায় দিয়ে পরোখ করে দেখতে কিংবা লেডিস রুম ব্যবহার করতে আমার মাকে বাধা পেতে হয়নি। আর আমার বাবা জুতা পায়ে লাগে কিনা দেখার জন্য দোকানের সামনের অংশে জুতা পরতেন, পেছনের রুমে নয়। তাদের দুজনের কেউই “শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য” লেখা ফাউন্টেন থেকে পানি খেতে পারতেন না, তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে মারা গেলেও না। 
বলতে খারাপ লাগলেও বলতেই হচ্ছে, শুরু থেকেই মেটারনিটি ওয়ার্ডে লুলা অ্যান শিশুটি আমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেই যাচ্ছিল। জন্মের সময় ওর ত্বক অন্যান্য বাচ্চাদের মতোই ফ্যাকাশে ছিল। এমনকি আফ্রিকার বাচ্চাদেরও এরকমই থাকে। কিন্তু দ্রুতই ওর ত্বকের রং বদলে যেতে থাকে। আমার চোখের সামনে ওর ত্বক নীলাভ কালো হয়ে যাওয়া দেখলাম; মনে হলো আমি পাগল হয়ে যাব। আমি জানি, মিনিট খানেকের জন্য আমি মাথা খারাপই হয়ে গিয়েছিলাম। ওর মুখের ওপরে এক সেকেন্ডের জন্য একটা কম্বল চেপে ধরেছিলাম। কিন্তু এর বেশি আর কিছু করতে পারিনি। মনে প্রাণে যতই চাই না কেন এই ত্বক নিয়ে ওর জন্মানো ঠিক হয়নি, তবু আমার পক্ষে আর নিষ্ঠুর হওয়া সম্ভব হয়নি। আমার এমনও মনে হয়েছিল, ওকে কোনো এতিমখানায় দিয়ে দিব। কিন্তু যে মায়েরা গির্জার সিঁড়ির ওপরে গোপনে বাচ্চা রেখে চলে যায় তাদের মতো হতে সাহস পাইনি। সম্প্রতি জার্মানির এরকম এক দম্পতির কথা শুনেছি। তাদের দুজনেরই ত্বক তুষারের মতো সাদা। তাদের কালো ত্বকের একটা বাচ্চা হয়েছে। কেউ কোনো সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। মনে হয় যমজ বাচ্চার কথা শুনেছিলাম: একটা সাদা ত্বকের, আরেকটার ত্বক কালো। তবে ঠিক জানতে পারিনি, খবরটা সত্যি কিনা। তবে আমার ক্ষেত্রে জানি, লুলা অ্যানকে পরিচর্যা করা মানে কোনো নিগ্রো শিশুকে পরিচর্যা করা; নিগ্রো শিশুকে আমার বুকের দুধ খাওয়ানো। বাড়ি ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওকে বোতলে দুধ খাওয়ানো শুরু করি।   
আমার স্বামী লুই ট্রেনে যাত্রীদের ঘুমানোর জায়গার পরিচারক। কাজ থেকে ফিরে এসে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি সত্যি পাগল হয়ে গেছি আর শিশু মেয়েটার দিকে তাকানোর ভাব দেখে মনে হলো লুই ভাবছে ও এসেছে বৃহস্পতি গ্রহ থেকে। যা তা নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর মতো মানুষ নয় লুই। লুই যখন ‘ধুস্ শালার! এটা কী নরকের কীট রে!’ বলল, তখনই আমি বুঝে গেলাম আমাদের মধ্যে ঝামেলার শুরু হলো বলে। সত্যি সত্যি সেরকমই হতে লাগল। তার আর আমার মধ্যে ঝগড়াঝাটি চলতে লাগল। আমাদের দাম্পত্য জীবন খান খান হয়ে গেল। আমরা এক সঙ্গে তিনটে বছর খুব ভালোই ছিলাম। কিন্তু শিশুটার জন্মের পর থেকে লুই আমাকে দোষ দিতে লাগল। লুলা অ্যানের সাথে তার আচরণ দেখে মনে হলো সে ওকে চেনেই না। আরও বেশি খারাপ হতে লাগল ওর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি— ও যেন লুইয়ের শত্রু। লুই ওকে কোনো দিন ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখল না।  
আমি অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে মজা লুটিনি— সে কথাটা আর লুইকে বোঝানোর চেষ্টা করিনি। কারণ চেষ্টা করে লাভ হতো না। সে জোর মনে নিশ্চিত থাকত, আমি মিথ্যে বলছি। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের যুক্তিতর্ক চলল বেশ। শেষে আমি লুইকে বললাম, লুলা অ্যানের ত্বকের রং এসেছে তার পরিবারের কোনো পূর্বপুরুষের কাছ থেকে। আমার পরিবারের কারো কাছ থেকে আসেনি। এরপর জটিলতা সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আমার কথা শুনে আর কোনো রকম প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে লুই বের হয়ে যায়। সুতরাং মাথা গোঁজার জন্য আমাকে আরো সস্তা একটা জায়গার খোঁজ করতে হয়। থাকার ঠাঁই খোঁজার ব্যাপারে আমি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি। বাড়ির মালিকদের কাছে আবেদন করার সময় আমি লুলা অ্যানকে সাথে নিইনি। ওর  দেখাশোনার  জন্য এক কিশোরী কাজিনের কাছে  রেখে যেতাম। পরেও অবশ্য ওকে নিয়ে খুব বেশি বাইরে বের হইনি। কারণ দু-একবার যখনই বের হয়েছি, ওর হাত গাড়ির দিকে উৎসুক লোকজন এগিয়ে এসেছে, উকি দিয়ে আদরের কোনো কথা বলবে ভেবেছে। কিন্তু সাথে সাথে চমকে গিয়ে কয়েক কদম পিছিয়েছে। তাদের মুখে অবজ্ঞার ভাব ফুটে উঠতে দেখেছি। সেটা আমার জন্য দুঃখের ছিল। যদি আমার গায়ের রং কালো হতো আর ওর গায়ের রং সাদা হতো তাহলে আমাকে বেবিসিটার মনে করাটা স্বাভাবিক ছিল। গায়ের রং কালো হলে, এমনকি ত্বকের ওপরে হলুদ রংটা খানিক বেশি থাকলেও শহরের ভদ্রপাড়ায় বাসা ভাড়া পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। নব্বইয়ের দশকে, লুলা অ্যানের জন্মের সময় আইন জারি হয়েছিল— বাসা ভাড়া দেয়ার সময় বৈষম্য দেখানো যাবে না। কিন্তু খুব কম বাড়িঅলাই সে আইনের পরোয়া করেছে। কৃষ্ণাঙ্গ ভাড়াটিয়াকে বাসা ভাড়া না দেয়ার নানা অজুহাত বের করেছে তারা। তবে মি. লেইফের বাড়ি ভাড়া পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যের অধিকারী মনে করলাম। তবে বিজ্ঞাপনে যা উল্লেখ্য করেছিলেন ভাড়া তার চেয়ে সাত ডলার বেশি নিলেন আমার কাছ থেকে। আর টাকা দেয়া এক মিনিট দেরি হলে আর কথা ছিল না; তার বাহ্যজ্ঞান লোপ পাওয়ার অবস্থা।      
আমাকে ‘মাদার’ কিংবা ‘মামা’ বলার বদলে ‘সুইটনেস’ ডাকতে শিখিয়ে দিলাম লুলা অ্যানকে। সেটাই নিরাপদ মনে হলো আমার। ওর গায়ের রং আর মোটা ঠোটে আমাকে মামা ডাকলে লোকজন গুলিয়ে ফেলতে পারে। তাছাড়া ওর চোখের রংটাও আরেক বিদঘুটে বিষয়— কাকের মতো কালো, কিন্তু তার ওপরে আবার নীলের ছোঁয়া। দেখলে কেউ ডাইনি মনে করতে পারে। 
সুতরাং আমাদেরকে অনেক দিন কাটাতে হয়েছে শুধু আমাদের দুজনের পরষ্পরের সান্নিধ্যে। আর পরিত্যক্ত স্ত্রী হওয়া কী যে কঠিন অভিজ্ঞতা তা আর মুখে বলা যায় না। আমার মনে হয় আমাদেরকে এভাবে ফেলে যাওয়ার জন্য লুই অনুতপ্তবোধ করেছে। কারণ কয়েক মাস পরে আমার ঠিকানা খুঁজে বের করে মাসে মাসে টাকা পাঠাতে শুরু করে সে। আমি অবশ্য তার কাছ থেকে কখনও টাকা চাইনি, কিংবা টাকার জন্য আদালতের দারস্থও হইনি। তার পাঠানো মাসে পঞ্চাশ ডলার এবং আমার হাসপাতালের রাত্রিকালীন চাকরি থেকে পাওয়া বেতন দিয়ে আমার আর লুলা অ্যানের মোটামুটি চলে যেতে থাকে; আমরা ওয়েলফেয়ারের দান থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম হই। ওয়েলফেয়ারের সুবিধা নেয়া যে রকম লজ্জার তাতে আমার মনে হয় ‘ওয়েলফেয়ার’ কথাটার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়াই ভালো: আমার মায়ের বালিকা বয়সে এটার নাম ছিল ‘রিলিফ’। যা-ই হোক, এ রিলিফ অনেকটা হাপিয়ে যাওয়ার পরে বিশ্রামের নিঃশ্বাসের মতো। এটা স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না। ওয়েলফেয়ারের ইতর কেরানিগুলোর স্বভাব চরিত্র মুখ থেকে ফেলে দেয়া থুথুর মতো। হাসপাতলে চাকরিটা পাওয়ার পর আমি যা উপার্জন করতে শুরু করলাম ওরা কোনো দিন সে পরিমাণও আয় করতে পারেনি। আমার মনে হয় ওদের দেয়া চেকের মধ্যেও হীনতার উপস্থিতি ছিল। সে কারণেই ওরা আমাদেরকে ভিক্ষুকের মতো দেখত। বিশেষ করে যখন ওরা লুলা অ্যানের দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে তাকাত ওদের চাহনি দেখে মনে হতো আমি যেন প্রতারণা করছি। হাসপাতালের কাজটা পাওয়ার পর অবস্থার অনেক উন্নতি হলেও আমাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। আমি লুলা অ্যানকে খুব সতর্কতার সাথে মানুষ করেছি। আমাকে কঠোর হতে হয়েছে, খুব কঠোর। ওকে ভালো করে শিখিয়ে দিয়েছি, অন্যদের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কারো সাথে বিবাদে না জড়ানোর জন্য কীভাবে মাথা নিচু করে থাকতে হবে। লুলা অ্যান ওর নাম কত বার বদল করল না করল তা নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই। কিন্তু ওর গায়ের রঙের বোঝা ওকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। তবে এটা আমার কোনো দোষ থেকে হয়নি; আমি দোষী নই, মোটেও না। 
ওহ, হ্যাঁ, লুলা অ্যান খুব ছোট থাকা অবস্থায় ওর সাথে যে রকম আচরণ করেছি আমি তার জন্য খুব অনুতাপ হয় আমার। কিন্তু তোমাদের বুঝতে হবে: ওকে রক্ষা করার দরকার ছিল তো আমারই। জগৎ সংসার কেমন তা তো ওর জানা ছিল না। ওরকম ত্বকের কারণে কেতাদুরস্ত হওয়া, কিংবা সঠিক পথে থেকেও অন্যের অন্যায় আচরণের বিপক্ষে কঠিন হওয়ার চেষ্টা করার তো কোনো মানে হয় না। সঠিক কথাটি মুখের ওপর বলতে গেলেই কিশোর অপরাধের নাম করে জেলখানায় ঢুকিয়ে দেবে। এ জগতে চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গকে সবার শেষে বিবেচনা করা হয়; কিন্তু চাকরি থেকে ছাঁটাই করার সময় তাকেই প্রথমে ছাঁটাই করা হয়। জন্মের পর ওতো এসবের কিছু জানত না। জানত না ওর কালো ত্বক শ্বেতাঙ্গদের কী রকম ভয় পাইয়ে দিতে পারে, কিংবা ওকে নিয়ে তারা কীভাবে হাসাহাসি করবে, তামাশা করবে। একবার একটা মেয়েকে দেখেছিলাম; লুলা অ্যানের মতো এতটা কালো নয়। বয়স দশ বছরের ওপরে হবে না মোটেই। একদল শ্বেতাঙ্গ ছেলে পায়ে পা লাগিয়ে ওকে বার বার ফেলে দিচ্ছে। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই দলের আরেক ছেলে ওর পিঠের ওপরে লাথি দিয়ে আবার ফেলে দিচ্ছে। মজা দেখে হাসতে হাসতে ছেলেগুলোর পেটে খিল ধরে যাওয়ার উপক্রম। অনেক কষ্টে মেয়েটা উঠে চলে গেল; তবু ওদের হাসি আর যেন থামে না। নিজেদের নিয়ে ওদের গর্বের শেষ নেই মনে হলো। আমি বাসের জানালা দিয়ে দেখেছিলাম তাদের উল্লাস; নইলে আমি মেয়েটাকে সহায়তা করতে পারতাম, তাকে শ্বেতাবর্জনার স্তুপ থেকে উদ্ধার করতাম। এবার বুঝতে পারছ, লুলা অ্যানকে আমি না শেখালে ও সব সময় রাস্তা পার হওয়া এবং শ্বেতাঙ্গ ছেলেদের থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারত না। ওকে এতসব শেখানোর ফলাফল পাওয়া গেছে। শেষ পর্যন্ত ওর জন্য আমি গর্বিত।  
তোমাদের জানা দরকার, মা হিসেবে আমি খারাপ ছিলাম না। তবে ভালো করতে গিয়ে আমার একমাত্র মেয়েকে দুঃখ দেয়ার মতো কোনো কাজ করে ফেলতেও পাির। কারণ ওকে রক্ষা করার দরকার ছিল আমার। অবশ্যই। দরকার ছিল শুধু আমার ত্বকের সুবিধার কারণে। প্রথমত শুধু ওর পরিচয়ের জন্য সাধারণভাবে ওকে ভালোবাসতে পারিনি আমি, ওর কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয়কে এড়িয়ে সেটা সম্ভব ছিল না। তবে এখন আমি পারি। সত্যিই পারি। আমার মনে হয় সেটা ও বুঝতে পারে। আমার তো সে রকমই মনে হয়।  
গত দুবার ওর সাথে দেখা হওয়ার সময় ওকে আমার কাছে নজরে পড়ার মতোই মনে হয়েছে। বেশ সাহসী, আত্মবিশ্বাসী। প্রতিবার ও যখন আমাকে দেখতে এসেছে আমি ভুলেই গেছি আগে ও কতটা কালো ছিল। কারণ নিজের সৌন্দর্যকে ও ফুটিয়ে তুলেছে সুন্দর সাদা পোশাকে। 
ওর কাছ থেকে একটা শিক্ষা আমি পেয়েছি, সেটা আগেই পাওয়া উচিত ছিল: বাচ্চাদের সাথে বড়রা যে আচরণ করে থাকে তার গুরুত্ব অনেক। বড় হতে হতে ওরা কখনোই ভোলে না সে সব। ওর সক্ষমতা আসার সাথে সাথে লুলা অ্যান আমাকে সেই অসহনীয় অ্যাপার্টমেন্টে রেখে চলে যায়। আমার থেকে যতটা সম্ভব দূরে চলে যায় ও। নিজেকে ভালো পোশাকে সজ্জিত করে, ক্যালিফোর্নিয়াতে ব্যস্ততার বড় চাকরি শুরু করে। তারপর ফোন করে না, কিংবা আর দেখা করতে আসে না। মাঝে মধ্যেই টাকা পয়সা, এটা ওটা পাঠায়। কিন্তু কত দিন যে ওকে দেখি না! শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারি না। 
নগরীর বাইরে আরো সব বড় বড় ব্যয়বহুল নার্সিং হোম আছে; তবে আমি থাকি উইনস্টন হাউস নামের একটাতে। আমার এটাই ভালো লাগে। আয়তনে ছোট, খরচ কম, বাড়ির মতো পরিবেশ। চব্বিশ ঘণ্টা নার্সদের সেবাযত্ন। সপ্তাহে দুদিন ডাক্তার আসেন। আমার বয়স এখন তেষট্টি। এরকম জায়গায় আসার পক্ষে বেশ অল্প বয়স। কিন্তু হাড়ের একটা রোগের আক্রমণে আমি কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম। সেবাযত্ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। শারীরিক দুর্বলতা কিংবা ব্যথার চেয়ে একঘেয়েমি আরো বেশি খারাপ। তবে এখানকার নার্সরা খুব ভালো। আমি যখন বললাম আমি নানি হতে যাচ্ছি একজন নার্স আমার কপোলে চুমু দিয়ে দিল। মেয়েটার হাসি আর প্রশংসা অতি সম্মানের মুকুটের মতো মনে হলো। লুলা অ্যানের পাঠানো নীল কাগজের চিরকুটটা আমি মেয়েটাকে দেখালাম। চিরকুটের নিচের অংশে লুলা অ্যান স্বাক্ষর করেছে, ‘ব্রাইড’ বলে। ওই শব্দটাতে আমি মনোযোগ দিইনি। ওর কথাগুলো আমার কাছে কিছুটা ইন্দ্রিয় বিলাসী মনে হলো বলে। “এস, অনুমান করতে পারো এই খবরটা দিতে কত আনন্দিত হয়েছি আমি? খুব শিঘ্রই আমার বাচ্চা হতে যাচ্ছে। আমার খুব শিহরণ লাগছে। আশা করি তোমারও।” আমার শিহরণ শিশুটাকে নিয়ে, ওর বাবাকে নিয়ে নয়। কারণ লুলা অ্যান শিশুর বাবা সম্পর্কে কিছুই লেখেনি। আমার জানতে ইচ্ছে করে সেও ওর মতোই কালো নাকি! যদি তা-ই হয় তাহলে আমাকে যতটা চিন্তায় পড়তে হয়েছিল লুলা অ্যানের তত চিন্তার কিছু নেই। আমার অল্প বয়সের সে অভিজ্ঞতা থেকে এখন দিন খানিকটা বদলে গেছে। নীলচে কালো রঙের মানুষদের এখন টিভিতে, ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোতে, বিজ্ঞাপনে— সবখানেই দেখা যায়। এমনকি সিনেমাতেও তারা অভিনয় করছে। 
খামের ওপরে ওর নিজের ঠিকানা নেই। সুতরাং বুঝতে পারি, আমি এখনও খারাপ মা-ই রয়ে গেছি। আমার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত শাস্তি পেতে হবে আমাকে। কেননা প্রয়োজনের দিকে নজর দিয়ে, বাস্তবতার দিকে খেয়াল করেই আমি ওকে মানুষ করেছি। আমি জানি ও আমাকে ঘৃণা করে। আমাদের সম্পর্ক কত নিচে নেমে গেছে: ও আমাকে টাকা পাঠায়। বলতেই হচ্ছে, এজন্যও আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ। নইলে অতিরিক্ত খরচের জন্য ভিক্ষে করতে হতো। অন্য কয়েকজনকে সেটা-ই করতে দেখেছি। একাকী খেলার জন্য তাসের সেট চাইলেই আমি পেতে পারি; তার জন্য লাউঞ্জের পুরনো রংচটা সেট নিয়ে খেলতে হবে না আমাকে। মুখে ব্যবহারের জন্য বিশেষ ক্রিমও আমি কিনতে পারি। কিন্তু নিজেকে অতটা বোকা বানানোর পক্ষে নই আমি। আমি জানি, যেটুকু বিবেকবোধ ওর অবশিষ্ট আছে তার চেয়েও নিচের একটা কাজ হলো শুধু টাকা পাঠিয়ে দূরে চুপ করে থাকা। 
আমার কথা যদি বিরক্তিকর মনে হয়, অকৃতজ্ঞের মতো শোনায় তাহলে এর আংশিক কারণ হলো আমার অনুশোচনা— যে সকল ছোটখাটো কাজকর্ম আমি করিনি, কিংবা ভুল করে করেছি সেগুলোর জন্য অনুশোচনা। প্রথম যখন ওর রজঃস্রাব হয়েছিল তখনকার কথা মনে আছে; ওর প্রতি আমার প্রতিক্রিয়াও মনে আছে। কিংবা হাঁটতে গিয়ে হোঁচট লাগলে, কোনো কিছু ফেলে দিলে চিৎকার করে উঠেছি। আরো একটা সত্যি কথা হলো, ওর জন্মের সময় ওর ত্বকের কথা ভেবে আমি হতাশবোধ করেছি, বিরক্তবোধ করেছি। খুব দ্রুত আমাকে সেসব স্মৃতি দূরে ঠেলে দিতে হবে। সে স্মৃতি জিইয়ে রেখে লাভ নেই। আমি জানি, ওরকম পরিস্থিতিতে ওর জন্য যেটা সবচেয়ে ভালো সেটাই করেছি আমি। আমার স্বামী যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায়, লুলা অ্যান আমার কাছে একটা বোঝা ছিল তখন। একটা বড় বোঝা। কিন্তু আমি সে বোঝা ভালো করেই বহন করেছি। 
আমি ওর প্রতি কঠোর ছিলাম ঠিকই, তোমরা জোর গলায় বলতেই পারো। ওর বয়স বারো পেরিয়ে তেরোর দিকে যাওয়ার সময় আমাকে আরো কঠোর হতে হয়েছে। মুখে মুখে কথা বলত, আমার রান্না খেতে দিলে খেতে চাইত না, আমি চুল বেধে দিলে স্কুলে গিয়ে খুলে ফেলত। আমি চাইতাম না অন্যদের চোখে ওকে খারাপ দেখা যাক। লোকে কী কী নামে ডেকে ওকে ক্ষেপাতে পারে সে সব সম্পর্কেও ওকে সতর্ক করে দিতাম। আমার কোনো কোনো সতর্কতা হয়তো ওর মনে বেশি দাগ কেটেছে। দ্যাখো, কেমন বদলে গেছে। ক্যারিয়ার নিয়ে কত সফল, সচ্ছল! ওকে কি আর ছোট করে দেখার সুযোগ আছে?  
এখন ওর পেটে বাচ্চা। চমৎকার অর্জন লুলা অ্যান। যদি মনে করে থাকো মাতৃত্ব মানে মধুর স্বরে কথা বলা, মাতৃত্ব মানে প্রাপ্ত কোনো মূল্যবান দ্রব্য, কিংবা ডায়াপার ইত্যাদি, তাহলে তোমার মানসিক ঝাঁকি খাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। বড় ধরণের ঝাঁকি। কল্পনা করে দ্যাখো তোমার বেনামি ছেলেবন্ধু, কিংবা স্বামীর কথা! আই লাভ ইউ মাই বেবি! 
আমার কথা শোনো। মা হলে কেমন লাগে এখন বুঝতে যাচ্ছ— জগৎ সংসার কেমন, কেমন করে চলে এ জগৎ, মা হওয়ার পরে জগৎটা কেমন করে বদলে যায়— সব দেখতে পাবে। 
সব সৌভাগ্য তোমার জন্য! ঈশ্বর তোমার সন্তানের মঙ্গল করুন। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।