দুপুর ০১:১৯ ; শনিবার ;  ২০ জানুয়ারি, ২০১৮  

পাবলো শাহির কবিতা

2

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

দেহ স্টেশন

দেহকে নিয়ে এখন আর কোনো চিন্তা করি না বরং শার্টের 
প্রকাশ নিয়ে জগতকে জুতোর ফিতের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে 
বলি। যদিও ছেঁড়া ফ্রকে, পোকাও নুনে চেখে দেখি— 
শৈশবের ওপারের কোনো ব্যুৎপত্তি লেখা আছে কিনা? ঝিনুক 
বেলা থেকে মেঘের মতো যত ব্যথার বেণী আছড়াতে আছড়াতে 
বড় হয় স্মৃতি। এভাবেই আমার হারানো দিনের 
সব মানুষেরা ঈশ্বরের মেয়ে হয়ে ওঠে— তাদের জামার 
আস্তিনে লুকানো থাকে আকাশ রংয়ের টিয়ে।

এরা সবটা দুঃখ নয়— কিছুটা ডুমুর, কিছুটা কার্বন; বাড়ির 
পেছনে জামগাছতলায় পড়ে থাকা মনপোড়াগল্প। যেখানে 
ধূসর শরীরের গাছে ঝুলে থাকে স্তনেরটব; তারপরও 
প্রেমহারা মানুষের আদি কষ্ট বলে কিছু নেই— আছে বক্ষে 
জমে থাকা কার্নিসের ফুটো।

এসব জেনেও আজকাল প্রকাশ-চিন্তা বিষয়ক রেডিও অনুষ্ঠান 
শুনি; উল্টো করে তুলি গতজন্মেও জট। অথচ পোকাদের 
সঙ্গম দেখ মনে পড়ে— আমারও আছে আটচল্লিশ বছর 
আগের— অনেকগুলি অতৃপ্ত দুপুর।

 

পনেরো দিনের অধিবক্ষ

আমাদের চিলেকোঠা থেকে এলিজি ধার করে আমি কবিতার 
এপিটাফে রেখে আসি। যদিও কবিতার নামে একটি নারী 
আছে আমার, তার রোদটুকু, তার সাবান ও তোয়ালে, তার 
ভেংচিকাটা মুখ— অভিমানে পুড়তে থাকা অধিবক্ষটুকু আমার
তার মন খাঁচায় পোরা মেঘ; আমি তার বুক পকেটে জানালা 
খুলতে গিয়ে বলি, ‘বোতামের দুপুর তোমাকে দিলাম, তার 
বদলে কলেজে আজ তুমি বাংলা পড়াতে যেও না।’ কিন্তু সে 
কবিতা নামের নারীটি— বৃষ্টিতে মেঘবিধাবাদের কান্না শুনতে 
পায়, তার আয়নায় চুল আঁচড়ায় অশুভ দেশ থেকে বেড়াতে 
আসা শাকচুন্নি; বাচ্চা ফোটাবে বলে তা’ দেয় দুখীদের 
কুয়োতলা। আর সারাক্ষণ তার সঙ্গে থাকে তিনটে শালিক। 
এসব জেনেও তাকে ভুলিয়ে নিয়ে যায় সপ্তর্ষীমণ্ডল। তখন 
ব্যথাদূরতীত বীণা তাকে বলে, ‘যে পনেরো দিন তুমি 
আমাকে হারিয়ে লাল তারামালাদের সাথে ছিলে; সে স্মৃতিকে 
এখন ভুলপাখি ভেবে শরীর থেকে খুলে কাগজের নৌকায় 
ভাসিয়ে দাও জলে। তারপরও আমাদের চিলেকোঠা থেকে 
একটু দূরে এই কবিতার লন, সেখানে মনের অমল 
দেবদূতেরা সাবান ও গামছা রেখে গেছে। তবুও আমরা এসব 
ঘটনার অক্ষরগুলো প্রকাশ করতে পারি না? এসব জেনেও 
আজও তাকে বলি, ‘এসো মহাজগত থেকে নামিয়ে আনি 
দশখানা নক্ষত্র, সাজাই কুয়োতলা; যদি কোনো একদিন স্নান সেরে 
তুলে রাখতে পারি— আমাদের রোগ, বিছানাপত্র, দুঃখের 
পাজামা ও পেটিকোটগুলি।

 

আগুনের দিঘি

হয়তো কোনো একদিন অসুখের তপস্যা শিখেছিল ছাতিমের 
গাছ, সেই বিষাদের কথা ভেবে তোমার সঙ্গে কথা বলি। 
হয়তো কোনো একদিন বাইজির ঝুমুরের গল্প ছড়িয়েছিল 
মহেঞ্জদারোর রাত; আমি সে সাপের আলাপের হাত ধরে 
আর্ত বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা নেই। যে নারীমৃগ একা একা 
পুড়ে মরে তার সংকেতের পৃথিবীতে এভাবেই গল্প সাজাই। 
তারপরও একদিন বিষাদমাখা ডুমুরের সাথে কথা হলো, কথা 
হলো প্রেমপ্রার্থী লাল মোরগের সাথে। এইসব মর্ম বিরহের 
কথা জানে ঝাউবনের ডাইনি বুড়ি। সে বলে, প্রেমিকারা যাবে 
লাল ডুমুরের বনে সঙ্গে নিয়ে পূর্ণ বয়স্ক গাবগাছ আর তাদের 
সঙ্গি হবে ছায়াযুবতীর বাষ্প ও কার্বন। আর কেঁচোদের কাছে 
শেখা যৌনজীবন। কেননা, যারা তাকে ভালোবাসে তারা তো 
পাঠাদের বাগানের ঝুমঝুমি বাদক। তারপর মানুষ এই 
জোকারের নাম দিয়েছে কবি, মূলত সে বীতনিদ্র বিষাদবৃক্ষ। 
কারণ ভালোসাবার নামে কোমলমতি ছুরিতে যে হত্যা করে— 
নারীর গ্রীবায় রতিউল্কা আঁকা, দৈবজীবাশ্ম।

 

নভযাত্রীদের ভালোবাসার

বক্ষেরভূগোলে সেই স্মৃতি মকরক্রান্তি হয়ে আছে, দিব্যি 
তার নাম ও অভিধা নিয়ে তর্ক চলছে আজ সারাদিন। এসেছে 
আর্ত ব্যাকুল ছাতিমের গাছ, তার তলে দাঁড়িয়ে তুমি বললে, 
মানুষ প্রেমে পড়লে আগুন-পানি এক সঙ্গে খায়। কোনো 
একদিন এই নামরূপ জীবকূলের অধিপতি মনুষ্য হয়তো 
ভালোবাসার নামে নিরর্থক ক্রিয়াকৌশলের ফাঁদে আটকা 
পড়বে। নভযাত্রীদের ভালোবাসার এইদিন শেষ হয়ে আসছে, 
কোনো এক দৈব ঝরাপাতা এই কথা বলতে বলতে তোমাকে 
বললো, বাদামী শেয়াল আমাদের খুব কাছের বন্ধু; বিষুবরেখা 
নিয়ে তার তাত্ত্বিক গবেষণা আছে। আজ মোমবিরহের দিন 
তার নরম নরম পাণ্ডিত্য গলায় গুপ্তডুমুরের আলাপ শুনবো। 
রাতে সাধারণত আমি ব্যথাযুবতীর নিঃশব্দ হাহাকারের মধ্যে 
পড়ে যাই, দিনে সংহিতা রচনা করি। তারপরও চাঁদ নিয়ে 
ইদানিং পড়েছি বিপদে। আধুনিক কবিতায় তাকে বাদ দিতে 
গিয়ে কোনো এক বিকেলে আকাশে চাঁদ উঠতে দেখি।

রূপকথার ঘোড়া 

অসময়ের এক রূপকথার ঘোড়া, যে কখনো আগুন দেখেনি 
ব্লাসফেমি দেখেনি, সে এসেছে পৃথিবীর কতটুকু অসুখ 
অথবা পাথরের বক্ষে কোনো শোকজল আছে কিনা খোঁজ 
নিতে। জগতটা ভালোবাসার অদ্ভুত সিঁকি আধুলির মতো; চুমু 
পোড়া পৃথিবী নিয়ে তার সাপ খেলা চলে। মুদ্রা ঘোরানো হাতে 
ঘুমের ভেতরের সুড়ঙ্গ দিয়ে ক্লীব মানুষরা এদিকেই আসছে, 
তারা ঘুঘুমনে শুনতে চায় বাগেশ্বরীর কথা। তারপরও যারা 
তোমার বক্ষে আলপিন দিয়ে চাঁদ বিঁধে রাখে, তাদের শোনও 
অপরাধ বিজ্ঞান। আর দুপুরে জ্যোৎস্না উঠলে বন্দুক হাতে নিয়ে 
চলো মন শিকারে বেরুই। তারপর পৃথিবীর আয়ু নিয়ে, 
আহ্নিক গতি নিয়ে কথা বলি। তুমি গীলগামেশের কাব্য পাঠ 
করতে করতে বলবে, দেখো রতিউল্কার মশাল কেমন পুড়ে 
যাচ্ছে আমাদের গুপ্ত সারোবরে। আমি বাদামী তাবুর কাছে 
দাঁড়িয়ে বলবো; বন্দুক হাতে যে শিকারীর ঘুম পায় সে মূলত 
প্রেমভিখারী। তাকে অসুখী আয়নায় নাম লিখতে নিয়ে চলো, 
দেখবে তার চোখে ভেসে উঠবে ছাতিম গাছের নিচে লুকানো 
নিয়াণ্ডারথাল নারীর বিষাদ।

 

ছায়াযুবতীর আয়না

পাকুড়গাছে ঝুলে থাকে ছায়াযুবতীর আয়না, এই গুপ্ত কথা 
জানবার পর পৃথিবীর আর ঘুম আসে না। তাই পাতার আড়ালে 
পুড়ে যেতে থাকে বিষাদের পোশাক। তুমি বললে, এসব 
রূপকথা শুনেছি জ্ঞানী বৃক্ষদের কাছে। আমি বললাম, যতদূর 
চোখে দেখা যায় ততখানি মাটি ফুঁড়ে তুলে আনো টুকরো 
কব্জির ভালোবাসা। আর যারা খোঁজে কাম, তাড়না ও 
জিপসির মুখে ছড়ানো আক্ষেপের ভাষা— তাদেরকে নিয়ে 
যাও অনন্ত জুমচাষী রমণীর কাছে। কোনো এক বিচ্ছেদের 
বিকেলে এই কথা ভাবতে ভাবতে আমরা প্রাগৈতিহাসিকের 
মাথার খুলিতে ঢুকে পড়ি। কিন্তু মুশকিল হলো সেখানে 
কাগজের তৈরি জোকার সুতোকাটে ঘুড়িবিচ্ছেদে, মনের পাথর 
ভেঙে জল্লাদ বানায়। তুমি বললে, জল্লাদটাকে পর্ণ কুটিরে 
নিয়ে গিয়ে ভালোবাসা দাও। জলে ডুবাও, আগুন মুখে দাও,
দেখবে সে প্রেমিকার চিঠি দিয়ে বানাবে পূর্ণবয়স্ক কাগজের 
ছুরি। আর তা দিয়ে কেটে ফেলবে রতি, দৈব বিরহ আর 
জেব্রার যৌন সুখ দেখা অসুখী মানুষের মন।

 

 

অলঙ্করণ : মোস্তাফিজ কারিগর

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।