রাত ০১:১১ ; শুক্রবার ;  ২১ জুন, ২০১৯  

এক রত্নের কত গুণ!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সাইফ আজাদ।।

অভিনয় করছেন মঞ্চে। আবার প্রযোজনাও। একটু পর মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া। আবার টেলিভিশনের ছোটপর্দায় জলের গানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন গিটার হাতে। এখানেই শেষ নয়, সম্প্রতি তাকে দেখা গেছে একটি শ্যুটিং ইউনিটের সেটে পরিচালনায় ব্যস্ত সময় পার করতেও। নাম তার এবিএস জেম। ও হ্যাঁ, মেটাল ব্যান্ড সেইট্যানিকের মধ্যমণিও তিনি! শোনা যাক তবে জেম-কাহন।

নাম শুনে গায়েব!

পুরো নাম আবু বকর সিদ্দিকী জেম। নিজেই ছোট করে দিয়েছেন এবিএস। নাম নিয়ে  শোনালেন মজার ঘটনা। সেইট্যানিকের শো দেখতে আসা এক তরুণী হয়ে গেলেন তার ভক্ত। খোঁজ নিয়ে জোগাড় করে ফেললেন জেমের ফেসবুক আইডি। বন্ধুত্বের আহবানে সাড়া দেন জেম। আস্তে আস্তে পরিচয়ের পরিসরটা এগিয়ে চলছিল। কিন্তু কথাবার্তার এক পর্যায়ে ফেসবুকেই ওই তরুণী জানতে চাইলেন এবিএস-এর মানে কী? আর ওই নামের মানেটাই কাল হয়ে দাঁড়ায় সম্পর্কের। নামের মানে শোনার পর তরুণী-ভক্তের মনের রঙ মুছে যায়। এরপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না!

 

মামাদের পথে ভাগনে

এবিএস জেম তার নিজের পরিচয় দিলেন এভাবে- আমি একজন পারফর্মার। জন্ম থেকেই পারফর্ম করে যাচ্ছি। যেদিন মারা যাবো সেদিনই হয়তো ইতি ঘটবে।

জন্মের পরপরই বিচ্ছেদ হয়ে যায় মা-বাবার। বাবার দেখা পাননি। ভাই-বোন নেই। মায়ের কাছে ঢাকার খিলগাঁওয়ের নানাবাড়িতেই পার করেছেন জীবনের এতগুলো দিন। সেখানে আট মামার একমাত্র বোন ছিলেন তার মা। এ কারণেই আদরের ছিল না সীমা-পরিসীমা। তবে অতি আদরে বাঁদর হননি। মামাদের মধ্যেই রয়েছেন ফুটবল খেলোয়াড়, নৃত্যশিল্পী ও অভিনেতা। নিজের অজান্তেই তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে সংস্কৃতি পাড়ার সঙ্গে।

ছেলেবেলা থেকেই ‘ভূতের’ উপদ্রপ ছিল জেমের ওপর। যখন যে ভূত কাঁধে চেপে বসেছে তখন তাকে নিয়েই ছুটেছেন সামনে।

খেলোয়াড় হওয়ার বাসনায় ফুটবল খেলেছেন, ক্রিকেট খেলেছেন। মার্শাল আর্ট শিখেছেন, গিটার শিখেছেন, অভিনয় করেছেন। এসব ক্ষেত্রে কেবল শখের বশে নয়, বরং পেশাদার মনোভাব নিয়েই এগিয়েছেন। জেমের মতে এ সবই করেছেন মাথায় ভূত চাপার কারণে। আর এর মধ্য দিয়েই হয়ে উঠেছেন আজকের জেম। তবে শেষ ভূতটা নিজে ঘাড়ে চাপায়নি বলেই দাবি তার।

শেষ ভূত প্রাচ্যনাট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন জেম। সেখানে ভর্তি হয়েই ২০০৫ সালের পয়লা বৈশাখে চারুকলায় আয়োজিত যাত্রাপালা দেখে মুগ্ধ হন। তখন ছিলেন দর্শক। পরের বছর যাত্রাপালার নির্দেশক সুনিল দা তাকে বললেন- অভিনয়ে নামতে হবে। এক কথায় রাজি। শুরু হলো নতুনের পথে যাত্রা। সুনিলদার চাপানো সেই ভূত তাকে নিয়ে গেল প্রাচ্যনাটে। আরও জেঁকে বসে অভিনয়ের নেশা। প্রাচ্যনাটে তৌফিকুল ইসলাম ইমনের দেখানো পথে হেঁটে আজ এতদূর আসা। প্রাচ্যনাটের বেশ কয়েকটি প্রযোজনায় অভিনয় করার পাশাপাশি করেছেন সঙ্গীত পরিচালনাও।

 

জলের গানের জেম

দলের কাজের সময় রাহুলদা যখন গাইতেন তখন সবাই বসে পড়তো। সবাই গান গাইতে পারে, বাদ্য বাজাতে পারে। এরপর নাটকের গান নিয়ে প্রাচ্যনাট ওপেন এয়ার কনসার্ট হলো। এক মঞ্চে ২২জন উঠে গান গেয়েছিলেন। শাওন দা গান লিখতেন, রাহুল দা সুর করতেন, কনক দা গাইতেন। এভাবেই এলো জলের গান। সবসময়ই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল জেমের। এরপর জলের গানে একজন গিটার বাদকের প্রয়োজন হলে হাজির হয়ে যান গিটার হাতে।

এদিকে নিজের ব্যান্ড দল সেইট্যানিকের একটি একক অ্যালবামের কাজ শেষ করেছেনে এবিএস। তবে জেম এবং তার দল চাচ্ছেন অ্যালবামটি দেশের পাশাপাশি দেশের বাইরেও প্রকাশ করতে। আর তাই একটি আন্তর্জাতিক ব্যানারের জন্য অপেক্ষা করছেন। নিজেদের উপযোগী ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমানে তারা কোনও স্টেজ শো করছেন না বলেও জানালেন তিনি।

এবার পালা নির্দেশনার

প্রাচ্যনাটকেই নিজের শেকড় মানেন জেম। অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনার গোড়াপত্তনও এখানে। ‘টিনের তলোয়ার’ নামে একটি স্কুল প্রযোজনার মাধ্যমে নির্দেশনার শুরু। এরপর ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) থিয়েটার ক্লাবের প্রযোজনা ‘ক্ষুধিত পাষাণ’র নির্দেশনা দেন। দল ও দলের বাইরেও অনেক সঙ্গীত নির্দেশনা দিয়েছেন। সম্প্রতি নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘কাকপক্ষী’র জন্য বাইসাইকেল নামে একটি টেলিফিল্ম তৈরি করেছেন। আগামী ঈদ উল আজহায় কোনও একটি চ্যানেলে টেলিফিল্মটি সম্প্রচার হবে বলে আশা করছেন।

 

ভূত ও ভবিষ্যৎ

আগামী দশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে স্বভাবসুলভ লাজুক ভঙ্গিতেই জানালেন নির্দেশনার পারফরমার হবেন। নির্দেশনাকে পারফরমেন্স হিসেবেই দেখেন তিনি। কাকপক্ষী থেকেই পেশাদারী নির্দেশনায় নেমেছেন এবং ভবিষ্যৎ সকল নির্দেশনা এ ব্যানার থেকেই করবেন। কাকপক্ষীর লক্ষ্য চলচ্চিত্র বানানো। তবে তৈরি করবেন বিনোদনের অন্য খোরাকও।

নিজের বিচার নিজেই করেন

সবসময় চেষ্টা করেন নিজের কাজের বিচার নিজেই করতে। মানুষ হিসেবে দোষ-গুণ তো থাকবেই। তবে এর মাঝেও চেষ্টা করেন সৎ উপায়ে জীবন যাপন করতে। সবাইকে খুব দ্রুত বিশ্বাস করেন। এ কারণে ঠকেছেনও অনেকবার। সবসময়ই চেষ্টা করেন নিজেকে অহংকারমুক্ত রাখতে। আর এক্ষেত্রে নিজেকে সফল দাবি করেন তিনি।

যারা ভাবছেন দেশ, সমাজ অথবা নিজের জন্য কিছু করবেন তাদের উদ্দেশে জেম একটি কথাই বললেন, ‘এখনই সময়। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে কাজে লেগে পড়তে হবে। নিজেকে ও নিজের আশপাশ পরিবর্তনের মাধ্যমেই দেশ গড়ার কারিগর হতে হবে।’

 

ছবি : সাজ্জাদ হোসেন

 

/এসএ/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।