রাত ০৯:৪৯ ; রবিবার ;  ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯  

ডিকন্সট্রাকশন ও জ্যাক দেরিদা প্রসঙ্গে জহর সেনমজুমদার || শেষ পর্ব

প্রকাশিত:

পূর্ব প্রকাশের পর

লখাই। আর কোনো নামের দরকার হলো না। আর কোনো পরিচয়ের দরকার হলো না। সবাই মনসার সন্তান হিসেবে, সেই মনসামঙ্গলের রূপক-সংকেতের মাধ্যমে লখাই হয়ে উঠল সেই আটপৌঢ়ে গ্রামের মানুষের তথা মাঝিমাল্লাদের অন্তর্বর্তী শরীর ‘সাব-অল্টার্ন’। তো সেই লখাই একদিন ওখানকারই এক ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিন্যস্ত এক জমিদারের রক্ষকের কাজে নিযুক্ত হয়। একদিন জমিদার রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে লখাইয়ের বলিষ্ঠ ঋজু দেহ এবং অদ্ভুত সুন্দর রূপ দেখে মুগ্ধ হলেন। ডেকে পাঠালেন, এসো, তুমি আমার সঙ্গে এসো, আমার সঙ্গে কাজ করো। আমার রক্ষী হিসেবে। পছন্দ করতেন লখাইকে, ভালোবাসতেন লখাইকে। কিন্তু জমিদার যতবার জিজ্ঞেস করেন লখাইকে- কে তুমি, কি তোমার পরিচয়, কোথা থেকে এলে? লখাই এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারে না। দিন বাড়তে থাকে, লখাই মাঝিদের একটি মেয়েকে বিয়ে করে। যদিও তার স্বামী ছিল এবং সে বিয়ে নিয়ে অনেক ইতিহাস আছে। তো লখাই জমিদারের বাড়িতে কাজ করে ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত হয়ে ফিরে আসে বাড়িতে। বউ বারবার জিজ্ঞস করে, তোমার কিছুই মনে পড়ে না পেছনের দিনগুলোর কথা? কোথা থেকে এলে কিছুই মনে পড়ে না তোমার? প্রথম প্রথম বোকার মতো তাকিয়ে থাকতো। পরের দিকে এসব প্রশ্ন করলে রাগে, বিরক্তিতে লখাই ঝাপ্টা মেরে দিতো। এমন সময় মহারাণী ভিক্টোরিয়া ঘোষণাপত্র করে দিয়েছেন, ভারতবর্ষের মানুষদের জন্য। যেভাবে প্রতিশ্রুতি দেয় এমপি-মন্ত্রীরা, ঠিক সেভাবেই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন মহারাণী ভিক্টোরিয়া। অর্থাৎ ১৮৫৭ সালের ক্ষতস্থানের মলম লাগানোর জন্য ১৮৫৯ সালে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যে প্রতিশ্রুতির একটাও রক্ষা করেননি। এবার জমিদার মশাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শিরোপা পাবেন। তখন রায় বাহাদুর ইত্যাদি ইত্যাদি উপাধী দেয়া হতো। তো সে কথা যারা আলোচনা করছে লখাই সেখানে বসে ছিল। মহারাণী ভিক্টোরিয়া তার জমিদারকে সম্মানিত করতে চান। কবে যেতে পারবে দিন-তারিখ ইত্যাদি নিয়ে সেখানে আলোচনা হচ্ছিল। যেই লখাই মহারাণী ভিক্টোরিয়ার নাম শুনেছে তখন লখাইয়ের মাথার মধ্যে যেন কেমন করছে। যখন লোকজন সবাই চলে গেছে তখন জমিদারকে জিজ্ঞেস করছে, ভিক্টোরিয়া কে? জমিদার বলে, ভিক্টোরিয়াকে তুই জানিস না? ভারত-ঈশ্বরী, আমাদের মা। লখাই বলছে আমাদের মা কবে থেকে হলো? এ তো আমাদের মা নয়। মঙ্গলপাণ্ডে কোথায় গেল, তাতিয়া কোথায় গেল? এবার জমিদার মশাই বলছে, তুই এসব নাম কোথা থেকে জানলি। আবার লখাইয়ের স্মৃতিটা চলে গেছে। না, না, আমি এসব কি বলছি? এর কোনো মানে নেই, কে তারা আমি তা জানি না। রাত্রিবেলা, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তা ধরে স্মৃতিকাতর হয়ে লখাই বাড়ি ফিরে আসছে। এবার বউ যখন প্রশ্ন করছে, লখাই আগের মতো উত্তেজিত না হয়ে বলছে, জানো না, সিপাহি বিদ্রোহের সময় আমি হীরালাল সিপাহি ছিলাম। আমি লড়াই করেছিলাম, ইংরেজরা আমাকে গুলি করেছিল, আমি জলে লাফ দিয়েছিলাম। আমি তারপর জানি না কী হয়েছে। মনসামঙ্গলের লক্ষীন্দর, সিপাহি বিদ্রোহের হীরালাল সিপাহি হয়ে উঠলো। স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সঙ্গীতে পরিণত হয়ে গেল, সৈনিকে পরিণত হয়ে গেল। এক যুগের ভাষা, এক যুগের ভাবনা এভাবেই পরিণত হয় যাকে আমরা বলি বিনির্মিত ভাববিশ্ব। এ উপন্যাসের দুটি অসাধারণ ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে। তারমধ্যে একটা ঘটনা হচ্ছে, শ্রীকৃষ্ণকেন্দ্রিক একটা আখড়া ছিল। লখাই সেই আখড়ায় আসছে। সাব-অল্টার্ন বলে সে ঐ মন্দিরে বা আখড়ায় প্রবেশ করতে পারছে না।

এমন সময় দুটো ঘোড়ায় সৈন্য এসে লখাইকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। এর প্রতিবাদে লখাই বলছে, মারছো কেনো, মারছো কেনো হে? আর উপন্যাসটা শেষ হচ্ছে আরেকটা ঘটনার মধ্য দিয়ে। গ্রামের রাস্তা গেছে জলের দিকে। লখাই এবং লখাইয়ের ছোট ছেলে, দু’জনে মিলে রাস্তা ঠিক করছে। কাদা-মাটি দিয়ে রাস্তা তৈরি করছে। এমন সময় দুটো ঘোড়ার গাড়ি ছুটে আসছে। সামনে কিছু লোকজন। তারা হঠ্ যাও, হঠ্ যাও বলে চিৎকার করছে। লখাই কাছে আসতেই দেখল, সেই ঘোড়া দুটো যে ঘোড়া দুটো সেইদিন তাকে মন্দিরে অসম্মান করেছিল। লখাই রাস্তা থেকে এতটুকু সরলো না। বাচ্চা ছেলেটার হাত ধরে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকলো। বাচ্চাটি জিজ্ঞেস করছে, কে বাবা? লখাই কোনো উত্তর দিলো না। দেখলো সেই সাহেব দুটো ধাক্কা মেরে ঘোড়া চালিয়ে সেই মাটির উপর দিয়ে চলে গেলো। চলে যাবার পর লখাই দেখছে মাটিতে ঘোড়ার পায়ের দাগ লেগে আছে। এবার লখাই ছোট বাচ্চাটিকে বলল, নরম মাটি নিয়ে আয়। নরম মাটি আনা হলে, এবার লখাই সেই মাটি দিয়ে সেই ঘোড়ার পায়ের দাগ ডেকে দিতে লাগলো। ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন ঘোড়ার পায়ের দাগ দিয়ে প্রবেশ করতে চেয়েছিল, লখাইয়ের মতো মানুষরা সেই ঘোড়ার পায়ের দাগ মুছে দিতে লাগলো। সেদিন থেকে ভারতবর্ষ নতুন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। তাহলে আমরা বলব না- সমরেশ বসু মনসামঙ্গলে গেলেন, কিন্তু মনসামঙ্গলে থাকলেন না। উপস্থিতকে অনুপস্থিতের নাম করে আবার উপস্থিত করছেন। আমি মনসামঙ্গল কাব্যের নাম ব্যবহার করলাম, অনুষঙ্গ ব্যবহার করলাম তা বিনির্মাণ নয়, বদলে দিতে হবে, পাল্টে দিতে হবে টেক্সটকে, সারপ্লাস অর্থে পৌঁছে দিতে হবে। যারা পারবেন তারা বিনির্মিত হচ্ছেন এবং সাহিত্যও বিনির্মিত হচ্ছে। যারা পারছেন না তারা নন। অনুষঙ্গ ব্যবহার। যেমন- পরবর্তীকালে ১৯৫১ সালের পর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ ঠিক একই কাজ হলো। মনসামঙ্গলের একটা অনুষঙ্গ অনন্ত এবং কিশোরের আলোচনার মধ্য দিয়ে উঠে এলো। আমরা কিন্তু ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসকে বিনির্মিত উপন্যাস বলছি না। কিন্তু অনুষঙ্গ এসেছে মনসামঙ্গলের। তারপরে ১৯৫৭ সালের পর ১৯৭৬ কি ১৯৭৯ সাল, আমার ঠিক মনে নেই। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, চিত্ত সিং একটা উপন্যাস লিখেছিলেন ‘বেহুলা’। সেই উপন্যাসটা কি ছিল? সেই উপন্যাসটা যদি পারেন কখনো পড়ে নেবেন। একটা বিকল্প প্রতিবেদন তৈরি হয়ে গেল সেই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। বেহুলা তার মাকে চিঠি লিখছে, আসলে মা নয়, গোটা বঙ্গদেশকে উদ্দেশ্য করে সে নানা সম্ভোধনে চিঠি লিখছে। বেহলা তার মৃত স্বামীকে নিয়ে যাচ্ছে আর গোটা বাংলাদেশের জন্য রেখে যাচ্ছে তার ভাষ্য। কী বলছে বেহুলা? বেহুলা চোখের সামনে কী দেখছে? এইবার কিন্তু প্রথম মনসামঙ্গল কাব্যের একটা বৈজ্ঞানিক রূপান্তরিত হচ্ছে। তার কারণ হচ্ছে, আমরা জানি। দীর্ঘদিন ধরে বেহুলা যখন মৃত লক্ষীন্দরকে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো পচে যাবে। স্বাভাবিক। এতদিন ধরে গাঙুরের জলে তা পচে যাবে কিংবা চিল-শুকুন তা নষ্ট করে ফেলবে। চিত্ত সিং বলছেন, বেহুলা দেখছেন আস্তে আস্তে তার চোখের সামনে স্বামীর মৃতদেহ পচতে শুরু করছে। বেহুলা কিছু করতে পারছে না। মাকে বলছে, মাগো মা, আমি কী করব তুমি বলে দাও। তারপর মৃতদেহের মাংসগুলো গলে গলে পড়ছে নৌকার পাঠাতনে। বেহুলা আস্তে আস্তে সেই গলে যাওয়া মাংসগুলো নৌকার পাঠাতন থেকে তুলে নদীর পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। আর দেখছেন হাড় ছাড়া আর কিছুই নেই। তাহলে প্রশ্ন হয় বেহুলা কী আর লক্ষীন্দরকে নিয়ে চম্পকনগরীতে ফিরতে পারেনি। ফিরেছে। সেখানে একটা বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার উপস্থাপনা আমরা দেখলাম চিত্ত সিং করলেন। আসলে বেহুলা ফিরলো। কোন বেহুলা ফিরলো? সন্তান সম্ভাবনা বেহুলা। পেটে একজন লক্ষীন্দরকে নিয়ে ফিরলো। চিত্ত সিং তার উপন্যাসে লক্ষীন্দর কখনো গাঙুরের জলে ভেসে চম্পকনগরীতে প্রতাবর্তন করেননি। তার কোনো পুনঃজীবন হয়নি। আসলে বেহুলা লক্ষীন্দকে নিয়ে গিয়েছিলো কিন্তু হাড়খানা ছাড়া বেহুলা লক্ষীন্দরকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। ফিরিয়ে এনেছে পেটের সন্তানকে। যে আসলে আরেক লক্ষীন্দর। পরবর্তী প্রজন্মের লক্ষীন্দর, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লক্ষীন্দর, যারা যুগ যুগ ধরে বেহুলাকে এবং দেশকাল, সমাজ এবং বাস্তবতাকে বাঁচিয়ে রাখবে লক্ষীন্দরের নামে, লক্ষীন্দর পরিচয়ে এবং লক্ষীন্দরের প্রতিবেদনে। আরেকটা নতুন ভাববিশ্বে পৌঁছে যাই। এরপরে ১৯৭৯ সালের পরে ১৯৮৪ সালে যতদূর মনে পড়ছে। আমার ঠিক সালগুলো সঠিকভাবে মনে নেই । ১৯৮৪ সাল নাগাদ সেলিনা হোসেন চাঁদবেনে  লিখলেন। আমি আশা রাখি, আপনারা সবাই উপন্যাসটি পড়েছেন। সেখানে চাঁদবেনেতে তিনি কী দেখাচ্ছেন? চাঁদবেনে উপন্যাসে দেখানো হচ্ছে- চম্পাইগঞ্জের চাঁদ মন্বন্তর আক্রান্ত ধান ক্ষেতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যাদের ধান জমিগুলো আজু মৃধা নামক এক মহাজনের গর্ভে চলে গেছে? এখন চাঁদের পরিচয় হচ্ছে নিঃস্ব, ফতুর। আর এখন চাঁদের কাজ হচ্ছে এই মৃধা জমিদারের কাজ করা অর্থাৎ দিন মজুরি করা। ফাঁকা, ধূধূপ্রান্তর, মন্বন্তর আক্রান্ত ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখছে বন্ধ্যা ধানক্ষেত, অনুর্বর ধানক্ষেত, কোথাও সৃষ্টির কোনো গন্ধ নেই, একেবারেই শুকনো গটগটে হয়ে গেছে। পদ্মা নদী শুকিয়ে গেছে, পদ্মার সেই জল আর নেই। তাহলে কী পদ্মা ভারতবর্ষ হয়ে যাচ্ছে? অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন আছে। প্রশ্নমুখী অনুসন্ধান আছে। সব মিলিয়ে অসামান্য। চাঁদ সেদিন দেখছে সমস্ত শূন্য, সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। নষ্টগ্রস্ত এই দেশ, এই নষ্টগ্রস্ত দেশের মাঝে চাঁদ ধান ফলাতে চায়। পদ্মার বুকে জল দেখতে চায় এবং জলের উল্লাস ধ্বনিতে সে নিজেকে মেলাতে চায়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার সেও পারে না। তার বিবি ছমিরন, এখানেও রূপক অর্থে পাল্টে যায়। সেই ছমিরন বিবি কী করছে? একটার পর একটা সন্তানের জন্ম দিচ্ছে এবং ছ’টা সন্তান জন্মের আগেই মারা গেছে। আমরা মনসামঙ্গল কাব্যের রূপক সেই কাহিনিটা পাই, ছ’টা দিনই চাঁদ ডুবে গেছিলো। আসলে ছ’টা দিনই হয়তো নয় এভাবে ছ’টা সন্তানই নষ্ট হয়ে গেছে। চাঁদের কাছে ওই ছমিরন বিবি শুধু একটা জিনিস চায় তুমি যেনোতেনোভাবে আমাকে একটা লক্ষীন্দর এনে দাও। যেনোতেনোভাবে আমার শুধু একটা লক্ষীন্দর চাই। তো এইরকম অবস্থায় চাঁদ দেখছে ছমিরন কেমন যেন পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছে। পাগলের মতো কাজ-কর্ম করছে। যখনই বাড়ি যায়, খিদে পেয়েছে চাঁদের, খেতে চায় ছমিরন খেতে দেয় না। চাঁদ শুধু ছমিরনের পা ঝাকিয়ে বলে, আমাকে খেতে দাও। আর ছমিরন চাঁদের পা ঝাকিয়ে বলে, আমাকে একটা লক্ষীন্দর দাও। সহ্য করতে পারে না, সামলাতে পারে না চাঁদ। চাঁদ খুব মারে ছমিরনকে। ছমিরন বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদে। চাঁদ ছমিরনের মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এবং বারবার বলে, কোথা থেকে আনবো লক্ষীন্দরকে, কোথা থেকে এনে দেবো? যত লক্ষীন্দর আনলাম সব তো মরে গেলো। তো উপন্যাসে আমরা দেখলাম, ছমিরন শেষ পর্যন্ত তার ছয় সঙ্গীকে, আবার এই ছয়, বারবার এই ছয়ের ভেতরে সেলিনা হোসেন আমাদের নিয়ে গেছেন। তো চাঁদ এই ছয়জনকে নিয়ে রাতের বেলা এই আজু মৃধার গোলা লুট করলো। রাতের অন্ধকারে সে মৃধার গোলা লুট করে সে দেশের নিম্নবর্গের মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দিলো। সেদিন থেকে এক অপরাধী মনুষ্যের লড়াই শুরু হলো। চাঁদের সেই লুটের মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ যেমন মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন- এক মারনেওয়ালা আরেক হলো মারদেনোওয়ালা রক্তকরবীতে। যারা মারনেওয়ালা তার বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে শুরু করলো চাঁদ আস্তে আস্তে সেই শুষ্ক, অনুর্বর, ধূধূপ্রান্তর মাটিতে দাঁড়িয়ে। এই যে উপন্যাস, এই যে ভাবনা এবং ভাবনাকে আরো জীবন্ত করে তোলেন একেবারে উপন্যাসের শেষ দিকে যখন সেলিনা হোসেন বক্তৃতা করেন। সেখানে দেখা যায়, শুধু একেবারে রুগ্ন, বন্ধ্যা, অনুর্বর ধানক্ষেত পড়ে আছে কোথাও এতটুকু শস্যের দানা নেই, কোথাও এতটুকু জল নেই, তার মাঝখানে নতুন করে, সেই উন্মুক্ত প্রান্তরের মাঝখানে, সেই খোলামেলা প্রকৃতির মাঝখানে, গোটা বাংলার ভৌগোলিক বাস্তবতার মাঝখানে চাঁদের নতুন বউ, ছমিরনের মৃত্যুর পর নতুন সন্তানের জন্ম দিচ্ছে। অর্থাৎ যে লক্ষীন্দরকে ছমিরন চাঁদের কাছে চেয়েছিলো সেই সন্তানকে। যেখানে কোনো আবরণ নেই, একেবারে খোলা মাঠে জন্ম নিচ্ছে দেশ-কাল-সমাজ এবং বাস্তবের এক সত্যিকারের লক্ষীন্দর। আমরা বুঝতে পারছি বন্ধ্যাত্বের মাঝখানে, অনুর্বরতার মাঝখানে, মরুভূমির মাঝখানে আবার সৃষ্টিকর্তার নতুন ভাবনা, আবার সৃষ্টিকর্তের নতুন বীজ অঙ্কুরোদগম হলো। এখান থেকেই আবার শোনা যাবে মানুষের চিরকালীন অভিনাসিক স্বর। এই উপন্যাসগুলো যত পড়বো আমরা, যত ভাববো আমরা ততই আমরা বুঝতে পারবো মনসামঙ্গল ক্রমশঃ প্রসারিত হচ্ছে, ক্রমশঃ সম্প্রসারিত হচ্ছে, মনসামঙ্গল আরো আরো তার সৃষ্ট আখ্যানের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করছে, টেক্সটের সঙ্গে মানুষের আরো কথোপকথন শুরু করছে এক নতুন ভাবনায়। পরবর্তীকালে এরকম আরো অনেক উপন্যাস লেখা আছে। আমি একটা উপন্যাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। সে সময় আমাদের রেল লাইনের দুপাশে যে বস্তি তৈরি হয়, সে বস্তি উচ্ছেদ করা হয়েছিলো। আমরা প্রতিবাদে তখন অনেকেই রাস্তায় বের হয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে এক গল্পকার, ঔপন্যাসিক শচীন দাশ ছিলেন। ডাকুরিয়ার সে রেল বস্তি উচ্ছেদ করা হলো। সেটা পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে শচীন দাশ একটা উপন্যাস লিখলেন। সে উপন্যাসটার নাম ছিলো...কী নদী যেন। তো সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, পুলিশ আসছে, রাষ্ট্রযন্ত্র আসছে। তারা একজন একজন করে ওই বস্তি থেকে চুলের মুঠি ধরে বের করে আনছে। আসলে কারা তারা? বস্তির ঘর থেকে বেরিযে আসছে লক্ষীন্দর, চাঁদ, বেহুলা একটার পর একটা। অর্থাৎ মনসামঙ্গল কাব্যের চরিত্ররা শচীন দাশের উপন্যাসে অভিবাসী বা বস্তির অধিবাসী। নানা রকম শ্রেণি বিভক্ত সমাজব্যবস্থার দান ছিলো বা দারিদ্রের নিচতলার মানুষের চাপাপড়া কণ্ঠস্বরের মানুষজনকে আবার নতুন করে লক্ষীন্দরের, চাঁদের বা বেহুলার মধ্য দিয়ে ফিরিয়ে আনছে। যেখানে যত বিদ্রোহ আছে, যেখানে যত সন্ত্রাস আছে, সেই সন্ত্রাসকবলিত সন্ধ্যাতারার মাঝখানে বা বাংলা উপন্যাসে বারবার বেঁজে উঠছে, বাংলা উপন্যাস বারবার এক অনির্বচনীয় ব্যাকুলতা নিয়ে বারবার পৌঁছে যাচ্ছে নির্মাণের কাছে। যখন ফিরে আসছে তখন দেখা যাচ্ছে আমাদের ঝুলি ভরে গেছে। সে ঝুলির মধ্যে আছে এক নতুন বিশ্ব, নতুন ভাবনাবিশ্ব। যাকে আমরা বলছি সারপ্লাস মিনিং। (শেষ)

 

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন— 

ডিকন্সট্রাকশন ও জ্যাক দেরিদা প্রসঙ্গে জহর সেনমজুমদার

ডিকন্সট্রাকশন ও জ্যাক দেরিদা প্রসঙ্গে জহর সেনমজুমদার || পর্ব-২

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।