বিকাল ০৫:৪৮ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

সিগারেটের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হাসপাতাল

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জাকিয়া আহমেদ।।

রোগ সারাতে যে হাসপাতালে ছুট দেয় মানুষ, সেখানেই অপেক্ষা করছে মৃত্যুফাঁদ। বেশকিছু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে দেদার বিক্রি হচ্ছে বিড়ি-সিগারেট। মানা হচ্ছে না তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন। অথচ হাসপাতালসহ পাবলিক প্লেসগুলোতে সতর্কতামূলক নোটিস প্রদর্শনের সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। রয়েছে এ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালাও। 

অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একেবারেই চুপ। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এর ধারা ৪ অনুযায়ী হাসপাতালসহ অন্যান্য পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয়।

সরেজমিনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতাল গিয়ে দেখা যায় আইনের ব্যত্যয় ঘটছে দেশের প্রাচীন হাসপাতাল দুটিতে।

পঙ্গু হাসপাতাল কম্পাউন্ডে ঢুকতেই দেখা যায় হকাররা সারি সারি বসে আছে সিগারেট-পান নিয়ে । সেখানে ওষুধ কোম্পানিগুলোর রিপ্রেজেনটেটিভ, ডাক্তারসহ হাসপাতলকর্মী এবং দর্শনার্থীরা দাঁড়িয়ে ধূমপান করছেন। পঙ্গু হাসপাতালের কম্পাউন্ডের ভেতর ঠিক যেখান থেকে রোগীদের অ্যাম্বুলেন্সে করে উঠানো-নামানো হয় সেখানেও কেউ কেউ ধূমপান করে যাচ্ছেন। এরা বেশিরভাগই হাসপাতালের দালাল, তাই এদেরকে কেউ কিছু বলার সাহস দেখাতে পারে না।

পঙ্গু হাসপাতাল থেকে অতি সম্প্রতি অন্যত্র বদলি হওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি ওখানে জয়েন করার পর একবার এসব হকারদের হাসপাতাল কম্পাউন্ড থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিলাম, কিন্তু হকার এবং দালালরা সেখানে এতটাই শক্তিশালী যে শেষ পর্যন্ত আমিই ভীত হয়ে উঠি নিজেকে নিয়ে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দর্শনার্থীরাতো বটেই ডাক্তাররাও ধূমপান করেন।’

অপরদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অবস্থা আরও ভয়ংকর। সেখানে জরুরি বিভাগের প্রধান গেইটে সারি সারি সিগারেটের দোকান। রয়েছে হাসপাতালের ভেতরেও! খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এসব হকারদের নির্দিষ্ট ‌‌‌সিন্ডিকেট রয়েছে এবং ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে তারাই সবচেয়ে শক্তিশালী। কারণ, হাসপাতালের তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সঙ্গে রয়েছে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগসাজশ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এসব নেতাদের কারণে অসংখ্যবার হাসপাতালের গেইটের বাইরের দোকানগুলো উচ্ছেদ করেও রেহাই মেলেনি। যতবার উচ্ছেদ হয়েছে ততবারই নতুনভাবে আবার এরা দোকান বসিয়েছে।   

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গেইটের বাইরেও দেখা গেছে একই চিত্র। বাদ পড়েনি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালও।

আর বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোর ভেতরে বাইরেও সিগারেট বিক্রি করতে দেখা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে এসব হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের কর্মকর্তা কর্মচারীরাই জড়িত এসব দোকানগুলোর সঙ্গে। এমনকি নিয়মিত এসব দোকান থেকে মাসোহারাও নিচ্ছে তারা।

হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের গেইটের বাইরের এক সিগারেট বিক্রেতা জানালেন, প্রতিদিন তাকে হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষীদের ৭০ টাকা দিতে হয়। আর যারা দোকান নিয়ে বসে আছেন তারা দেয় একশ থেকে দেড়শ টাকা।

ক্যাম্পেইন ফর টোবাকো ফ্রি কিডস-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি শরীফুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পাবলিক প্লেসে ধূমপান এমনেতিই নিষিদ্ধ। আর তা যদি হয় হাসপাতাল তাহলে তো বিষয়টা ভয়ানক।

হাসপাতালগুলোতে ধূমপান করা এবং সিগারেট বিক্রি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রোকসানা কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা গত সপ্তাহে এবং বুধবারও বিষয়টি নিয়ে মিটিং করেছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি প্রতিটি জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হবে মোবাইল কোর্ট বাড়ানোর জন্য। এ ছাড়া প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে আলাদা করে চিঠি দেব যেন হাসপাতালে ধূমপান এবং সিগারেটের দোকান না রাখা হয়। 

হাসপাতাল কম্পাউন্ডে সিগারেট বিক্রি শুধু আইনত দণ্ডনীয়ই নয় এটা আমাদের নৈতিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে, বলেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী। 

অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আইনে যে 'স্মোকিং যোন' থাকার কথা বলা হয়েছে হাসপাতালে সেটিও থাকতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি তারা দায়িত্ব পালন না করে তাহলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।