সকাল ০৯:৩৭ ; সোমবার ;  ২২ জুলাই, ২০১৯  

স্মরণ : তারেক মাসুদ ও ‘মাটির ময়না’র কলকাতা জয়

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

প্রসূন রহমান।।

সময়টা ২০০৭ এর জুলাই মাস। এর মাত্র কয়েকদিন আগে দীর্ঘ গবেষণা ও কাটাছেঁড়ার পর ‘কাগজের ফুল’ এর প্রাথমিক পাণ্ডুলিপিটি প্রস্তুত হয়। জুলাইয়ের মধ্যভাগে আমরা তিন সদস্যের দল (তারেক মাসুদ, ক্যাথরিন মাসুদ ও এই নিবন্ধের লেখক) কলকাতায় রওয়ানা হই। উদ্দেশ্য ‘মাটির ময়না’র কলকাতায় মুক্তির সময় উপস্থিত থাকা এবং একইসঙ্গে ‘কাগজের ফুল’ এর কলকাতা অংশের লোকেশন ও শিল্পী নির্বাচন করা। পরিবেশকের পক্ষ থেকে নন্দনে ‘মাটির ময়না’ মুক্তির দিন ধার্য করা হয় ২৯ জুলাই রবিবার। মুক্তির এক সপ্তাহ আগে অর্থাৎ ২২ জুলাই নিউ মার্কেটের কাছে একটি অভিজাত হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। যেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খ্যাতিমান নির্মাতা মৃণাল সেন, গৌতম ঘোষ, মৌসুমী ভৌমিকসহ টলিউডের বেশ ক’জন স্বনামধন্য নির্মাতা, চলচ্চিত্রকর্মী এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা।

কোনও এক শীত সকালে শ্যুটিং লোকেশনে
Caption

বলে রাখা ভালো, মোট ৩৫টি দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শন শেষে সর্বশেষ ভারতে মুক্তি পায় ‘মাটির ময়না’। সে মুক্তির অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিল না। বাংলাদেশে ভারতীয় চলচ্চিত্র বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শন শুরু হওয়ার আগে এখানে যেমন নানাদিক থেকে প্রতিবাদ হয়েছে তেমনি ওখানেও জোরালো প্রতিবাদ হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত দুই জায়গাতেই প্রতিবেশী দেশের চলচ্চিত্র ঠিকই ‘মুক্তি’ পেয়েছে, ‘বন্দী’ করে রাখা যায়নি।

যাই হোক, কলকাতার এসআরএফটিআই (সত্যজিৎ রায় ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট) এর অধ্যাপক বীরেন দাশ শর্মার নিজ প্রতিষ্ঠান ‘ডিজি ম্যাজিক’ আগ্রহী হয় ভারতে ‘মাটির ময়না’ পরিবেশনার দায়িত্ব নেওয়ার। উল্লেখ রাখা প্রয়োজন, বীরেন দাশ শর্মা তারেক মাসুদের পুরনো বন্ধু এবং প্রথমত এবং প্রধানত ‘মাটির ময়না’ সারা ভারতে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই তিনি ‘ডিজি ম্যাজিক’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন।

তারেক মাসুদ ও প্রসূণ রহমান
Caption

প্রায় সবকিছু চুড়ান্ত থাকার পরও হঠাৎ একদিন খবর আসে নন্দন কর্তৃপক্ষ ছবিটি প্রদর্শন নিশ্চিত করতে পারছে না। কারণ হিসেবে জানা যায়- ‘ইমপা’ (ইন্ডিয়ান মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন) নামে একটি সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে নালিশ করেছে- বাংলাদেশি ছবি কলকাতায় বাণিজ্যিকভাবে চলতে দিলে স্থানীয় ছবি ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবরটা শুনে তারেক মাসুদ খানিকটা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। অস্বস্তিতে পড়েন ছবিটির পরিবেশক বীরেন দাশ শর্মা। এদিকে বিষয়টি মিডিয়ায় চাউর হয়ে গেলে প্রায় সবগুলো প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া প্রতিদিনই এ নিয়ে নানা আলোচনা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। প্রতিদিনই বিভিন্ন পত্রিকার এবং টেলিভিশনের প্রতিবেদক আসেন সাক্ষাৎকার নিতে।

তারেক মাসুদ তার স্বভাবসুলভ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই উত্তর দিচ্ছেন সব প্রশ্নের। সবাইকে পুরোপুরি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন এমন নয়। তিনি  বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ হিন্দি সংস্কৃতির চাপে আছে, বাংলা সংস্কৃতির নয়। বাংলাদেশের দুয়েকটা ছবি এলেই পশ্চিমবঙ্গের ছবি বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এতোটা খারাপ অবস্থা তাদের নয়। তাছাড়া এটা তো একতরফা হবে না, নিশ্চয়ই বিনিময় হবে। সব ধরনের ছবিও আসবে না, শুধুমাত্র শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রের বিনিময় হবে। এখানকার ভালো ছবিও বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শন করার উদ্যোগ আপনারা নিতে পারেন। আর এটা এমন এক সময়ে হতে যাচ্ছে, যখন দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে প্রায় ৪৫ বছর পর দুই বাংলার মাঝে আবার সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ চালু হচ্ছে। এরপর হয়তো পারস্পরিক অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসবে।

মাটির ময়না’র একটি দৃশ্য
Caption

সাক্ষাৎকার শেষে কিছু লেখা ও প্রতিবেদন ‘মাটির ময়না’ মুক্তির পক্ষে যেমন এসেছে তেমনি কৌশলী কিছু লেখাও এসেছে যা আসলে বিপক্ষের অবস্থানটাই স্পষ্ট করে। কিন্তু ছবি মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে দেখা গেলো স্পষ্টতই দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ছবিটির পরিবেশক বীরেন দাশ শর্মাও তার সমস্ত যোগাযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে সবার শ্রদ্ধাভাজন নির্মাতা মৃণাল সেন ছবিটির পক্ষে অনেক কথা বলে গেলেও কী এক অজানা কারণে পরে আর এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। ধারণা করা হচ্ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব বাবুর সঙ্গে মৃণাল সেন একবার কথা বললেই ব্যাপারটা খুব সহজেই সুরাহা হয়ে যেতে পারতো। ওনার সহযোগিতা না পেয়ে বীরেন দাশ শর্মা এই নিবন্ধের লেখককে সঙ্গে করে একদিন মুখ্যমন্ত্রীর দাফতরিক কার্যালয় ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ এ গিয়ে হাজির হন। তার সঙ্গে দেখা করে ছবিটির সর্বভারতীয় মুক্তির সেন্সরপ্রাপ্তির কাগজপত্রের অনুলিপি রেখে আসা হয়। কিন্তু অবস্থা তারপরও প্রতিকূলে।

সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে এই রকম একটি পক্ষ কলকাতায় ‘মাটির ময়না’ মুক্তির বিষয়টি প্রায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করাবেন এমন সময়ে কয়েকটি সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল সরাসরি বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারেক মাসুদ তার স্বাভাবিক অবস্থান নিয়েই সেসব বিতর্কে উপস্থিত হন এবং তার বক্তব্য তুলে ধরেন। ২৭ তারিখ রাতের একটি টেলিভিশন টক শো পুরো অবস্থা পাল্টে দেয়। তখন ‘তারা বাংলা’য় একটি আলোচনা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন শিল্পী সুমন চট্টোপাধ্যায় (কবির সুমন)। সে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন তারেক মাসুদ ও সেই প্রতিবাদী সংগঠন ‘ইমপা’র তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তপন ঘোষাল। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যস্থতায় সরাসরি এই বিতর্কে দুজনেই যার যার অবস্থান তুলে ধরেন। কেন এই মুক্তির প্রয়োজন, কেন নয়? এটা কী শুধুই একটি চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক প্রদর্শন, নাকি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ? এটা কি একটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র, নাকি একটি শিল্পকর্ম? আলোচনায় তারেক মাসুদের চাইতে স্মার্ট উপস্থিতি আর কারও হতে পারে এটা ভাবা একটু কষ্টকর বৈকি। হয়েছেও তাই। আলোচনার ফাঁকে এসএমএসের মাধ্যমে দর্শকের ভোট দেওয়ার একটি পর্ব রয়েছে। আলোচনা শেষে দর্শক জরিপে দেখা যায় প্রায় ৮০ শতাংশ দর্শক ‘মাটির ময়না’ দেখবার পক্ষে এবং এই ধরনের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র বিনিময়ের পক্ষে রায় দিয়েছেন। হঠাৎ করেই পুরো অবস্থাটি ‘মাটির ময়না’র পক্ষে চলে আসে।

স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে
Caption

এই অনুষ্ঠানের পর সরকারও ভাবতে বাধ্য হয়, যে ছবি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাণিজ্যিক প্রদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন সে ছবি প্রদর্শন আঞ্চলিক সরকার বন্ধ করে কী করে! একইসঙ্গে দর্শক মতামতকে গুরুত্ব দিলেও এই ছবি প্রদর্শন বন্ধ করা সরকারের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। ফলে ‘মাটির ময়না’ সেখানে জিতে যায় এবং ২৯ জুলাই ২০০৭ নন্দনে মুক্তি পায়।

ছবিটি কয় সপ্তাহ সেখানে চলেছিল, বাণিজ্যিক মুক্তিতে কতোটা বাণিজ্য করতে পেরেছে সেই বিষয়টা কখনওই মুখ্য হয়ে উঠতে দেখিনি। কারণ শেষাবধি বিষয়টা হয়ে উঠেছিল একটি যৌক্তিক অবস্থানের জয়। তারেক মাসুদ ও তার বন্ধু বীরেন দাশ শর্মার যৌথ উদ্যোগে একটি আন্তঃবিনিময়ের শুরু। ‘ইমপা’সহ পশ্চিমবঙ্গবাসী বুঝতে সমর্থ হয়েছিল বাংলাদেশের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র তাদের জন্য হুমকি নয়। হয়তো কোনও দেশের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রই অন্য কারও দেশের জন্য হুমকি নয়। আকাশ সংস্কৃতির যুগে দর্শকের জন্যেও অপশন থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন যথাযথ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের, উৎসবের।

তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর যুগল
Caption

আমাদের চলচ্চিত্র নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে তারেক মাসুদের নিজস্ব গবেষণা এবং বেশকিছু লিখিত প্রস্তাব তিনি নিজের হাতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, পৃথিবীর যে কোনও দেশেই বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উপর ট্যাক্স আরোপ করা হয় প্রায় দ্বিগুণ। যেটা দেশীয় চলচ্চিত্রের বেলায় হয়ে থাকে নামে মাত্র। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হতে হবে সক্রিয় এবং ব্যবসায়িকভাবে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। আর যারা ছবি আমদানি করবেন বা করতে চান তারা দেশের স্বার্থটাও ভাববেন। ছবি বাছাইয়ের বেলায় রুচির পরিচয় দেবেন। আমাদের এখানে যেমন কালেভদ্রে কিছু ভালো ছবি হয়, কলকাতায়ও কিছু ভালো ছবি হয়। সেসব নিয়ে এলে দর্শকও নিশ্চই এর পক্ষে থাকবে। যেমন করে ‘মাটির ময়না’র পক্ষে ছিল পশ্চিম বাংলার জনগণ। কিন্তু তার আগে এখানে প্রয়োজন অনেকগুলো আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স। যা পশ্চিমবঙ্গের আছে, আমাদের নেই।

তারেক মাসুদ বলতেন, ‘আমাদের নির্মাতাদেরও প্রতিযোগিতার সাহস তৈরি হোক, সাহস হোক বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার। তাহলেই বরং সাবালক হয়ে উঠবে আমাদের চলচ্চিত্র। রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলে নিজেদের গোলপোস্টের সামনে সকলে মিলে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খুব আনন্দের নয়, মাঝে মাঝে আমাদের খেলোয়াড়দেরও গোল দেওয়ার ইচ্ছে হোক।’

তারেক মাসুদের চতুর্থ মৃত্যবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। স্মরণ করছি ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট তার সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া শ্রদ্ধেয় মিশুক মুনীরসহ ওয়াসিম, মুস্তাফিজ ও জামালকে। আপনারা যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা

proshoon.rahmaan@gmail.com

/এম/এমএম/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।