রাত ১০:১৯ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

আমি ছবিতে মিস্টিসিজমকে ধরতে চেয়েছি : মোস্তাফিজ কারিগর

প্রকাশিত:

[মোস্তাফিজ কারিগরের জন্ম ১৪ আগস্ট, ১৯৮৬ কুষ্টিয়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। তার প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী হয় ২০১২ সালে ঢাকার অলিয়স ফ্রসেসে। ২০১৪ সালে জাপানের টোকিওতে একটি দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। এ মাসে মোস্তাফিজের ২য় একক চিত্রপ্রদর্শনী শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির ডাউরটাউন গ্যালারিতে। এই প্রদর্শনী নিয়ে তার সাথে কথা বলেছেন জাহিদ সোহাগ।]

 

প্রশ্ন : প্রথমেই জানতে চাই, আমেরিকায় প্রদর্শনী করতে পেরে আপনার কেমন লাগছে?
উত্তর : এটা আমার জন্য খুবই আনন্দের যে একটা বিদেশি কমিউনিটির সাথে আমার কাজের পরিচয় ঘটছে। আর আমেরিকাতে তো শিল্পের সমজদার আমাদের দেশের চেয়ে অনেক বেশি। আমার ছবি সম্পর্কে ওদের মতামত আমার জন্যে খুবই আশির্বাদের হবে। 

প্রশ্ন : সেখানকার কাগজে কোনো সমালোচনা ছাপা হয়েছে? তারা কি বলছে?
উত্তর : ওখানকার একটা বাংলাভাষী পত্রিকা ‘জাগো নিউজ 24.কম’-এ নিউজ ছাপা হয়েছে। তারা লিখেছে, অনেক লোকসমাগম হচ্ছে। দর্শকরা খুব আগ্রহ নিয়ে ছবি দেখছে ইত্যাদি। এছাড়া সমালোচনাধর্মী কোনো লেখা এখনো পাইনি। তবে জানতে পেরেছি টেনেসি ইউনিভার্সির ফাইন আর্টের প্রফেসর সাম ইয়েটস লিখছেন। আর আমার কাছে আর একটা মেইল এসেছে, ড. জয়ালক্ষী ইয়াগনাস্বামী নামে একজন ভারতীয় আর্ট হিস্টোরিয়ান আমার প্রদর্শনী নিয়ে লিখতে আগ্রহী। তিনি লেখা শুরু করেছেন। এখনো হাতে পাইনি। তবে গ্যালারির কিউরেটর আমাকে মেইল করেছিলেন, বললেন, Your work are very amazing.   

প্রশ্ন : আমরা জেনেছি, সালভাদার দালি গ্যাটের কবিতা নিয়ে ছবি এঁকেছিলেন। এবং সেই প্রদর্শনীও হয়েছিলো ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির ডাউরটাউন গ্যালারিতে। এরপর নাকি আপনিই দ্বিতীয়। ব্যাপারটার সত্যাসত্যি কি? এবং আপনার কাছে কেমন লাগছে? দালির ওইসব কাজ দেখেছেন কিনা?
উত্তর : না, ওটা আসলে দান্তের কবিতা থেকে কাজটি করা। কাজটি আমি দেখেছি। আমার কাছে সালভাদর দালির একটা ভলিউম ক্যাটালগ আছে। হ্যাঁ, কিউরেটর জানিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে ঐ গ্যালারিতে সালভাদর দালির কিছু কাজের প্রদর্শনী হয়। ওখানে দান্তের কবিতা নিয়ে করা দালির ঐ চিত্রকর্মটিও ছিল। আমি আসলে দালি দ্বারা ভীষণভাবে আলোড়িত। আমি তার শিল্পচিন্তাকে চর্চা করি। আমার প্রথম দিকের কিছু কাজে তাঁর প্রভাব পড়েছিল, পরে বেড়িয়ে এসেছি। একবার দালির মতো গোঁফও রেখেছিলাম। চারুকলার বন্ধুরা আমাকে লিটল দালি বলেও ডাকতো। খবরটা শুনে খুবই আনন্দিত হয়েছি। তাহলে, সত্যিই দালির সাথে একটা সামান্য যোগ ঘটলো আমার।

প্রশ্ন : আমেরিকার ভিসা যেহেতু পাননি, পরবর্তীতে বাংলাদেশে এই কাজ নিয়ে প্রদর্শনী করবেন কিনা?
উত্তর : হ্যাঁ, সেই চিন্তাটা আছে।

প্রশ্ন : কবিতা অবলম্বনে ছবি আঁকার প্রেরণা কিভাবে পেলেন? হুমায়ুন কবিরের কবিতাই বা কেনো?
উত্তর : বইপত্র পড়তে গিয়ে দেখেছি পিকাসোরা তাদের কবি বন্ধুদের, যেমন অ্যাপোলিনিয়ারের কবিতার বিষয় নিয়ে ছবি এঁকেছে। কিউবিজমের উৎপত্তিই হয়েছিল একদল কবি ও শিল্পীদের এই ভাববিনিময় থেকে। যেহেতু নিজেও কবিতা লিখি, সেক্ষেত্রে প্রথমে আমি আমার কবিতা নিয়েই কিছু ছবি আঁকা শুরু করি। সেই সময় ক্লাসিক্যাল মিউজিক নিয়ে আমি পড়াশোনা করছিলাম। পরে কিছু কাজ ক্লাসিক্যাল মিউজিক নিয়ে করতে থাকি। এই সময় কবির ভাই আমার স্টুডিওতে বেড়াতে এলেন। ওনার সাথে চিত্রকলা, কবিতা নিয়ে অনেক আড্ডা হলো। উনি আমার কাজ দেখে ভীষণ খুশি হলেন। আমাকে বললেন, আমেরিকা ফিরে গিয়ে ওখানের গ্যালারীগুলোর সাথে কথা বলবেন- আমার একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করা যায় কিনা। আলোচনার এক পর্যায়ে আমিই ওনাকে বললাম, তাহলে একটা কাজ করতে পারি আমরা, আপনি নিজেও যেহেতু কবি, আমি এই মুহূর্তে তো কবিতা নিয়ে ছবি আঁকছি, আমি আপনার কবিতা নিয়ে কাজ করতে পারি। আর সেই ছবিগুলো নিয়ে আমেরিকায় প্রদর্শনীর চেষ্টা করা যেতে পারে। উনি আগ্রহী হলেন, তারপর কাজ আগাতে থাকলো। 

প্রশ্ন : সব সময় কি টেক্সটের অনুগামি থেকেছেন নাকি ভাবের সম্প্রসারণ ঘটেছে?
উত্তর : না, আমি বেশিরভাগ সময় টেক্সটাকে অতবেশি গ্রাহ্য করিনি। ভাবটা নিয়ে খেলেছি। আর ওনার কবিতার ভেতরে এক ধরনের ভাবালুতা আছে, সূফী ঘরানার। বিমূর্ততা আছে। ভাবকে খুঁজে খুঁজে আনন্দ নিতে হয়। সেই বিষয়টাই ছবি আঁকতে গিয়ে আমি ভীষণভাবে ব্যবহার করেছি- রঙে, কম্পোজিশনে। 

প্রশ্ন : কী ধরনের মেটাফোর ব্যবহার করেছেন- যেটা কবিতাকে চিহ্নিত করতে পারে?
উত্তর : ওনার কবিতার ভেতরে কথক বা চরিত্রগুলো ভীষণ নির্মোহ, ভাবুক। দৃশ্যগুলোর ভেতরেও একধরনের মিস্টিক আবহ আছে। আমি আমার ছবিতে সেই নির্মোহতা বা মিস্টিসিজমকে ধরতে চেয়েছি।

প্রশ্ন : আপনার প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিলো ২০১২ সালে, ঢাকার অঁলিয়স ফ্রসেসে- সেই সময়কার ছবিতে লক্ষ্য করি- ক্যারিকেচারের কিছুটা ছাপ আছে বা বলা যায় শিশির ভট্টাচর্যের প্রভাব দেখতে পাই। এবার ফর্মের দিকটা কেমন? রঙের ব্যবহার বা রঙের ভাবনা বিন্দু সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : এবারের কাজগুলো বিভিন্ন ইজমের কোলাজ। যেমন আমি ড্রইংয়ে ওরিয়েন্টালিজমকে রেখেছি, আবার কম্পোজিশনে কনটেমপোরারি ইউরোপ-আমেরিকান আর্টিস্টদের ধরনকে আশ্রয় করেছি, রঙের ক্ষেত্রে অ্যাকশন পেইন্টার, যেমন মিশেল বাশকিয়া বা গেরহার্ড রিখটারের রঙ লেপনের ধরণকে চর্চা করতে চেয়েছি।  

প্রশ্ন : আপনার তো ছবি আঁকাই পেশা। বইয়ের প্রচ্ছদ ইলাস্ট্রেশনও করেন। বাংলাদেশে ছবির বাজার কেমন?
উত্তর : আসলে ছবির বাজার বলতে যা বোঝায়, তা কখনোই বাংলাদেশে ছিল না। যা কিছু ছবি বিক্রি হয় তা একটা নির্দিষ্ট কমিউনিটির ভেতর। এবং তারা এটাকে একটা সিন্ডিকেটের মতো করে রেখেছে। কোনো তরুণের ছবি কাজের গুণে বিক্রি হবে এমনটি নয়। কিছু ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিরা সিনিয়র শিল্পীদের নিয়ে একধরণের সাজানো আর্ট-কালচারের চর্চা করে। কেউ যদি ছবি বিক্রি করতে চাই ওনাদের পেছনে ঘুরতে হবে, বিভিন্নভাবে আতাত করতে হবে। গ্যালারি বিজনেস যারা করে তারাও অখ্যাত বা তরুণদের প্রমোট করতে চায় না। এটা আসলে পুঁজির শক্তির কাছে নত। পুঁজিপতিরা যদি মনে করে আমাকে স্টার বানিয়ে ওদের কোনো উপকার হবে, বিজনেস হবে তবে ওরা আমাকে প্রমোট করবে। শিল্প হলো কি হলো না তারা তা বুঝতে চান না। আর মধ্যবিত্তরা কালচারালি পিছিয়ে থাকার কারণে আমাদের দেশে চিত্রকর্মের বাজার নেই বললেই চলে। 

প্রশ্ন : আমাদের গ্যালারীর সংখ্যাও ক্রমশ কমে আসছে। ঢাকা আর্ট সেন্টার বন্ধ হয়ে গেছে। বেঙ্গলও সবগুলো গ্যালারী চালাতে চাচ্ছে না। এই বাস্তবতায় চারুকলা থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা যারা ছবি আঁকাকেই পেশা হিসেবে নিতে চায় তারা করবে কি?  
উত্তর : শুধু ছবি একে বেঁচে থাকার দেশ এটা না। কেউ কেউ সরাসরি চাকরিতে ঢুকে যাচ্ছে। কেউ কেউ অড জব করছে। বা কাউকে কাউকে পুঁজিপতিদের সাথে কম্প্রোমাইজ করে, ব্যক্তিত্বকে খুইয়ে বাঁচতে হচ্ছে। আমি নিজেও তো প্রচ্ছদ-ইলাস্ট্রেশন, ইনটেরিয়র এসব করে চালিয়ে নিচ্ছি, যদিও এটা ছবি আঁকা রিলেটেডই। তবে যে কাজ করতে চাই তাকে এ সোসাইটির সাথে যুদ্ধ করেই করতে হবে। এই জীবনটাকে আর্থিক সংকট হিসেবে না দেখে সাংস্কৃতিক সংকট হিসেবে ভেবে কাজ করে যেতে হবে। যেদিন সাংস্কৃতিকভাবে আমাদের কমিউনিটি জেগে উঠবে সেদিন দেখবেন অর্থকষ্টও থাকবে না মানুষের।

প্রশ্ন : আমি এমনও দেখেছি পাশ করা ছাত্রছাত্রীরা কেরানীর চাকরি করছে। কথা বলে জেনেছি তারা ঝুঁকি নিতে চান না। আপনি হয়ত বলবেন, যে আঁকার সে সব ঝুঁকি অগ্রাহ্য করেই আঁকবে। এ ব্যাপারে আপনার কথা শুনতে চাই।  
উত্তর : হ্যাঁ, শিল্পীদের জীবন তো বাজি খেলার মতো। যে এই বাজি খেলায় আত্মশক্তি বাড়াতে পারবে তার কাছে অর্থনৈতিক সংকট কখনো প্রধান হয়ে উঠবে না। আমি মনে করি সব জীবনেরই অনিশ্চয়তা আছে। জগতের কিছু সত্যিকে তো বুঝে নিতে হবে। আমাদের জন্ম, মৃত্যু, সম্মৃদ্ধি তো আমাদের হাতে নয়। আমাদের কাজ হলো শুধু কাজ করে যাওয়া। আমি আমার জীবটাকে এভাবে করেই চালিয়ে নিয়ে যেতে চাই। মিথ্যে মিথ্যে নিশ্চয়তার কথা ভেবে কোনো লাভ নেই। জগতের সবকিছুই একটা ইনফিনিটির দিকে চলেছে, এসবকে কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে আটকে রাখতে আমরা পারবো না। ছবি আঁকার ভেতর দিয়ে আমি সেই ইনফিনিটিকে উপলব্ধি করে আনন্দ পায়। 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।