সকাল ১১:২৩ ; সোমবার ;  ১৭ জুন, ২০১৯  

ডানা মেলা এক ঝাঁক তরুণ ও তাদের ভাবনা

প্রকাশিত:

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক।।   

তরুণরা এগিয়ে যাচ্ছেন। হতাশ হয়ে যখন বয়োবৃদ্ধরা মাথা নেড়ে বলেন, এ যুগের ছেলে-পেলে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, তখন হাল না ছাড়া, হার না মানা তরুণরা মুচকি হাসেন। কারণ তারা কিছু করায় বিশ্বাসী কথা বলায় না। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তরুণরা। আর এখনই তাদের যে সাফল্য সেটি নিসন্দেহে ঈর্ষণীয়। তবে তারা এইটুকু সাফল্যে খুশি নন। যেতে চান বহুদূর। বিশ্ব যুব দিবসে এমনই ক’জন ডানা মেলা তরুণের ভাবনা তুলে ধরছে বাংলা ট্রিবিউন।

সামিরা জুবেরি হিমিকা, উদ্যোক্তা

হিমিকা নামটি তরুণদের কাছে এখন খুব চেনা একটি নাম। অনেকেই বলে উঠেন ও টিম ইঞ্জিনের হিমিকা? অনেকে আবার তাকে চেনেন বাংলা ওসিআরের প্রবক্তা হিসেবে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিস তথা বেসিসের পরিচালকদের একজন হিমিকা। সঙ্গীত শিল্পী, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, আইটি ব্যক্তিত্বসহ অনেকগুলো পরিচয় হিমিকার নামের পাশে লেখা যায়।

এই সময়ের তরুণদের নিয়ে  হিমিকা বলেন, এ যুগের তরুণদের নিয়ে ভাবলে যে বিষয়টি আমাকে একটু বেশি ভাবায় সেটি হচ্ছে আমরা স্বপ্ন দেখতে কার্পণ্য করি। বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে বিদেশিরা এগিয়ে এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বসে রয়েছি আমরা। গ্লোবালাইজেশনের যুগে বিশ্বব্যাপী কি হচ্ছে সে বিষয়ে আমরা বিস্তারিত বোঝার চেষ্টা করিনা। এক্ষেত্রে নিজেদের উদ্যোগ নেই।  সংশয় রয়েছে আমাদের মধ্যে।  এক কথায় বলব বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে স্বপ্ন দেখার সাহস করা উচিত। আর স্বপ্ন বাস্তবে রুপ দেওয়ার মোক্ষম সময় তারুণ্য।

হিমিকা মনে করেন, এজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমিত্ব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমাদের কাজ ও পরিকল্পনাগুলো অন্যান্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। ঘরে বসে নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসেবে ভাবলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে নিজেদেরকে ছড়িয়ে দিতে হবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এতে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পক্ষে-বিপক্ষে ফলাফল আসতে পারে। আর তরুণ বয়সটি হচ্ছে নতুন নতুন চেষ্টার। কিছু করার মানসিকতা অব্যাহত রাখলে ভুল করতে করতেও নিজেকে শুধরে নেওয়া যায়। আর এটি সবচেয়ে বেশি সম্ভব তরুণ বয়সে।

সামিরা জুবেরি হিমিকা তারুণ্যের শক্তি ব্যবহার করার বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে আগ্রহী।  ইতোমধ্যে যারা সফল হয়েছে তাদের সঙ্গে সম্পর্কটা আরও জোরদার করে নিজের কাজ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথাও বলেন তিনি। এটাকে তার ভাষায় তিনি বলেন, ফিডব্যাক মেকানিজম। তরুণদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারন একা একা কোনও কাজ করা সম্ভব না।

এ ক্ষেত্রে বলব আমরা আমাদের দেশের একটি বিষয়ে পরিবর্তনের চেষ্টা করছি। এটি অনেকটা পার্টনারশিপ ওয়ার্ক। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণে একটি বিষয় বলতে চাই তরুণ উদ্যোক্তাদের। অনেকেই ভাবেন যে পড়ালেখা শেষ করে কোন ব্যবসা শুরু করবো। কিন্তু আমি বলবো এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসা উচিৎ। অনার্স লেভেল ক্লাস খুব বেশিক্ষণ থাকে না। বাকি সময় টুকুতে শুধু আড্ডা আর আনন্দ খোজার চেষ্টা না করে উচিৎ নিজের লক্ষ্য অর্জনে কাজ করা। ফলে স্নাতক শেষ করতে করতে নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যোগ থাকবে অনেক কিছুই ।

আর টেকনোলজির ক্ষেত্রে তিনি বলতে চান,খুব ছোট টিমে ছোট ছোট করে একটি ওয়েবসাইট ডিজাইন হোক বা সফটওয়্যার ডিজাইন হোক বা কোন ক্যাম্পেইন। যে কোনও কিছু করতে খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন হয় না। টেকনোলজির সৌন্দর্য হচ্ছে স্বল্প বিনিয়োগে অল্প মানুষ দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা অনেক বেশি।

তবে তরুণদের শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক না হয়ে উচিত ছড়িয়ে যাওয়া এমনটাও মনে করেন তিনি। ঢাকার বাইরে তরুণদের আধুনিকতার বিষয়ে গঠনমূলক অনুপ্রেরণা দেওয়ার কাজ খুব কম হয়। তবে সব কিছুর বাইরে আলাদা ভাবে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সেটি হচ্ছে কোন বিষয়ে লেগে থাকার  মানসিক প্রবণতা। হিমিকা বিশ্বাস করেন, নিজের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এগিয়ে যেতে হবে। কারও দ্বারা উৎসাহী হওয়ার দরকার নাই বা আশাহত হওয়ার দরকার নাই । আস্থা রাখতে হবে নিজের বিশ্বাসের ওপর। হিমিকা নিজেও এভাবেই এগিয়েছিলেন। আপনি নন কেন?

প্রীত রেজা, আলোকচিত্রী

ওয়েডিং ডায়েরি নামটা খুব চেনা চেনা লাগছে ? কোথায় দেখেছেন মনে করতে চাচ্ছেন? বিশ্বসেরা ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসান কিংবা মুশফিকুর রহিমের বিয়ের ছবি দেখেছেন? তাদের ছবি দিয়ে ঢাকা শহরে কয়েকটি বিলবোর্ডও হয়েছিল। এবার নিশ্চয় ওয়েডিং ডায়েরির কথা মনে পড়েছে? ওয়েডিং ডায়েরি হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠান যারা বিয়ের ছবি নিয়ে কাজ করে আসছে বিশ্বব্যাপী। আর সেই প্রতিষ্ঠানের পেছনের মানুষটা প্রীত রেজা। বিয়ের ছবি তোলাকে আনন্দের বা স্মৃতি ধরে রাখার খোরাক থেকে তিনি রূপ দিয়েছে শিল্পে। বনেছেন উদ্যোক্তা। বিয়ের ছবি দিয়ে বাংলাদেশে প্রদর্শনী করার প্রথম ঘটনাটাও তিনিই ঘটিয়েছেন। এবার নিশ্চয় আপনি চিনেছেন প্রীত রেজাকে। তিনি শুধু ওয়েডিং ডায়েরি নয় একইসঙ্গে পরিচালনা করছেন প্রীত রেজা প্রোডাকশন, ডব্লিউডি স্কুল অব ফোটোগ্রাফি, ওয়েডিং ডায়েরি গিফট শপ। একা নিজের হাতে সব সামলাচ্ছেন তিনি। আর হ্যা আলোকচিত্রী হিসেবে অর্জন করা পুরস্কারের কথা নাইবা বললাম। সেদিনও হাতে নিলেন ফটোফি বর্ষসেরা আলোকচিত্রীর পুরস্কার। আরেকটি পরিচয় না বললেই নয়, ফোটো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। তিনি কাজ করেছেন দৈনিক ইত্তেফাক, নিউ এইজ, দ্য ডেইলি স্টার, দৃক নিউজ, দৈনিক আজকের কাগজ এবং দৈনিক ভোরের কাগজের আলোকচিত্রী হিসেবে।

তরুণেরদের নিয়ে তার ভাবনার কথা জানতে চাইতেই বললেন,  ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন সময় শুনে আসছি এটা করো না, ওটা খেওনা, ওখানে যেওনা, এভাবে বলো না থেকে সকল প্রকার ’না’ শব্দের সম্মেলন। আর এ কাজটি করে গেছেন আমাদের কাছে-দূরের, পছন্দের-অপছন্দের মানুষেরা। এটি দোষ নয়, কিন্তু একটি প্রতিবন্ধকতা নতুনত্বের পথে ।

যখন সাংবাদিক ছিলেন, তখন বিয়েবাড়িতে টাকার বিনিময়ে ছবি তুলতেন বলে কত কথা শুনতে হয়েছে তাকে। এমন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি।  প্রীত বলেন,যে কোনও ধরনের ছবি তুলতেই তার ভালো লাগতো। তবে বিয়ের ছবি তোলার কারণে অনেক পরিচিতরাই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে এড়িয়ে চলতো। প্রশ্ন করতো এত ভালো ছবি তুলেন তাহলে বিয়ের ছবি তোলার কী দরকার। সেই মানুষগুলোর ওপর অভিমান কিংবা রাগ থেকে নয়, বরং প্রথা ভাঙ্গতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। জেদ থেকেই নাকি সব হয়। প্রীত তাই দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

মানুষের স্বজাত স্বভাব হচ্ছে কোন ব্যক্তিত্ব থেকে অণুপ্রেরণা খুঁজে নেয়া। তবে প্রীত বিশ্বাস করেন যে কেউ তার নিজের গুণটি দিয়ে হয়ে উঠতে পারেন তার নিজের অনুপ্রেরণা। সেজন্য প্রয়োজন কেবল নিজের সুন্দর অভ্যাসটির প্রাত্যহিক পরিচর্যা। এভাবেই তরুণরা এগিয়ে যাবে। ওদের হারানোর কিছু নেই। তরুণদের নিয়ে তার অনেক প্রত্যাশা। তিনি বিশ্বাস করেন তারা অনেক কিছু করবেই।

একুয়া রেজিয়া, কথা সাহিত্যিক

২০১৫ সালের বইমেলায় যারা বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকা খুঁজে বই কিনেছেন, তারা অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘এই শহরের মেঘেরা একা ’ বইটার নাম নিশ্চয় জানেন। এটিই ছিল রকমারি নির্বাচিত এবারের বই মেলার বেস্ট সেলার উপন্যাস। এই বইটির লেখককে অনেকে খুঁজেছেন। ভেবেছেন কোনও ভারিক্কি লেখক তিনি। নিশ্চয় তার আরও অনেক বই আছে এমন খোঁজও নিয়েছেন। তিনি একুয়া রেজিয়া। একদম ছটফটে ছোট্ট একজন মানুষ। লেখা দিয়ে জয় করে নিয়েছেন হাজারও মানুষের হৃদয়।

তরুণ ও তারুণ্য নিয়ে তিনি মুখোমুখী হয়েছিলেন বাংলা ট্রিবিউনের। তিনি বলেন, ‘তারুণ্য’  শব্দটাকেই আমার ভীষণ শক্তিশালী মনে হয়। তারুণ্য বয়সসীমা দিয়ে বেঁধে রাখার মতো কোনও বিষয় নয়। তারুণ্য একটা বিস্ফোরণ, একটা স্ফুলিঙ্গ, একটা স্বপ্ন কিংবা শক্তির নাম যা ধারণ করতে হয় মনেপ্রাণে এবং কাজে।তারুণ্য মানেই দারুণ কিছু। ছকের বাইরে কিছু করা কিংবা বলা যায় দেয়াল ভেঙে চুরমার করে নতুন কিছু গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। আর এই প্রচেষ্টা আর স্বপ্ন আমরা যতদিন বুকে ধারণ করবো ততদিন আমাদের লাল সবুজের বাংলাদেশ উজ্জ্বল হয়ে থাকবে গর্বে, অর্জনে।তারুণ্য হচ্ছে এমন একটা পরশ পাথর যেটাকে ঠিক মতো কাজে লাগাতে পারলে অনেক অসাধ্যকে সাধন করা সম্ভব।
৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এ সময়ে এসে ঈদে পথশিশুদের জন্য নতুন কাপড় সংগ্রহ করা, কিংবা মধ্যরাতে নিতান্তই অচেনা কাউকে রক্ত দিতে চলে যাওয়াসহ আমি সব কিছুতেই দেখতে পাই তারুণ্যের জয়জয়কার। আমি বিশ্বাস করি আমাদের দেশের অধিকাংশ তরুণ যেই লক্ষ্য অর্জন করতে এগিয়ে যাবে, দিনশেষে সেখানেই সৃষ্টি হবে ইতিহাস। তো তরুণরা প্রস্তুত তো লেখক একুয়া রেজিয়ার মতো বিস্ফোরিত হতে?

/এআই/এফএএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।