রাত ১০:১৭ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

স্কুলব্যাগের দ্বিগুণ ওজন, বই-খাতার বাঁধাই দায়ী!

প্রকাশিত:

উদিসা ইসলাম।।

সাতটা খাতা, সাতটা বই, টিফিনবক্স, অ্যাসাইনমেন্টের কপি (এক দিস্তা কাগজ), স্কুল ডায়েরি, পেন্সিলবক্স, কালারবক্স (ড্রয়িংক্লাস থাকবে যেদিন)। এইসব মিলে ব্যাগের ওজন যা হয় তা আপাতদৃষ্টে একজন শিশুর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন অনেকে। যাদের সামর্থ আছে তারা ট্রলিব্যাগ কিনে সেই ভার কম করতে চাইলেও শিশু অধিকার কর্মীরা বলছেন, আগে ব্যাগ এত ভারি হতো না। এখন কেন ভারি হচ্ছে তা বের করে ওজন কমাতে হবে। তারা বলছেন, এতে শিশুর শারীরিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আসতে পারে এবং বোঝা বহনের অভিজ্ঞতা কখনওই ভাল ফল আনে না।

সেন্ট জোসেফ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রের এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষা্থীদের খাতা স্কুল থেকেই কিনতে হয়। সেই খাতায় তারা টেকসই করতে যে মলাট ব্যবহার করে তাতেই ভারি হয়ে ওঠে খাতা। এ ছাড়া স্কুলের নানাবিধ কর্মসূচি ও অভিভাবকদের নির্দেশনার জন্য যে ডায়েরি ব্যবহার করতে হয় সেটার ওজনও না। আর আছে আধা লিটার পানি ও টিফিনবক্স।

ওই মা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমার ছেলের ঘাড়ে রোজ ব্যথা বলে। আমি চাকরিজীবী মা। রোজ ছেলেকে নিতে গিয়ে ব্যাগ সঙ্গে করে নিয়ে আসব সেটার সময়ও পাই না। ওকে একা আসতে হয় এবং ব্যাগ বহন করতে হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ চাইলেই এই বোঝা কমানোর ব্যবস্থা করতে পারে।

কেবল বেসরকারি নয়, সরকারি স্কুল ঘুরেও শিশুদের কাঁধে ভারি ব্যাগ বা মায়ের হাতে ভারি ব্যাগ দেখা গেছে। শিক্ষকরা বলছেন এখনকার পড়ার ধরন পাল্টে গেছে আগের চেয়ে। ফলে সব বই কমবেশি ব্যাগে আনতে হয়। এতে আসলে করণীয় খুব বেশি কিছু নাই। আর প্রি-প্রাইমারি স্কুলে শিশুদের ব্যাগ বহন না করে স্কুলে রাখার জন্য যে কাঠামো দরকার তা সবার পক্ষে করা সম্ভব না।

গত মঙ্গলবার শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি স্কুলব্যাগের ওজন নিষিদ্ধ করতে ও প্রি-প্রাইমারি শিশুদের স্কুলব্যাগ বহন না করতে কেন আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে দায়ের করা এক রিট আবেদনের শুনানি করে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের তিন আইনজীবী এসএম মাসুদ হোসেন দোলন, মো. জিয়াউল হক ও ‍আনোয়ারুল করিম গত ৯ আগস্ট এ রিটটি দায়ের করেছিলেন।

আইন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত শিশুদের ভারি স্কুলব্যাগ বহন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করা হয় এ আবেদনে। কিন্তু কেন ব্যাগ ভারি হয় সে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বই ও খাতা টেকসই করতে দেওয়া বাঁধাইয়ের দিকেই তীর ছুড়লেন সকলে।

গ্রিনহেরাল্ড স্কুলের এক অভিভাবক জানান, ক্লাসের রুটিন অনুযায়ী বই, আলাদা আলাদা খাতা, টিফিন, পানির বোতল, রংপেন্সিল, আলাদা পেন্সিলবক্সসহ নানাকিছু মিলিয়ে ব্যাগ ভারি আর এখনকার ব্যাগগুলোর সাইজ ও ধরনটা খালি অবস্থাতেই অনেক বেশি ভারি। সবমিলিয়ে শিশুকে ব্যাগ বইতে দেওয়ার কোনও উপায় নেই। গত দুই বছর ধরে তিনি নিজেই ব্যাগ বহন করেন।

আবেদনকারী এসএম মাসুদ হোসেন দোলন বলেন, আমার দেখা শিশুদের ওজন ও ব্যাগের ওজনের যে অনুপাত সেটা শঙ্কার। আইন করে এটা বন্ধের সময় এসেছে।তিনি বলেন, একজন ১০ বছরের শিশুর কেনও পিঠে ব্যথার অভিযোগ করবে সেটা একবার ভেবে দেখা দরকার।

অতিরিক্ত ওজন বহন প্রসঙ্গে নিউরোসার্জন রেজাউস সাত্তার বলেন, অতিরিক্ত ওজন বহনের কারণে শিশুদের মেরুদণ্ড ও অস্থিসন্ধিস্থলগুলোয় ক্ষতি হয়ে থাকে। এতে ধরুন, ১০ শতাংশ শক্তি দিয়ে যে কাজটা তার করতে পারার কথা সেটা সে ২০ শতাংশ শক্তি ব্যয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে। এই বাড়তি ক্ষয় কী দিয়ে পূরণ হবে?

এতে শিশুর কতটুকু ক্ষতি হয় তা জানতে বাংলাদেশে কোনও গবেষণার পদক্ষেপ এখনও নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি ভারতের একটি আদালত শিশুর স্কুলব্যাগ তার ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না বলে আদেশ দিয়েছে।

গবেষণা না থাকলেও একটা হিসাব দিতে চেষ্টা করেছেন শিশুচিকিৎসক ডা. শাহরিয়ার। তিনি বলেন ঠিক ১০ শতাংশের হিসেবেই যদি যাই, সেক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রদের ব্যাগের ওজন হবে এক থেকে সর্বোচ্চ দেড় কেজি। এর পরের ক্লাসগুলোতে তিন কেজি নিতে পারলেও পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির শিশুদের চার কেজির ওপর বহন নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। তার মতে বয়সন্ধিকালে ভারী কিছু বহন করলে তা পরবর্তীতে প্রজনন-ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী সালমা আলী বলেন, শিশুর ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে মানসিক বিকাশ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি আরও বলেন, শিশুদের কোমল অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেলে সেই প্রজন্ম যখন বড় হবে তখন মানবিকতা খুঁজে পাওয়া দুরূহ হয়ে যাবে।

 

/এফএএন/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।