রাত ০১:৩২ ; রবিবার ;  ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০  

রসগোল্লা, তুমি কার?

প্রকাশিত:

নাঈম সিনহা।।  

ভারতবর্ষে বাঙালির অবদান কম নয়। বেশ কিছু জিনিসের মালিকানা বাঙালিরা ভারতবর্ষের কাছে দাবি করতে পারে। এর মধ্যে প্রথমটি হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার। এ ছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সূর্যসেন থেকে অমর্ত্য সেনের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পর্যন্ত আছে আরও কতশত অবদান। তবে একটি খাবারের স্বাদ নিয়ে ভারতবর্ষে বিতর্ক না থাকলেও তার মালিকানা ও সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে আছে বিতর্ক। অমৃতটির নাম রসগোল্লা।

তিন জাতির এক দাবি- রসগোল্লা তার। বাঙালি, ওড়িষ্যা ও পর্তুগিজ। কে বা কারা প্রথমবারের মতো তৈরি করেছিল রসগোল্লা। আসুন ইতিহাসটা একটু নেড়েচেড়ে দেখা যাক।

 

ওড়িষ্যার দাবি

রথযাত্রা’র সময় বহুকাল আগে থেকেই ওড়িষ্যার জগন্নাথ মন্দিরে রসগোল্লার প্রচলন ছিল। জগন্নাথ মন্দিরের জনপ্রশাসন কর্মকর্তা লক্ষ্মীধারা পুজাপাণ্ডে টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে বলেন, ১২শ শতাব্দীর দিকে জগন্নাথ মন্দিরের জন্মের পর থেকেই রসগোল্লা খাওয়ার প্রচলন আছে।
এ নিয়ে চলতে থাকে বিতর্ক। কেউ কেউ এর প্রতিবাদ করে বলেন এই মিষ্টান্ন আসলে ‘ছাপ্পান ভোগ’ নামে পরিচিত। যা ভগবান কৃষ্ণের জন্য তৈরি হতো। এর সঙ্গে রসগোল্লার সম্পর্ক নেই। এ ছাড়াও ইতিহাসবিদ কে টি আচার্য বলেন, ‘হিন্দু ধর্মে ছানাকে সেই সময় অপবিত্র বলে মনে করা হতো। কারণ দুধ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেই ছানা তৈরি হয়। আর ১২শ শতাব্দীতে একটি রক্ষণশীল সমাজে ছানার ব্যবহার দুষ্প্রাপ্য কিংবা অধর্মই বলা যেতে পারে। ’

ইতিহাসে ১৭শ শতাব্দীর আগে ভারতবর্ষে পনিরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদ ও খাদ্য বিষয়ক লেখক চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘কৃষ্ণ তার যুবককাল একটি কৃষক পরিবারে অতিবাহিত হয়। সেখানে বহুবার দুধ, মাখন, ঘি ও লাচ্ছির উদাহরণ আছে। তবে একবারও ছানার কথা নেই।’

 

পর্তুগিজদের দাবি
মধ্যযুগে ভারতবর্ষের দিল্লি ও স্থানীয় রাজাদের ওপর মোঘলদের চাইতে বেশি আধিপত্য ছিল পর্তুগিজদের। আরবরা এশিয়া স্থলপথ আবিষ্কারের পরেই পর্তুগিজরা তাদের সকল শক্তি ও অর্থ সমুদ্রপথ আবিষ্কারে ব্যয় করে। এই বিশাল ব্যয়কে তারা আয়েও পরিণত করে। 

১৪৯৮ সালে ভাস্কো ডা গামা ভারতে আসার পথ বাতলে দেন। এরপর তারা আর বসে থাকেনি, পাড়ি জমিয়েছে চট্টগ্রাম,কলকাতা বন্দর থেকে বোম্বে পর্যন্ত। তাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় যেমন যোগ হয়েছে কিছু ভিনদেশি শব্দ, তেমনই জীবনযাত্রায় বাঙালি অভ্যস্ত হয়েছে বিভিন্ন বিদেশি যন্ত্র ব্যবহারেও।

শুধু তাই নয়, কিছু খাবার পর্তুগিজদের মাধ্যমে ভারতবর্ষে জনপ্রিয় হয়। তাদের একটি প্রিয় খাবারের মধ্যে ছিল ঘরে তৈরি পনির। যা তারা তৈরি করতো সেদ্ধ দুধের সঙ্গে সাইট্রিক এসিড মিশিয়ে। কে টি আচার্য বলেন, পর্তুগিজদের এই ধারণা থেকেই বাঙালিদের ময়রার সৃষ্টি হয়।     

ফ্রাংকয়িজ বার্নিয়ার ছিলেন মোঘলদের একজন ব্যক্তিগত শরীরচর্চাবিদ। তিনি জানান,‘বাঙালিরা আগে থেকেই পর্তুগিজদের অনুসরণ করে মিষ্টি তৈরিতে এবং তা বিক্রিতেও পারদর্শী ছিল।’

পর্তুগিজরা বাঙালিদের তিন ধরনের পনির বানানো শিখিয়েছিল। প্রথমটি সাধারণ ছানা, দ্বিতীয়টি হলো চমৎকার ঘ্রাণযুক্ত বান্ডেল পনির। যা এখনও কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার কিছু দোকানে এখনও পাওয়া যায়। তৃতীয়টিকে বর্তমানে ‘ঢাকাই পনির’ নামেই সবাই চিনে। এটি শুধু ঢাকায় পাওয়া যায়। উল্লেখ্য পনির নামটি তুরস্ক থেকে এসেছে।
যেহেতু ছানা রসগোল্লার মূল উপাদান। সেহেতু পর্তুগিজদের এই ছানা কিভাবে রসগোল্লা হলো সেটাই মূল রহস্য। আগের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে উড়িষ্যার জগন্নাথ মন্দিরের রসগোল্লার কাহিনীটির ভিত্তি নেই।

অন্যদিকে পর্তুগিজরা তো শুধু ছানা কিংবা পনির পর্যন্ত এসেই ইতিহাসে দাঁড়ি দিয়েছেন। রসগোল্লা পর্যন্ত আসা হয়নি।

 

দোকান যার, মালিকানাও তার  

অনেকেই মনে করেন রসগোল্লা বাংলার সৃষ্টি। বাংলার রসগোল্লাই পরবর্তীতে ওড়িষ্যা সহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপক্ষে বেশ কিছু যুক্তিও আছে।

আধুনিক রসগোল্লার জনক কলকাতার বাঙালি নবীন চন্দ্র দাস। তিনিই প্রথম ছানার গোল্লাকে চিনির রসে ভেজে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু করেন।

তবে তার আগেও কেউ এমনটা করেছে কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তাতে কী! স্টিভ জবস আইফোন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে এনেছেন। তাই তাকে আইফোনের জনক বলা হয়। একইভাবে প্রথম রসগোল্লার দোকানি হওয়ার সুবাদে বাঙালি নবীন চন্দ্র দাসকেই রসগোল্লার জনক বলা যেতে পারে। অন্তত একটা ঠিকানা তো আছে। অতএব ইতিহাসের পাতায় সকলকে হটিয়ে ঠাঁই পেয়েছে বাংলার নাম রসগোল্লার জনক হিসেবে।

ছবি: সংগ্রহ

/আরএফ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।