রাত ১১:২১ ; রবিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৮  

ডিকন্সট্রাকশন ও জ্যাক দেরিদা প্রসঙ্গে জহর সেনমজুমদার || পর্ব-২

প্রকাশিত:

পূর্ব প্রকাশের পর
...ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়ে। এরকম পঙক্তি ছিল। বেহুলা কী? আমরা বিজয়গুপ্তের বেহুলাকে দেখি না? আবার সেই সময়ের বেহুলাকে যারা নতুন করে রচনা করছেন, এরকম একেবারেই নয়। এই প্রথম আমরা বাংলা কবিতায় নতুন এক বেহুলাকে দেখলাম। আমরা একটা অকথিত বা অবর্ণনীয় চাপা ইতিহাস, বাংলার নারীর- অগ্নিদগ্ধ নারীই বলবো- মানসিক দিক থেকে বিধ্বস্ত এক নারী দেখলাম। বিপন্নতার আর্তনাদ- যেটা বাংলা কবিতায় বেহুলার মধ্য দিয়ে জীবনানন্দ প্রকাশ করেছেন। এই বেহুলা সেই ইতিহাস বলতে পারছে না, যে ইতিহাস সে-ই একমাত্র জানে- কী সেই ইতিহাস? আমরা জানি যে, লক্ষীন্দরকে বাঁচানোর জন্য বেহুলা তার মৃতদেহ নিয়ে দেবতাদের সভায় গিয়েছিলো। এবং একথা আমরা জোরের সঙ্গে কেউ বলতে পারি না যে, সব দেবতারাই সৎ চরিত্রবান। আবার একথাও সত্য কোনো বিনিময় ছাড়া বেহুলাকে দেবতারা তার মৃত স্বামীকে ফিরিয়ে দিবেন- একেবারেই নয়, এক্কেবারেই নয়। যেটা বলা হচ্ছে নৃত্য, গীত ইত্যাদি পরিবেশন করে, দেবতাদের খুশি করে বেহুলা তার স্বামীকে নিয়ে ফিরে এলেন আবার চম্পকনগরীতে। যারা এ কথা বলেন মিথ্যে বলেন। তার কারণ হচ্ছে, এর ভেতরে আরেকটা গোপন, করুণ বঙ্গদেশের নারীর ইতিহাস লুকিয়ে আছে। স্বামীদের বাঁচাতে মেয়েদের অনেক কিছু খোয়াতে হয়। যে অবমানিত বেহুলা, লাঞ্চিত বেহুলা, অপমানিত বেহুলা, যে নিরুপায়, বাধ্য হয়ে নাচ-গান নয়, হয়তো দেহদানের মধ্য দিয়েই লক্ষীন্দরকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল চম্পকনগরীতে। এই করুণ ইতিহাসের ইঙ্গিতটুকু প্রথম আমাদের সামনে বাংলায় জীবনানন্দ দাশ দিয়েছিলেন। সুতরাং যারা বলেন, বাংলার ত্রস্ত নীলিমা  রূপসী বাংলার কবিতা, রূপসী বাংলা বলে কোনো কাব্যগ্রন্থ হতে পারে না। হয় না, জীবনানন্দ লেখেননি অন্তত। হতে পারে না। কারণ রূপসী বাংলার কোনো কবিতা বাংলার প্রকৃতিকে বন্দনা করে নয়, বাংলার, ভাঙা বাংলার, ভাঙা হারিকেনের, ভাঙা জীবনের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। আক্রান্ত মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে, যে আক্রান্ত মানুষ বেহুলা, যাকে তার অনেক কিছু ত্যাগ করার মধ্য দিয়ে মৃত স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে লম্পট দেবতাদের সভা থেকে। লাঞ্চিত বেহুলার এমন কান্না- নিষ্পাপ ঘুঙুরও বেহুলার জন্য কাঁদছে। বাংলার নদী, মাঠ, ক্ষেত সবাই বেহুলার জন্য কাঁদছে। এই বেহুলার কান্না গোটা বাংলার কান্না হিসেবে প্রথম জীবনানন্দ দাশ দেখালেন। বেহুলাকে বুঝতে পারলাম, বেহুলাই প্রকৃতি, বেহুলাই বাংলার নারী, বেহুলাই গোটা অবিভক্ত বাংলার রূপকে পরিণত হয়েছি। ফলে, মনসামঙ্গলে কোথাও যেন এই বেহুলার কান্না চাপা ছিল। সেই নির্মিত পাঠ্যবস্তু জীবনানন্দের হাতে নতুন রূপ পেল, যখন আমরা প্রথম বেহুলাকে কাঁদতে দেখলাম আমাদের সামনে। এই কান্নার কথা তো আমরা আগে জানি না, এই কান্নার ইতিহাস তো আমরা জানতাম না। প্রথম বাংলা কবিতায় সে কান্না শোনালেন জীবনানন্দ দাশ। তারপরে আরেকটি কবিতা বলি... ধীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বেহুলাকে নিয়ে অসামান্য কবিতাটি, একেবারে অসামান্য কবিতাটি তিনি লিখেছেন। এই কাব্যগ্রন্থটির নামই ছিল লক্ষীন্দর । তখন আমাদের ওপার বাংলায় ‘নকশাল আন্দোলন’ হচ্ছিল। আমাদের সাথে ধীরেনদার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি দেখতাম লোকটা রাতের পর রাত পাগলের মতো পায়চারি করছে। কী রকম? তখন রাতের বেলা পুলিশ আসত, এসে নকশাল ছেলেদের ডাকতো- প্রেসিডেন্সি কলেজের, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের- তরুণ ছেলেদের নকশাল বলে তুলে নিয়ে যেত। নিয়ে গিয়ে রাতের বেলা ময়দানে ছেড়ে দিত। ‘কী যে করিস বাবা, আত্মীয়, ভাই-বোন আছে, কেনো যে এগুলি করিস, জেলে পঁচে মরবি- এসব নকশাল-পকশাল ছেড়ে দে।’ ভয়ে হয়তো নকশাল ছেলেটা অবাক হয়েছে। কী করব, যাই চলে যাই। কালো গাড়ির দরজা খুলে দেই যা চলে যা, তবে কথা দে আর কোনোদিন নকশাল করবি না। ছেলেটি অবাক, শীতের কুয়াশার মধ্যে চারপাশ দেখে ছেলেটি তখন দরজার খুলে, কালো ভ্যান বা প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে দু’পা এগিয়ে দৌড়াতে শুরু করছে, পুলিশ পেছন থেকে গুলি করছে। ধীরেন্দ্রনাথের কবিতায় আমরা দেখলাম, নকশাল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মনসামঙ্গলে ফিরে আসছে। অর্থাৎ মনসামঙ্গল কাব্যকে আশ্রয় করে ফিরে আসে। গোটা ভারতবর্ষকে তিনি তখন বলছেন মৃত লক্ষীন্দর। পরে কনসেপ্ট পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। গোটা ভারতবর্ষকে তখন দেখতে পাচ্ছি চম্পকনগরী হিসেবে। চম্পকনগরীর লক্ষীন্দরকে দেখতে পাচ্ছি অভিসক্ত নকশাল যুবা হিসেবে। এবং তখন ধীরেন্দ্র তার কবিতায় আহ্বান করছেন, বেহুলাকে। যে ভারতবর্ষের ছেলেরা যখন এভাবে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে, এসো বেহুলারা রাস্তায় নামো। চল সঙ্গবদ্ধ মিছিলে যাই, চল প্রতিবাদ করি, চল প্রতিরোধ করি, চল সংকল্পের নতুন সংকল্পনা সৃষ্টি করি। অসামান্য। আমরা যদি প্রশ্ন করি, ধীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কাছে, জীবনানন্দের কবিতার কাছে তাহলে আমরা বুঝতে পারব। যদি বলি আপনারা কী মনসামঙ্গলের সঙ্গে মিতালি করে বিনির্মাণের দিকে নিয়ে গেলেন না? প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না, তার কারণ হচ্ছে, আমরা বুঝতে পারি এই ভাবনাগুলো মনসামঙ্গলকে সামনে রেখে, মনসামঙ্গলকে উদ্বৃত্ত কোনো সারপ্লাস অর্থে পৌঁছে দেবার এক প্রচেষ্টা দেখা যায় পরবর্তীকালের লেখকদের মধ্যে। আরেকটি আসামান্য কবিতা বলি তাহলে হয়তো আরো বুঝতে সুবিধা হবে। বিখ্যাত কবিতা, খুব বিখ্যাত কবিতা, সেটিও মনসামঙ্গলের। আমি মূল টেক্সটাকে রাখতে চাচ্ছি। কারণ বরিশালে আমি মনসামঙ্গল ছাড়া কিছু বলব না। অরুণ মিত্রের, ঠিক এই নকশাল আন্দোলনের সময়, তখন আমাদের শক্তি বলতে ঠিক দুইজন অভিভাবক ছিলেন। একজন হচ্ছে ধীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আরেকজন হচ্ছেন এই অরুণ মিত্র। আমারও বেঁচে থাকার কথা ছিল না, আমারও চাকরি করার কথা ছিল না। আমার এখানে এভাবে বলার কথা ছিল না, অনেক আগে চলে যাওয়ার কথা ছিল। বাঁচিয়েছেন এঁরা। অরুণ মিত্রের কবিতা, আপনারা পড়বেন, কবিতা পড়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর নয়। যাই হোক, অরুণ মিত্রের কবিতাটির নাম ছিল ‘বেহুলা’। তখন রাত্তির হয়ে গেছে, অনেক রাত মানে মাঝরাত। কবি ঘুমোতে পারছেন না। একা একা পায়চারি করছেন। পায়চারি করতে করতে ভাবছেন, আমাদের জীবন থেকে তো অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। আমাদের অনেক মূল্যবোধ, ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে, দেশ-কাল, সমাজ-পরিবার থেকে অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। আচ্ছা, সেই হারানো সময়ের সাথে যদি একটু কথা বলা যায়? এই হারানো সময়ের কথা বলতে গিয়ে আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল, আগে বলে নেই সেটা। একজন বিদেশি লেখক, তাঁর একটা অসামান্য গ্রন্থ ছিল। সেখানে তিনি বলছেন, আমাদের জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যায় তার পরিবর্তে আমরা আবার অনেক কিছু পাই। একটার পরিবর্তে আরেকটা পেলাম। ধরা যাক, কীভাবে? ঈশ্বর, ঈশ্বরের পরিবর্তে বিদ্যা, বিদ্যার পরিবর্তে প্রকৃতি, প্রকৃতির পরিবর্তে লোকায়িত জীবন, লোকায়িত জীবনের পরিবর্তে নাগরিক জীবন। তিনি বলতে চাচ্ছেন আমাদের হাতে একটা পরিবর্তন আসে। সেজন্য আমাদের আরেকটা হারাতে হচ্ছে। যেটা চলে গেল আর যেটা হাতে এলো- এ দুটোর মধ্যে কিন্তু বোঝা যায় যে কোন জিনিসটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোন কি আমদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ? না, আগে যেটা ছিল? এই যে সমস্যা, এই সমসাময়িক সময়ে। যা হারিয়ে যায়, সময়ের চলমানতার সঙ্গে যা হারিয়ে যায়, আমাদের জীবন থেকে একটার পর একটা চলে যেতে থাকে। সেই চলে যাওয়াকে তিনি বলছেন, ‘সিম্বলি এক্সচেঞ্জ এনটেক্ট’। বইটির নামই ছিল ‘সিম্বলিক এক্সচেঞ্জ’। এগুলো একেকটি হচ্ছে সিম্বলিক বিনিময়। তা যেমন বিশ্বায়নের তেমনি বিজ্ঞানেরও। তা অরুণ মিত্র বলছেন, আমাদের জীবন থেকে তো বেহুলা হারিয়ে গেছে অনেক আগে। আমাদের সমকালীন যাপন বৃত্তান্ত থেকে, আমাদের পার্থিব কথোপকনের বিশ্ব থেকে। আচ্ছা এই মাঝরাতে যদি বেহুলার সাথে যদি একটু কথা বলা যেতো! আমাদেরও কথা বলতে ইচ্ছা করে যা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। ঠিক, সেরকম ব্যাপার। বেহুলার সঙ্গে একটু কথা বলা যেতো। তো কী করবেন? অরুন মিত্র পায়চারি করতে করতে ভাবছেন, সময়ের এপার থেকে ওপারে ডাকছেন, ‘বেহুলা, ও বেহুলা। বেশ কয়েকবার ডাকছেন। তারপর বেহুলা সায় দিচ্ছেন, কিছু বলবেন? তখন এক নতুন কথোপকথনের বিশ্ব তৈরি হচ্ছে। মনসামঙ্গলের বেহুলার সঙ্গে আধুনিক সময়ের একজন কবির মুখোমুখি সাক্ষাৎকার। বলে, কিছু বলবেন? হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে দু-চারটি কথা ছিল। বলেন। অরুণ মিত্র যেভাবে কালিদাস তার প্রশংসা করেছেন, সেইভাবে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন বেহুলাকে প্রথমদিকে। তোমার মতো সতীসাদ্ধী ভারতবর্ষে আর নেই। বেহুলা চুপ। তোমার মতো পূর্ণময়ী নারী ভারতবর্ষে একটিও নেই। এবারও বেহুলা চুপ। গোটা দেশ নয়, গোটা বিশ্বের মানুষ তোমার পদপ্রান্ত ছুঁয়ে নতুন নারী উদ্দীপ্ত হয়। বেহুলা চুপ। কারণ এ প্রশংসার বেহুলা কী উত্তর দিবেন। সুতরাং বেহুলা চুপ করে আছেন। তারপরে বলছেন, আচ্ছা বেহুলা, তোমাকে একটা কথা বলি। এই যে তুমি তোমার স্বামী মারা যাবার পর গাঙের জলে ভেসে গেলে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। এবার তোমাকে একটা কথা বলি। তো বেহুলা বলছেন, বলুন। আচ্ছা, যদি উল্টোটা ঘটতো? উল্টোটা মানে? ধরা যাক, তুমি মারা গেছো, লক্ষীন্দর বেঁচে আছেন- আমরা বারবার মনে রাখবো সবসময় প্রথম নির্মিত পাঠ্যবস্তু। এটা মাথায় রাখতে হবে সিলেক্টিং মিনিং- বলছেন, তার মানে? দেখো, তুমি বলতে পারো না, আমি বলছি তুমি শুনো। বলে, দেখো তোমার মারা যাবার পর লক্ষীন্দরের মনে খুব কষ্ট। বলে, হ্যাঁ। সে ওই গাঙুর নদীর চারপাশে ঘুরে ঘুরে তোমাকে খুঁজতো। পাগল এবং উদাসীন হয়ে গাঙের জলের দিকে তাকিয়ে সে বসে থাকত। তারপর চারদিক তার ফাঁকা ফাঁকা লাগত। জীবনটাকে সন্ন্যাসীর মতো লাগত, কিছুই তার ভালো লাগত না। তারপর? তারপর, সন্ন্যাসীর জীবন থেকে বের হবার জন্য সে আরেকটা বিয়ে করল। আমার মনে পড়ে যাচ্ছে, ধীরেন্দ্রনাথের ‘৬৬তম জন্মদিনে অরুণ মিত্রের কবিতা পাঠের আয়োজন করেছিলেন তাঁর বাড়িতে। সে অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম। অরুণ মিত্র এই কবিতাটা পড়ছিলেন। ছিপছিপে বেটের মতো একটা রোগা শরীর কিন্তু মেরুদণ্ডটা সোজা ছিল। কবিতাটা শেষ হচ্ছে, বলল- একটা বিয়ে করছে। বেহুলা চুপ করে আছে এবারও। সে হয়ত তোমার মতো এতো সুন্দরী, রূপবতী, স্বাস্থ্যবতী হতো না। তারপর কবিতার মারাত্মক একটা মোচড়... মানে কী? যেমন একটা হলেই হল মানে, যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মতো একটা কাজ হয়ে গেলেই হলো। এই জায়গায় বাংলা কবিতায় প্রথম নারীবাদ তথা মেয়েদের অরুণ মিত্র এনেছেন। আমরা বুঝতে পারলাম এই বেহুলা প্রথম নারীর নিজস্ব জায়গা তৈরি করছেন, নারীর নিজস্ব ভাষ্য এবং প্রতিবেদন তৈরি করছেন। যেমন-তেমন একটা মেয়ে বেহুলার মতো না হতে পারে। তার মতো সুন্দরী, রূপসী নাও হতে পারে। একটা মেয়ে হলেই হলো, আমাদের জীবনে চলে যায়। এই রকমই একটা অদ্ভুত, আশ্চর্য... সম্পন্ন জীবনের মধ্যে ডুবে ডুবে বারবার নারীদের আমরা আসতে দেখি। অরুণ মিত্র সেই বেদনার জায়গায় প্রবেশ করলেন। আক্রমণ করলেন মনসামঙ্গল কাব্যকে। অন্তর্বর্তী অন্তর্ঘাত সৃষ্টি করলেন মনসামঙ্গল কাব্যে। তার জন্য মনসামঙ্গল কাব্য ধ্বংস হয়ে গেল না। তার জন্য মনসামঙ্গল কাব্য অবলুপ্ত হয়ে গেল না। বরং আরেক ভাষ্য এবং প্রতিবেদনসহ আমাদের সামনে সজীব, আকর্ষণীয় এবং প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। এই আশ্চর্যজনক লিখন ক্ষমতা যে কবি, লেখক বা যাদের আছে তারই একমাত্র ওই বিনির্মিত ভাববিশ্ব তৈরি করতে পারেন। তারা মিতালি এবং সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে প্রশ্নমুখী, অনুসন্ধিৎসার মধ্য দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত ভূমিকে কম্পন লাগাতে লাগাতে শেষ পর্যন্ত একটা বিনির্মিত ভাববিশ্বের কাছে আমাদের পৌঁছে দিতে পারেন। আশ্চর্য ব্যাপার। বারবার আমরা দেখেছি যুগে যুগে বাংলা কবিতা নয়, বাংলা উপন্যাসেও যেন ঠিক কোথা থেকে যেন মনসামঙ্গলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। তার মানে একটা জিনিস আমরা বুঝতে পারছি, এত বছরের আগের একটা পয়ারের কাব্যগ্রন্থ, হ্যাঁ পয়ার যেখানে ৮, ৬ মাত্রা। সাধারণ একটা কাব্যগ্রন্থ, সাধারণ একটা কাহিনি কতখানি প্রাণসমৃদ্ধ হয়ে উঠছে পরবর্তীকালের উদীয়মান যুগের সঞ্চালকের অভিমুখে। অসাধারণ, অসামান্য। তার মানে বুঝতে হবে মনসামঙ্গল একটা এক্সচেঞ্জ পসিবিলিটির জায়গায় দীর্ঘকাল ধরে আমাদের মনের মধ্যে তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের গল্প। মৃত্যু নেই, ভয় নেই। বেচেঁ থাকবে, বাঁচিয়ে রাখবে বাংলার সংস্কৃতিকে মনসামঙ্গল কাব্য। ঔপন্যাসিকরা বারবার বিনির্মিত ভাববিশ্বের জন্য পৌঁছে গেছেন ওই মনসামঙ্গল কাব্যের দরজায়। কড়া নেড়েছেন, ভেতরে ঢুকেছেন, মিতালি করেছেন, তাদের সঙ্গে সহবাস করেছেন। তারপর বেরিয়ে এসেছেন নতুন ভাব, নতুন বিশ্ব, নতুন চেতনা এবং নতুন অনুসন্ধিৎসার মধ্য দিয়ে। প্রথম আমরা দেখলাম ১৯৫১ সাল নাগাদ সমরেশ বসুর একটা উপন্যাস ছিল ‘উত্তরঙ্গ’। কী ছিল? উত্তরঙ্গ, আধাল মনসামঙ্গল। সমরেশ বসু কি লিখছেন? উপরে একটা সাব-টাইটেল দেয়া রয়েছে- ১৮৬০ সালের পর। তার মানে সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক তিন বছর পর এই উপন্যাসের আখ্যান শুরু হলো। আখ্যানটা কী? গঙ্গার পারে,  নৈহাটি, ব্যারাকপুর বলে যে জায়গাটা আছে যেখানে লেবারদের হাঁটবার জায়গা, লেবাররা যে পরিশ্রম করে, আর মাঝিরা নৌকা বেয়ে মাছ ধরে গঙ্গায়, সারারাত পরিশ্রম করে সকালে যখন তারা মাছ মাঝিঘাটে নিয়ে আসছে তখন মাঝিরা দেখছে একটা নৌকায় একটা লাশ ভেসে এসেছে। সবাই প্রথমে উঁকিঝুকি দিচ্ছে, ভাবছে এটাতো মৃতদেহ নিশ্চয়; কিছুক্ষণ বাদে দেখা যাচ্ছে মৃতদেহটা নড়ছে তখন সবাই মানে মাঝিমাল্লারা চিৎকার-চেঁচামেচি করছে আরে নড়ছে, নড়ছে মৃতদেহটা। প্রাণ আছে মৃতদেহটার। সবাই ছুটে যাচ্ছে মৃতদেহটার কাছে। কিন্তু লোকটা কারো সাথে তখনও কথা বলছে না। মাথায় একঝাঁক চুল, কারো সাথে কথা না বলে খোড়াতে খোড়াতে লোকটা সামনের একটা বড় গাছের নিচে বসে পড়ল। সবাই ভিড় করে চারপাশে ঘিরে ফেলল লোকটাকে। তখন সবাই একেক করে প্রশ্ন করে- কে তুমি, কোথায় তোমার বাড়ি, কোথা থেকে এলে তুমি, আর এভাবে এলে কেনো? কোনো প্রশ্নের উত্তর নয়। সে শুধু ভাঙা ভাঙা গলায় বলছে আমার খিদে পেয়েছে। খিদের ভাষা সব দেশেই এক; প্রতিবাদের ভাষাও সব দেশেই এক। যাক, সে অন্য ব্যাপার। লোকটা শুধু বলছে আমার খিদে পেয়েছে। তখন মাঝিরা তাদের যে মুড়ি ছিল; সে মুড়ি-জল খাবার পর লোকটা একটু সুস্থ হয়েছে। কিন্তু কে তুমি, কোথা থেকে এলে এসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। শুধু তাই নয় সে নিজের নাম পর্যন্ত বলতে পারেেছ না। তখন মাঝিদের মাঝখান থেকে একজন সে বলল- হ্যাঁ রে কি করছিস, এ-ত লক্ষীন্দর। লখাই, লখাই। এভাবেই তো লখাই-এর লাশ নিয়ে বেহুলা এসেছিল। যখনই এসব কথা বলা হলো মাঝিদের মাঝখান থেকে তখনই বাংলা উপন্যাস মনসামঙ্গলের গল্প ধারণ করে। সেই নাম পরিচয়হীন মানুষটা মাঝিদের কাছে আস্থায় পরিণত হলো। মাঝিরা সেবা-শুশ্রূষা করে একটু সুস্থ স্বাভাবিক করে তুললো। কিন্তু লোকটা কিছুতেই নিজের নাম বলতে পারে না, নিজের পরিচয় বলতে পারে না, কোথা থেকে এসেছে বলতে পারে না। কিন্তু গ্রামে গ্রামে রটে গেল লখাই এসেছে নৈহাটি গ্রামে, ব্যারাকপুর গ্রামে। (চলবে) বাকী অংশ ছাপা হবে ১৭ আগস্ট।

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-

ডিকন্সট্রাকশন ও জ্যাক দেরিদা প্রসঙ্গে জহর সেনমজুমদার

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।