রাত ০৩:১১ ; বুধবার ;  ১৭ জুলাই, ২০১৯  

নীলিমায় নীল

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তসলিমা নাসরিন 

নিলয় নীল। ভালো নাম নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়। বয়স ২৭। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে মাস্টার্স। ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে পাস করা। দর্শনের বাইরেও অনেক বিষয় নিয়ে ও পড়তো। চমৎকার লিখতো। শিক্ষিত। সচেতন। সুদর্শন যুবক। নীলাদ্রিকে আমরা নীল বলতাম। নীল ‘তসলিমা পক্ষ’ নামে  আমার অনুরাগী পাঠক পাঠিকারা একটি যে সংগঠন গড়ে তুলেছিল, সেটার সদস্য ছিল। গত বছর আমার জন্মদিনও ওরা বেশ ঘটা করেই পালন করেছে। আমি মাঝে মাঝে পড়তাম নিলয়ের পোস্টগুলো। বেশ বুদ্ধিদীপ্ত। বেশ যুক্তিবাদী। বেশ প্রখর। কী করে এত জ্ঞান ও সঞ্চয় করেছে, ভাবতাম! অনেক কিছু নিয়ে তো লিখতই, ধর্ম নিয়েও লিখতো। সব ধর্ম নিয়েই। হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, ইসলাম ধর্ম। ওর প্রজ্ঞা, প্রতিভা আমাকে মুগ্ধ করতো। 

 একসময় নীলকে আমি ফেসবুকের বন্ধুলিস্ট থেকে খুব সামান্য কারণেই সরিয়ে দিয়েছিলাম। আশামনি নামে একটি মেয়ে নীলের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতো।  আশামনি আর নীল দুজনই আমার ফেসবুক বন্ধু ছিল। আশামনি সাজ্জাদ সাজুর বন্ধু। সাজ্জাদ সাজুকে আমি আবার বাংলাদেশে থাকাকালীন চিনি। ও তখন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতো। ফ্যাক্টরির সমস্যা টমস্যা আমার কাছে বলতে আসতো। সাজু আমার নিষ্ঠ পাঠকও ছিল। একসময় আমার পক্ষে রীতিমত অ্যাকটিভিস্ট হয়ে গেল। সাজুই ‘তসলিমা পক্ষ’ এর শুরুটা করেছিল, ওই পক্ষে অনেকেই পরে যুক্ত হয়েছে। তো যে কথা বলছিলাম, একদিন আশামনির একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে  আমি ধন্দে পড়লাম। লেখাটিকে আমার লেখা বলে মনে হচ্ছে। কোথাও আমি এই লেখাটা লিখেছি, কোথায় লিখেছি মনে পড়ছে না।  আশামনিকে বললাম, এই লেখাটা তো আমার। লেখকের নামটা উল্লেখ করলে ভালো হতো না কি?  ও বললো, বেশ জোর দিয়েই বললো,  লেখাটি আমার নয়, লেখাটি ওর। ও গতকালই লেখাটা লিখেছে। আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। এভাবে অন্যের লেখাকে আমার দাবি করা আমার স্বভাবের মধ্যে নেই। ভুল কার হচ্ছে। আমার? নাকি আশামনির? হয়তো আমারই। বয়স হয়ে গেছে। স্মৃতিশক্তিও আগের মতো নেই। সে কারণেই হয়তো সেই লেখাটিকে আমার লেখা বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু মন মানছে না, বললাম,  তাহলে এটাকে আমার লেখা বলে মনে হচ্ছে কেন? আশামনি বললো আমার নাকি ভুল মনে হচ্ছে। ওদিকে নিলয় নীল এসে বললো, ‘আশামনি আমার সামনে বসে লেখাটা লিখেছে’। সাজু বললো, আশামনি তোমার লেখা এত পড়েছে, যে, একইরকম ভাবনা চিন্তা গ্রো করেছে। একই ভাবনা চিন্তা দুজনের, সে কারণেই ওর লেখাটাকে তোমার লেখা বলে মনে হচ্ছে। আমি চুপ হয়ে গেলাম, তবে  কনফিউশন রয়েই গেল।  দু’দিন পর দাঁড়িপাল্লা ধমাধম নামে আমাদেরই এক ফেসবুক বন্ধু আমার একটি পুরোনো কলাম অনলাইনে পেয়ে গেলো, সেটি সে দেখালো সবাইকে। দেথা গেলো,  সেই কলামের একটা প্যারাগ্রাফই আশামনি কপিপেস্ট করেছে। কপিপেস্ট  বলছি এইজন্য যে আমার লেখার প্রতিটি শব্দ তো বটেই, লেখাটির দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনও যেমন ছিল, তেমনই আছে আশামনির  স্ট্যাটাসে। লেখাটি যে আসলে আমার, সেটির প্রমাণ দেওয়ার পরও আশামনিকে স্যরি বলতে শুনিনি,  নীলও দুঃখ প্রকাশ করেনি। আমি ওদের বন্ধু লিস্ট থেকে তখন   সরিয়ে দিই। পরে আমার অনেকবার নিজের নিষ্ঠুরতার জন্য খারাপ লেগেছে। আমি তো মানুষটা মূলত উদার। কেউ একটু ভুল করেছে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার ক্ষমতা কি আমার ছিল না? আমি তো জীবনে কত লক্ষ লোককে ক্ষমা করেছি। অক্ষমাযোগ্য অপরাধ করার পরও তো তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি! নীলকে হয়তো আশামনি বারবার বলেছে সে নিজেই লিখেছে লেখাটা, বলেছে  তাকে ডিফেন্ড করতে, নীল তাই করেছিল। এরপর ওরা ভুল প্রমাণিত হওয়ার পর হয়তো লজ্জায় আর সামনে আসেনি। কেউ মিথ্যে বললে আমার খুব রাগ হয়, আমি জানি। কিন্তু চারদিকে মানুষ কি মিথ্যে বলছে না? অহোনিশি বলছে। তাহলে আমি কেন নিজগুণে ওদের ক্ষমা করি দিইনি, বিশেষ করে নিলয় নীলকে, যে বুঝতে হয়তো পারেনি লেখাটা আসলে আমার ছিল, হয়তো ভুল করে চাপে পড়ে ধন্দে পড়ে আশামনিকে ডিফেন্ড করেছিল। নীলের মতো প্রতিভাবান তরুণকে তার ওই সামান্য ভুলের জন্য দূরে সরিয়ে দেওয়া আমার উচিত হয়নি। এ আমার নীল মরে যাওয়ার পর নয়, ও বেঁচে থাকাকালীনই আমার অনেকবারই মনে হয়েছে। তারপরও ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, যাহা শুনিব সত্য শুনিব, সত্য বৈ মিথ্যা বরদাস্ত করিব না’, এই আদর্শ অনুযায়ী চলা তখন আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে নীলকে আর আমন্ত্রণ জানাইনি আমার বন্ধুতালিকায়। ধর্মকারী এবং আরও কিছু ফেসবুক বন্ধুর শেয়ার করা পোস্ট পেতাম নীলের। পড়তাম, মুগ্ধ হতাম। কখনও নীলের কোনও লেখা  আমি পাইনি, যে লেখা আমাকে মুগ্ধ করেনি। 

রাজিব হায়দারের মৃত্যুর দিন থেকে চেঁচাচ্ছি। অভিজিৎ হত্যায় এতটাই শকড ছিলাম যে ননস্টপ প্রতিবাদ করে গেছি দীর্ঘদিন। এরপর ওয়াশিকুর, অনন্তর বেলাতেও আমার চিৎকার দীর্ঘ দীর্ঘ দিন পর্যন্ত চলেছে। কত শত বার যে বলেছি, হে সরকার, প্রগতিশীল ব্লগারদের নিরাপত্তা দাও, খুনীদের গ্রেফতার করো, শাস্তি দাও। কে শোনে কার কথা।

অনন্ত বিজয় দাশ নিহত হওয়ার পর আমাদের গ্রুপ চ্যাটেই একজন বললো, ‘মনে হচ্ছে হিন্দু ব্যাকগ্রাউণ্ড থেকে যে নাস্তিক ব্লগাররা এসেছে, তাদেরই টার্গেট করা হচ্ছে বেশি। কী জানি, এরপর নিলয় নীলকে হয়তো মেরে ফেলতে পারে’। বুক কেঁপে উঠলো। নীল এখন কোথায়? ও কি বিদেশ চলে যেতে পারে না, নিদেন পক্ষে ভারতে তো চলে যেতে পারে? কেউ কিছু বলতে পারলো না নীল কোথায়, আদৌ নিরাপদে আছে কী না, দেশ থেকে বেরোনো তার পক্ষে সম্ভব কি না। একদিন শুনি নীল ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে। কোনও এক গ্রামের দিকে অচেনা লোকের ভিড়ে মিশে গেছে। শুনে স্বস্তি পেলাম। নীল যদি সেখানে থাকে, যেখানে কেউ তাকে নীল বলে চেনে না, তাহলে অন্তত বেঁচে যেতে পারে। ভারতে চলে যেতে পারে না? প্রশ্ন করলাম। কেউ উত্তর দিলো, হয়তো তাই করার চেষ্টা করবে। তখন আমি দু’একজন  ব্লগারের জন্য বিদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলছি, তাদের ভিসার ব্যবস্থা করছি। তখন আমি আমেরিকার একটি মানববাদী সংগঠনের সঙ্গে কথা বলছি, যে সংগঠন ব্লগারদের নিরাপত্তার জন্য ফান্ড জোগাড় করছে। আমার এখন আফসোস হয়, কেন আমি নীলের খোঁজ করিনি। কেন নীলকে  নিরাপদ জায়গায় পাঠানোর চেষ্টা করিনি, যে উজ্জ্বল তরুণ আমার বই পড়তো, আমাকে শ্রদ্ধা করতো, তার কথা কেন আমি ভাবিনি! নীল নিশ্চয়ই মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে থাকতো, বাঁচার জন্য ছুটোছুটি করতো। আমরা কেউ তাকে কোনও আশ্রয় দিতে পারিনি, কোনও নিরাপত্তা দিতে পারিনি। নীলের মৃত্যু আমাকে বড় অপরাধী করে দিচ্ছে। ক্ষমতাহীন এক ক্ষুদ্র মানুষ আমি। আমার পক্ষে খুব বেশি কিছু করার উপায় ছিল না, কিন্তু চেষ্টা তো করতে পারতাম। কে জানে, কাজ হয়তো হতেও পারতো। হয়ত বেঁচে যেতেও পারতো নীল।

রাজিব হায়দারের মৃত্যুর দিন থেকে চেঁচাচ্ছি। অভিজিৎ হত্যায় এতটাই শকড ছিলাম যে ননস্টপ প্রতিবাদ করে গেছি দীর্ঘদিন। এরপর ওয়াশিকুর, অনন্তর বেলাতেও আমার চিৎকার দীর্ঘ দীর্ঘ দিন পর্যন্ত চলেছে। কত শত বার যে বলেছি, হে সরকার, প্রগতিশীল ব্লগারদের নিরাপত্তা দাও, খুনীদের গ্রেফতার করো, শাস্তি দাও। কে শোনে কার কথা। আমি জানি বাংলাদেশের জন্য আমি কেউ নই, কিছু নই। বাংলাদেশ যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে। মুক্তচিন্তক মরছে, তাতে কারওর কিছু যায় আসে না। কিন্তু কিছু মানুষ যেন লেখা পড়ে আমার, উদ্বুদ্ধ হয়, রুখে ওঠে, প্রতিবাদ করে, সমাজ বদলায়, সে কারণেই নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই। সে কারণেই লিখি। 

যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে দেশের, তা কি দেশের মানুষ জানে? একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছিল ভিনদেশি শত্রুরা, আজ  দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যা করছে দেশের মানুষরা। সরকার খুনীদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। সরকারি দল আওয়ামি ওলামা লীগ নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছে, নাস্তিকদের দেশ থেকে বের করে দেবারও দাবি জানাচ্ছে। সরকারি দল কি তাদের মান্যগণ্য ওলামাদের দাবি মেনে চলবে না? দাবি আসলে পরোক্ষভাবে মেনেই চলছে। রাস্তাঘাটে ব্লগার হত্যার পর এমনই ত্রাস সৃষ্টি হয়েছে যে ব্লগাররা দেশ থেকে নিজেরাই বের হয়ে যাচ্ছে আর ফাঁসি দেওয়ার মানে তো কল্লা ফেলাই, সেটার জন্য অত আদালত, রায়, ফাঁসিকাঠ, দড়ি টড়ির ঝামেলা না করে জল্লাদ পাঠিয়ে একেকটা অবাধ্য ব্লগারের কল্লা রাস্তায় এমনকী ঘরে গিয়েও ফেলে আসাটা বরং সহজ। সরকার, মনে হচ্ছে, তাই করছে। 

ভালো উপদেশ দিয়ে তো কোনও লাভ নেই। অতএব যে উপদেশ সরকারের পছন্দ হবে, সেই উপদেশই দিচ্ছিঃ সব প্রতিভাবান প্রগতিশীল মানববাদীদের খুন করে ফেলো। অতঃপর নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় ঘাড়ের ওপর পা তুলে দেশ চালাবে ভন্ড ধর্মান্ধ সরকার, সঙ্গে থাকবে বুদ্ধিহীন ধর্মান্ধ জনগণ। 

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।