সকাল ১১:২৬ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

ডিকন্সট্রাকশন ও জ্যাক দেরিদা প্রসঙ্গে জহর সেনমজুমদার

2

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

১৯৬৬ সাল নাগাদ দেরিদা আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, দিতে দিতে প্রথম ‘ডিকন্সট্রাকশন’ শব্দের ব্যবহার করেন— আমি পুরোটাই স্মৃতি থেকে বলছি, যদি সালের একটু অসুবিধা হয়, আপনারা একটু দেখে নেবেন— এবং প্রথম ‘ডিকন্সট্রাকশন’ শব্দের ব্যবহার করেন। তারপর মাঝে প্রায় দশ বছর কেটে গেছে। ১৯৭৬ সাল নাগাদ আমাদেরই প্রাচ্যের আরেক মহৎ নারী গায়ত্রী চক্রবর্তী যিনি পরবর্তীতে স্পীভাক হয়েছিলেন, তিনি ১৯৭৬ সাল নাগাদ দেরিদার Of Grammatology গ্রন্থের অনুবাদ করেন। এবং প্রায় দেড়’শ পৃষ্ঠার এক অসামান্য একটি ভূমিকা লেখেন। তার আগে প্রাচ্যে আমরা ‘পুনঃনির্মাণ’ শব্দটা জানতাম। দেরিদার ‘ডিকন্সট্রাকশন’ বাংলায় যখন অনির্মাণ বা বিনির্মাণ বাক্যে পরিবর্তন হয়ে গেল একেবারে। তার আগে কিন্তু আমরা ‘পুনঃনির্মাণ’ শব্দটা জানতাম। ‘পুনঃনির্মাণ’ শব্দ সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা ছিল। পাশ্চাত্যে বিনির্মাণ নতুন হলেও আমাদের প্রাচ্যে বিনির্মাণ ব্যাপারটা নতুন ছিল না। কিন্তু সবকিছু মুশকিল হচ্ছে আমাদের দেশে যা কিছু বলি বাইরে পাশ্চাত্যের হাত ধরে আমাদের দেশে পৌঁছায়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সেই দার্শনিক প্রস্তাবনাগুলো আমাদের গ্রহণ করতে দ্বিধা হয়। আর সমস্ত দর্শন যতক্ষণ না পর্যন্ত আমেরিকার হাত ধরে না আসছে ততক্ষণ না পর্যন্ত তা আমরা গ্রহণ করছি না বা ততোধিক গুরুত্ব পায় না। তো ঠিক তাই হলো, ‘৬৬ এর বিনির্মাণ ‘৭৬ এর গায়ত্রীর হাত ধরে আবার আমাদের দেশে প্রবেশ করল, তখন পুনঃনির্মাণ সম্বন্ধে সচেতন হলাম। আমাদের কাছে কিন্তু ব্যাপারটা নতুন নয়, পাশ্চাত্যে গোটা ঘটনাটা বা দার্শনিক প্রস্তাবনাটা আমি কিন্তু একবারও ‘তত্ত্ব’ শব্দটা ব্যবহার করছি না। কারণ, প্রথমেই মনে রাখবেন ‘তত্ত্ব’ দিয়ে কোনো সাহিত্য রচিত হয় না। তা কবিতা হোক, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প হোক, কোনো ‘তত্ত্ব’ কখনো কোনোদিনও উপন্যাস বা সাহিত্যকে ধারণ করতে পারে না। সাহিত্য থেকে পরবর্তীকালে ‘তত্ত্ব’ তৈরি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এই শব্দটাকে আমরা ‘তত্ত্ব’ হিসেবে ব্যবহার করব না। আমরা বলব, দার্শনিক প্রস্তাবনা। দেরিদার দার্শনিক প্রস্তাবনা যখন ডিকন্সট্রাকশন বা বিনির্মাণ গোটা বিশ্বকে আলোড়িত করল, তখন তাদের কাছে গোটা ব্যাপারটা নতুন ছিল এক কথায় অভিনব। যখন আমাদের পুনঃনির্মাণ পাশ্চাত্যের হাত ধরে বিনির্মাণরূপে আমাদের কাছে এসে পৌঁছালো তখন আমরা সাদরে গ্রহণ করলাম। কেন এই কথা বলছি? তার কারণ হচ্ছে, অনেক আগে ১৮৬২-৬৩ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে রামায়ণের একটা বিনির্মিত ভাবমূর্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তার আগেই আমরা পেয়ে গেছি। তারপর রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রক্তকরবী’ নাটকে রূপক, সংকেতের মধ্য দিয়ে গোটা রামায়ণকে নতুনভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপিত করেছেন। ফলে এই পুনঃনির্মাণের ব্যাপারটা আমাদের কাছে নতুন কোনো বিষয় বা অভিনব নয়, আমাদের কাছে গ্রাহ্যতা পেয়েছে। কাকে বলব আমরা বিনির্মাণ বা কাকে বলব আমরা পুনঃনির্মাণ? কোথাও কি পাশ্চাত্যের বিনির্মাণের সঙ্গে প্রাচ্যের বিনির্মাণের তফাৎ ঘটে যাচ্ছে? কোথাও? মুখ্যত, আমি যতদূর পর্যন্ত দেখেছি, পুনঃনির্মাণের সঙ্গে পাশ্চাত্যের বিনির্মাণের কোনো বিশেষ তফাৎ নেই। মূলতঃ একটি বা দুটি বাক্য ছাড়া কোথাও পার্থক্য পাওয়া যায় না। এছাড়া দেরিদা পাশ্চাত্যে বাড়তি বা অভিনব কিছু সৃজন করতে পারেননি। এই যে বিনির্মাণ দেরিদা যাকে বিনির্মাণ বলছেন, আমরা এই বিনির্মাণকে গুরুত্ব দিচ্ছি এই কারণে যে, গায়ত্রী চক্রবর্তী প্রাচ্যের লোক এবং তিনি যখন ’৭৬ সালে দেরিদার Of Grammatology অনুবাদ করছেন, তখন আমরা একটা সত্যের কাছে পৌঁছে যেতে পারি। সেটা হচ্ছে যেহেতু গায়ত্রী প্রাচ্যের লোক সেহেতু তিনি পুনঃনির্মাণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। আবার গায়ত্রী যখন পাশ্চাত্যের লোক হয়ে উঠলেন তখন তিনি বিনির্মাণ সম্পর্কেও সচেতন। ফলে আমরা এটা বুঝতে পারি যে, গায়ত্রীর কাছে পুনঃনির্মাণ বা বিনির্মাণ সম্পর্কে খুব বেশি দূরত্ব বা ব্যবধান ছিল না। একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসতে পারে যে, গায়ত্রী যা বলেছেন, সেই দেড়’শ পৃষ্ঠার ভূমিকায় সেটা আমরা কতখানি গ্রহণ করবো। আবার আদৌ গ্রহণ করবো কিনা? সেক্ষেত্রে একটা বড় উদাহরণ হতে পারে যে, দেরিদা ২০০৪ সাল নাগাদ বেঁচে ছিলেন (১৯৩০-২০০৪)। ২০০৪ সাল নাগাদ ছিলেন তার মানে মাঝখানে এই গ্রন্থটি প্রকাশের পর অর্থাৎ গায়ত্রীর অনুবাদ প্রকাশের পর অন্তত ২৯ বছর সময় পেয়েছিলেন দেরিদা গায়ত্রীর যে প্রস্তাবনা বা গায়ত্রীর যে লিখিত ভাষ্য তার বিরোধিতা করার। এটা সম্ভব ছিল। যদি দেরিদার কোনো অমত থাকত যে গায়ত্রী যা বলছেন তা আমি মানতে পারছি না বা গায়ত্রী যেখানে পৌঁছে দিচ্ছে তা আমি বলতে চাই নি। যদি এরকম কোনো ভাবনা দেরিদার থাকত তাহলে এই ২৯ বছর যথেষ্ট সময়, যা তিনি কোনো মন্তব্য বা ভাবনার আলোকে প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু আমরা দেখলাম গায়ত্রীর ওই ভূমিকার প্রায় ২৯ বছর কেটে যাবার পরও যখন নিঃশব্দ রইলেন দেরিদা তখন আমরা বুঝতে পারি যে গায়ত্রী যা বলেছিলেন তা দেরিদার অসম্মত নয় বরং দেরিদা তা সমর্থন করেছেন। এখন আমরা কিভাবে দেখছি বা আমরা কিভাবে দেখব যারা প্রাচ্যের পুনঃনির্মাণ থেকে পাশ্চাত্যের বিনির্মাণে যেতে চাই বা পাশ্চাত্যের বিনির্মাণ থেকে প্রাচ্যের পুনঃনির্মাণে ফিরে আসতে চাই বারবার। কিভাবে? বাংলা অভিধানে ‘পুনঃনির্মাণ’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে একের অধিক অর্থাৎ একাধিক ভাবনার গতি পায় যেখানে। সেখান থেকে পুনঃনির্মাণ কথার আবির্ভাব। আসলে প্রত্যেক লেখক তাদের এক সৃজন বিশ্ব থাকে, সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার তিনি যখন লেখেন সেটা তাঁর নির্মাণ। এটা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার, প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তু এটা হচ্ছে নির্মাণ। ধরা যাক, বিজয়গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’ এটা হচ্ছে নির্মাণ। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ নির্মাণ। অজস্র লেখা চণ্ডীমঙ্গল, রামায়ণ, নাথসাহিত্য, চর্যাপদ সমস্ত কিছু প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তু মানেই নির্মাণ এটা মনে রাখতে হবে। আর তাহলে বিনির্মাণ কী? প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তুর একাধিক বিনির্মিত পাঠ্যবিশেষ। আর বস্তু নয়। আমি আবার বলছি, একজন লেখকের সৃষ্টিকে একদম ভাগ করে নেই, দুইটি ভাগ। তার মানে একজন লেখকের নির্মিত সৃজন বিষয়কে দু’ভাগে ভাগ করব। একটা হচ্ছে নির্মিত পাঠ্যবস্তু আর একটা হচ্ছে বিনির্মিত পাঠ্যবিশ্ব। প্রথম নির্মিত পাঠ্যবস্তু যখন একাধিক ভাব-তরঙ্গে প্রভাবিত হয়ে একটি বিনির্মিত পাঠ্যবিশ্ব রচনা করতে সক্ষম হয় তখন তাকে আমরা বলছি বিনির্মিত ভাবনা। এক্ষেত্রে আমি যদি আরো পরিষ্কার করে বলতে চাই, প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তু, আমরা কাকে বলছি প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তু? যে কাহিনিগুলো, যে কাব্যগুলো বা ভাবনাগুলো দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে; কীরকম? যেমন ‘মনসামঙ্গল’ যেহেতু বরিশাল আরো সুবিধা হয় আমার জন্য। ধরা যাক, মনসামঙ্গলের কাহিনি, এটা আমরা বলছি প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তু। আমার মনে হয় যে, মনসামঙ্গলের কাহিনি এখানে একটি ছেলে-মেয়েও নেই যারা জানে। যে কেউকে যদি আমি বলি, ‘উইথ আউট টেক্সট’ মনসামঙ্গলের কাহিনি বলো তো? সবাই নিজের মতো করে মনসামঙ্গলের কাহিনিটা বলে যেতে পারবে। তার জন্য কিন্তু বিজয়গুপ্তের প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তুতে অর্থাৎ মনসামঙ্গল কাব্যে ফিরে যেতে হচ্ছে না। তার মানে এগুলো দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মধ্যে, দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে, জীবনের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে ফিরতে ফিরতে কখন যে হৃদয়ের মধ্যে আত্মীকৃত হয়ে গেছে। যাকে আমরা খুঁজেই পাই না। অর্থাৎ যে কোনো সময় চণ্ডীমঙ্গল-এর কাহিনিটা যদি আমরা ধরি কালকেতু ও ফুল্লুরার কাহিনি, নাথসাহিত্যের কথা বলি গোরাক্ষনাথ এবং বিজয়নাথের কথা বলি। এগুলো মোটামুটি আমরা আমাদের ভাষাগত ভাবনা থেকে, বিষয়গত ভাবনা থেকে মোটামুটি নিজের ভাষায় বিবৃত করে দিতে পারব। গোটা মনসামঙ্গলের কাহিনিতে কি হয়েছে মোটামুটি কারোর কোনো অসুবিধা হবে না এবং কাউকে প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তুর কাছে ফিরে যেতে হবে না। হাতে নিয়ে বলতে পারবে। তার মানে এটুকু সর্বজনীন, এতখানি সর্বগ্রাহ্য পেয়ে গেছে এই কাব্য। আমাদের ভেতরে বাইরে এবং সম্ভবত, আরো ভবিষ্যৎ প্রজন্মে যারা আসবে তারাও আমাদের মতো করে একদিন বলতে পারবে চিরকালের এই কাহিনি। অনিঃশেষ সম্ভবনাময় এ কাহিনির কথা। এটাই লিখিত পাঠ্যবস্তু। তার মানে এটা আমরা কিভাবে সনাক্ত করব? প্রথম কথা হচ্ছে, প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তু; তার একটা লিখিত অর্থ আছে। নির্দিষ্ট অর্থ আছে, নির্বাচিত অর্থ আছে, নির্ধারিত অর্থ আছে, পছন্দসই অর্থ আছে। নির্মিত পাঠ্যবস্তু কিন্তু এগুলো। কিন্তু একটাই, তার একটা নির্দিষ্ট অর্থ আছে। অর্থাৎ একটা নির্মিত অর্থ আছে। কেন বলছি? তার কারণ হচ্ছে যেকোনো সময়, যেকোনো মুহূর্তে আমরা যদি প্রশ্ন করি ‘মনসামঙ্গল কী? আর দ্রুত কাহিনিটা বলো? তখন তুমি তোমার নির্বাচিত জায়গা থেকে, নির্ধারিত ভাবনা থেকে, নির্দিষ্ট একটা অর্থ বলতে পারবে। অর্থাৎ তুমি একটা আখ্যান আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারবে। তার মানে কি? দীর্ঘদিন ধরে আমাদের হৃদয়ে এই কাহিনিটা আমাদের জনজীবনের সঙ্গে, জন-সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের ভেতরে বাহিরের অর্ন্তগত স্পন্দনের সঙ্গে এমনভাবে মিলে মিশে গেছে যে, প্রথম সেই লিখিত পাঠ্যবস্তু ক্রমাগত অনিঃশেষ আরো অনিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে এই যে প্রবাহমানতা এটা শুধু প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তুতে পাওয়া যায়। ফলে একটা নির্দিষ্ট অর্থ তৈরি হয়েই আছে। আমি যদি এখানে তিন চারজনকে মনসামঙ্গলের কাহিনি বলতে বলি, তাহলে দেখব এখানে সবাই একই কাহিনি বলছে। শুধু কীভাবে কয়েকজন ভাষাগত দিক থেকে অর্থাৎ পাঁচজনের ভাষাগত ব্যবহারটা বদলে যাবে, বলার কথনটা বদলে যাবে। বা ‘মনসামঙ্গল’ থেকে কে কোন অংশটা, অন্যজন আরেকটা অংশ নিয়ে সেইটাকে নিজের মতো করে উপস্থাপিত করবে। এভাবেই করবে। কিন্তু কিছুতেই আমরা সেই প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তুর বাইরে যাবো না। কারণ সেই অর্থটা নির্ধারিত হয়ে গেছে। সেই অর্থটা নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। সেই অর্থটা নির্মিত হয়ে গেছে। এটাকে বলা হচ্ছে সিলেকটিভ নির্মিত। ঠিক এই জায়গাটা সিলেকটিভ নির্মিত অর্থাৎ যা নির্বাচিত, নির্দিষ্ট, নির্ধারিত, যা একরৈখিক এবং নির্মিত তা সিলেকটিভ নির্মিত। সিলেকটিভ নির্মিত খুব একটা বদলে যায় না। যা ছিল, যা আছে এবং থাকবেই। এবার বিনির্মিত পাঠ্যবিশ্ব কী? বস্তু তখন আর নেই। বস্তু তখন একরৈখিক হয়েছিল, সেটা বদলে যাচ্ছে। ফলে আমরা সেটাকে বলব পাঠ্যবিশ্ব, বিনির্মিত পাঠ্যবিশ্ব। সেখানে কী হচ্ছে? নির্দিষ্ট অর্থ অনির্দিষ্ট অর্থে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অর্থ অনির্দিষ্ট অর্থে, একরৈখিক অর্থ বহুরৈখিক অর্থে পরিণত হচ্ছে। নির্মিত অর্থ হয়ে যাচ্ছে অনির্মিত। সর্বোপরি, সিলেকটিভ অর্থ সারপ্লাস অর্থে পৌঁছে যাচ্ছে। মারাত্মক, মারাত্মক বলছি এই অর্থে, সারপ্লাস অর্থটা আসছে কর্মাস থেকে। সারপ্লাসের অর্থ হচ্ছে উদ্বৃত্ত। তাহলে উদ্বৃত্ত শব্দটা ডিকন্সট্রাকশন শব্দের মধ্য দিয়ে যেখানে আমরা বলতে চাচ্ছি সিলেকটিভ মিনিং-এর মধ্য দিয়ে সারপ্লাসে পৌঁছে যায়। গায়ত্রী এইসব কথাগুলো বলেছেন নানভাবে। যে সিলেকটিভ নির্মিতি ছিল একটা নির্দিষ্ট অর্থের দিকে, একটা নির্দিষ্ট কাহিনির দিকে, তার পরিণত বিষয়ের দিকে। আর সারপ্লাস নির্মিতি হচ্ছে সিলেকটিভ নির্মিতি থেকে একটা অনির্দিষ্ট অনিঃশেষ প্রবাহমানতার দিকে যাত্রা করে। অর্থাৎ বহুরৈখিক অর্থে, বহুরৈখিক শ্লেষে ধাবিত করে। এই তফাৎটা গায়ত্রী চক্রবর্তী করে দেখান। আমি আশা করব তোমরা পড়বে ওই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা-অংশটা, তোমরা না পড়লে; খুব ভুল থেকে যাবে বলে আমি মনে করি। যেখানে বিনির্মাণের কথা বলছেন, তিনি তিন চারটি সূর্যের কথা বলছেন; কী করে বিনির্মাণ, কী করতে পারে বিনির্মাণ? কোথায় পৌঁছে দিতে পারে বিনির্মাণ? এই প্রশ্নগুলো গায়ত্রী করেছেন? এরকম করতে করতে প্রথম যে কথাটা বলছেন, বিনির্মাণের মধ্যে দুটো ভাবনা একই সঙ্গে সমানভাবে কার্যকরী হয়। মিতালি এবং সংঘর্ষ। বলছেন প্রথমে কী হয়? এটা তো পরিষ্কার, প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তু যাঁরা লেখেন আজকে যদি বিজয়গুপ্তের তো আর সম্ভব নয়, এই যুগে এসে, এই সময়ে এসে নতুন করে ‘মনসামঙ্গল’ লেখা। যিনি প্রথম লেখক তার পক্ষে কিন্তু বিনির্মাণ তথা বিনির্মিত ভাব বিশেষ রচনা করা সম্ভব নয়। সব সময় একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, পরবর্তী সময়ের বা যুগের একটা বড় উপাদান বা পাথেয় হয়ে যায়। যিনি লিখে গেছেন তিনি তো আর নতুন করে জন্ম নিচ্ছেন না, ফিরেও আসছেন না। কিন্তু তিনি ফিরে আসছেন নতুন করে, জন্ম নিচ্ছেন পরবর্তী বা ভবিষ্যৎ লেখকের মধ্যে। তিনি কেন নতুন করে ফিরে এসে তার যে টেক্সট রয়েছে তার আবার পুনঃনির্মাণ করছেন, আবার বিনির্মাণ করছেন। ফলে পরবর্তী লেখকরা যে বিনির্মাণ করেন, সেক্ষেত্রে কী গুরুত্বপূর্ণ? এখানে মিতালি এবং সংঘর্ষ এর মধ্যে ভাববিনিময় করতে গেলে পরবর্তীকালের লেখকদের প্রথম যে টেক্সটা রয়েছে সেই টেক্সটার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এবং সেই মিতালিটাই সংঘর্ষে পরিণত হবে। কথাটার অর্থ কী? ধরা যাক, আমরা এখানে অনেকেই রয়েছি, সবার ‘মনসামঙ্গল’ ভালো লাগে এরকম হতে পারে না। আবার কারো ‘মনসামঙ্গল’ ভালো লাগতে পারে। আবার কারো ‘চণ্ডীমঙ্গল’ ভালো লাগতে পারে। তার কারণ হচ্ছে মিতালি। মিতালি সবার সঙ্গে সবার হয় না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত জীবনেও হয় না সবার সঙ্গে। যার সঙ্গে মনের মিল হয় সেখানেই মিতালি শব্দটা আসে। তার সঙ্গে আমি মিতালি করলাম। ঠিক তাই, পূর্ববর্তী কোন রচনাখণ্ডের সঙ্গে আমার মিতালি সম্পর্ক স্থাপিত হবে সেটা দেখতে হবে। একজন লেখক তিনি ধরা যাক, যিনি লিখছেন, তার যদি মনসামঙ্গলের সঙ্গে মিতালি থাকে, তিনি মনসামঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবেন। কিন্তু সম্পর্ক স্থাপন করলেই হবে না; সম্পর্ক স্থাপন করলে কি হয়? তখন আর দোষ-ত্রুটিগুলো, সরল-পতনগুলো আর দেখা যায় না। ঘনিষ্ট মানুষের ক্ষেত্রে হয় যে, তোমার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক স্থাপিত হলো। পরবর্তীকালে আমি তোমার দোষ-গুণ একটাও দেখছি না, সবই গুণ দেখছি এটা সাহিত্যের ক্ষেত্রে হয়। আর মিতালি করলে হয় কি? সম্পূর্ণ অনুকরণে চলে যেতে হয় বা অনুমানে চলে যেতে হয়। তো গায়ত্রী বলছে মিতালিটা কিভাবে তৈরি হলো? কিন্তু মিতালি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ অনুকরণ নয়, অনুসরণ নয় মিতালিকে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত আরেকটা ভাব প্রকাশের পথ তৈরি করে দিতে হবে। যেটা বলা হচ্ছে বাংলায় অর্ন্তবর্তী অন্তঃসযোগ স্থাপন। মিতালি হচ্ছে কী? অর্ন্তবর্তী অন্তঃসংযোগ স্থাপন, ভেতরে ভেতরে সম্পর্ক তৈরি হবে। তারপরে সংঘর্ষটাকে কী বলছেন? বলছেন, অন্তর্বর্তী অন্তর্ঘাত। কথাগুলো বলতে অদ্ভুত লাগছে, লেখাগুলো আমি পড়ে রোমাঞ্চিত হই, আমার বারবার পড়তে ইচ্ছা করে। আমি এখানে কথাগুলো আলোচনা করছি মাত্র, আর মাধ্যমেই আমি আরো স্পষ্ট করে বুঝতে চাই। মানে এর শেষ নেই কোনো। এইবার আমরা মিতালি, সংঘর্ষ শব্দটাকে ভাগ করবো। মিতালি হচ্ছে অন্তর্বর্তী অন্তঃসংযোগ স্থাপন। আমাদের মনসামঙ্গল কাব্যের সঙ্গে অন্তর্বর্তী অন্তঃসংযোগ স্থাপন করতে হবে। তারপর মনসামঙ্গলের কাহিনি যদি অন্তর্বর্তী অন্তঃসংযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে চলবে না। এবার সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে অর্থাৎ অন্তর্বর্তী অন্তঃঘাতের সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয়টি বলছেন, বিনির্মিত ভাববিশ্ব রচনার ক্ষেত্রে লেখকের সুপ্রতিষ্ঠিত যে অর্থ তৈরি হয়ে গেছে, সে সুপ্রতিষ্ঠিত অর্থের তলদেশে অন্তহীন কম্পন জাগাতে হবে। অর্থাৎ যে নির্দিষ্ট অর্থটা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জীবনের সঙ্গে, আমাদের পারিপার্শ্বিক জীবনের তথা বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যে অর্থ ভাবনা থেকে আমরা নিজেদের আর সম্পূর্ণরূপে বের করে আনতে পারি না। সেই অর্থ ভাবনা অর্থাৎ যে অর্থটা একটা স্থিতবস্থায় রয়ে গেছে; তার নিজের একটা অন্তহীন একটা কম্পন জাগাতে হবে। যেমন ভূমিকম্পে সব কিছু ভেঙে পড়ে। ঠিক যে অর্থটা দীর্ঘদিন ধরে মনসামঙ্গলে তৈরি হয়েছে বা চণ্ডীমঙ্গলে তৈরি হয়েছে বা নাথসাহিত্যে তৈরি হয়েছে। সে অর্থটা ভূমিকম্পের মতো করে ভেঙে পরতে হবে। এটা দ্বিতীয় কথা বলছি। তৃতীয় কথা বলছে, যে বিনির্মাণ হচ্ছে এক ধরনের নাছোড়বান্দা ভাঙাগড়া। যে নাছোড়বান্দা ভাঙাগড়া পরবর্তীকালে লেখককে একটা প্রশ্নমুখী অনুসন্ধিৎসার দিকে নিয়ে যায়। এগুলোকে আমি এখানে বাংলায় অনুবাদ করছি মাত্র। তার ভাবনাগুলোকে। অর্থাৎ যা রয়েছে, যা আছে তার কাছে প্রশ্ন করো, তার কাছে তল্লাশি করো, তার কাছে জিজ্ঞেস করো। তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনো। সে টেক্সটকে প্রশ্ন করতে হবে যে টেক্সট আমাদের সামনে আছে। সেক্ষেত্রে একটা বড় প্রশ্ন কিন্তু আমাদের সামনে আসে যে, তাহলে কী এই যে ভাঙাগড়ার কথা বলছেন গায়ত্রী, অন্তর্বর্তী অন্তঃঘাতের কথা বলছেন গায়ত্রী বা দেরিদা যা বলছেন, তাহলে কী মূল যে টেক্সট সেগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে, বিলুপ্ত হয়ে যাবে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? একেবারে না। অর্থাৎ বিনির্মাণ ধ্বংসের কথা বলছে না, বিলুপ্তের কথা বলছে না। বিনির্মাণ কোনো কিছুকে আক্রমণ করে ওই অন্তর্ঘাতের মধ্য দিয়ে নিশ্চিহ্নের কথা বলছে না। সত্যি তো আজকে যদি আমরা মনসামঙ্গলকে বিভিন্ন বাক-বদলের মধ্য দিয়ে একটা বিনির্মিত ভাববিশ্বে পৌঁছে দেই মনসামঙ্গল যেখানে ছিল, যে ভাব-বিশেষে ছিল সেখানেই থাকবে। শুধু তার সঙ্গে নতুন নতুন কিছু ভাবনা মনসামঙ্গলের সঙ্গে যোগ হয়ে যাবে। এভাবে নতুন নতুন ভাবনা চণ্ডীমঙ্গলের সঙ্গে, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদির সঙ্গে জড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ বাড়তি, উদ্বৃত্ত অর্থ তৈরি হবে বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে। এটা বাংলা কবিতায় চলছে অদ্যবধি স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও তেমনি নাটক, উপন্যাসেও। কীরকম? আমি আগে কয়েকটি কবিতা বলি তাহলে ধারণাটা একেবারে স্পষ্ট হয়ে যাবে। মনসামঙ্গলকে আমরা টেক্সট ধরছি, প্রথম লিখিত পাঠ্যবস্তু। সেখানে কীভাবে পরিবর্তনটা হয়। ধরা যাক, কালিদাস একাটা কবিতা লিখলেন বেহুলাকে নিয়ে। সমস্ত কবিতা জুড়ে কালিদাস শুধু বেহুলার প্রশংসা করে গেলেন যে তুমি সতীসাদ্ধী নারী, তুমি ভারতবর্ষের মহীয়ষী নারী, গোটা দেশ তোমার ওই দুঃসাহসিক অভিযাত্রা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে, তোমার চরণে প্রণত হচ্ছে আমাদের জীবন, আমাদের শ্রদ্ধা, সবকিছু তোমার চরণে অর্পন করছি। তাহলে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, মনসামঙ্গলে কলিদাস বেহুলাকে গ্রহণ করলেন, তাকে নিয়ে কবিতা লিখলেন এবং একালের একজন কবি হিসেবে সেকালের কাব্যের এক নারীর কাছে, তার মহীয়ষী ভূমিকার কাছে বা তার পদপ্রান্তে সমর্পণ করলেন। এটা কী বিনির্মাণ? একেবারে নয়। তার কারণ হচ্ছে এখানে মনসামঙ্গলের বেহুলাকে শুধু উচ্ছ্বসিত আবেগের মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র প্রশংসা করা হয়েছে। আমরা বেহুলাকে বহুরৈখিক ভাবনায় একেবারে পাচ্ছি না। তাহলে এটা নির্মিত যে পাঠ্যবস্তু আছে তার প্রতি একালের এক কবির নিছক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন মাত্র। প্রথম বাংলা কবিতায় বেহুলাকে বিনির্মিত ভাববিশ্বে পৌঁছে দিলেন... আনন্দ প্রকাশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এই কবিতাটি আমাদের কলকাতায় মানে পশ্চিমবঙ্গে ক্লাস নাইন-টেনে পাঠ্য। কবিতাটি একেবারেই ক্লাস নাইন-টেনে পাঠ্য হবার যোগ্য নয়। যাই হোক, সেটা অন্য ব্যাপার। কিন্তু অদ্ভুত এই প্রথম আমরা একটা বিনির্মিত ভাববিশ্বে পৌঁছে যাচ্ছি জীবনানন্দের হাত ধরে। কীভাবে? সেই বাংলার ত্রস্ত নীলিমার কাব্য গ্রন্থের কথা আমরা ভাবি যেখানে বলছেন, বাংলার নদী, মাঠ, ঘাসফুল... (চলবে) বাকী অংশ ছাপা হবে ১০ আগস্ট। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।