রাত ১১:৫২ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

ফিরিয়ে দাও বন্ধুত্ব- লহ এই যান্ত্রিকতা

প্রকাশিত:

রুম্পা সৈয়দা ফারজানা জামান ।।

কোলাহলহীন জীবনে মানুষ যেন ক্রমেই যন্ত্র হয়ে যাচ্ছে বন্ধুর অভাবে। বন্ধুত্ব আটকে যাচ্ছে অন্তর্জালের মরিচীকায়। ব্যস্ত দিনের শেষে হাতের মুঠোয় শুধু অন্তর্জাল। আর সেই অর্ন্তজালের সামাজিক মাধ্যমে চলছে 'লাইক' আর 'শেয়ার'-এর বন্ধুত্ব। তাতেই চলছে বন্ধুত্বের অনুশীলন। ব্যাস হয়ে গেল বন্ধু? মিটে গেল বন্ধুত্বের তৃষ্ণা?

বিশ্বজুড়ে যখন বন্ধু দিবস নিয়ে এতো আয়োজন, এতো আলোচনা তখন সামাজিক মাধ্যমে টিকে থাকা বন্ধুত্ব নিয়েও হচ্ছে সমালোচনা। পারস্পরিক সম্পর্কবিহীন শুধু যান্ত্রিক এই সম্পর্কের ফলাফল নিয়েও চিন্তিত অনেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ ক্রমেই স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে অন্যতম কারণ বন্ধুহীনতা। সামাজিক জীব হওয়ার পরেও এই বন্ধুহীনতার কি কি কারণ – সেটা নিয়েও এখন আলোচনা চলছে ব্যাপক হারে।

স্কুল শিক্ষিকা রুমানা বিনতে হাবীব জানালেন, আমাদের সময় স্কুলে পড়ার সময়েই পেয়ে যেতাম জীবনের সেরা বন্ধু। আজও বিশ-পঁচিশ বছর ধরে সেই বন্ধুত্ব আছে অটুট। কিন্তু আজকাল বাচ্চারা স্কুলে আসে শুধু প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে।

রুমানা আরও বলেন, বাচ্চাদের উপর কোনও না কোনওভাবে পড়ালেখা বা গান বাজনা করার একটা চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই মনে করে সবাইকে পিছনে ফেলে তাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তাই কোনও না কোনওভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বদলে তৈরি হয় প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব।

স্কুলপড়ুয়া জায়ানের মা ফারিয়া আফরীন জানান, এখন সবকিছুতেই প্রতিযোগিতা। গান গাইলে তাকে প্রতিযোগিতায় পাঠানো হয়, নাচলে – নাচের মঞ্চে। বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই জানে মনের আনন্দে নয়, যা কিছুই শিখবে তা নিয়ে তাকে দাঁড়াতে হবে অন্যের মুখোমুখি। এমন অবস্থা হলে বাচ্চারা বন্ধু বানাবে কখন? ওরা তো ব্যস্ত তথাকথিত সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায়।

বড় হতে হতে কিশোরবেলা এবং তারুণ্যের সময়গুলোতেই প্রতিযোগিতা নিচ্ছে নানা রূপ। কখনও প্রতিযোগিতা হচ্ছে দামি মোবাইল সেট নিয়ে। কখনও আবার চাকরীর সম্মানি নিয়ে।

একদিকে প্রতিযোগিতা অপর দিতে ভার্চুয়াল মোহবিষ্ট প্রজন্মের বন্ধুত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন আরও অনেকে।

ক্রমশ যন্ত্রমুখী প্রজন্মকে দোষারোপ করে কেউ কেউ বলেন, এই প্রজন্ম কারও সঙ্গে মিশতে অপারগ। এজন্য বাড়ছে যৌন হয়রানির মতো অপরাধ। পরস্পরের প্রতি সম্মান না করার প্রবণতা বাড়ছে।

এক সময়ের এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠক নূরে আলম আক্ষেপের সুরে বলেন, একটা সময় পাড়ায় পাড়ায় এলাকার সাংস্কৃতিক দল থাকতো। ছেলে-মেয়েরা দলবেঁধে অনুষ্ঠান করতো, একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাতফেরির প্রস্তুতি নিত বা পহেলা বৈশাখে একসঙ্গে কাজ করতো। এভাবে গড়ে উঠতো বন্ধুত্ব। এখন এসব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছেলেমেয়েরা নিজেদের বন্ধু ভাবতে পারে না।

একই সুরে গৃহশিক্ষক লোপা বলেন, বর্তমানে ছেলেমেয়েরা 'কারণ' ছাড়া একে অপরের সঙ্গে মিশতে পারে না বলেই হয়তো এখন ছেলের কাছে মেয়ে মানে গার্লফ্রেন্ড। আবার মেয়ের কাছে ছেলে মানে বয়ফ্রেন্ড। এখানে নিখাঁদ বন্ধুত্বের কোনও স্থান নেই।

বন্ধুত্ব মানে শুধু একসঙ্গে ফাস্টফুড খাওয়া নয়, বন্ধুটির সঙ্গে নিজের ফাস্টফুডটা শেয়ার করা। বন্ধুত্ব মানে নিজে পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়ে প্রথম স্থানে থাকা বন্ধুর জন্য আনন্দ করা। বন্ধুত্ব মানে অন্য বন্ধুর ছেড়া কাঁথাটা সেলাই করে কষ্টটা পূরণ করে দেওয়া।

এখন অনেকেরই প্রশ্ন- এমন বন্ধুত্ব কোথায়!

বন্ধুত্ব নিয়ে এতো বিজ্ঞাপন এতো নাটক- তারপরেও বন্ধুত্বই যেন হারিয়ে গেছে সমাজ থেকে। এর কারণ সামাজিক মাধ্যমে ব্যস্ততা বা অনিরাপত্তা নয়। এর পিছনে কারণ হয়তো সুযোগহীনতা। একটি বাচ্চাকে যদি আরেকটি বাচ্চার সঙ্গে কারণ ছাড়া মিশতে দেওয়া হয় তাহলে একদিন সে তার নিজের চকলেটটা ঠিকই ওকে দিবে। পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক দলে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে কাজ করলে ওই বন্ধুরাই এগিয়ে আসবে পহেলা বৈশাখে আরেক বন্ধুর হাতে হাত রেখে।

এই প্রজন্মকে বন্ধু তৈরি করার সুযোগ দিতে হবে। বন্ধুহীন কংক্রিট জীবন যেন আগামী প্রজন্মকে হতাশ না করে সেজন্য কাজ করতে হবে সবার। পৃথিবীটা প্রতিযোগিতার নয়- বন্ধুদের। আর বন্ধুরা একসঙ্গে জিততে পারে যেকোনও প্রতিযোগিতায়।

বন্ধু দিবসের মাধ্যমেই শুরু হোক এমন আড্ডা যে আড্ডায় তর্কে ব্যস্ত থাকবে বন্ধুরা, হোক ছবি দেখার উৎসব, হোক গান বাজনার আসর। আসুক প্রতিযোগিতাহীন বন্ধুত্বের যুগ।

সবাইকে বন্ধু দিবসের শুভেচ্ছা। 

 

ছবি: মাহফুজুর রহমান

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।