রাত ১১:৪৮ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

তুমিই বন্ধু...!

প্রকাশিত:

নওরিন আক্তার॥

তোমার প্রিয় বন্ধু কে? সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে হইচই, আড্ডায় মেতে থাকা ইউনিভার্সিটিপড়ুয়া প্রিয়তির চটপট উত্তর, আমার বাবা! তবে যে সারাদিন ঘোরাঘুরি এতো এতো বন্ধু নিয়ে? ‘ওরা ভালো বন্ধু অবশ্যই, যেকোনো প্রয়োজনে পাশে পাই ওদের। ভালো লাগে একসঙ্গে সময় কাটাতে। কিন্তু বাবার সঙ্গে বন্ধুত্বটা তো বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই! তার কাছেই শিখেছি কিভাবে সঠিক বন্ধুকে চিনতে হয়। তাই আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু বাবাই’- প্রিয়তির মতামত এটা। 

বন্ধুত্ব আসলে কী? একেকজনের কাছে উত্তরটা হতে পারে একেক রকম। বন্ধুত্ব মানে একসঙ্গে ছুটে বেড়ানো বন, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, ঝরনায়। চিৎকার করা উচ্ছ্বাসে। অকারণ হাসিতে মেতে ওঠা। শপিং করা ইচ্ছামতো। সময় পেলেই নির্মল আড্ডায় কাটিয়ে দেওয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবে উত্তর যার কাছে যেমনই হোক না কেন, একটা ব্যাপারে কিন্তু বন্ধুত্বের সংজ্ঞা সবার কাছেই এক। আর সেটা হচ্ছে খুব মন খারাপের সময় যাকে পাশে পেতে ইচ্ছা করে, নিজের সবচেয়ে বড় ভুলের কথা যার কাছে বলা যায় নির্দ্বিধায় এবং যে প্রচণ্ড দুঃসময়েও জড়িয়ে ধরে গভীর ভালোবাসায়- সে-ই বন্ধু। হ্যাঁ, বন্ধুত্ব মানে পাশে থাকা।

ভেবে দেখুন তো হঠাৎ বিপদে পড়লে যখন পুরো দুনিয়া মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন ভরসার কাঁধটি এগিয়ে দেয় কে? দিনভর শাসন করা রাগী বাবা, বাসায় ফিরতে দেরি হলে বকাঝকা করা মা কিংবা কথায় কথায় ঝগড়া করা ভাইটিই তখন এগিয়ে আসে প্রিয় বন্ধু হয়ে। বন্ধুত্বের এ বন্ধন আত্মস্থ করা চাই একদম ছোটবেলা থেকেই।  
 

মা-ই সবচেয়ে কাছের বন্ধু ফারিয়ার

মডেল ও অভিনেত্রী শবনম ফারিয়ার কাছে তার প্রিয় বন্ধু মা। ঠিকমতো পড়াশোনা না করলে, শুটিং থেকে বেশি রাত করে ফিরলে, রাত জাগলে মা বকাঝকা করেন খুব। কাজের প্রশংসার চাইতে সমালোচনাই করেন বেশি। কিন্তু দিন শেষে বাড়ি ফিরে সারাদিন কি ঘটলো সেটা মাকে বলতে না পারলে যেন রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায় ফারিয়ার। তিনি মনে করেন মায়ের মতো আর কেউই বোঝে না তাকে।

ওয়েডিং ডায়েরির ক্রিয়েটিভ হেড পলা রহমান জানালেন সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি হচ্ছে তার জীবনসঙ্গী প্রীত রেজা। ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষেই শুরু হয়েছিলো বন্ধুত্ব। তারপর প্রেম এবং বিয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে গেছে। শুধু বদলায়নি সেই আগের বন্ধুত্ব। ‘এখনো প্রীত সবকিছু আমার সঙ্গে শেয়ার না করে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সেটা ক্যারিয়ার সম্পর্কিত কিছু হোক কিংবা পরিবার। আবার আমার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। কোন অনুষ্ঠানে কি পরে যাবো সেটা পর্যন্ত প্রীতর সঙ্গে আলাপ করেই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়’- বলেন পলা। আবার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও কাজের খাতিরে দুজনের পরিচিতজন ও বন্ধুরাও একই। ফলে কখনও আলাদা আড্ডাও দিতে হয় না।     

প্রিয় বন্ধু জীবনসঙ্গী প্রীত রেজা

সংগীতপরিচালক ও গায়ক খৈয়াম সানু সন্ধি জানালেন তাদের তিন ভাইবোনের বন্ধুত্বের কথা। সভ্যতা, স্বাগতা দুইবোনের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হয়। তবে যখনই কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তখনই ঝগড়া ভুলে স্বাগতার খোঁজ নেওয়া শুরু করে সভ্যতা! কারণ সাজগোজটা স্বাগতার মতো আর কেউ পারে না। দুইবোন একমত হয় কেবল একটি ব্যাপারেই। আর সেটা হচ্ছে মা তাদের থেকে ছেলেকে বেশি ভালোবাসে! এই নিয়ে দুজনের অভিযোগের শেষ নেই। এইসব খুনসুটি চলে সবসময়ই। তবে সন্ধ্যায় চায়ের আসরে একজন গিটার হাতে তুলে নিলেই হলো। নিমিষেই গায়েব সব ঝগড়া! তিন ভাইবোন মেতে ওঠে গানের আড্ডায়। ‘বন্ধুত্বটা এমনই, খুব মজার’- বলেন সন্ধি।      
 

তিন ভাইবোনের বন্ধুত্ব আড্ডা আর খুনসুটিতেই...

একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ফেরদৌস হাসান। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে সর্বপ্রথম শিখিয়েছি কাকে বন্ধু ভাবা যায় আর কাকে না। মেয়ের বন্ধুদের সবাইকেই আমি চিনি। ভালো কিছু বন্ধু সবসময় আশেপাশে থাকলে দুঃশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যায়। অনেক বাবা মাকেই দেখি ছেলেমেয়েকে বকাঝকা করে দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া নিয়ে। তাতে লাভের মধ্যে লাভ হয় বাচ্চারা মিথ্যা বলে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে যায়। এতে বাবা মায়ের সঙ্গে দূরত্বও বাড়ে। সন্তানকে যেকোনো পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া শেখালে তাদের উপর ভরসা কিন্তু করাই যায়। যেমন আমার মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে আমাকে ছবি পাঠায়। ওর খুশি দেখাতেই আমার আনন্দ।’    

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের চিকিৎসক সিফাত ই সাঈদ জানান, পরিবারের মধ্যে বন্ধুত্ব থাকাটা খুবই জরুরি। যদিও এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে বাবা মা বন্ধু হবে এটা খুব ভালো চোখে দেখা হয় না। তবে আশার কথা আজকাল কিছু কিছু শিক্ষিত পরিবার বুঝতে শুরু করেছে ব্যাপারটির গুরুত্ব। ‘সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হলে অনেক বিপদ থেকে সন্তানকে রক্ষা করা সম্ভব। যে ছেলে বা মেয়ে তার বাবা মায়ের সঙ্গে নির্দ্বিধায় সবকিছু শেয়ার করে, সে কখনও বিপথে যাবে না। আবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে যেমন এড়ানো যায় অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, তেমনি তাদের সন্তানও বেড়ে উঠতে পারে নিশ্চিত নিরাপদ পরিবেশে’- বলেন সিফাত।    

বাবা মা কিংবা ভাই বোনের সঙ্গে বন্ধুত্বের শুরুটা হতে পারে খেলাচ্ছলে কবিতা পড়ার সময়েই। শৈশব, কৈশোর পার হতে হতে হয়তো অনেকবারই বদলে যায় সে বন্ধুত্বের রূপ। কখনও আদরে, কখনওবা শাসনে। তবে দিনশেষে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে প্রিয় এ মানুষগুলোই। তাই বন্ধুত্বের চর্চা শুরু হোক পরিবার থেকেই।   

 

আরএফ

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।