ভোর ০৭:০৯ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮  

হারবার্টকে খুন করলো কে?

প্রকাশিত:

মনে হয় ‘হারবার্ট’-এ যা আছে তার চেয়ে যা নেই তার জন্যই হারবার্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংযম। বাংলাভাষীরা অতিকথনপ্রিয়। আর উপন্যাসকে অতিকথনের জন্য বোর্হেস একবার অভিশপ্ত বস্তু বলেছিলেন। হয়তো সে জন্যই তিনি উপন্যাস লেখেন নি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হারবার্ট আশ্চর্য স্মার্ট।

জাহেদ সরওয়ার ||

হারবার্ট সরকার কেবল নামেই হারবার্ট। গালভরা ইংরেজি নাম। রেখেছিলেন তার বাবা স্বর্গত সৌখিন হবু চিত্রপরিচালক ললিতকুমার। নিম্নমধ্যবিত্তের যা হয় আর কি। হয়তো উপরের দিকে চলে যাও না হয় নিচের দিকে নেমে আসো। একটা অস্থির অবস্থান এই শ্রেণিটার। হারবার্টের বাবা ললিতকুমারেরও হয়েছিল তাই। সাতচল্লিশের যুদ্ধপরিস্থিতি ও দেশভাগের বাজারে কামানো সব টাকা ফিল্মে ঢেলেছিলেন। এর দুবছর পরেই হারবার্টের জন্ম। আর এর একবছর পরেই সিনেমার নায়িকাসহ শুর্টিংয়ে যাবার পথে শ্রী ললিতকুমার অক্কা পেয়েছিলেন। সিনেমাপ্রেমী ললিতকুমার কোনো এক হলিউডি চিত্রনায়কের নামে রাখা শিশু সন্তান হারবার্ট তার মা শোভারাণী। শোভারাণীও হারবার্টের শৈশবে ছাদে ইলেকট্রিকের তারে কাপড় মেলে দিতে গিয়ে পটল তোলে। 
এরপর আত্মীয়দের মাঝে হারবার্ট বড় হয়ে উঠে এক শ্রেণিহীন জীবের মতোই। উনপঞ্চাশ থেকে বিরান্নব্বই সালের দুনিয়া। এটুকুই আয়ু হারবার্টের। তারপর অন্ধকার ঘুপচি ঘরে হাতের শিরাকাটা হারবার্ট। সবার আগে বুঝতে পারে অন্ধমাছিটা। রক্তের গন্ধে। কিন্তু যেই অমীমাংশিত প্রশ্ন বারংবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে তা হচ্ছে হারবার্ট সরকার কি আত্মহত্যা করেছে? নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে? নাকি তাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়া হয়েছে। অথবা আদৌ কি বেঁচেছিল হারবার্ট? হারবার্টকে খুন করলো কে? কিন্তু মনে রাখতে হবে এই সেই হারবার্ট শশ্মান যন্ত্রের ভেতর লাশ হয়ে পুড়তে থাকা অবস্থায় যে ফাটিয়ে দিয়েছিল গোটা চুল্লিটাই। 
তখন ঔপন্যাসিক রগড় করে আমাদের বলবেন, হারবার্টের রক্তহীন মৃতদেহ দাহ করার সময় যে জঘন্য ঘটনা ঘটেছিল তা অবধারিতভাবে এই ইঙ্গিতই দিয়ে চলে যে কখন, কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটবে এবং তা কে ঘটাবে সে সম্মন্ধে জানতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এখনও বাকি আছে।  হয়তো হারবার্ট উপন্যাসে এই ম্যাসেজটাই দিতে চেয়েছিলেন আমাদের নবারুণ।
ছোটখাটো আঙ্গিকে লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে বেশ কিছু কালজয়ী কাজ আছে। ‘হারবার্ট’ও নবারুণ ভট্টাচার্যের সেরকম একটি উপন্যাস। মাত্র আশি পৃষ্টার এই উপন্যাসটির যেই বিস্তৃতি সেটা একটা প্রশ্নচিহৃই বটে। উপন্যাস অনেকটা নির্জীব শিল্প যাই ঘটুক যত কঠিন বাস্তবতাই আসুক সে বর্ণনা করে যায়। তবে ঔপন্যাসিকের চালটা থাকে ভেতরে। বিনয় মজুমদার লিখেছিলেন ‘রক্তের ভেতর জোৎস্না’ অনেকটা সেরকম। মনে হয় ‘হারবার্ট’-এ যা আছে তার চেয়ে যা নেই তার জন্যই হারবার্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংযম। বাংলাভাষীরা অতিকথনপ্রিয়। আর উপন্যাসকে অতিকথনের জন্য বোর্হেস একবার অভিশপ্ত বস্তু বলেছিলেন। হয়তো সে জন্যই তিনি উপন্যাস লেখেন নি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হারবার্ট আশ্চর্য স্মার্ট। অসম্ভব সংযমী। বাংলা উপন্যাস লিখিয়েরা হারবার্টের কাছ থেকে সংযম শিখতে পারে। 
নবারুণ ভট্টাচার্য কেবল কবি না কেবল ঔপন্যাসিকও না। তার প্রত্যেকটা লেখার ভেতর বারুদ থাকে, প্রশ্ন থাকে। হারবার্টের মৃত্যুতেই সে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই যে হারবার্ট রূপী হাস্যকর চরিত্র মৃতের সঙ্গে কথোপথনের মত পরাবাস্তব বা আজগুবি কোনো ব্যবসা না পেলে কিভাবে বেঁচে থাকতো। অথবা সামাজিক কারণেই এরকম আজগুবি বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মৃতের সঙ্গে দেখা করতে আসা শহরের আধুনিক মানুষগুলো যাদের ফিস নিয়ে হারবার্টের বেঁচে থাকা। আবার সেই মানুষগুলোর ভেতর থেকেই তৈরি হয় হারবার্টের মরণ ফাঁদ। যুক্তিবাদী সঙ্ঘ’র চ্যালেঞ্জ। যা শেষ পর্যন্ত হারবার্টের মত কর্মহীন আধামানবকে ঠেলে দেয় আত্মহত্যার দিকে। এটা এমন একটা পরিবেশ যে সবকিছুতে সমান অধিকার চেয়ে নকশালরা মরছে। যেমন হারবার্টের ভাতিজা বিনু। অসম্ভব ভালছাত্র ও সম্ভাবনা থাকা স্বত্ত্বেও সে নকশাল বনে যায়। শেষে পুলিশের হাতে প্রাণ দেয়। 
মূলত নকশাল বিনুর পুলিশের হাতে মৃত্যুর পর হারবার্টের জীবন পাল্টে যায়। হারবার্ট বাস্তবতা থেকে পরাবাস্তবতায় প্রবেশ করে। ‘হাজার হাজার কাকের একটা মেঘ ওপারে কাচের কাছে ছুটে আসে। কাচে ঠোকরায়। ডানা  ঝাপটায়। অথচ কোনো শব্দ নেই। কাকের রক্ত, কাকের গু ছেবড়ে ছেবড়ে কাচটাকে নোংরা করে দিচ্ছে। সেই অসংখ্য কাকের ফাঁকে বিনুকে দেখতে পায় হারবার্ট। ৮০ দশকের মধ্যভাগ। বিনুর মৃত্যুর পর এই প্রথম বিনু। বিনু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। বিনু কিছু বলছে। কাকের ঢেউ এসে বারবার বিনুকে আড়াল করে। কাচের তলায়, ওপারে, মরা কাক জমছে। বিনু একটু এগিয়ে আসে। বিনু হাসছে। হারবার্টও হাসে। হাত নাড়ে। কথাগুলো, বিনুর কথাগুলো কাচের এপারে ইকো হচ্ছে অনেক দূরের ভেসে আসা মাইকের গানের সঙ্গে। 
এরপর মৃত বিনুর সঙ্গে তার স্বপ্নে দেখা হয়ে যাবার ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে যাবার পর তার এই পেশায় সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার তৈরি হতে থাকে। অন্ধের ষষ্টির মত। বিনুদের যেই সামাজিক অবস্থান সেটা রাষ্ট্রের কারণেই। এই একই অপারগতা থেকেই তৈরি হয় সামাজিক কুসংস্কারাচ্ছন্নতা। কিন্তু সেটাকে বিজ্ঞানের নামে সরাসরি আঘাত করাটা যুক্তিগত নয়। সমাজের যেই তলা থেকে এই ধর্মান্ধতা কুসংস্কারাচ্ছন্নতা আসে সেই শ্রেণির মানুষের জীবন যাবনে পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই এই কুসংস্কারাচ্ছন্নতার পরিবর্তন আনা যেতে পারে। কিন্তু সরাসরি টার্গেটে পরিণত করে তাদেরকে নিজের মতে স্বপক্ষে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। সেই যুদ্ধে হারবার্ট হেরে যায়। হারবার্টের হত্যাকারী আসলে সমাজ, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী সমাজ। হারবার্টকে দিয়ে যেই সময়ের গল্প আমাদের শুনিয়েছেন নবারুণ তিনি সেই সময়ের একটা গ্লোবাল ম্যাপও তুলে ধরেন আমাদের সামনে। ‘১৯৯২ সালের মে দিবস। রাশিয়াতে বরিস ইয়েলেৎসিন জব্বর ভূতের জলসা বসিয়েছেন। লাখ লাখ কমিউনিস্ট ক্যাপিটালিজমের ভূত দেখছে। সলঝেনিৎসিনের ছদ্মবেশে রাসপুটিন ফিরে আসছে। যুগোস্লাভিয়া ভেঙে পড়েছে। ক্রোশিয়ান টেনিস খেলোয়াড় গোরান ইভানোভিচ ভাবছে প্রচণ্ড গতিতে সার্ব করে জিম কুরিয়ার বা আন্দ্রেই আগাসিকে পুঁতে ফেলবে। শেষবার এক দেশের দল হিসাবে সুইডেনে খেলতে যাবে বলে তৈরি হচ্ছিল কমনওয়েলথ অফ ইন্ডিপেনেডেন্ট স্টেটস বা প্রাক্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন। একীভূত জার্মানি ভেবে পাচ্ছে না কাদের দিয়ে দল গড়বে পূর্ব না পশ্চিম? পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভেকিয়া, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, আলবেনিয়া জুড়ে মহা হট্টগোল। কমিউনিজম কেলিয়ে পড়েছে। 
বিশ্বজুড়ে কমিউনিজম ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার সঙ্গে যেন হারবার্টের আত্মহত্যার কোনো এক অদৃশ্য যোগসূত্রতা তৈরি হয়। উভয়ের ভেঙেপড়ার যেই সংযমী মন্তাজ সৃষ্টি করেন নবারুণ মনে হয় সে কারণেই এই ছোট উপন্যাসটি এত গ্রহণযোগ্য হয়েছে বাংলা পাঠকের কাছে। কিন্তু জীবিত বিনু বা জীবিত হারবার্ট যা করতে পারে নি সেটা হারবার্টের মৃতদেহই করে। বিনুর লুকিয়ে রাখা বোমাভর্তি বিছানা যখন হারবার্টের সঙ্গে চিতায় পোড়ানো হয়। তখন লাশপোড়ানো ঘরটাই গুড়িয়ে যায়। নবারুণ শেষাবধি আশাবাদি থাকতে চেয়েছেন।  
 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।