বিকাল ০৪:৫২ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

রাজন ও আমাদের মনুষত্ব

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মুহাম্মাদ রেজাউল করিম।।

‘এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না/ এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না/ এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না।’ কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের মতো, যে দেশে রাজনরা বাঁচে না সে দেশ আমার নয়, যে দেশ একজন তেরো বছরের শিশুকে পাশবিক নির্যাতন থেকে বাঁচাতে পারে না, সে দেশ কখনোই আমার হতে পারে না। অসহায় রাজনকে বাঁচানোর জন্য যখন একজন মানুষও এগিয়ে আসে না, তখন এই অভিশপ্ত জাতি থেকে নিজের পরিচয় মুছে ফেলতে আমার এতটুকুও দ্বিধা হয় না। দেশ মধ্যমআয়ে পৌঁছে গেছে, কিন্তু মানুষের মনুষত্ব  নিম্নতর হচ্ছে। অর্থনৈতিক চালিকা শক্তির  ওপর ভর করে দেশ চলে আর মনুষত্বের ওপর ভর করে মানুষ চলে। অর্থনীতি থেমে গেলে, দেশ ঠেকে যায় আর মনুষত্ব হারিয়ে গেলে মানুষ পশু বনে যায়।

সামান্য চুরির অপবাদে যদি রাজনকে পাশবিক মৃত্যু বরণ করতে হয়, তবে শেয়ার বাজারের বড় বড় চোরদের শাস্তি কী হওয়া উচিত ছিল? এই দেশে যারা শক্তিধর তাদের কোনও শাস্তি নেই, তাদের সাত খুন মাফ, আর পান থেকে চুন খসলেই মৃত্যু নিশ্চিত অসহায় রাজনদের। কারণ, এরা বলি না হলে, আত্মপূজা হয় না মনুষত্বহীনদের। যাদের ধরবার ক্ষমতা নেই, তাদের জন্য বউকে মেরে ঝিকে  শেখানোর  ফরমুলা মন্দ নয়, আর তাইতো রাজনরা জল্লাদের এই কসাইখানায় বলি হয় রোজ। এই রাজন একজন নয়, এই রাজন হাজারো, এই রাজন লাখো বা তার চেয়েও অধিক। প্রতিনিয়ত এই রাজনরা অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। দরিদ্র এই দেশের দারিদ্র্যের অভিশাপ ঘোচাতে গিয়ে অকালেই প্রাণ হারাতে হয় রাজনদের। রাজনের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জীবনের নিরাপত্তা দানে রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে, সেই ব্যর্থ রাষ্ট্রে রাজনরা বাঁচে না। এই দেশে আইন হয়, সংসদে বিল পাস হয় কিন্তু পারতপক্ষে সেই আইনের সুফল জনতা কতটুকু পায় সেটাই মুখ্য প্রশ্ন। যেমনিভাবে ২০১৩ সালে পাস হওয়া শিশু আইনে বলা হয়েছে, ‘কোনও ব্যক্তি যদি তার দায়িত্বে থাকা কোনও শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন বা অবহেলা করেন তাহলে ওই ব্যক্তি অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানার অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’ কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এক জরিপে বলা হয়েছে, মাত্র এক বছরেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে প্রায় দশ লাখ শিশু। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নির্যাতনকারী কারও তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য বিচার  হয়নি। শিশু আইন বিল ২০১৩ তে, ‘১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু বলে গণ্য করা হয়েছে এবং ঝুঁকি রয়েছে এমন কাজে এদের নিয়োগ কার যাবে না।’ কিন্তু পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থার জরিপ ২০১২ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে এমন ৪৫ ধরনের কাজের মধ্যে ৪১ ধরনের কাজেই শিশুরা অংশ নিচ্ছে। বর্তমানে মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৭৯ লাখ। গত পাঁচ বছরে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে ১০ লাখেরও বেশি। এইসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু মৃত্যুর হারও নেহাত কম নয়। নানা অত্যাচার আর অনাচারে শিশুদের প্রাণনাশ হচ্ছে। এক জরিপে বলা হয়, গত দশ বছরে শুধু বাসায় কাজ করতে গিয়েই নিহত হয়েছে প্রায় ৩৯৮ জন শিশু। অপরাধীদের মধ্যে যারা বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের অনেকেই আবার আইনের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। অথচ গরিব নির্যাতিতরা চিরকালই অসহায়, চিরকালই আইনের মারপ্যাচে আটকে পড়েন। এরা অপরাধ না করেও অপরাধী।

দেশে এক দিকে আইন হয়, অন্যদিকে আইনকে পায়ে মাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা মানুষের মধ্যে বিরাজমান। এদেশে দলিল পত্রের আইন আর বাস্তবতার আইন কখনও এক নয়, দুটো সম্পূর্ণই আলাদা বিষয়। এদেশে ক্ষমতাহীন আর ক্ষমতাবানদের মধ্যে আইনের পার্থক্য ও বৈষম্য রয়েছে।

রাষ্ট্রে অন্যায় বাড়লে, মূল্যবোধ হারায়। মূল্যবোধ হারালে মনুষত্ব মরে যায়। তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না, মানুষ পশু হয়, মানুষ বর্বর হয়। তখন দেশও আর দেশ থাকে না, দেশও বর্বর হয়। আর বর্বর দেশে কোমলমতি রাজনদের বাঁচার অধিকার থাকে না।  অধিকারহীন রাষ্ট্রে রাজনদের অধিকারের কথা বলাটাও যেন অন্যায়!

রাজনরা এভাবে মৃত্যুকে সয়ে নিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে, মানুষ আর পশুতে তেমন কোনও তফাৎ নেই। শুধু মাত্র একজন রাজনের চিত্র দেহে সারা দেশ কেঁপেছে, কিন্তু এই রকম হাজারো রাজন, হাজারো আদুরি, হাজারো সালেহা, হাজারো রহিমা, হাজারো রুবি দিনদিন অনাদরে, অনাহারে অন্যের হাতে নিঃশ্বেষ হচ্ছে, সে রিপোর্ট কে জানে? আমরা ততটুকুই জানি, যতটুকু প্রকাশ পায়। গরিবের ঘরে জন্ম নেওয়া দুমুঠো ভাতের জন্য যেসব শিশু জীবিকায় যায়, তাদের প্রতি এই রকম হিংস্র আচরণ যাদের, তারা আর যাই হোক অন্তত মানুষ নয়, এটা নিশ্চিত। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে আর যেন কোনও রাজন এভাবে প্রাণ না হারায়। শুধু রাষ্ট্রই নয়,  প্রতিটি মানুষকেই এ রকম নিষ্ঠুর আচরণ বন্ধ করতে হবে। শিশুদের  প্রতি প্রেম ও সহমর্মিতার হাত বাড়ালে, পৃথিবীকে এরাও আলোকিত করতে পারে।

যতদ্রুত সম্ভব রাজনের হত্যাকরীদের ফাঁসি নিশ্চিত করা, এটা এখন সময়ের দাবি। যতদিন রাজনের হত্যাকারীদের ফাঁসি না হবে, ততদিন এই দেশ রাজনের আত্মার অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে না।

লেখক: কবি

eadrito@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।