সকাল ০৯:৩৯ ; সোমবার ;  ২৩ জুলাই, ২০১৮  

ওয়েলকাম টিউনে কদর বাড়ছে দেশি গানের

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম॥

মোবাইল ফোনের রিংটোন এবং ওয়েলকাম টিউন হিসেবে হিন্দি গান ব্যবহার বন্ধের পর দেশি বাংলা গানের কদর বাড়তে শুরু করেছে। মোবাইল ফোনের থার্ড পার্টি সলিউশন প্রোভাইডার বা কনটেন্ট প্রোভাইডাররা (সিপি) এরই মধ্যে খোঁজখবর করতে শুরু করেছে জনপ্রিয় বাংলা গানের। যোগাযোগ করছে বিভিন্ন অডিও হাউজে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ আদালতের এই আদেশের ফলে দেশীয় বাংলা গানের বাজার অন্তত ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

প্রসঙ্গত, গত ৯ জুলাই বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের রিংটোন ও ওয়েলকাম টিউনে হিন্দি গানের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে জাতীয় সংগীতকেও মোবাইল ফোনের রিংটোন এবং ওয়েলকাম টিউন হিসেবে ব্যবহার অবৈধ বলে হাইকোর্টের দেওয়া রায় গত ১ মে বহাল রেখে রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

মোবাইল ফোনের রিংটোন এবং ওয়েলকাম টিউনে হিন্দি ও উপমহাদেশের অন্য কোনও দেশের গান ব্যবহারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত জুন মাসে একটি রিট আবেদন করেন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এমআইবি) সভাপতি একেএম আরিফুর রহমান। আবেদন শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।

উচ্চ আদালতের এ আদেশের ফলে সঙ্গীতাঙ্গনে বইছে দখিনা হাওয়া। শিল্পী, সুরকার, গীতিকবিরা তাদের সৃষ্টি নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। অডিও প্রযোজনা সংস্থাগুলো নতুন করে বিনিয়োগের কথা ভাবছেন বলে জানালেন এমআইবির সভাপতি ও লেজারভিশনের চেয়ারম্যান একেএম আরিফুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এটা আমাদের দীর্ঘ দিনের চাওয়া ছিল। তিনি বলেন, মোবাইল ফোনে রিংটোন ও ওয়েলকাম টিউন হিসেবে হিন্দি গানের এই আগ্রাসনের পেছনে আমাদের দেশের সিপি (কনটেন্ট প্রোভাইডার) নামধারী কিছু প্রতিষ্ঠান জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠান ৯০ শতাংশ হিন্দি গান বুস্ট করে আর বাংলা গান করে মাত্র ১০ শতাংশ। ফলে দেশ থেকে হিন্দি গানের জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা চলে যাচ্ছে অন্য দেশে। উচ্চ আদালতের আদেশের ফলে এগুলো বন্ধ হবে। একেএম আরিফুর রহমান অভিযোগ করেন, মোবাইল ফোনে রিংটোন ও ওয়েলকাম টিউন হিসেবে হিন্দি গানের প্রসার প্রসারে বেশি দায়ী মোবাইল অপারেটর এয়ারটেল, রবি ও বাংলালিংক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনও স্যাটেলাইট চ্যানেল ভারত দেখাবে না, কিন্তু তাদের হিন্দি গান এখানে আসবে, তা হতে দেওয়া হবে না। এ আদেশের ফলে ৫০ শতাংশ না হোক ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি গানের বাজার 'কনটেন্ট মার্কেটে' বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে বাংলাদেশে হিন্দি গান এনে রিংটোন বা ওয়েলকাম টিউন তৈরির কাজে জড়িত রয়েছে প্রায় ৭-১০টি প্রতিষ্ঠান। আদালতের এ আদেশের পরে প্রতিষ্ঠানগুলো অতি সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় উচ্চ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার। আপিলের করার পেছনে তাদের যুক্তি, এ খাতে তাদের বিপুল বিনিয়োগের কথা আদালতের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু বৈঠকে আমন্ত্রণ পাওয়া একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে অংশ নেওয়াদের মধ্যে অধিকাংশই আপিলের বিপক্ষে। তাদের যুক্তি, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এ নিয়ে চিন্তা না করে বরং দেশীয় বাংলা গানের প্রতি মনোযোগ দিতে। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা এখনও আপিলের পক্ষে রয়েছেন বলে ওই সূত্র জানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সিপি'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আমরা যারা শুধুই বাংলাদেশি গান নিয়ে কাজ করি তাদের জন্য এটা একটা বিশাল প্রাপ্তি। খারাপ হোক, ভালো হোক আমরা বাংলাদেশি গান নিয়েই থাকতে চাই। আমরা হিন্দি গানের পক্ষে নই। রিংটোন এবং ওয়েলকাম টিউন হিসেবে হিন্দি গানের বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, জায়গা কখনও শূন্য থাকে না। হিন্দি গানের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, বাংলা গান দিয়ে আমরা পূরণ করতে পারব।

এরই মধ্যে তাদের কাছে বাংলাদেশি জনপ্রিয় এবং নতুন গানের চাহিদা আসতে শুরু করেছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান, ঈদের আগে মোবাইলে নতুন রিংটোন এবং ওয়েলকাম টিউন সেট করার একটি ট্রেন্ড চালু হয়েছে আমাদের দেশে। এবার হিন্দি গানের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমরা বেশ চাহিদা লক্ষ্য করছি বাংলাদেশি গানের। 

জানা গেছে, আমাদের দেশে মূল্য সংযোজিত সেবা বা ভ্যাসের মার্কেট প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর মোট আয়ের ২ থেকে ৩ শতাংশ আসে এই ভ্যাস (কনটেন্ট- ওয়েলকাম টিউন, রিংটোন, ওয়াল পেপার ইত্যাদি। এর মধ্যে ইন্টারনেট অন্তর্ভুক্ত নয়) থেকে। ওয়েলকাম টিউন, রিংটোনের বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে হিন্দি গানের উপস্থিতি থাকায় ভ্যাস মার্কেট বড় হলেও বাংলাদেশ বড় বাজারের সুবিধা নিতে পারছিল না। কারণ এসবে হিন্দি গানের আধিপত্য থাকায় হিন্দি গান আনার নাম করে টাকা সব চলে যাচ্ছিল দেশের বাইরে। এবার অন্তত এসব ঠেকানো যাবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

দেশে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান অন মোবাইল কাজ করে বিভিন্ন মোবাইলফোন অপারেটরের টেকনিক্যাল পার্টনার বা সলিউশন প্রোভাইডার হিসেবে। যদিও আমাদের দেশীয় কনটেন্ট প্রোভাইডারগুলোর অভিযোগ অন মোবাইল গেটওয়ে হিসেবে কাজ করে। নিজেরা ভারত  থেকে কনটেন্ট না আনলেও তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। যদিও বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করেননি প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র রিজিওনাল বিজনেস ম্যানেজার রাশেদুল করিম। তিনি বলেন, আমরা কেবলই সেবা দেই। সেবার ধরন বোঝানোর জন্য তিনি বলেন, আমরা দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরকে রিংটোন এবং ওয়েলকাম টিউন তৈরি করে দেই। মোবাইল রেডিও সার্ভিসও প্রোভাইড করি। ধরা যাক, এটি প্রতিষ্ঠান আমাদের গান এনে দিল। অন মোবাইল সেটিকে রিং টোনে রূপান্তর করা, ওয়েলকাম টিউন তৈরি করা এবং সেগুলো অপারেটরের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে থাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ৮ থেকে ১০টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো সিপি হিসেবে ভারত থেকে হিন্দি গান, ভারতীয় চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের ছবি-সহ অন্যান্য কনটেন্ট এনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে থাকে। রিং টোন এবং ওয়েলকাম টিউনে হিন্দি গানের বিপুল চাহিদা থাকায় এসব কোম্পানি একের পর এক বাড়ছেই। সংশ্লিষ্টরা জানান, হিন্দি গান আনার নাম করে এসব প্রতিষ্ঠান আদতে আমাদের দেশ থেকে টাকা নিয়ে যায়। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কারণে এখন দেশের টাকা দেশেই থাকবে।

 

/এইচএএইচ/এফএ/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।