বিকাল ০৫:০৯ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

ঈদে সবুজ পাহাড়ের খোঁজে খাগড়াছড়িতে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জসিম উদ্দিন মজুমদার, খাগড়াছড়ি॥

ঈদ উপলক্ষে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে খাগড়াছড়ির পর্যটন স্পটগুলো। চারিদিকে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ পাহাড় ও আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় জীবন-সংস্কৃতির কারণে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এ জেলা। আর যোগাযোগের জন্য পর্যাপ্ত গাড়ির ব্যবস্থার পাশাপাশি পর্যটন স্পটগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলায় সবুজ পাহাড়ের ছড়াছড়ি। পাহাড়ের বুক ছিড়ে বয়ে যাওয়া চেঙ্গী, মাইনী ও ফেনী নদী খাগড়াছড়ি জেলাকে সাজিয়েছে অপরূপ সাজে জেলার সদর উপজেলার হর্টিকালচার পার্ক, আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা, হেরিটেজ পার্ক, মাটিরাঙার শতবর্ষী বটগাছ, রিছাং ঝর্ণা, মহালছড়ির মনারটেক লেক, দেবতার পুকুর, মানিকছড়ির বনলতা এগ্রো প্রাইভেট, পুরাতন রাজবাড়ি, পানছড়ির অরণ্য কুঠির, রামগড়ের কৃত্রিম লেক, চা বাগান ও দীঘিনালার হাজাছড়া-তৈদুছড়া ঝর্ণাসহ রয়েছে শতাধিক মনোরম পর্যটন স্পট।

খাগড়াছড়ির বেসরকারি হোটেল গাইরিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটক আকর্ষণের জন্য নতুন করে সাজিয়েছেন তার হোটেলকে। অতিথিদের জন্য স্থানীয় বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা রাখা হবে এই হোটেলে। কেউ চাইলে স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে উপভোগ করতে পারবেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও।

খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের ম্যানেজার বিএম ওমর ফারুক বলেন, খাগড়াছড়িতে ঈদের মৌসুমে হাজার হাজার পর্যটক আসে। এ জন্য নতুন করে সাজানো হচ্ছে সব কক্ষগুলো। তবে ঈদ মৌসুমে তাদের মোটেলে গড়ে ১৫০ জন থাকার ব্যবস্থা থাকলে গড়ে ১০০ থেকে ১২০জন দেশি-বিদেশি পর্যটক থাকে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য খাগড়াছড়ি অত্যন্ত চমৎকার জায়গা। যে কোনও পর্যটক একবার খাগড়াছড়ির নয়নাভিরাম সবুজাব পাহাড়ের দৃশ্য, চপলা ঝর্ণা, সর্পিল নদী, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্রময় জীবনধারা ও বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি উপভোগ করলে তিনি এ জেলায় বারবার আসবেন। তিনি সবাইকে বিভিন্ন দেশের পর্যটন স্থানগুলো ভ্রমণের আগে খাগড়াছড়ি ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মজিদ আলী জানান, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় তিন পোশাকধারীর পাশাপাশি ডিবি ও সাদা পোশাকে পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছেন। কোনও পর্যটক পুলিশ চাইলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।

খাগড়াছড়িতে যেসব উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পটগুলো হলো-

আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র

খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশ পথেই সবচেয়ে খাগড়াছড়ির বড় পর্যটন স্পট আলুটিলা। প্রায় হাজার ফুট উচুঁতে দৃষ্টি-নন্দন এই আলুটিলার শীর্ষে দাঁড়ালে শহর, চেঙ্গী নদীর সর্পিল গতিপ্রবাহ ও বিস্তৃত আকাশের মেঘমালা সবার মনকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। এখানে রয়েছে একটি রহস্যময় প্রাকৃতিক গুহা। পাহাড়ি পথ বেয়ে গুহার মুখ পর্যন্ত যেতে দর্শনার্থীদের এক সময় কষ্ট হলেও এখন জেলা পরিষদের অর্থায়নে পাকা সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে ২৬৬টি সিঁড়ি পেরোলেই গুহামুখ। গুহাটির ভিতরের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮২ ফুট। অন্ধকার গুহার ভিতরে মশাল নিয়ে ঢুকতে হয়। গুহার সৌন্দর্য ও ভেতরে শতশত বাদুড়ের উড়াউড়ির দৃশ্যও চোখে পড়ে।

হর্টিকালচার পার্ক

খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের ১ কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে হর্টিকালচার পার্ক। শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় বিনোদন ব্যবস্থার পাশাপাশি এখানে রয়েছে ঝুলন্ত ব্রিজ, কৃত্রিম লেক, সু-সজ্জিত ফুল ও ফলজ বাগান। ছায়া-সুনিবিড় এই পার্কে ও লেকে সব সময় দেখা যায় শতশত পাখি।

হেরিটেজ পার্ক

খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের সামনে চেঙ্গী নদীর অববাহিকায় জেলা আনসার ২০০৭ সালে গড়ে তোলে হেরিটেজ পার্ক। এই পার্কে গ্রামীণ অবয়বে রয়েছে ছোট-ছোট কুঠির। এসব কুঠিরে বসে চেঙ্গী নদীর প্রবাহ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়।

রিছাং ঝর্ণা

আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরেই রিছাং ঝর্ণা। মূলত রিছাং মারমা শব্দ। শব্দটি বিশ্লেষণ করলে রি অর্থ পানি আর ছাং শব্দের অর্থ ধারা বুঝায়। ছন্দে-ছন্দে প্রবাহমান হিম শীতল ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি যে কাউকেই কাছে টানবে। এর জন্য অবশ্য মূল সড়ক থেকে কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে যেতে হবে। রিছাং ঝর্ণায় যেতে ইতোমধ্যেই মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবেশ মুখে একটি গেটসহ পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কটি গোল ঘর। নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে পুলিশি চৌকি।

দেবতা পুকুর

মহালছড়ি উপজেলার দুর্গম নুনছড়ি মৌজায় অবস্থিত দেবতার পুকুর। সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১০০ ফুট উপরে পাহাড়ের চূড়ায় ৫ একর জায়গায় অবস্থিত এই পুকুরটি। পুকুরটির স্থিতিশীল স্বচ্ছ জলরাশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। পুকুরের চারিদিকে রয়েছে ঘন সবুজ বন। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস স্থানীদের পানি চাহিদা পূরণের জন্য জলদেবতা পুকুরটি তাদের উপহার দেন। প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিতে হাজারও নারী-পুরুষ পূর্ণ্য লাভের আশায় দেবতা পুকুর পরিদর্শনে আসেন।

ভগবান টিলা

মাটিরাঙ্গা উপজেলা থেকে সোজা উত্তরে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত ভগবান টিলা। জেলা সদর থেকে উত্তর পশ্চিমে এর কৌণিক দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কিলোমিটার। সবুজের বুক চিরে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলে দেখা যাবে এ টিলা। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এ টিলা সম্পর্কে স্থানীয়দের ধারণা, এ টিলার উপরে দাঁড়িয়ে ডাক দিলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা শুনতে পান। আর এ কারণেই এ টিলার নামকরণ ভগবান টিলা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর একটি আউট পোস্ট রয়েছে এখানে।

রামগড় চা বাগান

রামগড় সীমান্ত ঘেঁষে জেলায় প্রবেশের সম্মুখভাগে খাগড়াছড়ি-ফেনী আঞ্চলিক মহাসড়কের-সড়কের দুইধারে, ফেনীর নদীর অববাহিকায় অবস্থিত চোখ জুড়ানো চা বাগান, যা খাগড়াছড়ির পর্যটনশিল্পকে করেছে আরও বৈচিত্রময়। ভ্রমণপিপাসুদের স্বাগত জানাতে সদা প্রস্তুত সবুজ গালিচা বিছানো এ চা বাগান।

রামগড় লেক

জেলা সদর হতে ৫০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে রামগড় উপজেলা। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে ২০০১ সালে রামগড় উপজেলা পরিষদের সামনে খনন করা হয় লেকটি। হ্রদটি প্রায় ২৫০ মিটার লম্বা। এতে রয়েছে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি নৌযান। এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন, লেকটির চারপাশে রেলিং বাঁধানো আর ফুল বাগানে সজ্জিত। মাঝখানে রয়েছে সুদৃশ্য ঝুলন্ত সেতু। রয়েছে সুন্দর সুন্দর বাগান, সবুজ ঘাস, আধুনিক লাইটিং ও লেকে নামার জন্য শান বাঁধানো ঘাট। দুই তীরের উদ্যানে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য রয়েছে ১২টি শেড।

মানিকছড়ি রাজবাড়ি

চট্টগ্রাম থেকে সড়ক পথে খাগড়াছড়ি আসার প্রবেশমুখে মানিকছড়ি উপজেলা। উপজেলা সদরে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মানিকছড়ি রাজবাড়ি। রাজবাড়িতে রয়েছে মংসার্কেল চিফ (মংরাজা) এর রাজত্বকালীন বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। রাজার সিংহাসন, মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রত্নতাত্ত্বিক অনেক স্মৃতি বিজড়িত এ রাজবাড়ি।

মাটিরাঙ্গা শতাবর্ষী বটগাছ

মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদরের খুব কাছাকাছি আলুটিলা-বটতলী এলাকায় এ শতবর্ষী বটবৃক্ষটি ইতিহাসের সাক্ষী। ৫ একরের বেশি জমির ওপরে ছড়ানো এ গাছটি হাজারও পর্যটককে আকর্ষণ করেছে। মূল বটগাছটি থেকে নেমে আসা ডালপালা ও ঝুড়ি মাটিতে মিশে এক একটি নতুন বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। বটগাছটিকে ঘিরে আছে নানা কাহিনী। যেমন এটি রোগমুক্তির প্রতীক। মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কি.মি. উত্তরে অবস্থিত এ বটবৃক্ষের নামানুসারেই গড়ে উঠেছে বটতলী বাজার। গাছটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্কুল, মাদ্রাসা ও বাজার।

কিভাবে আসবেন

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির দূরত্ব ৩১৬ কিলোমিটার ও চট্টগ্রাম থেকে ১০৯ কিলোমিটার। ঢাকার কমলাপুর, সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান থেকে সরাসরি বাস রয়েছে খাগড়াছড়িতে। সেন্টমার্টিনের এসি বাস, এস আলম, সৌদিয়া, শান্তি পরিবহন ও শ্যামলী পরিবহনের যে কোনও একটি বেছে নিতে পারেন। চট্টগ্রাম থেকে আসতে হলে অক্সিজেন অথবা কদমতলী বিআরটিসি বাস টার্মিনাল যেতে হবে। অক্সিজেন থেকে রয়েছে শান্তি পরিবহন ও লোকাল বাস এবং কদমতলী থেকে বিআরটিসি। চট্টগ্রাম থেকে আসতে ভাড়া ১৮০ থেকে ২২০ টাকা।

পর্যটন স্পটগুলোতে কিভাবে যাবেন

খাগড়াছড়ি শহর থেকে এসব পর্যটন স্থানে যেতে কমপক্ষে ১০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। খাগড়াছড়ি থেকে আলুটিলা এবং রিছাং ঝর্ণায় আসা যাওয়ায় মাথাপিছু খরচ হবে ১০০টাকা,  মাটিরাংগার শতবর্ষী বটগাছ দেখতে গেলে মাথা পিছু ২০০ টাকা, মহালছড়ির দেবতা পুকুর দেখতে গেলে মাথা পিছু ৩০০টাকা, মানিকছড়ির রাজবাড়ি যেতে মাথাপিছু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, দীঘিনালার হাজাছড়া-তৈদুছড়া ঝর্ণায় অথবা রামগড়ে আসা-যাওয়ায় খরচ মাথাপিছু খরচ হবে ৪০০ টাকার মতো। এছাড়া অন্যান্য মনোরম পর্যটন স্পটগুলোতে আসা যাওয়ায় প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

কোথায় থাকবেন

শহরের প্রবেশমুখে চেঙ্গী নদীর তীর ঘেষে অবস্থিত পর্যটন মোটেলের ডবল রুম নন-এসি ১ হাজার ৫০ টাকা, ডবল এসি রুম ১ হাজার ৫০০ টাকা, ভিআইপি স্যুইট ২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়াও রয়েছে জেলা সদরের মিলনপুরে হোটেল গাইরিং ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হোটেল ইকোছড়ি ইন। সেখানে থাকা-খাওয়ার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। খাগড়াছড়ি বাজার এলাকার হোটেল আল-মাসুদ, হোটেল লবিয়ত ও হোটেল ফোর স্টারসহ অনেকগুলো হোটেলে থাকতে পারবেন সুলভে।

নয়নাভিরাম এসব দৃশ্য দেখতে আপনিও আসতে পারেন ঈদের আগে বা পরে।

/এমডিপি/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।