রাত ০১:১০ ; রবিবার ;  ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯  

নিঃসঙ্গ ঈদ যাপন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জাকিয়া আহমেদ।।

দরজায় দাঁড়িয়ে পর্দা সরিয়ে ‘রুমটা বেশ বড় তো’ বলতেই কেউ একজন বলে উঠলেন, ‘এটা বড় নয়, রুমে আসবাব কিছু নেই তাই বড় লাগছে দেখতে।’ কিছুটা চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে দেখা গেল তাকে। আগন্তুকে ভয় নেই তার, বরং আছে আগ্রহ। বলে যেতে লাগলেন, ‘আমার ঘরে কেবল বইভর্তি ব্যাগ, আর কিছু নেই। ঢুকবে ঘরে?’ প্রশ্নের মতো উত্তরটাও নিজেই দিলেন তিনি, ‘এসো, তোমাকে তুমি করে বলছি কিছু মনে করছো না তো!’ মাথা নেড়ে ‘না’ বলতে বলতে ঘরে ঢুকলাম তার।

রুমজুড়ে ব্যাগ আর টেবিলে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস। টেবিলের পাশেই চেয়ার। তিনি বিছানায় বসলে তার মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম। কিছু বলার আগেই চোখে পড়ল বিছানায় রাখা বইগুলোর ওপর।  কিছুটা অস্ফুট স্বরে বললাম, 'আমি কেন ইশ্বরে বিশ্বাস করি না'....হেসে পেছনে তাকিয়ে প্রথমে বই পরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সবার মতো তুমিও প্রথমে এই কাজটিই করলে।তোমাকে দেখে কেন যেন অন্যরকম লেগেছিল’, বললেন তিনি।

মুখে কিছু না বলে আবার হাসলাম।

তিনি যেন কথার ঝাঁপি খুলে বসেছেন আজ। বলে যেতে থাকলেন,  কলকাতার বিখ্যাত সাংবাদিক প্রবীর ঘোষের লেখা বই এটি। আমি আসলে বইটি খুব সময় নিয়ে পড়তে চাই। আমি যে ইশ্বরে বিশ্বাস করি না বিষয়টি কিন্তু তা নয়, তবে আমার কিছু প্রশ্ন আছে সেগুলোর উত্তর এখানে পাই কিনা তা দেখব বইতে।’

মুখটা হঠাৎ আরও মোলায়েম হয়ে উঠল তার, ‘আমি আসলে দীপাবলি হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শেষের দিকে দীপাবলির কিছু ভুল ছিল মনে হয়, সাতকাহন পড়ে বারবার তাই মনে হয়েছে।’ তার কথা শুনতে শুনতে উল্টেপাল্টে দেখছিলাম বইগুলো।

সুনীলের ‘মুহূর্তকথা’ আর ‘প্রথম আলো’, আনিসুল হকের ‘শুধু তোমার জন্য’, ‘রবীন্দ্ররচনাবলী’, যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’। 

এবার তার বই পড়ার আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম। একটু হেসে বললেন,  বই ছাড়া আর কে আছে নিঃসঙ্গ মানুষের ভালো বন্ধু?’

তার কথায় কিছুটা কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম, আপনি নিঃসঙ্গ?’ প্রশ্ন করতেই কেমন যেন শূন্য দৃষ্টিতে তাকালেন, মৃদু স্বরে জবাব দিলেন, ‘হুম, জীবনে না হতে পেরেছি কন্যা, না হতে পেরেছি বধূ না হতে পেরেছি মা।’ এরপর তাকে কী জিজ্ঞাস করব তার খেই হারিয়ে ফেললাম। গভীর কোনও বিষাদ হঠাৎ ছেয়ে ফেলল ঘরটা। তিনিই নীরবতা ভাঙলেন। বলতে থাকলেন, ‘আমার একটা সাজানো সুন্দর ফ্ল্যাট ছিল, একমাত্র বুকের ধন ছেলে ছিল। এখন তো আমার কিছুই নেই।’

জানা গেল, বিয়ের পর ১৫ দিন সংসার করেছেন তিনি। একটা প্রতারকের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। তার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বেরিয়ে আসেন। তিনি বলেন, ‘জীবন দিয়ে বুঝেছি দুনিয়াটা শক্তের ভক্ত নরমের যম। ১৭ বছর বয়স থেকে নিজেকে গড়েছি, ছেলেকে গড়েছি। সেই ১৫ দিনের সম্পর্কের ফল আমরা ছেলেটা, আমার বাবু।’

নিজের সংগ্রামের কাহিনী বলে যতে থাকলেন আবেগী কণ্ঠে, ‘ছেলের ৪১ দিন বয়সে পিয়নের কোলে তাকে দিয়ে আইসিডিডিআরবিতে ইন্টারভিউ দিতে ঢুকলাম। তারপর সেই পথ চলা আর থামেনি। ছেলের মেধা ছিল আর ছিল আমার চেষ্টা। কারও সহযোগিতা ছাড়া সীমিত পয়সায় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে ছেলেকে এমবিএ করিয়েছি। আমার সেই ছেলে, সেই বাবুর সঙ্গে গত ঈদে দেখা হয়েছিল পাঁচ বছর পর। তারপর থেকে আর দেখা হয়নি। আমি চাই ও ভালো থাকুক।’

বিষাদের ভার তখন ঘিরে ধরেছে আমাদের। আর কীভাবে তার সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া যায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এসময় চুপ করেই থাকতে হয়। তবে এবারও তিনি উদ্ধার করলেন, জানতে চাইলেন আমার সম্পর্কে। আমার সামনে তখন তার ভেজা চোখের অভিমান। এখনই যেন তা বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসবে।

আমি বের হতে চাইলে তিনি জানতে চাইলেন, ‘ঈদ কোথায় করেন আপনি?’ ঢাকায় জবাব দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম ‘আপনি?’ এ প্রশ্নের অপেক্ষায় যেন ছিলেন তিনি এতদিন, কিম্বা এতটুকু আন্তরিকতার, আর বাঁধ মানল না তার চোখ। কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘আমি কোথাও যাব না, কোনও ঈদ নেই আমার জীবনে, কোনও আনন্দে আমি নেই, আমার জন্য কোনও আনন্দ হয় না।’

নঅনেক সংকোচ নিয়ে তার নামটা জানতে চাইলাম।নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই পারো...লিখো আঞ্জুমান আরা। যখন ফিরে আসছি পেছন থেকে বললেন, আর একটা কথা লিখো, ‘অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলে  মেয়েদের মুক্তি নেই, সেই সঙ্গে দরকার সচেতনতা। নিজের অধিকারটুকু যেন মেয়েরা বুঝে নেয়।’

 

আগারগাঁওয়ের এই প্রবীণ ভবনে আসার আগে বেশ ভয়ে ছিলাম। সারা জীবন যারা সংসারে ছিলেন তারা কেমন করে এই বৃদ্ধ বয়সে সব ছেড়ে এখানে একা আছেন, কেমন করে কথা বলবো এসব একা মানুষের সঙ্গে। কিছু পরামর্শ নেওয়ার জন্য ফোন করলাম কাছের এক সাংবাদিককে। তিনি বললেন, আপু, ওখানে গিয়ে বলো না তুমি সাংবাদিক, ওনারা কিছুই বলেন না, অনেক সময় কষ্ট থেকে বকাও দেন, বলেন কী হবে লিখে আমাদের কষ্টের কথা।

 

ভবেন প্রবেশ করেই প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনিও একই কথা বললেন। তবে সঙ্গে করে একজন সহকারীকে দিয়ে বললেন আমাকে মাসুমা সিদ্দিকীর কাছে নিয়ে যেতে। বলে দিলেন, ইনি অনেক কিছু মনে করতে পারেন না, দেখেন কতোটুকু জানতে পারেন।

 

প্যাসেজ ধরে এগিয়ে যেতেই সহকারী বললেন, ওই যে বসে আছে মাসুমা সিদ্দিকী। গলায় একটা মোবাইল ব্যাগ, সাদা কালো চুল ছোট করে ছাঁটা। এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেই, বললেন চলো ঘরে যাই।

 

ছোট একটি রুম। একটি খাট, একটি টেবিল চেয়ার, একটি ফ্রিজ, একটি ওয়্যারড্রোব আর লম্বা একটি আয়না। টেবিলের ওপর থালা-বাটি গ্লাস, এক বাক্স ওষুধসহ একটি বড় ছবি যেখানে স্পষ্ট আভিজাত্য বিদ্যমান। দেয়ালে ঝুলছে দুজন কিশোরের সঙ্গে তার আরও একটি ছবি।

বাড়ি কোথায় দিয়ে কথা শুরু করি। জানতে পারি ফরিদপুর।

তাকর কাছে জানতে চাইলাম, আপনি তো অনেক সুন্দর ছিলেন,প্রেম করেছেন? বললেন,‘না, সে সুযোগ হয়নি তার আগেই বিয়ে হয়েছে।’ আমার পরবর্তী প্রশ্ন, কোথায় লেখাপড়া করেছেন? বললেন, ‘ভারতেশ্বরী হোমসে। ওখানে লেখাপড়া। পরে ওখানেই শিক্ষকতা করেছি। বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, মা শিক্ষক। ৪ ভাই ৪ বোন ছিলাম।’

থেমে থেমে এরপর নিজেই বলে যেতে থাকলেন তিনি, ‘দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মারা গিয়েছে, ছোট ছেলে নিউজিল্যান্ড থাকে, মেয়েটাও মারা গিয়েছে কয়েকদিন আগে। মেয়ের নাম ছিল মিলা। মিলাই এখানে আমাকে দিয়ে গিয়েছে। ছোট ছেলে খুব কম কথা বলে, ওর খুব রাগ আমার ওপর। ওর ধারণা আমি বদরাগী হওয়াতেই মিলা মারা গেছে। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ও আমাকে মাঝে মাঝে ফোনও করে কিন্তু কথা হয় না বেশি।’

টেবিলের ছবিটা কোথায় তোলা, জানতে চাইলে বলেন,  যুক্তরাষ্ট্রে, আমি ওখানে ২১ বছর ছিলাম। 

জানতে চাইলাম, এখানে থাকতে ভালো লাগে আপনার? তার অসহায় উত্তর, ‘ভালো লাগা না লাগার ব্যাপার না। এখানে থাকতে হয়, থাকতে হবে তাই থাকছি আর কিছু না।’

এরই মাঝে দুপুরের খাবার এলো, ভাত, মুরগি ভুনা আর ডাল। কথা বলতে বলতে কিছুটা হাঁপিয়ে গেলেন, খেয়ে শুয়ে পড়লে আমি বের হয়ে আসলাম নীরবে।

প্রবীণ নিবাসের এই ভবনের ছয় এবং সাত তলায় থাকেন পুরুষরা। কথা বলতে চাইলাম একজনের সঙ্গে। এড়িয়ে গিয়ে বললেন, আমি অসুস্থ একটু জিরিয়ে নিতে চাই। আমি ফিরে আসার জন্য পা বাড়াতেই বললেন, আপনাকে ঈদ মোবারক। আমিও তাকে ঈদ মোবারক বলে তাকে এবং নিজেকে মুক্তি দিলাম। মূল গেট দিয়ে বের হয়ে এলাম। পেছন ফিরে তাকালাম। কানে বাজছে মাসুমা সিদ্দিকীর কথা....আমি কোথাও নেই। 

/এসএস/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।