রাত ০৯:৪৫ ; মঙ্গলবার ;  ১৮ জুন, ২০১৯  

যশোরের দুইশ বছরের প্রাচীন ঈদগাহ

জামাতে অংশ নেয় ২০ হাজার মানুষ

প্রকাশিত:

তৌহিদ জামান, যশোর॥

প্রায় দুইশ’ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দয়ারামপুর ঈদগাহ। ঈদগাহের ভেতরে রয়েছে সারি সারি গাছ। তাই শামিয়ানা ছাড়াই ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে আদায় করতে পারেন ঈদের নামাজ। কেবল বাঘারপাড়া নয়, এই ঈদগাহে নামাজ আদায় করতে আসেন নড়াইল, মাগুরার শালিখা আর বাঘারপাড়া উপজেলার ৩০টি গ্রামের মানুষ।

দয়ারামপুর ঈদগাহ লাগোয়া সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আশরাফউদ্দিন জানান, ১৮১০ সালের দিকে এই ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তার দাদা পীরসাহেব ইউসুফ (রা.) এই ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই সময়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাপক আয়োজনে এখানে ঈদের জামাত আদায় হয়ে আসছে।

তিনি জানান, তার দাদা প্রথমদিকে ঈদের নামাজে ইমামতি করতেন। তার মৃত্যুর পর (১৯৪০ সালে) বড় ছেলে পীরজাদা আব্দুর রহিম ইমামতি করেছেন। উনার মৃত্যুর (১৯৬৫ সাল) পর ইমামতির দায়িত্ব পান তার ছেলে মওলানা শামসুদ্দিন। প্রায় ২৫ বছর আগে মওলানা শামসুদ্দিন ইন্তেকাল করেন। তারপর ছোটভাই মুফতি মওলানা ইমাদউদ্দিন দায়িত্ব পান। তিনি এখনও ইমামতি করছেন। মওলানা ইমাদউদ্দিন বর্তমানে ইতিকাফে রয়েছেন।

বাঘারপাড়া সদর থেকে প্রায় সাত কি.মি. আর নারিকেলবাড়ীয়া বাজার থেকে প্রায় এক কি.মি. দূরে অবস্থান এই শতাব্দী প্রাচীন ঈদগাহের। প্রায় তিন বিঘা (১০০ শতক) জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে ঈদগাহটি। এর উত্তরপাশে দয়ারামপুর সিদ্দিকিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, পূর্বপাশে একটি মসজিদ আর পশ্চিমপাশ ঘেঁষে চলে গেছে শেরশাহ সড়ক।

স্থানীয় ও পীরবাড়ি সূত্রে জানা যায়, ঈদগাহের জন্য জমি বরাদ্দ দেন সেই সময়কার বিশিষ্ট সমাজসেবক রাজেন্দ্রনাথ সাহা। তার দেওয়া জমির পরিমাণ ৩৩ শতক। স্থানীয় আরেক সমাজসেবক রহিম বক্স দেন ২৪ শতক এবং পীরসাহেব ইউসুফ (রা.) দান করেন ৪৩ শতক জমি।

স্থানীয়রা জানায়, নারিকেলবাড়ীয়া লাগোয়া মাগুরার শালিখা উপজেলার কাদিরপাড়া, গোবরা, হরিশপুর, দেয়াভাঙ্গা, হাজরাহাটি, ঝুনোরি, শতখালী, বাঘারপাড়ার ধলগ্রাম, বন্দবিলা ও নারকেলবাড়ীয়া ইউনিয়ন এবং নড়াইলের প্রায় ৩০ গ্রামের ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন।

এই ঈদগাহে ছোট বেলা থেকে নামাজ আদায় করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, আমার বাপ-দাদাও এখানে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। তিনি জানান, দয়ারামপুরের এই ঈদগাহ এলাকায় আগে অনেক আমগাছ ছিল। স্থানীয়রা সবাই ‘আমপোল’ হিসেবে চেনে। আর এখানকার পীরের নাম-ডাকও ছিল বেশ।

কথিত আছে, পীরজাদা আব্দুর রহিমের কাছে কয়েকজন মুরিদ আসেন ‘দাওয়াত’ নিতে। তখন প্রয়োজন হয় খাঁটি মধুর। কিন্তু মুরিদরা মধু পাচ্ছিলেন না। সেসময় তিনি মুরিদদের বলেন, একটি বাটি নিয়ে অদূরে থাকা একটি গাছের নিচে দাঁড়াতে। কিছু সময় পর ওইগাছে থাকা একটি মৌচাক থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে থাকে মধু।

পার্শ্ববর্তী জয়পুরের বাসিন্দা নারিকেলবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইমদাদ হোসেন জানান, তিনি প্রায় ৩৭ বছর ধরে এখানে নামাজ আদায় করেন। তার কাছে মনে হয় যেন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে নামাজ আদায় করছেন।

নারকেলবাড়ীয়া ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, ‘খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা এখানে বহু মানুষের উপস্থিতিতে নামাজ পড়ি।  কত বছর আগে এটি প্রতিষ্ঠা হয়, তা বলতে পারবো না। তবে, বাপ-চাচারা যা বলেন তাতে মনে হয় ১০০-১৫০ বছরের পুরনো তো হবেই।’

বাঘারপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান এই ঈদগাহটির প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে বলতে পারেন না। তবে তিনি বলেন, ‘এখানকার পীরবাড়ির খুব সুনাম, তারাই বহু বছর আগে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ঈদগাহটির মিনার ও গম্বুজের সংস্কার কাজ চলছে।’

ঐতিহাসিক এই ঈদগাহ সংস্কারে উপজেলা পরিষদ থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে বলে জানান তিনি।

/বিএল/এএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।