বিকাল ০৫:১৯ ; মঙ্গলবার ;  ২১ মে, ২০১৯  

এই পত্র আজ আমাকে লিখি || কবির হুমায়ূন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

শেষরাতে কোথা থেকে যেন রাজ্যের পেটব্যথা জড়ো হলে সে ব্যথাকে তাড়াতে মায়ের চেষ্টার অন্ত থাকে না। কখনো গরম শেক, কখনো ঘর থেকে বের করে ভোরের আলো ফোটার আগে উঠুনে নগ্নপায়ে হাটাতেন। ডাক্তার বলতে হরির চরের সোনা মিঞা ডাক্তার আর কবিরাজ বলতে রমেশ কবিরাজ। সোনা মিঞা ডাক্তারের কথা শুনলে ভয়ে প্রাণ আইটাই করতো। জ্বর হোক, পেটে ব্যথাসহ আর যে কোন উপসর্গই হোক, চিকিৎসা বলতে একটাই, ইনজেকশন লাগাও। আর রমেশ কবিরাজ মানে বোতল বোতল মিক্সার। বোতলের গায়ে ভিজে চুন লাগিয়ে শলা দিয়ে দাগ কেটে দিতেন। দিনে তিন অথবা চার বার। সেই মিক্সার দেখলে বিকট গন্ধে পেটের ব্যথা আরো বেড়ে যেত। অথচ উপায়ও নেই। খেতে হয় নিয়ম মেনেই। ডাক্তার কবিরাজে পেটের ব্যথা না কমায় জইল্লার মা (জলিলের মা) ভিক্ষা করতে আসলে মা তার উপর নির্ভর করেন। জইল্লার মায়ের অনেক গুণ। তিনি একদিকে ভিক্ষুক; অন্যদিকে দরবেশ এবং কবিরাজ। কুচকুচে কালো জটাধারী পানখাওয়া খয়েরী দাঁতের সঙ্গে জ্বলতে থাকা গজার মাছের লাল চোখ। সেই চোখের দিকে তাঁকালে পিলে চমকে উঠতো। পেট ব্যথা সারাতে মা আশ্রয় খোঁজেন জইল্লার মায়ের কাছে। তিনি আমার পেট উদুম করে চিমটি দিতে দিতে কি যেন মন্ত্রপড়ে প্রথমে থু থু ছিটান, পরে ফুঁ দেন। তাতেও পেটের ব্যথা না সারলে মায়ের উপর নির্দেশ জারি হয়; ফজরের নামাজের আগে আমাকে নিয়ে যেতে হবে জইল্লার মায়ের বাড়ি। সেখানে তিনি আসল চিকিৎসা দেবেন। নির্দেশ মতো খুব প্রত্যুষে মা আমাকে প্রায় ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে নিয়ে ছুটতে থাকেন জইল্লার মায়ের বাড়ি। 
এই দৃশ্যের পাশাপাশি আরও একটি দৃশ্য জড়ো হয়। বাশশা হাগল (বাদশা পাগল)। প্রায় সাড়ে ছয় ফিট লম্বা। এক সময় জাহাজে চাকরি করতেন। এলাকায় কতিথ আছে; আত্মীয়-স্বজন যাদের নামে তিনি টাকা পাঠাতেন তারা সব টাকা-পয়সা মেরে দেয়। সেই শোকে বাদশা মিঞা পাগল হয়ে জান। পরে প্রতিবেশিরা তার জায়গা-জমিও দখল করে নেয়। বাদশা পাগলের ঠাঁই হয় রাস্তার পাশে একটি জীর্ণ কুঠিরে। দিনভর সেই কুঠিরে অবস্থান করেন বাদশা পাগল। আর গুনগুন করে নিজের সম্পদের বর্ণনা দিতে দিতে নিজের সঙ্গে কথা বলেন। কখনো কখনো মৃদু স্বরে গালাগালের শব্দও ভেসে আসতো। কিন্তু তিনি কাউকে কখনো বিরক্ত করতেন না। সন্ধ্যার পর বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভাত ভিক্ষা করে খেতেন। বাড়ির দাওয়ায় এসে ভাত চেয়ে হাঁক দিয়ে অপেক্ষায় থাকতেন। আমরা ছোটরা ঘরে ঘরে গিয়ে ভাত তুলে সেই ভাত বাদশা পাগলের পাত্রে ঢেলে দিতাম। তখনো তিনি অনর্গল ইংরেজি এবং বাংলা মিশিয়ে নিজের সম্পদের কথা বলে যেতেন। পোস্ট অফিস থেকে কিভাবে তার টাকা পয়সা মেরে দেওয়া হয়েছে তার বর্ণনা দিতেন।
এই দুই দৃশ্যের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে ধানকাটা শ্রমিকদের এবং করাত শ্রমিকদের অনেকগুলো মুখ। বাগানের মধ্যেই মাচান করে লম্বা করাত দিয়ে গাছ কেটে তৈরি করা হতো প্রমাণ সাইজ কাঠ। আর দিনভর ধানকাটা শ্রমিকেরা সন্ধ্যার সময় বাড়িতে খেতে আসেন। মা তাদের জন্য শুকনো শিমের বিচির সঙ্গে গরুর মাংস মিশিয়ে রান্না করেন। শেষ খাবার হিসেবে দেওয়া হয় আমসত্ব দিয়ে তৈরি পায়েস। পেটভরে খেয়ে ডেকুর তুলতে তুলতে ধানকাটা শ্রমিকেরা বাড়ি ফিরে যান। তখন রীতিটা এমনই ছিলো। দিনভর যেসব শ্রমিক কাজ করতেন তাদের পারিশ্রমিকের পাশাপাশি খাওয়াতে হতো। অন্যদিকে মায়ের ব্যস্ততা কমে না। রাতভর ধানসিদ্ধ, ভোরে রোদ ফুটলে সিদ্ধ ধান রোদে মেলে দেওয়া এমন হাজারো কাজে মা শুধু ছুটতে থাকেন। ঘরের কাজের লোক রশিদ আর ফাতেমা সার্বক্ষণিক মায়ের নির্দেশ মেনে তাকে সহযোগিতা করেন। তার মধ্যে মা নিজ হাতে রান্না করছেন আমরা অনেকগুলো ভাইবোন এবং পরিবারের অন্যদের জন্যও। ডেকে এক সঙ্গে বসিয়ে খাইয়ে দিচ্ছেন। মোক্তব এবং স্কুলে পাঠাচ্ছেন। অসুস্থ হলে হাজারো কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের শুশ্রুষা করছেন। কিন্তু মা কখনো অসুস্থ হয়েছেন বলে মনে পড়ে না। মূলত শৈশবের কথা ভাবতে গেলে গুচিয়ে কিছু বলার আগে আমার চোখের সামনে এই দৃশ্যগুলো একটির পর একটি ভাসতে থাকে। 

দুই.
আবছা আবছা বুঝতে শুরু করার পর আমার সার্বক্ষণিক বন্ধু হয়ে উঠেন ওসমান কাকা। টুনি ফুফু, রেণু ফুফু এরা। অনেক ভাই-বোন থাকার পরও কারো সঙ্গেই আমার ভাব হয় না। বরং উল্টোটা হয়। বড় ভাই এবং বড় বোনদের আমি ভয় পাই। কি এক অদ্ভুত অণুশাসন জারি থাকায় বাবার সঙ্গেও আমার ভাব হয় না। একা একা বাড়িময় ঘুরে ঘুরে প্রজাপতি-ফড়িং এসবকে তাড়া করি। নির্ভরতা খুঁজে পাই ওসমান কাকা আর টুনি ও রেণু ফুফুর কাছে। স্কুলে যাবার আগে এদের সঙ্গেই মোক্তবে আমার হাতেখড়ি হয়। প্রতি ভোরে এদের সঙ্গেই মোক্তবে যাই। মোক্তব থেকে  ফিরে এলে মা অন্য ভাইবোনদের গরম ভাত খেতে দেন। আমি একা ঘরের পেছনে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকি। পেটের ভিতর রাজ্যের খুদা। কিন্তু আমাকে কেউ খেতে দেয় না। খাটের উপর বসে থেকে বুড়ো দাদি, যতোটা মৃদুস্বরে পারেন বলতে থাকেন— ও ছোড বউ, হোলাগা মোক্তবেরতাই আইছে। হিজ্জারে ভাত খাইতে দে। ছোট বউ সাড়া-শব্দ দেয় না। ছোট বউ তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছেন। আমার বুক ফেটে; চোখ ফেটে কাঁন্না পায়। ঘরের দাওয়া ছেড়ে বাড়ির দাওয়ায় চলে যাই। অনেকক্ষণ সময় পার করে ফিরে আসি। নিজেদের ঘরের দিকে যেতে সাহস হয় না। ভাই-বোনেরা ঠাট্টা করে তাড়া করে। 
দু’একদিনের মধ্যেই মা টের পেয়ে যান। কদিন হলো আমাদের বিশাল সংসার পৃথক হয়েছে। বাবা এবং চাচাকে পৃথক করে দিয়েছেন দাদি। ফলে দুই ঘরে আলাদা রান্না হয়। কি কারণে আমাকে ছোট চাচাকে দিয়ে দেওয়া হয় কখনো কাউকে জিজ্ঞেস করতে রুচিতে উঠেনি। মানে দাঁড়ালো পৃথক করে দেওয়ার সময় আমাকে দিয়ে দেওয়া হয় ছোট চাচাকে। ফলে আমার খাওয়া এবং থাকার ব্যবস্থাও হয় ছোট চাচার ঘরে। ভাইবোনদের সঙ্গে রীতিমতো আমার বিচ্ছেদ হতে থাকে। কিন্তু পেটের খুদার মীমাংসা হয় না। ছোট বউ শুধু ঘুমিয়ে থাকেন। আমার কখন খাবার লাগবে কিংবা কখন আমাকে খেতে দেওয়া উচিত এসবের তোয়াক্কা করেন না তিনি। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে নাকের জল চোখের জল এক করে দাদিকে ডেকে পাঠান। ফলে পরিস্থিতি দাঁড়ায় এমন; আমার আর ছোট বউয়ের ঘরে যেতে হয় না। সঙ্গে দাদিও ছোট বউয়ের ঘরে খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। ধীরে ধীরে আমিও ভিড়ে যেতে থাকি আপন ভাইবোনদের সঙ্গে। মোক্তব থেকে ফিরে মায়ের রান্না করা গরম ভাত খাই। খেয়েই ওসমান কাকার নেতৃত্বে বেরিয়ে পড়ি। বাগানে বাগানে ঘুরি। গাছে উঠতে শিখি। মাছ ধরায় পটু হয়ে উঠি। মাঠে গিয়ে ওসমান কাকার সঙ্গে গরুর ঘাস সংগ্রহ করি। 
ওসমান কাকা আমাকে ডাঙ্গুলি খেলতে শেখান, মার্বেল বাজি খেলতে শেখান, ঘুড়ি বানিয়ে উড়াতে শেখান। বাগানে বাগানে ঘুরে কোথায় জামরুল, কোথায় গোলাপজাম, কোথায় ডুমুর, কোথায় ডেউয়া, কোথায় কাউ  ইত্যাদি পাওয়া যায় দেখিয়ে দেন। পাখির বাসা থেকে কিভাবে ডিম পেড়ে আনতে হয় তাও শিখিয়ে দেন। কিন্তু কিছুতেই বাঁশি বাজানো শিখাতে পারেন না। ওসমান কাকা ভারি মিষ্টিসুরে বাঁশি বাজান। যতোই আমি বাঁশিতে ফুঁ দেই আঙ্গুল উঠানামা করি ভে-ভোঁ করে বেসুরা সুর বের হয়। ওসমান কাকা বিরক্ত হয়ে বিরতি টানের। আমি মুগ্ধ হয়ে ওসমান কাকার বাঁশি বাজানো শুনি। মাঝে-মাঝে ওসমান কাকা অন্য ছেলেদের ডেকে পয়সা বাজি খেলেন। আমার কাছে পয়সা না থাকায় খেলতে পারি না। পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি। কোন কোন দুপুরে পুকুর থেকে গোসল করে ফিরলে ওসমান কাকা আমাকে এবং টুনি ফুফু ও রেণু ফুফুকে ডেকে ছক্কা খেলতে বসেন। 
কিন্তু এসব সুখের দিন বেশিকাল প্রলম্বিত হয় না। একদিন মিয়া ভাই অর্থাৎ ওসমান কাকার বাবা তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে প্রচণ্ড পেটান। অপরাধ একটাই; ওসমান কাকাকে কিছুতেই স্কুলে পাঠানো যায় না। স্কুলে দিয়ে আসলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই পালিয়ে চলে আসেন। কিংবা গরম ভাত খেয়ে স্কুলে যাওয়ার নাম করে আমাদের নিয়ে বাগানে বাগানে ঘুরে বেড়ান। খুবই বর্বর কায়দায় ওসমান কাকাকে শাসন করা হলে তিনি আরও উগ্র হয়ে উঠেন। ফলে ঘর থেকে আমার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয় ওসমান কাকার সঙ্গে যেন আর না মিশি। ভাই-বোনেরা যে যার মতো করে লেখাপড়া, স্কুল নিয়ে ব্যস্ত। আমি বাড়ি, বাড়ির আড়া, পুকুরঘাট ইত্যাদি একা একা ঘুরে বেড়াই। মায়ের কাছে যাওয়ার উপায় নেই। তিনি সর্বক্ষণ কোন না কোন কাজে ব্যস্ত। 

তিন.
এক সময় দেখা যায়, দাদির সঙ্গে আমার খুব খাতির হতে থাকে। পাড়ার দোকানে নৌকা বিস্কেট দেখেছি। ওই বিস্কেটের প্রতি লোভ জন্মায়। দাদিকে সে কথা বললে দাদি কিছু পয়সা দেন বিস্কেট কিনে আনতে। কিনেও আনি। কিন্তু সে বিস্কেট আর খেতে ইচ্ছে করে না। ঘরের পাশে জবা ফুল গাছের নীচে নিজে নিজে কলাপাতা দিয়ে একটা ঘর বানাই। সে ঘরে বিস্কেট-বিস্কেট খেলা খেলি। অল্প সময়ের মধ্যেই বৃষ্টি নেমে সেই ঘর ভাসিয়ে নেয়। দাদির পর আমার ভাব জমতে থাকে দরবেশ জেঠার সঙ্গে। দরবেশ জেঠা আমাদের দাদার পালিত পুত্র। দাদাকে আমরা ভাই-বোনেরা কেউ দেখি নাই। তার আলাদা ঘর আছে। সেই ঘরে তিনি একা থাকেন। সময় হলে পাঁচ বার লাঠিতে ভর দিয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েন। বাকি সময় ঘরের মধ্যে ইবাদত করে কাটান। আমি আস্তে আস্তে দরবেশ জেঠার সঙ্গে মিশতে থাকি। তিনি আমাকে অনেক গল্প বলতে থাকেন। সেসব গল্প শুধুই মাছ শিকারের। দরবেশ জেঠার পুরো যৌবন কেটেছে মাছেদের পিছু পিছু তাড়া করে। কোঁচ দিয়ে ধানক্ষেতে মাছ শিকারের গল্প রীতিমতো রোমহর্ষক। কিংবা হরিদাস দিঘিতে কিভাবে দেও হয়ে যাওয়া গজার মাছটি শিকার করেছিলেন তাও এক অনন্য সাধারণ গল্প।
দরবেশ জেঠার পাশাপাশি মিঞা ভাইও আমার প্রিয় হয়ে উঠেন। বাড়ির অন্য কেউ খুব প্রয়োজন না হলে মিঞা ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন না। তিনিও কথা বলতে পছন্দ করেন না। খুবই মেজাজি মানুষ। সবাই তাকে ভয় পায়। ওসমান কাকাকে যেভাবে শাস্তি দিলেন তার থেকেই নমুনা পাওয়া যায়। দুপুরে পুকুর ঘাটে গোসল করতে গেলে মিঞা ভাইয়ের সঙ্গে আমার সময় মিলে যেতে থাকে।  তিনি আমাকে ছোট মিঞা ডাকতে থাকেন। টুকটাক কথা বলেন। খাবার-দাবার ঠিকভাবে করছি কি-না খোঁজ-খবর নেন। এসবের মধ্যেই আওড়াতে থাকেন ফার্সি কবিতা। আমি কিছুই বুঝতে পারি না। কখনো কখনো তিনি সুর করে বাংলাও করে দেন। তাতেও আমি বুঝি না। কোনভাবেই বুঝারও কথা নয়। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি, এরপর যতোদিন তিনি বেঁচে ছিলেন, এবং যতোবার তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে ততোবার তিনি আমার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলেছেন। ফার্সি কবিতা আওড়ে বাংলা তর্জমা করে বুঝিয়েছেন। সবার দৃষ্টিতে এই কঠিন-হিংস্র মানুষটার ভিতরে ছিলো আশ্চর্য কবিতা পাগল এক মন। আবার বাড়ির অন্য ঘরে থাকেন বড় ভাই। তিনি সুপুরির ব্যবসা করেন। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষ করে ঘরের দাওয়ায় বসে কোরআন তেলাওয়াত করেন। তেলাওয়াত শেষে সকালের নাস্তা করে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে সুর করে গলা ছেড়ে পড়তে থাকেন পুঁথি। প্রচলিত পুঁথির বাইরেও তিনি সমসাময়িক বিষয় নিতে স্থানীয় পুঁথিকারদের রচিত পুঁথি বাজার থেকে কিনে এনে সুর করে পড়তেন। পরে বুঝেছি, বড় ভাইয়ের বিনোদন বলতে এই পুঁথিপাঠ করা ছিলো।

চার.
আমার সুখের দিনগুলো আর ডানা মেলতে পারে না। মোক্তব থেকে ফিরে গরম ভাত খাওয়া শেষ হলেই আমার দিনভর স্বাধীনতা শুরু। বাবাকে কখনো সকালে আমাদের সঙ্গে বসে খেতে দেখিনি। তিনি সমাজের কর্তাব্যক্তি। অনেক কাজ। অনেক দেন-দরবার। সম্ভবত মায়ের উপর নির্দেশ জারি করা ছিলো মোক্তব থেকে ফিরে গরম ভাত খেয়ে আমি যেন আর স্বাধীন হয়ে যেতে না পারি। ভাত খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই বাবা এসে হাজির। মাকে বললেন; ওকে তৈরি করে দাও। মা আমাকে জামা-কাপড় পরিয়ে দিলে বাবা আমার হাত তার হাতের মুঠোয় নিয়ে হনহন করে হাটতে থাকেন। সেই হাটা থামে ফতেপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে গিয়ে। প্রধান শিক্ষকের হাতে আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে বাবা আবার তার কাজে চলে যান।
স্কুলের প্রতি ভীতি কিংবা প্রেম কিছুই আমার জন্মায় না। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে আমার জন্য নতুন বই নিয়ে আসা হয়। তার আগে অবশ্য বড় বোনদের এবং ভাইয়ের গৃহ শিক্ষক আনোয়ার উল্লাহ আমাকে স্লেটে বর্ণমালায় হাতে খড়ি দিয়েছিলেন। সেই কৈশরে লেখাপড়ায় আমার বিশেষ কোন প্রেম ছিলো বলে স্মরণে আসে না। খুব যে পড়তে চাইতাম তাও না। মাঝে-মাঝে আমার লেখাপড়া নিয়ে মা কিংবা বড় বোন এবং ভাইয়ের উৎকণ্ঠা দেখলে দাদি খুব রাগ করতেন। বলতেন, এই বলে রাখলাম; একদিন তোমরা ওর হাত থেকে বই কেড়ে নিয়ে ওর পড়া বন্ধ করবে। একদিন পড়তে চাইতাম না বলে মা, বড় বোনেরা এবং বড় ভাই খুব রাগ করতেন। এখনও তারা রাগ করেন; তবে এই রাগ আমার হাত থেকে বই নামানোর জন্য।

পাঁচ.
স্কুল শুরুর প্রথমদিন যে বিষয়টা নজরে পড়লো; হেড মাস্টার মশায় অন্যান্য শিক্ষকদের ডেকে আমাকে দেখিয়ে বলে দিলেন এটা সেকান্দার চেয়ারম্যানের ছোট ছেলে। কেন বললো, কোন উদ্দেশে বললো আমি জানি না। তবে স্কুলের অণুশাসন মেনে চলেছি, সেটাও মনে পড়ে না। বরং মনে পড়ে আমিও বাড়ি থেকে স্কুলের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে কোনও বাড়ির আড়ায় বইগুলো একপাশে রেখে বিরতি মেনেছি। বসে বসে চোখ বন্ধ করে নানা বাড়ি কিভাবে যেতে হয়; তার বর্ণনা দাঁড়িকমাসহ বলে গেছি। আমাদের দাদা শ্রী আবদুল মজিদ আমাদের ভাইবোনদের জন্মের আগেই ইহলোক ত্যাগ করেছেন। শ্রী বললাম এ কারণে, আমাদের বাড়িতে এখনো মেজবানির রান্না করার জন্য পিতলের যে বিশাল বিশাল ডেকছি রয়েছে তাতে খোদাই করা দাদার নাম শ্রী আবদুল মজিদ। একইভাবে আমাদের নানা মাওলানা জোবায়েদ উল্লাহ ও মারা গেছেন আমাদের জন্মের আগে। তিনি তখনকার হিন্দোস্তানের দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে পাশ করা মাওলানা ছিলেন। আমাদের মামা নেই। আবার দাদা কিংবা নানার স্মৃতিও নেই। ফলে অন্তত আমার কিশোর মনে নানা বাড়ির জন্য এক ধরণের হাহাকার ছিলো। তো স্কুলে যাওয়ার পথে কোনও পুকুরের জলের উপর হয়তো নুড়ে পড়া হিজলের গাছ আমার চোখে পড়লো, স্কুলে যাওয়ার পথ পরিবর্তন হয়ে গেলো। ঝুমকার মতো হিজলের ফুল আমাকে ভীষণ টানে। জলের উপর ঝরে পড়া হিজল ফুলের কার্পেট এখনো আমার ভালো লাগে। এখনো আমি থমকে দাঁড়াই। একদিন স্কুলে যাবার পথে হিজল গাছে উঠতে গিয়ে ডাল ভেঙ্গে জলে পড়ে যাই। সেই অবস্থায় বাড়ি ফিরে এলে মা আমার দিকে তাকিয়ে একটি কথা না বলে হেসে দিয়েছিলেন। ঠিকই বুঝে নিয়েছেন আমার বাঁদরামির কথা। তবে মা সম্ভবত এ কারণে খুশি হয়েছিলেন, ভিজে জামা-কাপড় নিয়ে পথে পথে না ঘুরে বাড়ি ফিরেছি।
সম্ভবত তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় কানন দিদি প্রায় আমাদের বাড়ি আসতে থাকেন। কানন দিদি আমার সেজো বোনের বান্ধবি। হাই স্কুলে পড়েন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। কানন দিদি জাত হিসেবে শীল। হিন্দুরা যেভাবে জাত মানেন, আমাদের ঘরে আমার মায়ের মধ্যে কখনো সেসব দেখিনি। সেজো বোনের সঙ্গে কানন দিদি আমাদের বাড়ি এলে মা তাকে আমাদের সঙ্গে একত্রে খেতে দিতেন। এতো মিষ্টিমুখ দ্বিতীয়টা আজ পর্যন্ত আমি দেখিনি। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি সেজো বোন বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছেন। অন্য ঘরে আলেয়া ফুফুও ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছেন। মা নিঃশব্দে কাজ করে চলেছেন। কিন্তু চোখে জল। আলেয়া ফুফুও কানন দিদির বান্ধবি। কিছুই বুঝতে পারছি না কি হলো। রেণু ফুফুকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম; কি হয়েছে। রেণু ফুফু খুব সহজে জানালো কানন দিদি গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ মরে গেছে। আমার কি হয়েছে জানি না; আমি ঘর থেকে বের হয়ে দৌঁড়াতে থাকি কানন দিদিদের বাড়ির দিকে। কিন্তু তার আগেই চিলতখলায় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। কানন দিদি আমার কিশোর মনের অসাধারণ এক শুভ্রতার প্রতীক। আমার অসংখ্য কবিতায় কানন দিদির কথা আছে। এখনো কানন দিদির মুখ আমার হৃদয়ে ভেসে উঠলে চোখ ভরে যায় জলে। কানন দিদি কেন আত্মহত্যা করলেন, কিংবা কেন মানুষ গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করে সেসব কিশোর আমার বুঝার কথা নয়। কিন্তু কিশোর আমি কেন তার আত্মহত্যার কথা শুনে দৌঁড়ে তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম তাও জানি না। বড় হয়ে পরে জেনেছি, কানন দিদির বাবা ছিলো না। ভাইদের সংসারে থেকে বড় হচ্ছিলো। দরিদ্র পরিবার। ভালো একটা সম্বন্ধের প্রস্তাব আসায় ভাইয়েরা চাইছিলো কানন দিদিকে বিয়ে দিতে। কিন্তু কানন দিদি চাইছিলেন লেখাপড়া করতে। ভাইয়েরা কানন দিদির কথা না শোনায় কানন গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করলেন। আর কিশোর আমি সেই নিষ্ঠুর কানন দিদির স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছি প্রায় চল্লিশ বছর। তৃতীয় শ্রেণীর এই কিশোর আমাকে কানন দিদি বয়েস বাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।
ঠিক তার কিছুদিন পর কানন দিদির ক্ষত আমার মন থেকে মুছে দিতে শুরু করে কাজল। কাজল আমাদের স্কুলে নতুন আসা বিজ্ঞানের শিক্ষকের কন্যা। আমাদের শ্রেণীতেই পড়ে। কাজল এবং নতুন শিক্ষকের ভাষা, পোশাক-আশাক সব কিছু আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শহর থেকে বিজ্ঞানের শিক্ষক বদলি হয়ে আমাদের স্কুলে এসেছেন। সঙ্গে পরিবারও নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সত্যি জানি না কেন তারা শহর ছেড়ে অজপাড়া গায়ে গিয়েছিলেন। কাজলের সঙ্গে আমার বেশ ভাব জমে উঠেছিলো। কাজলের বাবা মানে আমাদের বিজ্ঞানের শিক্ষক আমাকে স্নেহ করতেন। স্কুল থেকে একটু দূরে কাজলরা থাকতো। মূল সড়ক থেকে কাজলরা যে বাড়িতে থাকতো সে বাড়িতে যেতে খালের উপর একটি সাঁকো ছিলো। স্কুল ছুটি হলে মাঝে মাঝে আমি ঘুর পথে কাজলকে সাঁকো পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বাড়ি যেতাম। হঠাৎ কদিন কাজল আর স্কুলে আসে না। বিজ্ঞানের নতুন শিক্ষকও স্কুলে আসেন না। কাকে কি জিজ্ঞেস করবো? করিওনি। তারো কিছুদিন পর জানতে পারি নিউমোনিয়া হয়ে কাজল মরে গেছে। কিন্তু কানন দিদি কিশোর আমাকে যেভাবে উদ্ভ্রান্ত করে দিয়ে গিয়েছিলেন; কাজল করে দিয়ে গেছে নিঃসঙ্গ এবং শান্ত। চল্লিশ বছর ধরে এই কাজলও ঘুরে ফিরে আমার কবিতায় বার বার আসে। পরপর ঘটা এই দুটি ঘটনা আমার কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। কিছুতেই এখন আর কাজলের মুখ স্মরণে আনতে পারি না। অথচ কানন দিদির মুখখানা; আহা অপূর্ব সেই মুখখানা এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। চল্লিশ বছর পরও অবচেতনে আমিও কানন দিদি এবং কাজলকে খুঁজে বেড়াই। এখনো গ্রামের বাড়িতে গেলে মনে হয়; এই বুঝি কানন দিতি এসে খলবলিয়ে হেসে ঘরখানাকে মুখরিত করে তুলবে।

ছয়.
কোন কিছুই মন থেকে সম্পূর্ণ মুছে যায় না বলে, প্রায় আমি ঠাট্টা করে একটা কথা বলি, কিছুই আমি মনে রাখি না। প্রকৃত অর্থেই এতোকিছু মনে রেখে জীবন বয়ে নেওয়া অনেক কষ্টের। কিন্তু লিখতে বসে দেখি, সেই কিশোর কালের এতো এতো কথা স্মৃতিতে জমা হয়ে আছে; প্রকৃত অর্থে কিছুই ভুলিনি। আবার সবকথা লেখাও শোভন নয়। জন্মের পর থেকে জানি; অন্য ভাইবোনদের তুলনায় মায়ের স্পর্শে আমি খুব অল্প সময় কাটিয়েছি। আমার জন্ম হয়েছিলো বৃষ্টিমুখর মধ্যরাতে। তখন মায়ের শরীরে জলবসন্ত। ফলে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে আমাকে মায়ের স্পর্শ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। অর্থাৎ যে মা আমাকে গর্ভেধারণ করেছিলেন; জন্মগ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে দাই মায়ের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়। জন্মের প্রায় দেড়মাস পর আমি ফিরে আসি মায়ের কাছে। আবার অন্যান্য ভাই বোনেরা প্রায় সকলেই মায়ের আঁচল ঘিরে বেড়ে উঠলেও আমাকে খুব ছোট বেলায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দেওয়া হয় লেখাপড়া করতে। কিন্তু মা-অন্ত হয়েই আমি আছি; থাকি। মায়ের অপমান-অসম্মান কিছুতেই সহ্য করি না। সেই কিশোর বেলায় প্রায় প্রতি বছর আমাদের বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য উৎসব লেগে যেতো। আমার বড় জেঠা রাষ্ট্রদূত হওয়ায় বছরে তিনি একবার দেশে ফিরলে কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি যেতেন। তিনি সাধারণত বর্ষকালে গ্রামের বাড়ি যেতে পছন্দ করতেন। জেঠা বাড়ি গেলে আত্মীয়-স্বজন সকলে হুমড়ি খেয়ে পড়তো। অন্তরালে আমার মাকে সবকিছু সামাল দিতে হতো। 
জেঠা বাড়ি গেলে দুতিনটি নৌকা ভাড়া করে সবাই ঘুরে বেড়াতো। কিন্তু এসব আমার ভালো লাগতো না। ভালো লাগতো না মায়ের কারণে। সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে, আনন্দ-উৎসবে মেতে আছে; অথচ মায়ের নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। অক্লান্ত-অভিযোগহীন সকলের খাবারের ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন এক হাতে। সবাই রান্নার প্রশংসা করে যাচ্ছেন, কিন্তু কেউ খোঁজ নিচ্ছেন না আমার মা খেয়েছেন কি-না। এই যে জীবনের বৈপরীত্য; এই যে মানুষের উদাস নিষ্ঠুরতা এইসব আমি খুব কৈশর কাল থেকে রপ্ত করে ফেলি। একা হয়ে পর্যবেক্ষণ করি পরিবারের নিষ্ঠুরতা; নির্দয় মানসিকতা। কিন্তু কৈশরে ওই অভিজ্ঞতাগুলো না হলেই মনে হয় ভালো হতো। ভালোবাসাও আছে।
মুক্তিযোদ্ধা আমার বাবা নিজের বাড়িতে বাঙ্কার বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। সময়ে সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা সেই বাঙ্কারে এসে আশ্রয়ও নিতেন। সেই বাবাকে ধরে নিয়ে যায় রাজাকার বাহিনী। তাদের ক্যাম্পে নিয়ে বাবাকে জবাই করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশ কার্যকর করার মুহূর্তে কোথা থেকে অন্য এক রাজাকার ছুটে এসে বাবাকে জবাই করতে দেয় না। মৃত্যুর একসুতা দূর থেকে বাবা ফিরে এসেছিলেন। একে আমি কি বলবো? করুণা! মোটেও না। আমার বাবা কারো করুণার প্রত্যাশি ছিলেন না কখনো। অনেক পরে শুনেছি; বাবা ফিরে এলে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেছিলেন; মৃত্যুর ওই মুহূর্তে আপনার কার কথা মনে পড়েছিলো। বাবা দ্বিধাহীন তার অতি আদরের এক কন্যার কথা বললে; সবার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। আমার রাষ্ট্রদূত জেঠারও হয়েছিলো শুনেছি। বাবাকে বিদ্রুপও করেছিলেন এই জন্য তিনি। সে কথাও পরে শুনেছি। কিন্তু আমি আমার বাবাকে, কৈশরের বাবাকে স্যালুট জানাই সত্য বলার জন্য। মেকি কথা না বলার জন্য। এভাবে ভালোবাসায়; ঘৃণায়; দ্বিধায়; ঝড়তায়; অবহেলায়; স্নেহে; হাহাকারে; শ্রদ্ধায় একটু একটু করে আমি গড়ে উঠতে থাকি।

 


কবির হুমায়ূন : কবি, গদ্যকার ও সাংবাদিক। বাংলাদেশ।              

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।