দুপুর ০২:৩৫ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

এক পকেটে শৈশব || হামীম কামরুল হক

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বড় হয়ে যে গল্প-উপন্যাস লিখতে শুরু করবো, এর কিছু লক্ষণ মনে হয় ছোটবেলায় দেখা দিয়েছিল। আমি যেমন আঁকাআঁকিতে ভালো ছিলাম। আজো ছেলেবেলা বন্ধুরা দেখা হলে আমার সেইসব আঁকার কথা জিজ্ঞাসা করে। জানতে চায়, এখনো স্কেচ করি কিনা। বর্তমানের বিখ্যাত শিল্পী ঢালী আল মামুন অল্প কিছু দিনের জন্য আমাদের সিলেট ক্যাডেট কলেজে ড্রইং শিক্ষক হিসেবে এসেছিলেন। একটা কি দুটো ক্লাস নিয়েছিলেন। প্রথম ক্লাসে কী একটা আঁকার অনুশীলনী দিলেন। আমার আঁকা দেখে তার মন্তব্য ছিল, রেখার ওপরে আমার নাকি ভালোই দখল আছে। স্কুল জীবনের পুরোটা সময়ই মেতে ছিলাম ওই আঁকাআঁকি নিয়ে। ফিগার ড্রইং পারতাম মনে হয় সবচেয়ে বেশি। বন্ধুরা আমাকে নিয়ে নরনারীর মিথুনমূর্তিও আঁকিয়ে নিয়েছিল। আমার নিজেরও প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকার চেয়ে মানব-শরীর আঁকার দিকে ঝোঁকটা বেশি ছিল। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো মানুষের মুখ আঁকতে। আমার নিজের কোনো বোন নেই, তাই আমার কল্পিত বোনের স্কেচ করেছিলাম কোনো একসময়। অনেক জনের মুখের স্কেচ করেছিলাম, কখনো স্রেফ মনে মনে, কখনো ফটো থেকে। এবং সেটা কোনো মাপজোখ ছাড়া। একটা লুকানো ইচ্ছা ছিল আর্ট কলেজে পড়ব। পরে পরিস্থিতি এমন জটিল হয়ে গিয়েছিল যে আর আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া হল না। তার বদলে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়লাম। এজন্য নিজেকে যারপরনাই সৌভাগ্যবান মনে করি। এখন তো হাজার বার মনে হয়, ভাগিস্য সাহিত্য নিয়ে পড়েছিলাম। যখন কেউ বলেন, ‘‘সত্য এখন সাহিত্য ছাড়া আর কোথাও নেই’’— তখন আরো বেশি করে কথাটা মনে হয়। বলা বাহুল্য সেই সাহিত্য যদুমধুদের বাজার মাত করা সাহিত্য নয়, বাল্মীকি-বেদব্যাস-হোমার থেকে হোর্হে লুই বোর্হেস বা বিভূতিভূষণের মতো লেখকদের নির্মিত সাহিত্য। 

নিজে যখন সাহিত্যের জগতে পা ফেলেছি, তখন জানলাম যার পকেটে শৈশব নেই, প্রতিভার নদীতে তার সাঁতার না দেওয়াই ভালো। শ্যামল গাঙ্গুলির এ রকম একটা কথার সঙ্গে মেলে ঋত্বিক ঘটকের একটি কথার। পুনে ফিল্ম ইন্সিটিটিউটে পড়াতে এসে তিনি একদিন বলেছিলেন, যে, যারা শিল্প করতে চায়, তাদের দু পকেটে দুটো জিনিস থাকা লাগবে। এক পকেটে শৈশব; অন্য পকেটে দারু। ক্লাসের প্রায় সবাই মনে করল দারু মানে মদ। তাই সেদিন থেকে আচ্ছাসে মদ খেতে শুরু করল অনেকে। মদ খেয়ে বেহুশ হয়ে ইন্সিটিটিউটের এখানে ওখানে পড়ে থাকতে শুরু করল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। জানা গেল, তাদের এই মাতলামির পেছনে আছে গুরু ঋত্বিকের ওই কথা— শিল্প করতে হলে দারু থাকতে হবে। ঋত্বিককে বিষয়টি জানানো হলে, তিনি পরে শিক্ষার্থীদের বললেন, আরে এই দারু মানে তরল দারু নয়, এ হল প্যাশান, সৃষ্টির নেশা। শিল্প করতে হলে ওই প্যাশান থাকা চাই। 
শ্যামল-ঋত্বিক— দুজনের এই যে শৈশবের প্রতি পক্ষপাত— তা জানার বহু আগেই তো আমার শৈশব পার হয়ে গেছে। আর কেউ তো এটা ছোটবেলাতেই ঠিক করে নেয় না যে, আমাকে যে করে হোক একটা সমৃদ্ধ শৈশব কাটাতে হবে। হতে পারে সে-শৈশব তিক্ত, কিন্তু বৈচিত্র্যময় বা মধুর বা আনন্দময়। —এমনটা কেউ ঠিক করে নিয়ে তো শৈশব যাপন করতে পারে না। কারণ শৈশব তো সেই সময় যখন নিজের পক্ষে কোনো কিছু ঠিক করে নেওয়া সম্ভব নয়। জন্মের পর থেকে বয়োসন্ধির আগের সময়টাকেই শৈশব বলতে চাই। বাৎস্যায়ন বলেছিলেন, ‘আ ষোড়শাদ্ ভবেদৃ বালো যাবৎ ক্ষীরানুবর্তকঃ। মধ্যম সপ্ততি যাবৎ পরতো বৃদ্ধ উচ্যতে॥’ অর্থাৎ ষোল বৎসর বয়স পর্যন্ত বালক বলা হয়, সত্তর বৎসর বৎসর বয়স পর্যন্ত মধ্যম এবং তার পর বৃদ্ধ। সেদিক থেকে বাল্যকাল ষোল বছর পর্যন্ত এবং শৈশবের সময়টা এর ভেতরে পড়ে। আধুনিক সময়ে আঠারো বছর পর্যন্ত মানুষকে শিশু বলা হয়। এই নিয়ে নানান মত থাকতেই পারে। আমার তো মনে হয় জীবনের প্রথম বারো বছরই আসল শৈশব। পরের মধ্যশৈশব এবং উত্তরশৈশবকাল গিয়ে ঠেকেছে আঠারো পর্যন্ত, ততদিনের শরীর ও মনে অনেক ওলটপালট ঘটে যায়, পরিবেশ পরিস্থিতিতে পড়ে বা নিজের ইচ্ছায় অনেক কিছু ঘটে। প্রথম প্রেম থেকে কারো কারো ক্ষেত্রে এখন তো নানান রকমের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যৌন অভিজ্ঞতাও পাওয়া হয়ে যায়। কিন্তু বারো, আরো নিশ্চিত করে বললে, দশ বছর পর্যন্ত সেই সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হয় না। তাই দশ কি সর্বোচ্চ বারো পর্যন্ত বয়সটাকে শৈশব বলতে চাই।
সুখী শৈশব যেকারোর পরবর্তী জীবনের জন্য বিরাট আর্শীবাদ। আমার শৈশব খুব সুখের ছিল না, আবার দুঃখেরও ছিল না। বাবা-মায়ের প্রচণ্ড আদরে আদরে দিন কাটানো অবস্থা আমার ছিল না, কারণ আমি নিজেই সবার থেকে একবারে ছোটবেলা থেকে একটু আড়াল চাইতাম। বড় হয়ে মায়ের কাছে আমার নিজের প্রধান দুটো দোষ সম্পর্কে জানতে চাইতে মা বলেন, তোর দুটো দোষ আছে, ঠিক দোষও না, তারপরও যদি দোষ বলতে হয় তো এই দুটোই— এক হলো, তুই খুব একা থাকতে পছন্দ করিস; আর তুই ভীষণ একগুঁয়ে।
আসলে ঠিক একা থাকা নয়, আমি মনে হয় ছোটবেলা থেকে প্রচুর লোকজন আর হৈ হট্টগোল এড়িয়ে চলি। আর একগুঁয়েমি নিয়ে এখানে এক্কেবারের ছোটবেলার দুটো ঘটনার কথা বলি। তখন আমরা ঢাকায়। সকালের দিকে আব্বা কোথাও বের হচ্ছিলেন। আম্মা গেছেন তাকে বিদায় দিতে। কাজের মেয়ে আমার জন্য টেবিলে অল্প গরম করা একগ্লাস দুধ রেখে গেছে। বলেছে, ভাইয়া দুধটা খেয়ে নাও। সে আমাকে নিজের হাতে গ্লাসে করে দুধ খাওয়াতে চায়, আর আমি জিদ ধরি আমি নিজেই সেটা নিয়ে খাবো। তাই সে গ্লাসটা রেখে ঘরের বাইরে যায়। আমি টেবিলে দুধটার দিকে তাকিয়ে মনে করি, আগে তো ফিডারে শুয়ে শুয়ে দুধ খেতাম, এখন গ্লাসে কি শুয়ে শুয়ে দুধ খাওয়া যাবে কিনা। যেই ভাবা সেই কাজ। গ্লাসটা নিয়ে শুয়ে শুয়ে যেই খেতে যাবে, পুরো দুধটাই আমার শরীরের ওপর অংশ ভিজে যায়। 
আরেকটি ঘটনা। আমরা তখন মগবাজারে যৌথপরিবার। দাদাদাদি, চাচাচাচি, চাচাতো ভাইবোন, ফুপুদের নিয়ে জমজমাট আমাদের মগবাজারের ২৩৮ ঝিলিমিলি হাউস। একদিন সেজ ফুপু, পরী ফুপু বলি যাকে, তিনি বড় ফুপু আর আম্মা রান্না ঘরে। ওনারা দুজন বসে কথা বলছেন, আম্মা রান্না দেখেছেন। রান্না ঘরে দুটো দরজা। আমি এক দরজা দিয়ে এসে বলি, কী রান্না করো। আম্মা বলেন, এ বাবা তুই কেন? রান্না ঘর থেকে যা বাবা। আমি বলি, কেন যাবো? ফুপু বলেন, দেখছো না গরম ডাল, চুলা জ্বলছে, এর ভেতরে তুমি কেন?
আমি তখন কিছু বলবার আগেই, কৈ ডাল? কত গরম? বলেই ধাঁ করে দুই হাত একবারে ফুটন্ত গরম ডালের ভেতরে ডুবিয়ে দেই। তারপর তো চিৎকার, হুলুস্থূল। আম্মা তারপর যে যা বলেছে, তাই দিয়ে আমার হাত দুটোকে সারিয়ে তোলের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তেঁতুলের পানি, আলু বেটে আলু হাতে মাখানো। পোড়া হাত নিয়ে আমাকে কদিন ভালোই ভুগতে হয়। তার কিছু দিন পর আবারো সেই একই কাণ্ড করি। তখন আমাদের পরিবার দুটো বাড়িতে আলাদা হয়, কারণ নতুন একটা ঘর তোলা হয়েছিল। ছোটফুপু আমাদের সঙ্গে থাকতেন। একদিন ছোটফুপু সদ্য চা করে নিয়ে আসা হাড়িটা রেখেছেন, আমি সেই গরম চায়ের ভেতরে আবারও দুই হাত ডুবিয়ে দেই। ছোট ফুপু আম্মাকে বলে, ‘‘কী ব্যাপার! ওর এমন পোড়া কপাল কেন ভাবী। খালি পুড়তে চায়।’’
ছোটবেলা আর দুটো ঘটনা মনে পড়ে। তার একটা হল, একদিন সকালের শুরু দিকে আব্বা দৌঁড়ে বাইরে থেকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলছিলেন, শেখ সাহেবকে মেরে ফেলা হয়েছে, শেখ সাহবকে খুন করা হয়েছে। আর একটা হল আমি একদিন রাস্তায় দৌঁড়ে বের হয়েছি ঘর থেকে, ঘরের গেটের পাশেই রাস্তা, রাস্তা তো নয় গলি, সেই গলি দিয়ে আসা একটা তরুণের সাইকেলের নিচে আমি পড়ে যাই। আমার পড়ে যাওয়া আর চিৎকার শুনে আমার সেই পরী ফুপু দৌড়ে এসে ওই ছেলেটাকে আচ্ছাসে বকছিলেন, আর গা থেকে ধুলো ময়লা ঝাড়ছিলেন। আর একটু আবছা মনে পড়ে চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা। খুব সম্ভবত একটা যে ট্রাকে আমাদের মালপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই ট্রাকটা দেখেছিলাম রওনা হওয়ার সময়। আর আমরা এসেছিলাম ট্রেনে চেপে।
বলে রাখার দরকার, আব্বা-আম্মার বিয়ে হয় ১৯৭০ সালে। আব্বার তখন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে চাকরি। পোস্টিং কারাচি। বিয়ের পর আম্মাকে তাই করাচি যেতে হয়। এরপর তো মুক্তিযুদ্ধ। প্রায় আড়াই বছর বন্দিজীবন কাটে করাচিতে। এর ভেতরে আমার জন্ম। বাচ্চা হিসেবে আমি তেমন একটা জ্বালাইনি। কেবল ক্ষুধা লাগলে চিৎকার করে কাঁদতাম আর গরম সহ্য করতে পারতাম না। সারারাত আমাকে পাখার বাতাস করতে হতো। আব্বা রাতের বেলা থেকে দুটো পর্যন্ত পাখা করতেন, পরে আম্মা। সেসময় ১৮০ টাকা অ্যালায়ন্স পেতেন আব্বা। ওই দিয়ে দুই মানুষে দিব্যি চলে গিয়েছিল দিন। ছোটবেলা থেকে আমার ওই জিদ। যেটা চাইতাম সেটা দিতেই হতো এবং তখনই। এটাই ছিল আমার প্রধান বৈশিষ্ট্য। চকোলেট খেতে ইচ্ছা করছে, তো তখনই দিতে হবে। না দেওয়া পর্যন্ত কেঁদেকেটে নইলে চিৎকার করেই যেতাম।— এসব বড় হয়ে আম্মার কাছ থেকে জানি। এছাড়া আমি তাদের খুব একটা বিরক্তটিরক্ত করতাম না। আমার ছোটভাই যেমন প্রচুর যন্ত্রণা করতো। বৃষ্টির সময় কাদাপানিতে লাডির বাড়ি দিয়ে তার ছিঁটায় নিজের কাপড়চোপড় ময়লা করতো। বালতিতে রাখা পানিতে পেশাব করে দিত ইত্যাদি ইত্যাদি।
১৯৭৩ সালে বন্দিবিনিময়ের মধ্যে দিয়ে অক্টোবার মাসে বাংলাদেশে আসি আমরা। পরের মাস ছয়েক আব্বার চাকরি ছিল না। কিন্তু রেশন পেতেন। এর পর অর্ডার এল চট্টগ্রামে যাওয়ার। তাও ডেপুটেশানে ফিশারিতে। আমরা উঠলাম চট্টগ্রামের পোর্ট কলোনিতে। মাত্র দু রুমের একতলা পাকা বাড়ি। ছোট্ট একটা উঠান। সেখানে এক বৃষ্টির দিকে পিছলে পড়ে গিয়ে আমার মাথা ফেটে গেলে আব্বা আমাকে দক্ষিণ হালিশহরের সেইলার্স কলোনির সিকবে-তে নিয়ে গিয়েছিলেন। ‘সিক বে’ ছোট্ট একটা ডিসপেন্সারি মতো। অদ্ভুত নাম, বাংলায় কী হতে পারে ‘অসুস্থ উপকূল’? সেখানে মণিমালা খালাম্মার কথা খুব মনে আছে।
পোর্ট কলোনিতে ছিলাম তিন বছর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত। সেই বাড়ির সামনে ছোট একটা রাস্তা, তারপরই বিরাট খোলা মাঠ। দুর্বাঘাসে ছাওয়া। তিন চাক্কার ছোট্টগাড়ি নিয়ে সেখানে খেলা করতাম আমি আর আমার ছোট ভাই। ঢাকা থেকে কখনো নানা, কখনো ফুপুরা, কখনো মামারা বেড়াতে আসতেন। কোনো কোনো রাতে তারা ভরা আকাশের নিচে বসে আম্মা নাহার ফুপুর সঙ্গে গল্প করতেন। আশেপাশের অনাত্মীয় মানুষরা আমাদের ভীষণ আপন হয়ে উঠেছিলো। বড়ুয়া কাকা-কাকিরা পাশের বাসায়ই থাকতেন। খুব আদর করতেন আমাদের দুভাইকে। পোর্টকলোনির মুন্সি কাকা, নাহার ফুপুদের তো একেবারে নিজের আত্মীয়ই ভাবতাম। তারাও আমাদের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে বহুদিন পরে জানি যে তারা আমাদের আপন কাকা-ফুপু ছিলেন না। সুখে দুঃখে সব সময় সময় মুন্সি কাকাদের পরিবারের সঙ্গে আমরা একেবারে মিলেমিশে গিয়েছিলাম। তাদের বাবা-মারাই ছিলেন আমাদের দাদা-দাদি।
আমরা প্রথমে উঠেছিলাম পোর্ট কলোনির নয় নম্বরে, আর মুন্সিকাকারা একই নম্বরে রাস্তার উল্টোদিকে থাকতেন। পরে আমরা চলে আসি বারো নম্বরে। একটু দূরে। মুন্সিকাকাদের বাসায় হাঁটা পথে মনে হয় মিনিট পাঁচেক লাগত। কিন্তু সব সময় আমাদের এই দুই বাড়ির লোকজনের আশা যাওয়া চলত। আমাদের লাইনেই থাকতেন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ মিলনের নানি। তাকেও দাদি বলতাম। আম্মার সঙ্গে খুব ঘনিষ্টতা ছিল। 
পোর্ট কলোনি থাকার সময়ের সবচেয়ে বড় যে ঘটনাটির কথা মনে আছে, সেটি হল আমার হারিয়ে যাওয়া। যদিও সেটা মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের জন্য, কিন্তু ওই ঘটনাটা আমার কোনো দিনও স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। যে ভয়, যে আতঙ্কের ভেতরে আমি পড়েছিলাম পরবর্তীকালে কোনোদিন তেমন কোনো কিছুর ভেতরে পড়তে হয়নি।
ঘটনাটা বলা যাক। রোজার দিন। বিকালের দিকে আমি বাড়ির সামনের রাস্তায় বেরিয়েছি। এক বড় ভাইয়ার সঙ্গে দেখা। তিনি আমাদের পাশের বাসার থাকতেন। তিনি হেঁটে চলেই যাচ্ছিলেন। আমি তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করি তিনি কোথায় যান। তিনি বলেন, নদীর পাড়ে। আমি বললাম, আমি তার সঙ্গে নদী দেখতে যাবো। তখন আমার বয়স বেশি হলে পাঁচের মতো। তিনি প্রথমে রাজি না কিন্তু আমি যাবোই। আমার ওই জিদের কারণে তিনি রাজি হন। ভাইয়ার সঙ্গে নদীর পাড়ে আসি। তিনি তার এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন আর আমি নদীর পাড় ধরে কিছুক্ষণ হাঁটি, অন্য পারের দিকে তাকিয়ে থাকি। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল। আমি ভাইয়াকে বলি, এবার ফিরতে। কিন্তু তিনি বলেন, আরেকটু পরে। আমি বাসায় ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠি। আর তিনি আমাকে বলেন, তুমি রাস্তা চিনে যেতে পারবে? আমি বলি, পারবো। এবারও সেই জিদের কারণেই একাই রওনা দিই। কিন্তু কিছু দূর আসার পর দেখি, আশাপাশের কোনো কিছুই আমি চিনতে পারছি না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে দেখতে টের পাই আমি হারিয়ে গেছি। রাস্তার ভেতরে ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করি। 
আজান হয়ে গেছে অনেক আগেই। লোকজন ইফতার করে নামাজ পড়ে ফিরে আসছে মসজিদ থেকে। একটা লোকে আমাকে কাঁদতে দেখে বলেন, কী হয়েছে, আমি কাঁদছি কেন? আমার তখন একটাই কথা— বাসায় যাবো। তিনি বলেন, তোমার বাসা কোথায়?
আমি তখন বারো নম্বর বলার বদলে অন্য একটা নম্বর বলি। তখন পাশ দিয়ে একটা বেবি ট্যাক্সি যাচ্ছিল। লোকটা ওই ট্যাক্সিটা থামিয়ে জানতে চায় সে যেদিক দিয়ে যাবে পথেই আমি যে নম্বর বলেছি, সেই রাস্তাটা পড়বে। তাই আমাকে ওই লোক ট্যাক্সিতে তুলে দেন। 
ট্যাক্সিওয়ালা অল্প কিছুক্ষণের ভেতরেই আমার বলা ভুল রাস্তায় এসে থামেন। এলাকাটা বাজার মতো। আমাকে বলেন, এসে গেছি। নামো। কিন্তু নেমে তো আমি আবারও ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করি। ট্যাক্সিওয়ালা বলেন, আচ্ছা মুসিবতে পড়া গেল। ঠিক তখন মুন্সি কাকা সাইকেল করে আমার সামনে এসে থামেন। আমি সত্যিই মুন্সিকাকাকে চিনি কিনা সেটা ট্যাক্সিওয়ালা নিশ্চিত হন। এবং মুন্সি কাকাও সেটা নিশ্চিত করে আমাকে সাইকেলে করে বাড়ি ফেরেন। 
বাসায় এসে দেখি আমাদের দুরুমের ছোট্ট দুটো ঘরে মানুষ উপচে পড়ছে। আমাকে মুন্সি কাকা এসে নামিয়ে দিলে সে এক দৃশ্যের জন্ম হয়। পুরো পরিবেশ থমকে যায়, চাপা একটা স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে। সবার ভেতরে এদিকে আম্মার প্রায় বেহুশ দশা, তার ভেতরে আমি হাজির। লোকজন আমার জন্য পথ করে দেয়, আর আমি আম্মার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ি।
পরে জানি, আব্বা কেবল একটু পানি মুখে দিয়ে সাইকেল করে আমাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। মুন্সিকাকাদের বাসায় গিয়ে মুন্সি কাকাকে খবর দিলে, তিনিও কোনো মতে একটু পানি মুখে দিয়ে আমার খোঁজে বের হন। দুজন দুদিকে গিয়েছিলেন। তারপর তো আমার দেখা পেলেন মুন্সি কাকা।
এই যে ‘নদী দেখতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া’র গল্প, সেটাই মনে হয় আমার চিরজীবনের নিয়তি হয়ে ওঠে। কোনো এক না-দেখা সুন্দরকে আমি হয়তো এখনো খুঁজে বেড়াই। তাকে পাই আবার হারিয়ে ফেলি। কখনো আমি তাকে খুঁজতে গিয়ে নিজেই নিজেকে হারাই। এভাবে নিজেকে হারানো আর খুঁজে পাওয়া, আবার হারানো— এরই লীলা সেই শৈশব থেকে যে শুরু হয়েছে, আজো থামেনি। হয়তো কোনো দিনও থামবে না। আর যদি কখনো থেমে যায়, তখন হয়তো এসব লেখালেখিরও ইতি টেনে দিতে হবে।

 


হামীম কামরুল হক : কথাসাহিত্যিক প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। বাংলাদেশ। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।