দুপুর ০১:২৪ ; বুধবার ;  ২২ মে, ২০১৯  

শৈশব : ফড়িং ও সরলকাঠি || কুমার চক্রবর্তী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

কী জীবনই না ছিল আমাদের! একটি নদীর পেছন পেছন ছুটে বেড়ানো, সমতলভূমিতে জলপুষ্পের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো, একটি নক্ষত্রের খামারে মনে মনে ঘুরে বেড়ানো। আকাশের শত-সহস্র অদৃশ্য রেখাগুলো ধরে অবিরাম ছুটে চলা। কাঁচা রোদ গায়ে মেখে জলের উজানের দিকে ধাওয়া করা! আর একটি থমথমে দুপুরে পাখিদের পেছনে পেছনে দৌঁড়ে যাওয়া, তাদের উড়ন্ত ছায়াদের মাটিতে আবিষ্কার করা। ছুটে চলা পাখির ছায়া মাটিতে কি পড়ে! হয়তো পড়ে, হয়তোবা পড়েই অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। বা হয়তো পড়তে-পড়তেই অপস্রিয়মানতায় পরিণত হয়। রাতের নানা বর্ণের নানা আকারের মেঘগুলোকে মনে হতো রূপকথার মসলিন, মনে হতো তারা অপার্থিব জায়গা থেকে বের হয়ে আবার অজানা কোনো ঈশ্বরের জায়গায় চলে যায়। আবার কখনও কখনও মেঘগুলিকে পাহাড়-পর্বতের অবয়বে চিন্তা করতাম। উঁচু উঁচু এক-একটি পাহাড়। কখনও আবার বড়ো মেঘ মেঝো মেঘ ছোটো মেঘগুলোকে মনে হতো বাবা মা আমি আমার বোন ইত্যাদি। তাদের পেছনে ছুটছি অজানার পানে। আকাশকে মনে হতো অজানার গন্তব্য। রাতে তারাদের হাটে পরিদের মেলা, নানা কোণে নানা স্থানে, পরিরা আসে। কখনও মানুষকেও তারা ধরে তাদের রাজ্যে নিয়ে যায়। তখন জীবনের হাঁটা ছিল, জীবনের রাগদারি ছিল। একটি ছোট্ট পাখির জন্য যাবতীয় মনোবাসনা, একটি সুবর্ণখুরকির জন্য নির্নিমেষ চোখ ফেলে রাখা, একটি জলস্রোতের দিকে শমিত অনুভবকে স্থির করে রাখা, একটি ফড়িঙের পেছনে পেছনে জীবনকে ছুটিয়ে দেওয়া, একটি আকাশকে দেখে দেখে সারারাত মনের স্লেটে চকখড়ি দিয়ে ছবি আঁকা। আর রং বদলানো কাকলাশ, বিস্তির্ণ শটিবন, গাছালির সাথে বাক্যালাপ, হ্যাজাকের মেন্টল আরও কত কী। জীবন বেড়ে উঠছিল তখন, জীবনের নানা গান-তান-সুর-লয়ের জন্ম হচ্ছিল তখন, যদিও আমি সরাসরি টের পাইনি। তখন তো বোঝা যায় না যে, জীবন বেড়ে ওঠে চুপসে যাবার জন্য। আমাদের সব উচ্ছ্বাস তখন শ্রাবণ মেঘের মতন জড়ো হয়ে একসময় ঝরে পড়ছিল। সব সময় স্মৃতি হয় না, কিন্তু এই যে সময়খণ্ড, তার সম্পূর্ণটাই স্মৃতি হয়ে গেল! এটাই আমার শৈশব, আমার জীবনের নিমফিয়া লোটাস।
আমার মনে হয়, মনে হয় আমার, জীবন হরকে লব করে আর লবকে হর।  আমরা সারাজীবন শ্যাওলা-ধরা দেয়াল ধরে এটে থাকা শামুকের মতো উঠি আর নামি। এর মধ্যে শৈশব জীবনের যে বিস্ময় আর কল্পনাবোধ, তা সারাজীবন ধরে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। শৈশব হলো আমাদের সেই আয়না যাতে আমরা ঘন অমাবস্যায়ও নিজেদের মুখ দেখতে পাই। বয়স যতই বাড়তে থাকে ততই আমরা শৈশবমুখী হই, শৈশব তখন তার সমূহ উজ্জ্বলতা নিয়ে হাজির হতে থাকে। ভুলে যেতে চাইলেও তাকে আর ভুলে যাওয়া যায় না। আমরা ঘনীভূত হই, মনে হয় এই তো ফেলে এসেছি তাকে, আবার ফিরে যাই তার কাছে! এভাবেই হারানো আয়নাকে খুঁজে ফিরি আমরা। মারবেলের খেত আমাদের চারপাশে, আর জীবন থেকে একটানে বেরিয়ে যাওয়া  ছোটো ছোটো খালগুলি। এগুলি এখন আবার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে আমারই কাছে ছুটে আসছে, কিন্তু যাদের আমি জন্ম দিয়েছি একদিন, যাদের একদিন উড়িয়ে দিয়েছিলাম অজানার উদ্দেশে, তাদের কী করে এখন আবার ধরে রাখব? এতসব খালবিল, এতসব আকাশ নক্ষত্র নীলিমা নির্জনতা, এদের নিয়ে আমার জীবন যে প্রবহমানতার সূচনা করেছিল এখন এর আর অন্যথা হয় না। জীবন সূচনা করে কবিতার আর কবিতা সমাপ্তি করে এ জীবনেরে। কবিতা হলো সেই দ্বীপ যে-তার পল্লবিত উপকূল আর প্রাকৃতিক বাগান নিয়ে আমাকে বিস্মিত করে রাখে। আমি তো ভাবতে পারি, আমিই হলাম সেই ক্রুসো যে এসে পড়েছি এই কবিতার দ্বীপে, সাথে করে এনেছি উন্মুক্ত আত্মার দীপাধার আর জীবনের কিছু জমে থাকা প্রতিধ্বনি। এসব কিছু দেব কবিতাকে আর বলব, সে-যেন আমার জন্য একটি বই বানিয়ে দেয় যা হবে আমার জীবনপুস্তক। যখন আমি চাইব সে-তখন আমাকে শোনাবে অন্তর্গতের গান। যতবার পড়ব, ততবার সে নতুন হয়ে উঠবে। যখন পড়ব না তখন সে আমার পাঠের জন্য কান্না করবে। আমি শুনব সে-কান্নার শব্দ। আমি তা শুনে ছুটে আসব তার কাছে। আমি তাকে রেখে দেব জীবনোত্তর পাঠে। এই বই হবে আমার মৃত্যুর পর পাঠের একমাত্র বই। আর এইটি লেখাবে আমার শৈশব, আমাকে দিয়ে, আমাকে নিয়ে, শৈশবের ভাষায়। 
আমরা যারা নগরের বাইরে জন্মেছি, তাদের প্রকৃত অভিভাবক ছিল প্রকৃতি। সমস্ত শৈশব জুড়ে প্রকৃতি আমাদের শিখিয়ে গেছে পৃথিবীকে জানতে, তার রহস্যসমূহকে আবিষ্কার করতে। ঋতুকে জানা, সময়কে জানা, জীবনকে জানা— সবকিছু শুরু হয়েছিল শৈশবে প্রকৃতির হাত ধরে। এক-একটা সময়ের চিরন্তনতা ও ক্ষণস্থায়িত্ব, তার সফল শিক্ষক হলো প্রকৃতি। ফলে এখন যে কবিতা লিখি তা-ও আসলে প্রকৃতির দান। আর তা  শুরু হয়েছিল শৈশবেই। বহুদিন আগে, দীর্ঘকাল আগে, অনন্তকাল আগে, সুদূরের দিকে ভেসে যাওয়া এক মেঘ আমাকে শুধিয়েছিল তার জীবনের কথা। জলের সাথে তার মাখামাখির কথা। কী করে সে উড়ে যায় স্বর্গের দিকে, কী করে সে কথা বলে হাওয়ায় ডুবন্ত পাখিদের সাথে, কীভাবেই বা মানুষের ভাষা তাকে  করে তোলে অস্থির, সবকিছু সে আমাকে বলেছিল। আমি তখন শিক্ষাগ্রহণ করি যে, ভাষা শিখতে হয় পৃথিবীর যাবতীয় অনুভূতিশীল বস্তুপুঞ্জ থেকে। বুঝতে হয় ব্যাকরণহীন এইসব নীরব ভাষাকে। মানুষের ভাষায় এইসব অস্তিত্বকে অনূদিত করতে হয়। আর এর প্রধান দায়িত্ব কবিদের। এভাবেই শিখে নাও উচ্ছ্বসিত চেতনা থেকে, তার পর তোমার অজানা ভূমিটি তুমি দান করে দাও এবার। এসবেরই গোড়াপত্তন হয় শৈশবে।
কত কবিতা কত কবিতা কত কবিতা! মায়া, কুহক, সহজিয়া, মুখর, দানাদার, স্ফটিকায়িত, জায়মান, গর্জনশীল, নিশ্চুপ...বিষণ্ন, বিপন্ন, আত্ম, ইন্দ্রিয়পরায়ন, স্বপ্ন, নিখিল, অন্তরিত, হাহাকৃত, মৃদুল, স্মিত, চপল, অন্তর্বৃত। কোনো কোনো কবিতা ঝংকৃত, কোনোটি স্তব্ধ। ঝংকার থেমে গেলে কবিতাটি মরে যায়, রেখে যায় শোকগাথা যাকে বহন করে পাঠক। আর যে-কবিতাটি স্তব্ধ, সে রেখে যায় নৈঃশব্দ্যের মালভূমি। করে চলে স্তব্ধতার অনুবাদ। কবিতা তো সেটাই যা নৈঃশব্দ্যের মুখোমুখি করে দেয় পাঠককে। মহান স্তব্ধতা, মহান নৈঃশব্দ্য, মহান অন্ধকার। ছন্দগুলো সরে গেলে কবিতার যদি কিছু না থাকে তবে সে-কবিতা দিয়ে আমি কী করব! অতএব আমি তা থেকে বেরিয়ে আসি। আমার প্রয়োজন মহান নিঃশব্দতার। কবিতার কাছে আমার চাওয়া এ-ই : সে-যেন আমার না-জানা না-বলা কথা বলে। পৃথিবীর সাথে আমার সম্ভাব্য কথোপকথনগুলো যেন সে বিড়বিড় করে বলে। আমি তো সম্বন্ধকারী। বস্তুজগতের ছায়া ও কায়ার সাথে আমার সহবত, আমি তাদের সাথে আমার কলহাস্য চালিয়ে যেতে চাই। তারা ঢুকুক আমার মধ্যে তাদের সমূহ ইন্দ্রিয় দিয়ে, আমি ঢুকি তাদের মধ্যে আমার সব ভাঙাচোরা আর তোলপাড়করা আত্মবিলয় নিয়ে। আমার অদেখা ফাঁকফোকরগুলো পূর্ণ হোক অদৃশ্য জীবনের উপস্থিতিতে, তারা আমাকে শুনিয়ে যাক মর্ত্যজীবনের গান। আমার শরীরের নদীগুলো তাদের শরীরে ঢুকে যাক যাবতীয় অনিশ্চয় আর দেনা-পাওনা নিয়ে। প্রকৃত ভরকেন্দ্র না থাকলে কবিতা লেখা যায় না, কবিতার নামে হয়তো পঙ্ক্তিযোজন করা যায়। কেন এই কথা বললাম? কেননা আমারও মনে হয় ভরকেন্দ্রটি দরকার, তা না-হলে অন্তর্গত আর বহির্গতের আদান-প্রদানটিকে কবি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত করবেন। কবি বস্তুঅনুষঙ্গকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন এবং তাকে জারিত করে আবার বাহিরের দিকে তাকে উন্মোচন করেন। আর এ প্রক্রিয়াটি  শুরু হয় শেশব থেকেই। কে কবি হবে, তা আসলে ঠিক হয়ে যায় শৈশবেই।
সেই মুখগুলো এখন কোথায় যারা ছিল আমার শৈশবের সাথি! সেই পাখিগুলো কবে হারিয়ে গেছে মহাকালের গর্ভে, সেই খালবিলগুলোও নিঃশেষিত, কিন্তু আমার স্মৃতিসাম্রাজ্যটি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আমার শৈশব ছিল এক সন্ধিবিন্দু যেখানে গ্রাম আর শহরের দেখা হয়েছিল আমার ভেতরে। যে আমি নাড়াখেতে ফুটবল খেলেছি, সেই আমিই শহরের সরু গলিতে খেলেছি ক্রিকেট। আর দেখেছি সিনেমা― রাজ্জাক, কবরী, ববিতা, শাবানা, অলিভিয়াদের অভিনীত ছবি। আর অনুভব করেছি শরীরে প্রথমবারের মতো শরীর-সংকেতের প্রতিক্রিয়াগুলো। এইসব চলচ্চিত্র দেখে দেখে কখনও বা অজান্তে হয়ে পড়েছি স্লিপ-ওয়াকার। সেই নারকেল পাতার চশমাটি কোথায়, সেই কাগজের নৌকাটি কোথায় যা আমি ভাসিয়ে দিয়েছিলাম কোনো এক তোরভাঙা বরষায় নালার জলে। মহাকাল তার দুন্দুভি বাজিয়েছিল  শৈশবে। আমরা মহাকালকে নিয়ে চিন্তামগ্ন হই না। জানি এসব ভাবনার অতীত বা ভবিষ্যৎ ভাবনার বিষয়। কিন্তু দিন, মুহূর্ত বা বছর নিয়ে ভাবি। ভাবি আর কাজ করি তাকে মাথায় রেখে। কিন্তু মহাকাল আমাদের ওপর ভর করে আমাদের না-জানিয়ে। ছায়ার মতো সে এসে দাঁড়ায়। মুক থাকে কিন্তু গোয়েন্দার মতো একজাতীয় হিসাব-নিকাশ করে নেয়। আমার কাছে মনে হয় অন্ধকার হলো এই মহাকালের আদি ও আসল রূপ। মহাকাল তো অদৃশ্য কিন্তু সে তার কিছুটা প্রতিভাস রেখে গেছে অন্ধকারের কাছে, আর তাই অন্ধকারের কাছে গেলে, তার স্পর্শ পেলে যেন আমি মহাকালের দেখা পাই। মনে হয় মহাকাল আমাকে দেখছে, আমার কাছে ধরা দিচ্ছে, আমার কাছ থেকে আবার নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এই যে খেলা, এই যে মায়ামারীচের বন, তা আমাকে মুগ্ধ করে। মহাকাল কি অন্ধকারময়, নাকি অন্ধকার মহাকালময়! বড্ডো ভালো লাগে অন্ধকার, বড্ডো ভালো লাগে এই মহাকালের প্রতিবিম্ব। আমাদেরও কিছু প্রতিবিম্ব আছে। আমাদেরও আছে কতিপয় জীবনের ধ্রুবপদ। আমাদের প্রতিবিম্বগুলোই হলো কবিতা। সত্যিই কবিতাগুলো যখন আমাদের সত্যিকার প্রতিবিম্ব হয়, হয়ে ওঠে, তখনই তা প্রকৃত হয়ে ওঠে। কবিতা হলো আমাদের প্রতিবিম্ব, আমরা হলাম অন্ধকারের প্রতিবিম্ব আর অন্ধকার হলো মহাকালের প্রতিবিম্ব― এ জাতীয় একটি সূত্র রচনা করতে মন আগ্রহী হয়। অর্থাৎ একটি সমগ্রের প্রতিভাসকে যদি ছোটো করে ধারণ করতে পারি তবে আমরা একটি জটিল সমীকরণের সহজ সমাধান করতে পারি। সমাধানটি হয়তো হয়, হয়তো হয় না কিন্তু তা আমাদের একটি নির্বিকারত্বের পানে নিয়ে যায়। এই এককটিতে পৌঁছাতে পারলে কবিতা লেখা সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে পড়ে। কবিতা আসে। তবে তার জন্য নিজেকে শূন্য করতে হয়। শূন্য করে ভরে দেওয়া যাহার খেলা, তারি লাগি রইনো বসে সারা বেলা। কবিতা আমাদের শূন্য করে অবশেষে ভরে দেয় আপন খেয়ালে। আর এসবের পাটাতনটি গঠিত হয়েছিল আমার শৈশবে, যে শৈশব আবেশজড়িত, চিরস্মৃতির  গোলাঘর।
 কী বিপুল এই স্বাধীনতা― এই কবিতা লেখা। মুক্তি বা স্বাধীনতা ছাড়া বোধহয় কবিতা লেখা যায় না। এজন্যই সকল পরিস্থিতিতে নিজেকে স্বাধীন রাখতে হয়। মুক্ত থাকতে হয় সময়ের ও প্রচলের অনুভূমিক বিস্তার থেকে। বড়োর ভেতর নিজেকে ছোটো আবার ছোটোর ভেতর নিজেকে বড়ো করে রাখতে হয়। কবিতার পরিচয়ে তাকে বাঁচতে হয়। এবং এটাই তার মাহাত্ম্য যে সমস্ত জন্মগত ও সামাজিক পরিচয়কে আড়াল করে কবি পরিচয়কে প্রথম করে রাখতে হয়। এটা করার জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে পারিবারিক প্রপঞ্চগুলোকে বাতিল ও প্রতিবাদ করে যেতে হয়। ভাঙতে হয় নিজকে, নানাভাবে, নানা উপায়ে,  এলোমেলো জীবনের বহ্নুৎসবে। কবিতা লেখা এক আত্মপ্রত্যাহার যা তাকে স্বেচ্ছা নির্বাসনের এক দুর্মর এলাকায় নিয়ে যায়। এভাবেই কবি তার স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু কবিতা লেখা এতটা স্বাধীনতার ফসল বলেই বোধহয় এতে স্খলনের সম্ভাবনাও বেশি। স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠতম ফল দেয় আবার অর্থহীন ফলাফলও নিয়ে আসে। স্বাধীনতা প্রকৃতপক্ষে অসাধারণকে গ্রহণ করার, অসম্ভবকে সাধন করার স্বাধীনতা; তুচ্ছকে গ্রহণ করা স্বাধীনতা নয়। কতভাবে লেখা, কত উপায়ে লেখা, কীরকমভাবে লেখা! সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত্র, সময়ের কোনভাগে কত কবিতা, আহা কীভাবে যে কবিতা বেরিয়ে আসে! আমার মনে হয় একেক সময়ের কবিতা একেক রকম। সকালের  কবিতা প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন হয় বিকালের কবিতার সাথে, রাতের কবিতা নিশ্চিতভাবেই আর সবকিছু থেকে আলাদা। আবার জীবনেরও এক এক সময়ের কবিতা এক এক রকম। যৌবনের কবিতা, উত্তর যৌবনের কবিতা, বয়সের কবিতা। তবে জেনে রাখা দরকার, শৈশবের ভাষাই কবিতার শ্রেষ্ঠ ভাষা। যারা শৈশবের ভাষায় কবিতা লিখতে পারেন, তারাই সেরা কবিতাটি লেখার মারাত্মক সুযোগটি পেয়ে যান। শৈশবের ভাষা হচ্ছে আত্মার ভাষা, জীবনের ভাষা, এ ভাষা স্বতস্ফূর্ত ও সাবলীল। এ ভাষা প্রাকৃতিক। আর কবিতা লিখতে গেলে এর থেকে উৎকৃষ্ট ভাষা আর কী হতে পারে! শৈশবের ভাষা হলো শৃঙ্খলমুক্ত অবারিত ভাষা, আর এজন্যই তা কবিতার পক্ষে উপযোগী। আমরা কবিতার জন্য এমন একটি ভাষার অন্বেষণ করি যা হৃদয়ের ভাষাকে উন্মোচন করবে। শৈশবই হলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন সূচনা হয় জীবনের ভাষার। জীবনের ভাষা হলো সেই ভাষা যা স্বাধীন এবং অজ্ঞতানিরপেক্ষ। এই ভাষা মুক্ত, এই ভাষা নির্লিপ্ত। এর পর যে ভাষা আসবে তা প্রকৃতঅর্থে জীবনের ভাষা নয়, যাপনের ভাষা। জগতের সবকিছু থেকে ধার করে সে চলে। সবকিছুকে সে বিশ্লেষণে মেতে ওঠে। শৈশব হলো সেই সন্ধিকাল যখন জীবন জগতের সাথে যুক্ত হয়। আত্ম আর পর মেলামেশি করে। আদানপ্রদান চলে সারাজীবন। শৈশবই হলো সেই সময় যখন প্রকৃতি জীবনের পরতে পরতে শিকড় ছড়ায়। প্রকৃতি  গড়ে ওঠে মানবের ভেতর তার সমস্ত আদল নিয়ে যা সারাজীবন বহন করে বেড়াবে জীবন। এই শৈশবের ভাষা এক বাতাবরণ বিস্তার করে রাখে মানুষের জীবনে। ধীরে ধীরে আমাদের বোঝাপড়াগুলো ঝুনা হয়, তাতে বল্কল জমে, তার যুক্তি ও কূটচালে যাপন পরিণতির দিকে যায়। বুদ্ধির জোরে মানব মানব হয়ে ওঠে কিন্তু মানুষ যে মানুষ তা হয় হৃদয়ের বলে। পরিণতির সাথেসাথে যে-যুক্তিক্রম যে-কাঠামোগত পারঙ্গমতা দেখা দেয়, তাতে ভাষা বয়স্ক হয় কিন্তু কবিতার ভাষার জন্য দরকার এসবকে বাতিল করার। তার পরিবর্তে প্রয়োজন হয়ে পড়ে শৈশবের ভাষার। কোনোরকম বৌদ্ধিক সমস্যা ব্যতিরেকে কবিতা লিখতে জানতে হয়। জানা থাকলে কবিতা অন্যরকম হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে উদ্ভাসিত, আত্মসমাহিতও। আর এরকম কবিতা লিখতে চাইলে পুরো দেহ ও মনের, জীবনের ও যাপনের অখণ্ড মনোনিবেশ লাগে। আর এসবসমেত কবিতা লিখতে চাইলে শৈশবের ভাষাই হবে তার মোক্ষম বাহন। কিছুই হারায় না, রয়ে যায়-— হাওয়া হয়ে, পাখি হয়ে, স্মৃতি হয়ে। কিন্তু এ স্মৃতিতে বেদনাও রয়েছে। ছোটোবেলায় গঙ্গা ফড়িঙের ল্যাজ ছিঁড়ে কাঠি গুঁছে দিতাম মজা করে, তারপর দেখতে চাইতাম সে উড়তে পারে কি না। উড়তে গিয়ে তার ভেঙে ভেঙে পড়া,  আজ এতদিন পরও আমি সেই ফড়িংকে দেখতে পাই, যেন মনে হয় আমিই সেই ফড়িং যে আমারই গুঁজে দেওয়া ওজনকে নিয়ে উড়ে চলছে জন্ম থেকে, মৃত্যু পর্যন্ত। কয়েক বছর আগে তাই লিখি ‘ফড়িং ও সরলকাঠি’ কবিতাটি যেখানে এই বেদনাকে মূর্ত করতে চাইলাম আমি, যেখানে আমার হারানো শৈশব বিমূর্ত এক বেদনাকে নিয়ে মুহুর্মুহু হানা দিচ্ছে আমাকে :
মনে করো কোনো পাকদণ্ডি বেয়ে উঠে গেছি আমি পাহাড়ের বিস্তীর্ণ উঠোনে, আর  তাই বলে এখন তো উড়াল দিয়ে একা হতে যাই । কিন্তু...মনে হয় পাখা ভারী হয়ে আছে, ঘনকুয়াশায়...
তবে চলো ফিরে আসি আবার শৈশব-স্টেশনে; খুঁজি শিশিরের মারবেল আর নারকেল পাতার চশমা। দিনমান ছুটি ফড়িংটির পেছনে পেছনে, রোদকে পান্থশালা করে। কোনো এক খেলার ছলে সেই কবে ফড়িং-এর লেজে আমি গুঁজেছিলাম সরলকাঠি। আনন্দ পেয়েছি আমি তার পতনের ছলে। আহা ফড়িং, সরলকাঠি নিয়ে আজও ওড়ে আমার ভাটিয়াল জীবনের ব্লু-বুকে।
আনন্দ নিয়েছি আমি ফড়িং-এর বেদনার ভোরে। কিন্তু বুঝিনি তার মৃত্যুর ভাষা। বুঝিনি, কখন গিরিমাটি ছেয়ে গেছে চারপাশে, ঘন নেপিয়ার ঘাসে― ফড়িং-এর কান্নার আবেশে।
আজ যখন ভ্রমবশে পশ্চাদ্দেশে হাত দিই, লাগে ফড়িং-এর কাঠি। ফড়িং তো মরে গেছে ঢের আগে কিন্তু আমি আজও বহন করছি সেই মৃত্যুকাঠি, আপনার বেদনার দেশে!
তবে কি আমি এক বিগত ফড়িং, বস্তুদের বেদনার ভারে যে হারিয়েছে তার সংবৃত জীবন?

 


কুমার চক্রবর্তী : কবি প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক। বাংলাদেশ। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।