রাত ০৫:১৬ ; সোমবার ;  ২০ মে, ২০১৯  

আমার শৈশব || পাবলো শাহি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

কিছু মানুষ আছেন, শৈশব থেকে পরিপাটি জীবনমুহূর্তগুলো লুকিয়ে রাখতে পারেন বুকের মধ্যে। আমি সেরকম আয়না তৈরি করতে পারিনি বক্ষে। তারপরও বর্তমানের পটে কতিপয় ছবি ভেসে ওঠে মনের কন্দরে। মন শব্দটি কেমন দার্শনিক ও দুঃখভারাক্রান্ত— তাই বক্ষকে আমি করে তুলতে চেষ্টা করেছি কখনো কখনো, শৈশবে মর্জাদ বাওড় (নানাবাড়ি) আর বলুহর বাওড় (দাদাবাড়ি)— এই দুইয়ের মাঝগাঙে বুক ভাসিয়ে বড় হয়েছি আমি।

নানা ও দাদাবাড়ির লোকজনের ব্রাহ্মণত্ব আমাকে অহংকারী করেছিল বোধক্রান্ত শৈশবেরবোধভূমিতে। পার্সিয়ান আর কাজাক রক্ত আমার ধমনীতে এই গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। নবাব কন্যা উম্মে জোহরার ২য় কন্যা উম্মে সাবিনার বংশধর নানা, কাজাকস্থানের কোরাইশ আমার দাদা। নানা ছিলেন জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান, এমপি ও এমএলএ। মুসলিম লিগের পাণ্ডা ছিলেন— জিন্নাহ ও ফাতেমা জিন্নাহর বন্ধু। নির্বাচনে তাঁর বান্ধবী বোম্বে নায়িকা বৈজন্তীমালাকে হাজির করেছিলেন তাঁর নির্বাচন কাম্পিংয়ে। চল্লিশ পৌঁছানোর আগেই রাজনৈতিক হত্যার শিকার হন। মৃত্যুর পরও তাঁর দাপট বহমান ছিল ঝিনাইদহের বারোবাজার-নলভাঙা এলাকা জুড়ে— বিশেষত তাঁর হাতে তৈরি বারোবাজার হাইস্কুল, হাসপাতাল, মাদ্রাসা, রেলস্টেশনের জমি দান, নলভাঙাতে স্কুল প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড আমাদের গর্বের বিষয় ছিল। নানার অন্য পাঁচ ভাই ছিল ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ফলে— নজরুল, সুকান্ত, চীনা লাল বই, মাওজেদং, ল্যুসুন; আর সোভিয়েত ইউনিয়ন, সোভিয়েত নারী, উদয়ন পত্রিকা ইত্যাদির সাথে দাস ক্যাপিটেল, মার্ক্স-এঙ্গেল রচনাবলী, আন্তন চেখভ, তলন্তয়, নিকোলাই গোগল, নিকোলাই অস্ত্রভস্কি, গোর্কি, তুর্গেনাভ— বিশ্বকাঁপানো মহান লেখকদের বই নানাদের পারিবারিক লাইব্রেরিতে ভরা ছিল। কোরাইশ দাদা ছিলেন পীর খোন্দকার পরিবারের জামাই মুরীদ ও পরবর্তী গদিনশীন পীর। ফলে ইসলামী তরিকা, লড়কে লেঙগে পাকিস্তান আর কমিউনিস্ট নানার অন্য পাঁচ ভাই, আর বাবা-চাচা আওয়ামী লীগ— এই মিশ্র সংস্কৃতির উত্তারাধিকার আমার। নানা বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগটি ছিল মধুর। ফলত কমিউনিস্ট হবো এই দৃঢ়কল্প মনোভাব আমার শৈশবকে উদীপ্ত করলো। কবিতা আমি লিখতে চাইনি। তৃৃতীয় শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘উভচর মানুষ’ পড়ে বালিশে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছি। বহুদিন এই কষ্ট বুকে রেখেছি। তারপর পড়েছি নিকোলাই গোগলের ‘তারাস বুলবা’। এরপর একে একে ‘আমাদের কালের নায়ক’ ‘পিতা ও পুত্র’ ‘মা’ ‘পৃথিবীর পাঠশালায়’ ‘আনা কারানিনা’ ওয়ার এন্ড পিস’ ‘ইস্পাত’ নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’। এদের মধ্যে অস্ত্রভস্কি, গোগল ও গোর্গিকে বুঝতে পারতাম। তলস্তয় চেখভ তুর্গেনেভ দস্তয়ভস্কি— আধাবোঝা আধা আলো আঁধারির মতো ছিল। সেভিয়েত ইউনিয়নের রাগুদা, প্রগতির বই ছাড়া অন্য কোনো উপন্যাস কিংবা কাব্য ছিল না। এমনকি শরৎ, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ রাখা হত না সমাজতন্ত্রী নয় বলে। এগুলো পড়ে বড় হয়েছি। এরপরও ভেতরে নীল রক্তের টান অনুভব করি। নানার চাকর বাড়িতে ২০ একর জমির উপর আম কাঠাল লিচুর বাগান, গাছের উপর মাচা করে উঁচু ঘর, বাঁশের সিঁড়ি। গোলাপজাম, মিস্রিআম, কুষ্টাহাতা আম, কাঁচামিঠে আম, নতুন চারা আম, আর বিলম্ব গাছের শিকড় থেকে ডালপালা পাতা পর্যন্ত ঝুলে থাকা লাল শাদা সবুজ হলুদ ফল। বনে আতা দয়াকলা বাড়ির কাছে ডালিম গাছ নেওয়া গাছ। কাছারি বাড়ি দহলিজঘর কিংবা উঁচু করে বানানো বাড়ির ২য় ছাদে পোষা ও বুনো কবুতরের ঘর বাকবাকুম। এই সব আমায় নেশায় টানতো। 
নানার দুটি বউ থাকা সত্ত্বেও আমার নানী (তিন নম্বর বউ)কে বিয়ে করেছিলেন- জিন্নার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার জন্য স্মার্ট বউ দরকার তাই। এ ছাড়া তিনি ইন্ডিয়া থেকে মহিলা নিয়ে আসতেন, নবাব রক্তের জলসা বসতো চাকর বাড়ির গাছের উপরের মাচাঘরে। ৩/৬ মাস পর জাফরাণী নারীর কদর হারাতো নতুন নারীর আগমনে। নানা তাঁর প্রজাদের ২/৫ বিঘে জমি আর পুরানো জাফরাণী কন্যাদের বিয়ে দিয়ে দিতেন। এরকম ছয় ফুটে কৃষক ঘরণী দেখেছি তাদের বরগুলি খর্বকায়। ফলে যৌনগন্ধময় সামন্তীয়, পীর তরিকা, কমিউনিস্ট ও বাবা-চাচার হাতে আওয়ামী লীগ ঢুকলো আমার মনোদর্শনে।
এই সব কনফ্লিক্টে আমার ধমণী ধূসর স্মৃতিগাছ হয়ে উঠেছে। তার মধ্যে জেনেছি কবি দাদ আলী আমার মাতৃকূলের আত্মীয়। অভিনেতা রাজু আহমেদ, রঞ্জু আহমেদ। সংগীতে সৈয়দ আজমল হোসেন, ফরিদ আহমেদ, সৈয়দ সেলিম। সাহিত্য জগতে নানা ভাই সৈয়দ আকরম হোসেন, সৈয়দ আজিমুল হক, সৈয়দ আব্দুর রহমান, সৈয়দ আব্দুল মবিন।
দাদা, বাবা, দুই চাচা, ফুপাতো ভাই লেখাপড়া করেছেন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় যা এখন মওলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজ। ফলে বাবা পিরালী ঘরনার মানুষ হলেও কলকাতার প্রভাব ছিল তাঁর, তিনি ছবি আঁকতেন, নাটক করতেন এবং ১৯৬১ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। অর্থাৎ ৪৮ বছর যশোর উপশহর ডি ব্লক ইউনিটের সভাপতি ছিলেন আমৃত্যু। বাবা-মামারা সবাই পেশায় ছিলেন শিক্ষক। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার পরিবারের আটজন অংশগ্রহণ করে। বাবা কোরাইশি মো. সরোয়ার উদ্দীন, চাচা কোরাইশি মো.আবুল হোসেন, নানাভাই সৈয়দ আজিমুল হক, ফুপাতো ভাই হুমায়ুন কবির, চার মামা সৈয়দ আজমল হোসেন, সৈয়দ জাকির হোসেন, সৈয়দ রবিউল হোসেন ও সৈয়দ আরজু। ফলে শৈশবে বঙ্গবন্ধু ছিলো আমার হিরো। ৭৫-এ তাঁর মৃত্যু আমাকে কাঁদায়।
বাবা চাইতেন আমি ডাক্তার হই। কিন্তু ৫ম শ্রেণি পড়াকালে ছন্দ আমায় মনের কন্দরে বাসা বাঁধে। লিখে ফেলি ‘স্বপ্ন’ নামে পদ্য—
     একদিন স্বপ্নে দুই চোখ খুলছে,
     রঙিন অপরূপ স্বপ্নরা দুলছে।
     চারিদিকে হাহাকার ভিখারী ও নিঃস্ব,
     কথা কেউ বলে না নিশ্চুপ বিশ্ব।

১৯৭৫-৭৬-এ এই ঘোর। ফলে ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে বৃত্তি আমার কেরিয়ার তৈরি না করে ছন্দ আর দ্রোহ আমায় পেয়ে বসলো ৭৬-এ লিখলাম ভাসানীর ফারাক্কা পদযাত্রা নিয়ে। মার্ক্স-এর রাজনীতি টানলো আমায়। লিখলাম—
     মওলানা আমি তোমার কাছে ঋণী হয়ে আছি
     তোমার শিরদাঁড়া সোজা হয়ে দাঁড়াবার কাছে
     তোমার অব্যর্থ কণ্ঠ নির্ভীকতার কাছে 
     ঋণী হয়ে আছি তোমার সফেদ পাঞ্জাবীর কাছে।

তখন গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন খালেদুর রহমান টিটো। ওরা আমার কবিতা দিয়ে পার্টির পোস্টার করলেন। ইতোমধ্যে ৭৫-এ আমার পদ্য ছাপা হতে লাগলো দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈানিক স্ফুলিঙ্গ, সাপ্তাহিক দেশ হিতৈষী ও কলকাতার মাসিক অভিনব অগ্রণীতে। বিপ্লবী ও কবি ভাবতে লাগলাম নিজেকে। কমিউনিস্ট পার্টির মিটিং-এ কবিতা পড়তে যেতাম। বাসের সিটভাড়া দেওয়ার বদলে টিটো ভাইয়ের পেটের উপর বসে যশোরের গ্রামে গ্রামে যাচ্ছি। মার্ক্স-এঙ্গেলস-লেনিন-গোর্কি, রেজারেকশন, ইস্পাত, পৃথিবীর পাঠশালায়, মা পড়া হয়ে গেছে আমার। পরিচয় হয়েছে কবি আজীজুল হকের সঙ্গে ‘অগ্নিবীণার মন্ত্রে’ ‘কৃষ্ণ চূড়ার তৃষ্ণা’ পরে ৭১-এ তাঁর গান ‘সাবধান সাবধান সাবধান বাঙলার শত্রুরা সাবধান’ উনার কবিতা ‘একাত্তের অনুভব থেকে’ ‘বিনষ্টের চিৎকার’ উনার আলোচনা সমৃদ্ধি ঘটালো আমার চেতনাকে। 
এর মধ্যে ফিরোজা বেগম আর্থাৎ ছবির সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। মুগ্ধ হচ্ছি- প্রেম কবিতা দ্রোহে।   
না বুঝেই মার্ক্সের তত্ত্বের নামে খণ্ডিত ও বিকৃত তত্ত্ব্প্রচার করছি ‘ধর্ম আফিম”। পাশ্চাত্যের সেক্যুলার সংস্কৃতির নামে খ্রিস্টানিটি মনে গেঁথে ফেলছি। শৈশব থেকে এইভাবে পাল্টাতে থাকি প্রতিদিন। এরমধ্যে হাতে পেলাম  জাঁ পল সাঁত্রের ‘রুটস অফ ফ্রিডম’ ট্রিলজি ‘যখন সুমতি’ ’শিকল অন্তরে’ ‘আরো কিছু জীবন’। সিনেমা দেখলাম ঋত্বিক ঘটকের, জ্যাঁ লুক গঁদার, বানুয়েল— পারিবারিক জানালা দিয়ে ঢুকে পড়লো মনে। প্রথমে টানলো সালভেদর দালি আর পিকাসো কিন্তু কেঁদে ফেললাম ভিনসেন্ট ভেনখঘ-এর শিল্প জীবনের ব্যথায়। বড়ে নুসরাত আলির খেয়াল, নুসরাত ফতে আলি খানের কাওয়ালী, বড়ে গোলাম আলি ও গোলাম আলির গজল, নূরজাহান, বেগম আখতার, পারভীন সুলতানা ও সামসাদ বেগম-এর গান। বাঙলায় গীতা দত্ত ও সন্ধ্যার গান-এর মধ্যে মুজিব-জিয়া-মঞ্জুর হত্যাকারী এরশাদ-এর স্বৈরশাসন। লিখলাম—
       এই শীতে পোড়ো গণতন্ত্র তুলে ধরি
       কাপাস তুলোর উষ্ণতায়।
অথবা
        মৃত্যু থেকেই আমার জন্ম
        বারবার জন্ম নেবো, আমি আমরা আমিগুলি
        মৃত্যুকে ভয় দেখাবার জন্য।

এইসব পদ্য ঘিরে আমার শৈশব ৭০-এর বুক চিরে। এই হাতমসকরা থেকে আশিতে আমার কবিতা লেখার শুরু।
ফলে নানাবাড়ির খলসে, রয়না, পাবদা, গুলশা, খয়রা, চিতল, টেংরা, জিয়েল, মাগুর, পুঁটি, ঝিয়া, পাকাল মাছের ঘ্রাণ আমার বুক থেকে মুছে জেগে উঠলো কবিতা। নানাবাড়ির দলিজ ঘর, কাচারি বাড়ি, ছয় ফুট মোটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ১০ বিঘার উপর বাড়ি, প্রতিটা ঘরের মধ্যছাদে বুনো কবুতরের ঘর, দোয়েলের ডিম ভাঙা, পানি সেচে মাছ ধরা, বাঁশের বন্দুক বানিয়ে পটকা ফল দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, বাওড়ে জোকের ভয়ে নুন নিয়ে জলে নামা। ভাত, কুষ্টা, কচু, ছোলাশাক, হেলেঞ্চা ইত্যাদি শাকের ঘ্রাণ। ছোলাহুড়া, রস চুরি, শ্মশানে পেঁচার ডাক...এই ছিল শৈশব। সব ভুললাম কলোনি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে। হেগেল এর নামে খ্রিস্টানিটি আমার মনে মহর মেরে দিল। শৈশবেই ভেবেছি ধর্ম মানে খারাপ। এই বৈপরীত্যে কবিতা এগলো... ভাগাড়ে পড়ে রইল আমার ছোটকালের স্মৃতি। 
এর মধ্যে আশির লিটলম্যাগে যুক্ত হয়ে লিখলাম ‘প্রতিশিল্পে’র ইশতেহার। এই সবকিছুর মধ্যেই শৈশবমৎস্যের পেটের মধ্যে লুকানো ভ্রমরের পেটে লুকিয়ে রইল আমার কবিতাদৈত্যের প্রাণ। কখনো কখনো টুপ করে পানির তল থেকে মুখ উচুঁ করে আবার পানির গভীর তলে ডুবে যাওয়া।
আমি আর বাংলাদেশ এক সাথে জাগরণের মন্ত্র পেয়েছি। ১৯৬৫-এর ১৯ আগস্ট জন্ম আমার আর ৬৯-এ জাগতে শুরু করেছে বাংলাদেশ।
আমার শৈশব বাংলার কাদাজল, পুঁটি আর খলসে মাছেদের মধ্যে, বেদনা ও রক্তের কিংবা মনে না পড়া হারিয়ে যাওয়া শব্দ-গুঞ্জন-মালা-বুড়ির গল্পের ঝুলিতে।
২০ জুন ২০১৫

 


পাবলো শাহি : কবি ও প্রাবন্ধিক। বাংলাদেশ। 

        
        

    

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।