দুপুর ০১:০১ ; বুধবার ;  ২২ মে, ২০১৯  

মারিও বার্গাস যোসার শৈশব || স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ : রাজু আলাউদ্দিন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আরেকিপা ১৯৩৬-১৯৩৭
পুরো নাম হোর্হে মারিও পেদ্রো বার্গাস যোসা। পিতার নাম এর্নেস্তো বার্গাস মালদোনাদো, মায়ের নাম দোরা যোসা উরেতা। বাবা-মার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর মায়ের পরিবারের লোকজন অর্থাৎ মা-মামা এবং নানাদের মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকেন তিনি।  তার বাবা মৃত— এরকম ধারণা নিয়েই বড় হচ্ছিলেন শিশু মারিও। সত্য কথা জানার সুযোগ হয় তার দশ বছর বয়সে যখন বাবার আবির্ভাব ঘটে।
“বুলেবার পাররার দ্বিতীয় তলায় থাকতেন আমার নানা-নানীরা, ওখানেই দীর্ঘ প্রসব বেদনার মধ্য দিয়ে ১৯৩৬ সালের ২৮ মার্চের ভোরবেলা আমার জন্ম হয়। নানা টেলিগ্রাম মারফত বাবার কাছে পৃথিবীতে আমার আগমন বার্তা জানালেন। কিন্তু বাবা এর কোন জবাব দেননি। এমন কি মাকে কোনো চিঠিও দেননি তিনি। তারা জানালেন আমাকে মারিও নামে ব্যাপ্টাইজ করা হয়েছে।”
“নিজেকে আমার সব সময়ই আরেকিপার বলে মনে হয়েছে এবং আমাদের সম্পর্কে পেরুতে যে ঠাট্টা (Broma) চালু আছে মনে হয় আমাদেরকে ঈর্ষার কারণেই সেটা হয়েছে। তারা বলেন আমরা নাকি উদ্ধত, সহানুভূতিহীন, এমনকি উম্মাদ। আমরা কি অনেক বেশি বিশুদ্ধ স্প্যানিশ বলি না? আমাদের কি এই অসাধারণ স্থাপত্য সান্তা কাতালিনা নেই যেখানে ৫০০ নারী থাকতে এসেছিলো? আমরা কি পেরুর ইতিহাসের বড় বড় ভূমিকম্প এবং সর্বাধিক বিপ্লব পার হয়ে আসিনি?” 


কোচাবাম্বা ১৯৩৭-১৯৪৫
মারিওর জন্মের বছর বলিবিয়ার সান্তা ক্রুস-এ তুলার চাষ প্রবর্তনের এক চুক্তিতে সাক্ষর করেন তার নানা পেদ্রো যোসা। কোচাবাম্বার লাদিসলাও কাব্রেরা সড়কের পাশে তারা বিশাল তোরণসহ উঁচু ছাদের এক বাড়ি তৈরি করেন যার আঙ্গিনা জুড়ে ছিলো বৃক্ষরাজি। এখানেই মারিও তার পরবর্তী নয় বছর কাটিয়েছেন।
“অবশ্যই পাঠের আবিষ্কারও এই সময়ের একটা প্রধান ঘটনা। কোচাবাম্বার কলেহিও লা সাইয়ে’তে আমি পাঁচ বছর বয়সে পড়তে শিখি। পাঠ আমার কাছে এক মুগ্ধকর, আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছিলো। প্রতি ক্রিসমাসের আগে, মনে পরে, সবসময় আমি যিশুর (Niño Dios) কাছে চাইতাম যেন আমার জন্য তিনি বইপত্র নিয়ে আসেন। মনে পরে কোনো কোনো ক্রিসমাসের দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেতাম আমার বিছানার চারপাশে বইয়ের উপহার। এ এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য।”
“আমার সব মামারা আমাকে বই উপহার দিতেন, বিশেষ করে উপন্যাস। ঐসব বইয়ের মধ্যে একটা ছিলো কার্ল মাই  নামের এক জার্মান লেখক যিনি দূর প্রতীচ্যের, যে-প্রতীচ্যে তিনি কখনো যাননি, তার গল্প বলতেন। এরপর ছিলো এমিলিও সালগারির সান্দোকান-এর মতো উপন্যাসসমূহ। গোটা লাতিন আমেরিকাতে সে সময় যে-দুটো পত্রিকা দেখা যেত সেগুলোর কথা মনে পরে, একটা ছিলো আর্হেন্তিনার বিল্লিকেন, আরেকটা চিলির পেনেকা।”


পিউরা ১৯৪৬
মামা হোসে লুইস বুস্তামান্তে ই রিবেরা পেরুর প্রেসিডেন্ট হওয়ায় মারিও নানা পেদ্রো যোসার কাছে বায়না ধরে পিউরার প্রিফেক্ট (Prefect) হওয়ার। কোচাবাম্বা থেকে তাদের পরিবার পেরুতে চলে আসে যেখানে মারিও কলেহিও সালেসিয়ানোতে পড়াশুনা করেন। এগিগুরেন বেড়িবাঁধে বেড়ানোর সময় দশ বছর বয়সে মা তাকে জানালো যে অচিরেই বাবার সাথে তার দেখা হতে যাচ্ছে। এর আগে পর্যন্ত তার ধারণা ছিলো তার বাবা মারা গিয়েছেন। এই সাক্ষাৎ চিরস্মরণীয় হয়ে আছে মারিওর জীবনে। মারিও বার্গাস যোসা বহুবার বলেছেন যে তার বাবার বিরুদ্ধে না গেলে মনে হয় তিনি কখনোই লেখক হতেন না। 
“পেরুতে আসায় আমি খুবই উদ্বেলিত হয়েছিলাম, আবার একই সঙ্গে তা যন্ত্রণাদায়কও ছিলো; কারণ স্কুলে আমার কথা বলার ধরণ শুনে সবাই হাসতো। আমি কথা বলতাম গ্রাম্যভঙ্গীতে।” 
“পিউরাতে ইতিমধ্যে কবিতা লেখা শুরু করেছি যেগুলো নানা বাড়িতে আমাকে আবৃত্তি করতে হতো। মা আমার কবিতা নিয়ে খুব হাসাহাসি করতো (...)। মা আমাকে খুব উৎসাহ দিতো, লুচো মামাও। মামা নিজেও যৌবনে কবিতা লিখেছেন। ব্যাপারটা আমি আবিষ্কার করি যখন তিনি আমাকে কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করে শুনালেন। জিজ্ঞেস করলাম এগুলো কার লেখা। সে ব্যাপারে কিছু বললেন না। পরে আবিষ্কার করলাম যে এগুলো তারই লেখা।”


লিমা ১৯৪৭-১৯৫১ 
লিমা ভ্রমণে যান যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ বছর এবং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম দুই বছর পড়াশুনা করেন কলেহিও লা সাইয়েতে। বাবার সাথে পরিচয় তার জীবনকে বদলে দেয়। কারণ এখন তাকে বাবার সঙ্গে থাকতে হবে। যে নানা-নানী এবং মামা খালারা তাকে স্নেহ মমতা দিয়ে আগলে রাখতেন এখন সে তাদের কাছ থেকে দূরে। বাবার চাপে পরে কিশোর মারিওকে ঢুকতে হলো কলেহিও মিলিতার লেওনসিও প্রাদো দে লিমায় যেখানে তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ের (Secundaria) তৃতীয় এবং চতুর্থ বছর পড়াশুনা করেন।
“বাবার সাথে লিমায় আসার পর থেকেই সাহিত্যের সাথে আমার সম্পর্ক বদলে যায়। বাবার সাথে সম্পর্কটা যেহেতু খুব খারাপ ছিলো তাই লিমায় আসার অর্থ দাঁড়ালো এই যে দেশের সাথে, জগতের সাথে, প্রাকৃতিক প্রেক্ষিতের সাথে আমার সম্পর্কটা ছিন্ন হয়ে গেলো। নানা-নানী আর মামা মামিদের কাছ থেকে দূরে থাকাটা ছিলো বেদনাদায়ক। পাশাপাশি এও মনে হতো যেন মায়ের কাছ থেকে আমাকে চুরি করে নিয়ে এসেছে, যেন আমি আর তার নই। এখন আমি এই ভদ্রলোকের, যিনি আমার কাছে ভয়ংকরের এক মূর্তরূপ।”
“ভালো রেজাল্ট করলে ছুটির দিনগুলো মিরাফ্লোরেস-এ মামাদের সঙ্গে কাটাতে পারতাম। ওখানেই আমার বয়সের কয়েকজন ছেলেমেয়ের সাথে পরিচয় হয় যাদের সাথে কৈশোরের স্বপ্নগুলো তখন ভাগ করে নিতাম। এটা ছিলো তখনকার দিনের ভাষায় “এক আখরা”: সমান্তরাল এক পরিবার, যাদের আখরা হচ্ছে রাস্তার কোণ, যাদের সঙ্গে ফুটবল খেলা, গোপনে সিগারেট খাওয়া, মাম্বো নাচ শেখা আর মেয়ে পটানো ছিল মূল কাজ।”


পিউরা ১৯৫২
কলেহিও মিলিতার লেয়নসিও প্রাদো ছেড়ে পিউরার সান মিগেল কলেহিওতে প্রবেশ করেন মারিও। এখানে তিনি তার প্রথম নাট্যকর্ম ইনকার পলায়ন পরিচালনা করেন। ১৯৫২ সালের জুলাই এ শহরের বিচিত্র নাট্যমঞ্চে তা প্রদর্শিত হয়। ‘লা ইন্দুস্ত্রিয়া’ নামক দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

“১৯৫২ সালের এপ্রিল ও ডিসেম্বরে ওখানে যা-কিছু ঘটেছে তা আমার মধ্যে মননশীল এবং প্রাণবন্ত কৌতুহলের জন্ম দিয়েছে— এটা সব সময়ই স্মৃতিকাতরতার সাথে আমার মনে পরে। এসব কিছুর কেন্দ্রীয় মানুষটি ছিলেন লুচো মামা (...)। লুচো মামার প্রতি আমার পক্ষপাত কেবল আমার প্রতি তাঁর স্নেহ মমতার জন্যই নয়, আমাকে ঘিরে থাকা জীবনের নিরন্তর নবায়নের অভিযানময় গৌরবের কারণেও। কারণ তখন থেকেই আমি মুগ্ধতা অনুভব করেছিলাম সেই চরিত্রগুলোর জন্য যেগুলো উপন্যাস থেকে বেরিয়ে আসা বলে মনে হতো।”

নবীশ সাংবাদিক
দৈনিক  লা ক্রোনিকায় তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন এভাবে— “সেই সকালবেলা আমি উত্তেজনা আর ভয় নিয়ে লা কাইয়ে পান্দোর কাছে পুরোনো দ্বিতলা দালানের সিঁড়ি বেয়ে উঠি। সেখানটায় তখন লা ক্রোনিকার অফিসটি ছিলো। গিয়ে দেখা করলাম খুবই অমায়িক এক ভদ্রলোক জনাব বালবের্দের সাথে যিনি সংবাদিকতা বিষয়ে নানান সব ধারণা দিয়ে আমাকে মাসে পাঁচ শ সোল (পেররু মুদ্রার নাম) ও ছবিসহ এক পরিচয়পত্র দেয়া হলো যেখানে ’সাংবাদিক’ কথাটা রয়েছে”। ১৯৫২ সালের দিকে তিনি, হাইস্কুলে (সেকুন্দারিয়া) থাকাবস্থায় পিউরার লা ইন্দুস্ত্রিয়া'তে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন। 
“যে তিন মাস আমি ‘লা ক্রোনিকায় কাজ করেছি সে সময়টা আমার লক্ষ্য তীব্র অস্থিরতায় ভরে ছিলো। কার্যত ওখানেই সাংবাদিকতা শিখেছিলাম, চিনতে পারলাম অজানা এক লিমাকে এবং ঐ প্রথম ও শেষবারের মতো জীবন হয়ে উঠেছিলো বাউণ্ডুলে।” 

 


রাজু আলাউদ্দিন : কবি প্রান্ধিক ও অনুবাদক। বাংলাদেশ। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।