দুপুর ০১:০২ ; বুধবার ;  ২২ মে, ২০১৯  

জহর সেনমজুমদার-এর একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

 

 

 

স্বমেহন

কবিতার মতো এই মৃদু ধানক্ষেত; মাঝে মাঝে শ্বাসাঘাত পড়ে
জলপথে পড়ে আছে অগ্নিদগ্ধ বালিকার চুমু
স্থলপথে পড়ে আছে অগ্নিদগ্ধ বালিকার চুমু
এই চুমু বড়ো উপাদেয়
তুমি প্যাঁচা, তুমি সখা
চিরকাল স্বমেহনে নীরব আছো
তোমার চোখের সামনে মায়েদের হৃৎপিণ্ড জলে ভেসে যায়
তোমার চোখের সামনে বাবাদের শৌচাগারে সাপ ঢুকে পড়ে
কবিতার মতো এই মৃদু ধানক্ষেত; আমাদের রক্তমাখা কাব্যগ্রন্থে
তুমি কি একবার আসবে? ওগো প্যাঁচা দার্শনিক প্যাঁচা


প্রতিদিন

আমি বলবো না; আমি কিছু বলবো না; তুমি এসে একবার দেখে যাও
আমাদের মায়েদের লাশে প্রজাপতি প্রতিদিন কাঁথা বুনে যায়
রান্নাঘরে হাঁড়ির ভেতর চাঁদ রান্না হয়; আমরাও পাগলের মতো
জোৎস্না দিয়ে ভাত খাই; আমাদের ঘুমের ভেতর ছেঁড়া ফাটা
কবিতাও ওড়ে; কিন্তু আমরা কখনোই কবিতা লিখি না
প্রিয় খরগোশ; তুমি ছাড়া আমাদের পাশে কেহ নাই
মাঝে মাঝে একটা ঝাপসা গাছ এসে নিঃশব্দ শিকড়ের কথা বলে 
মাঝে মাঝে একটা অস্পষ্ট মেষপালক চীৎকার করে গালাগাল দেয়
চক্ষু ফেটে রক্ত বার হয়; চক্ষু ফেটে পুঁজ বার হয়
প্রিয় খরগোশ; তোমার কাব্যগ্রন্থ পড়তে পড়তে আমরাও আস্তে আস্তে
জলের গভীরে নেমে যাই


বহুবিধ

কালিমাখা হ্যারিকেন নিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের মলদ্বার থেকে ক্রমে আমি উঠে যাই
সহস্রার দিকে; মাথাভর্তি অন্ধকার নিয়ে তুমি তখন একা একা চুপচাপ
গাছেদের চুলে হাত রেখেছ; শোনো, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই আমার
কালিমাখা হ্যারিকেন ছাড়া আমি কিছু দেখতে পাই না আর
ভাঙা ভাঙা রামধনুর ওপর শুয়ে আছে তোমার সন্তানসন্ততি
আমি কি ওদের আজ ফেরত পেতে পারি?
শূন্যে শূন্যে বহুবিধ ঢেউ
বিশাল এক আদিগন্ত মাতৃগর্ভ থেকে নেমে আসছে যৌন কৃষিকর্মী
চারিদিকে বকুলগাছ ও কৃষ্ণচূড়া গাছের ঝগড়া শোনা যাচ্ছে
উড়ন্ত সখা; ওগো উড়ন্ত সখা; আমি তোমার সহস্রারে গৃহ বাঁধলাম


ময়ূরনিক্কন

গৃহস্থের ভিটেমাটি অশ্রু-বিগলিত; আমি তাকে মাথায় তুললাম;
ওগো সখা ময়ূরনিক্কন; একটু কি সাহায্য করবে আমায়? আমি
বহুরাত মাকড়শার জালে ঘুমিয়েছি; আমি বহুদিন পা ছাড়াই
হেঁটে হেঁটে শতাব্দীর হাঁড়িকাঠে তাঁত বুনেছি; কিন্তু তবুও
তোমার সাহায্য পাইনি; আমার নষ্টভ্রষ্ট মাথার ভেতর 
মাছরাঙা উড়ে মাছ ধরেছে; চাপ চাপ অন্ধকারে
বারবার মনে পড়েছে সন্ন্যাসীরাই সৃষ্টি করে যৌনতার দারুচিনি দ্বীপ
আর ব্রহ্মাণ্ডের পাঠশালা ক্রমশ অগ্নি ও জলের ভেতর ঘুম গিয়েছিল
আমি কি তাহলে আমার হাতভর্তি স্বপ্ন মাটিতে পুঁতে দেবো?
ওগো সখা ময়ূরনিক্কন; তোমার পিঠে আমাদের এই শান্ত ছেলেবেলা
রেখে যাচ্ছি; ইচ্ছে হলে নিজের মতো সৎকার করো

 

ভূকম্পপ্রবণ

মেঘে ঢাকা আলপথে সাপ ও ওঝার যুগ্মধ্বনি পড়ে আছে; আমি
সন্ধ্যাকালে সেই ধ্বনি সংগ্রহ করি; বৃষ্টিভেজা ভিক্ষা নিয়ে আজ
কতদূরে গিয়েছ তুমি? ওগো সখা; তোমার টিয়ার পাশে
আমাদের নাভি পড়ে আছে; তোমার প্যাঁচার পাশে আমাদের
বাঁশি পড়ে আছে; কোথাও আহ্লাদ নেই; কোথাও আমোদ নেই
মেয়েদের রান্নাঘর চারিদিকে ভূকম্পপ্রবণ হয়ে আছে
মাঝরাতে অবৈধ সঙ্গমের পর স্বামীর মুণ্ডু কোলে হেসে ওঠে নারী
ওগো সখা; তুমি ওই স্বামীর মুণ্ডুর ভেতর ঢুকে বিষ তুলে নাও
চারিদিকে জল শুধু জল; ভেতরে কাঁকড়ার বাক্য রয়ে গেছে
আমি শুধু ঘুরে ঘুরে সেই বাক্য সংগ্রহ করি
  

ভাসমান

ওগো সখা; বৃষ্টিভেজা ধানক্ষেতে বারবার শিকারিরা ফিরে ফিরে আসে;
তুমি কি এইসব শিকারিদের মাদল ও মাতলামির হাঁড়িকাঠে মাথা দেবে?
তুমি কি সহস্র শুক্রাণুকণায় প্রতিদিন লিখে রাখবে প্রজাপতি প্রেমিকের
পালকখেলা? আমাদের ডাকবাক্সের ভেতর সদ্যজাত মথেরা ঘুমোয়
বর্ষাজলে ভিজে ভিজে মেয়েরাও ভাসমান মনখারাপের মতো চারিপাশে
উড়ে উড়ে যায়; শিকারতত্ত্ব ঘিরে একগুচ্ছ উঁইপোকার বংশবৃদ্ধি হয়;
ওগো সখা; পঞ্জিকার হলুদ পাতায় পানকৌড়ির ডিম থাকে
একঝাঁক সাঁওতাল সারাগায়ে কাদামাটি মেখে ব্রহ্মাণ্ডের জলে ঝাঁপ দেয়
জল জল, জল জল, ওপর থেকে কালো লাগে
নিচে তার চারুচিনি দ্বীপ কথা বলে
ওগো সখা; বৃষ্টিভেজা ধানক্ষেত সাইকেলে তুলে আমরা এসেছি
কথা বলো; কথা বলো


চক্ষু 

ছোট ছোট ধানক্ষেত; আশ্চর্য এই দারুচিনি; ওগো সখা
বৃষ্টিভেজা তৈরি করো পথ 
ভিখারির গৃহ নেই? গৃহ দাও ওকে 
বৃক্ষতলে পথহারা শিশু বসে আছে? ইসকুলে দাও ওকে
কাল সারারাত স্তব্ধ বনভূমির ভেতর বাঁশি বেজেছিল
ওগো সখা, আমাদেরও বাঁশি বাজাতে দাও 
ছোট ছোট ধানক্ষেতে শ্বাসাঘাত ছন্দ দিয়ে আমরা 
যুগে যুগে কৃষি লিখব; শুধু কৃষি লিখব
ওগো সখা বৃষ্টিভেজা তৈরি করো পথ
গৃহে ফিরতে ফিরতে আমরা ওই চলমান পথ থেকে 
তোমার চক্ষু কুড়িয়ে নেবো


চিহ্ন

ওগো সখা মা নাই আমার; বাবার কাঁধে উঠে দেখলাম
অন্ধ মাস্টারমশাই বটবৃক্ষের নীচে ছোট্ট এক ইসকুল পেতেছে
ছোট্ট ছোট্ট ইঁদুর; ছোট্ট ছোট্ট হরিণ; আর চারিপাশে
কালো কালো জামরুলগাছ; শূন্যে হাত রেখে আমি 
জামরুল পাড়ি; ওগো সখা, মা নাই আমার 
বাবার হাড় নিলে কাঁধ ছাড়া কিছু নাই আমার 
তুমি আমায় হাত ভরে জামরুল দিয়েছ; তুমি আমায় 
জিভে জল আর মাড়িতে আশ্চর্য শক্তি দিয়েছ
এইবার আমাকে ওই অন্ধ মাস্টারমশাইয়ের কাছে পৌঁছে দাও 
ছোট্ট ছোট্ট ইঁদুর হবো; ছোট্ট ছোট্ট হরিণ হবো 
বাবার কাঁধে নয় আর; এবার পায়ে পায় পদচিহ্নে যাবো  


চাঁদ

বৃষ্টিভেজা ধানক্ষেতে শব্দহীন কবিতা লিখেবো আমি; ওগো সখা
তুমি বলো, এই যন্ত্রশহরে বৃষ্টিভেজা ধানক্ষেত কই? আমিও
বারবার ঘুমঘোরে স্বপ্ন দেখি; চাঁদ সিঁদুর মেখে মাটিতে নেমেছে
আমাদের ক্লান্ত বাবা সিঁদুর মাখা চাঁদ নিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে
ক্রমাগত চক্কর দিচ্ছে, বাবা বলছে, ওই শোনো বাবা বলছে
সিঁদুর মাখা চাঁদ কিনবে? সিঁদুর মাখা চাঁদ কিনবে?
শুকনেরা ঝাঁপ দিলো শেয়ালেরা ঝাঁপ দিলো চাঁদের ওপর
ওগো সখা, বাবার হাত থেকে চাঁদ কেড়ে নেবে বলে
সবাই বাবাকে কিল চড় ঘুষি লাথি মারছে
ওগো সখা রক্ষা করো ওগো সখা রক্ষা করো
বৃষ্টিভেজা ধানক্ষেতে কবিতা লিখবো আমি; তুমি শুধু বাবাকে বাঁচাও


ধিক

ওগো সখা চেয়ে দেখো; ওগো সখা চেয়ে দেখো; আমাদের মায়েরা
হাজার হাজার বছর ধরে ছেঁড়া শাড়ি গায়ে দিয়ে পৃথিবীর গোধূলিতে 
দুই হাতে ক্রমাগত হলুদ গুঁড়ো করে
ওগো সখা; মায়েদের চক্ষুর ভিতর শান্ত জোনাকি

ওগো সখা; মায়েদের চক্ষুর ভিতর ভাঙা রান্নাঘর;
আমাদের বাবারা মাকড়শার জাল গায়ে দিয়ে উড়ছে
এখানে সেখানে উড়ছে আর ফুটো কণ্ঠনালী দিয়ে 
রক্ত পড়ছে পুঁজ পড়ছে; তুমি আমাদের সখা
তুমি ছাড়া আমাদের উদ্ধার করবে কে?
বাবাদের ধিক; বাবাদের ধিক; বাবারা জানে না 
মাকড়শার জাল কখনো কোনোদিন শাড়ি হয় না

 


জহর সেনমজুমদার : কবি প্রাবন্ধিক এবং অধ্যাপক। ভারত। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।