রাত ০৯:০৮ ; রবিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৯  

মাসুদ খান-এর একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

কারণবায়ু

প্রতিটি কালোকে আরো কালো করে দিয়ে 
তবেই তো আলোকিত হয়ে ওঠো হে আলোকছন্দা।

বহু নক্ষত্রকে ম্লান করে দিয়ে, 
ঠেলে দিয়ে হিমকৃষ্ণ-গহ্বরের নিয়তির দিকে 
তারপরেই-না তুমি অতি-আলোমতি প্রেমকুমারী জ্যোতিষ্কগন্ধা।

আমাদের অগণিত ছোট-ছোট বহুবর্ণ মিথ্যা—
সেসব কুড়িয়ে নিয়ে ব্লিচিংয়ে শোধন ও শ্বেতীভূত ক’রে
তবেই তো সত্যবতী তুমি সত্যানন্দা।  

যে-নিয়মে নিয়মিত গ্রহদের বাঁকা বিচলন
সে-নিয়মে কুসুমিত একইসাথে বন আর মন।  


রসমঞ্জরী

শান্ত সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে একা এক রণতরী। 
দূর থেকে মনে হয় যেন 
অনন্ত ময়রার গোল গামলাভরা রসের ওপর ভাসছে 
এক ত্রিকোণায়তন রসমঞ্জরী—  
উপরিভাগে একটি একটি করে বসানো সব বুন্দিয়া 
আর কুড়মুড়ে পেস্তা বাদাম । 

মিষ্টান্নের দিকে চঞ্চু ব্যাদান করে ত্রিশ ডিগ্রি কোণে 
তেড়ে নেমে আসছে এক অতিকায় খেচর।

ওই হা-করা ধেয়ে-আসা চঞ্চু তাক করে ছুটল শতশত মিসাইল মুহূর্মুহূ। 

অবিশ্বাস্য বেগে ছুটে-আসা সেইসব জ্যান্ত মিসাইল, 
পেছনে লাঞ্চার, তারও পেছনে ডেকের ওপর 
পেস্তা বাদাম বুন্দিয়ার মতো ছড়ানো-ছিটানো সব ট্যাংক আর যুদ্ধবিমান 
আর জলযোদ্ধাদের কৃত্য ও কম্যান্ড
আর এই সবকিছু ধারণ করে আছে যে বহুতল রণতরী... 
সুড়ুৎ করে সমস্তটাই টেনে নিলো পাখি এক টানে, দ্রুত চঞ্চুক্ষেপে 

ঠোঁট আর কষ বেয়ে তখনো ঝরছে রসমঞ্জরীর রস। 
 

সনেট

বিন্দু শূন্যমাত্রিক। রেখা একমাত্রিক। ক্ষেত্র দ্বিমাত্রিক। ঘনবস্তু ত্রিমাত্রিক। দেশকাল চতুর্মাত্রিক... 

বহু ও বিচিত্র মাত্রা নিয়ে অনেককাল ধরে ভেবে আসছে মানুষ, মাত্রাতিরিক্তভাবে। 
মানুষের মন অন্তত আঠারোমাত্রিক। ভাবনানন্দ সনেট।


জলবিদ্যুৎ

দূরে নতোন্নত ল্যান্ডস্কেপ। পাহাড়ি অঞ্চল। 
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জলতড়িৎ প্রকল্প— 
জলবিভাজিকা, জলবন্ধন, জল-তুরবিন, বিদ্যুৎজননযন্ত্র...।   

তারও আগে আরো দূর থেকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে 
ভেসে এসেছে ফ্যারাডে-র বিজলিচৌম্বক আইন। 

পাহাড়ি নদীর ধারালো স্রোতের সঙ্গে ঘর্ষণ ঘটে 
ফ্যারাডে-র পরাক্রান্ত আইনের। 

জ্বলে ওঠে জলবিদ্যুৎ। 


 

মৌসুম

গাছগাছালিরা আবার প্রকাশ করবে পত্রপত্রিকা। 
কীটাক্ষরে ছাপা হবে তাতে কথা ও কথিকা, কবিতাও... 
মহোৎসব লেগে যাবে বানানভুলের, কাটাকুটি, 
নিরক্ষর পাতায় পাতায়। 

“আমার লাইন হয়ে যায় আঁকাবাঁকা, ভালো না হাতের লেখা...” 
গাইতে গাইতে এই তো এখনই ছুটে যাচ্ছে কাঠবিড়ালির শিশুকন্যা। 
তার ফোকলা দাঁতের খিলখিল হাসির হিল্লোলে 
আগাম চেয়ার উল্টে পড়ে যাচ্ছে ওই  
দ্যাখো সাপ্তাহিক কলাকাণ্ডের ঘোড়েল সম্পাদক।
রসিক পাঁকের মধ্যে খাবি খাচ্ছে সম্পাদনা, মৌসুমি আহ্লাদে।

অপরের ভাব ভাষা চুরি করে পাইকারি চালান দিতে গিয়ে 
ধরা খেয়ে জব্দ বসে আছে বর্ণচোরা দুই চতুর চড়ুই। 
শরমে স্থগিত করে দিচ্ছে পত্রপ্রকাশনা আপাতত 
শতশত ধোঁকা-খাওয়া মাটি-ঝোঁকা রাংচিতা-ঝোপ,
আলাভোলা আশশেওড়ার ঝাড়। 

আর ক-টা দিন পর
উড়াল কটাক্ষ ছুড়তে ছুড়তে গাছ থেকে গাছে 
উড়ে যাবে উড়ুক্কু শিয়াল, গিরগিটি বহুরূপী...  
আর প্রকাশিত পত্রপত্রিকা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে বলে 
দুড়দাড় গাছে উঠে পড়বে 
আরোহসক্ষম বেশ কিছু বন্য বেল্লিক ছাগল।
তারা খুদে পত্রগুলি খাবে আগে। 


সাক্ষাৎ

আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে বহুদিন পর।
মন যেন আজ হাবল-পূর্ববর্তী উপদ্রবহীন মায়াময় রাতের আকাশ— 
নিরিবিলি নীরব নিঝুম।

বহুকাল পর আজ দেখা হবে তোমার সহিত। 
জোনাকি-ফুটিয়ে-তোলা রাতের আকাশ ঝেঁপে নেমে আসবে 
বিলের পানিতে। ফুটে উঠবে অগণন তারামাছ। 
ধ্রুবকের মতো জ্বলবে তাদের প্রতিটি কৌণবিন্দু।

কতদিন হলো তুমি নাই এই দেশে। 
উঠানে বরইয়ের গাছে চুপচাপ
ঘনিয়ে-জড়িয়ে-থাকা স্বর্ণলতাগুলি 
এতদিনে বদলে গেছে জং-ধরা তামার তন্তুতে।
মৌমাছিরা সেই কবে উড়ে গেছে দূরের পাহাড়ে
ফাঁকা-ফাঁকা স্মৃতিকোষ হয়ে ঝুলে আছে 
এখনো মৌচাক, কৃষ্ণচূড়া গাছে।    
গুঞ্জনের রেশ, মধু ও মোমের অবশেষ, কিচ্ছু নাই কোনোখানে।

অভিমান করে নদী সরে গেছে দূরে
নাইয়র-নিতে-আসা নৌকাসহ। 
তবুও এখনো,  
সংসারে-হাঁপিয়ে-ওঠা, ক্রমশ-ফুরাতে-থাকা
নাম-না-জানা কোনো গৃহবধূ 
বিরহবিলাপ সুরে খুনখুনিয়ে গেয়ে যাচ্ছে অস্ফুট কাকুতিগান—  
“ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা পান খাইয়া যাও বাঁশি আল্লা’র দোহাই
এ পরানের বিনিময়ে তোমার পরান দিয়ো হাসি আল্লা’র দোহাই...”   


মূর্ছনা

জানোয়ার-জাগানো অসভ্য হাওয়া বইছে বনে। আর মনে। 
শিস দিয়ে, চোখটিপ মেরে, এলোপাতাড়ি ডিগবাজি 
খেয়ে খেয়ে ধেয়ে যাচ্ছে লুম্পেন বাতাস 
যত বন্য বাইসন-খ্যাপানো অশিষ্ট উপভাষায়। 

সঙ্গে-সঙ্গে ছাড়া-পাওয়া বাসনারা সব 
লাফিয়ে উঠছে জ্বলে-ওঠা জাগুয়ারের ভঙ্গিতে।
 
পক্ষান্তরে, এই দেশে আষাঢ়ের গুমোট নিরাক
থম ধ’রে আছে বহু বিষণ্ন বাতাস—
তারই মধ্যে কোথা থেকে হঠাৎ একটি
প্রসন্ন পাহাড়ি সুর হালকা মূর্ছে উঠেই মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে। 

 
প্রেমের প্লবতাগুণে...  

প্রেমের প্লবতাগুণে স্রেফ 
বিশ্বাসে নির্ভর করে অতীত নিভিয়ে দিয়ে 
ধর্ম-গোত্র-পরিজন ছেড়ে 
প্রেমিকের হাত ধরে একবস্ত্রে চলে 
এসেছে মেয়েটি। 

এসেই পা হড়কে পড়ে গেছে 
পাপ আর পাঁকে পূর্ণ সংসারের কুয়ার ভিতর।

অচেনা সংসার-ভরা কিলবিল-করা সাপ। 

তারপর
নীল হতে হতে নীলকণ্ঠী মেয়ে 
একদিন সংসারের সবগুলি কাঁথা পুড়িয়ে দিয়ে
সাপেদের লেজে লেজে আচ্ছা গিঁট লাগিয়ে, বানিয়ে লম্বা দড়ি 
তা-ই বেয়ে ঠিকই উঠে আসে সে গহ্বর থেকে।

আর সেই প্রেমিকপুরুষ
যে-কিনা একদা মরতে রাজি ছিল 
এক নয়, তিন-তিন দফা—
সে এখন কুয়াপাড়ে, বিভীতক গাছের মগডালে ব’সে 
দুই দিকে দুই পা ঝুলিয়ে ভাবলেশহীনভাবে 
বাজিয়ে চলেছে গায়ে-ফোসকা-ফোটানো 
বিছুটিপাতার বাঁশি।
 
হিসহিসে সাপের ভাষা একদম গেঁথে গেছে মেয়েটির মনে।


গ্লানি

এক ঘুণলাঞ্ছিত আসবাব, শান্ত সেগুনকাঠের। 
তার গ্লানি, আহত ব্যক্তিত্ব, তার যত ঘুণরন্ধ্রপথ... 

ওই রন্ধ্রপথেই ঘটে আসবাবের কেঠো রাগরেচন। 


নামায়ন 

ত্রিদোষে কাহিল দেহ, ত্রিতাপে পুড়ছে মন...
তবু সর্বঘটেই বিরাজ করে বাঘ ও তুলসিবন।

যাহা ঘট, তা-ই ভাণ্ড, তা-ই 
মন্দির ও ভূতাবাস বলে প্রচারিত। 
যেমন স্বর্গে যা মন্দাকিনী, 
পৃথিবীতে তা-ই গঙ্গা-পদ্মা,
পাতালে তা ভোগবতী নামে অভিহিত। 

 


মাসুদ খান : কবি। বাংলাদেশ। 

 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।