বিকাল ০৪:৩৮ ; মঙ্গলবার ;  ২১ মে, ২০১৯  

রামকমলের উপহার || মূল : কাজী আনিস আহমেদ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[কাজী আনিস আহমেদ বাংলাদেশি লেখক। প্রধানত ইংরেজি ভাষায় লেখেন। তিনি সাহিত্যপত্রিকা বেঙ্গল লাইটস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তার প্রকাশিত গ্রন্থ : ফোরটি এস্টেপস, গুড নাইট মিস্টার কিসিঞ্জার এন্ড আদার স্টোরিজ, ওয়ার্ল্ড ইন মাই হ্যান্ডস। রামকমলের উপহার  গল্পটি গুড নাইট মিস্টার কিসিঞ্জার এন্ড আদার স্টোরিজ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন মুহম্মদ মুহসিন।]

 

এখনো অলিখিত পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাসটির গ্রন্থকার হওয়ার দাবিদার রামকমল নয় মাস হল নিখোঁজ হয়ে গেছে। সে চিরতরেই নিখোঁজ কিনা এ ব্যাপারে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। তবে নয় মাসের মতো দীর্ঘ সময় কেউ নিজেকে ইচ্ছে করলেও লুকিয়ে রাখতে পারার কথা নয় বলেই নিখোঁজটা চিরতরেই বলে মনে হচ্ছে। নয় মাস ধরে তার সাথে আমাদের কারোর দেখা নেই, যোগাযোগ নেই। আমাদের কাছের-দূরের কারোর সাথে না। তারপরও আমরা আশা ছাড়তে চাইলাম না। সম্ভবত এই আশা রামকমলের প্রতি আমাদের ভালবাসা থেকেই শুধু উদ্ভূত না। আমরা মরিয়া হয়ে আশা করছিলাম আমরা দেখব সেই রহস্যময়ী উপন্যাসটির পরিণতি কী ঘটে যেটা লেখার যোগ্যতা রামকমলের পুরোপুরিই ছিল বলে আমরা ভাবতাম। 
বাহার খুঁজতে গেল রামকমলের পিতৃপুরুষের ঠিকানায়। ফিরে এসে বলল ওখানে রামকমল নামে কেউ কোনোদিন থাকত না। জয়দীপ কুষ্টিয়া গেল বাউলদের গঞ্জিকার আসরে খুঁজতে। দেখল ওখানে কেউ রামকমল নামের কাউকে চেনে না। রামকমলের গল্পগুলো ধীরে ধীরে বিশ্বাস হারাতে থাকলেও, অন্য অনেকেই শহরের অনেক সম্ভাব্য আস্তানায় তাকে খুঁজতেই থাকল। অনেক শুভানুধ্যায়ী বড়লোকের বাসায় খোঁজা হল। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার দিয়ে খোঁজা হল। স্পেশাল ব্রাঞ্চে আমার এক বন্ধু ছিল। উত্তরার ম্যাসেজ পার্লারে এবং সদরঘাটের চব্বিশ ঘন্টা খোলা রেস্টুরেন্টে খোঁজা হল। পাতি অস্ত্র কারবারিদেরসহ সকল অবৈধ কারবারিদের গণ্ডাদের মাঝে খোঁজা হল যাদের সাথে শেষ দিকটায় তার বেশ দহরম মহরম দেখা গিয়েছিল। 
কেউই কোনো কার্যকর ক্লু দিতে পারল না। যার সাথেই কথা হয় সে-ই বলে— ঐ মালের খোঁজ পেলে আমাকে একটু জানাবেন, আমি ওর কাছে টাকা পাই। এর চেয়েও কঠিন দুর্নাম বদনাম শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে উঠল। কলাবাগানে এক কাস্টমস কর্মচারির তার নেড়ে মাথাটা দেখিয়ে বলল— রামকমল এই চুলগুলো খেয়েছে। কথা ছিল সে তাকে এক অজ্ঞাত চর্মরোগের ওষুধ দিবে, দেয়নি। মিরপুরে এক গণ্ডা বলল— রামকমল তার বন্দুকের লাইসেন্সটি চুরি করেছে। যদি সামনে পায় রামকমলকে সে সোজা চোখ বরাবর গুলি করবে। আজিমপুরে যে খুঁজতে গিয়েছিল তার সাথে এক অল্পবয়সী অবসর-নেয়া অভিনেত্রীর সাথে দেখা হয়েছিল। তার কোলের বাচ্চাটির চোখ একদম রামকমলের মতো।
বিষয়গুলোতে রামকমলের খাস শিষ্যদের তুলনায় আমার অবাকবোধটা অনেক কম ছিল। কারণ আমি ঠিক রামকমলের শিষ্যদের একজন ছিলাম না। আমি রামকমলের বন্ধুস্থানীয় একজন ছিলাম এবং আমি তার বয়সী একজন ছিলাম। আমার সাথে তার দেখা হয়েছিল কয়েক বছর আগে। তবে মনে হচ্ছে সে অনেক দিন আগের কথা। এক বিখ্যাত কবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এই প্রথম দেখা। মূল জনতা থেকে একটু দূরে রামকমল তার লম্বাটে চোয়ালের মুখখানা অনেকখানি গম্ভীর করে একটি শিমুল গাছের সাথে শক্ত পেশীর শরীরটি হেলিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। গায়ে একটি আটসাট সাদা টি শার্ট। একটি ফিল্টারহীন সিগারেট ফুকছে। পায়ের লাল কেডস জোড়া ছিল শিমুল ফুলের মতোই লাল এবং বলে দিচ্ছিল এটাই রামকমল। চেহারায় একটি সাজিয়ে তোলা কর্তা কর্তা ভাব। তবে তার মধ্যেই আমি এক গভীর টেনশনের আবহ অনুভব করছিলাম। বিষয়টি আমাকে এক ঘোরের মধ্যে ফেলল। আমি কাছে গেলাম। জানতে চাইলাম— উনি আপনার খুব কাছের কেউ ছিলেন?
‘না না মোটেই না’, রামকমল বলল। ‘সে ছিল খুবই নিচু মানের এক লেখক। আমি নিশ্চিত হলাম যে তাকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।’
সেই প্রথম দেখা থেকেই আমি জানি রামকমল হল সেই রকম একজন মানুষ যার কাছ থেকে সবসময়ই অপ্রত্যাশিত কিছু আশা করা যায়। কবরের ওপর মাটির ঢেলাগুলো বিছানো শুরু করার পরই রামকমল এবং আমি ওখান থেকে হাঁটা দিলাম। আমরা কাটাবনে রামকমলের পরিচিত এটি রেস্টুরেন্টে এসে উঠলাম। দুই গ্লাস লেমন জুস অর্ডার দেয়া হল। এটা কোনো ভাল রেস্টুরেন্ট না। টেবিলের গোলাপি ফরমিকা জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে। অন্ধকার ঘুপচির মতো রুম। এসি একটা চলছে তবে ঠাণ্ডা বাতাসের চেয়ে ঘর্ঘর আওয়াজই বেশি দিচ্ছে। 
রামকমল জানত কীভাবে নিজের সম্পর্কে বলতে হয়। সব কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে এবং সেখান থেকে ভাব ছাড়া আর কোনো তথ্য পাওয়া যাবে না। সে সাহিত্য নিয়ে কথা বলত। দেখিয়ে দিত সাহিত্যের সমস্যা কোথায় এবং সাহিত্য যারা লিখে তাদের সমস্যা কোথায়। সে বলত আজ সাহিত্যের যতগুলো আঙ্গিক আছে সব সেকেলে। এই যুগটাকে সাহিত্যে উপস্থাপনের মতো আঙ্গিকই সাহিত্যেকদের হাতে এখনো তৈরি হয়নি। সে যেভাবে কথাগুলো বলত তাতে সেগুলো গালগল্প ভাবার কোনো উপায় থাকত না। সে কোনো সাহিত্যকে সেই সাহিত্যের সনাতন রীতির মধ্যে আটকে রেখে আলোচনা করত না। সে মনে করত আধুনিক কালে অর্থাৎ স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারে পর থেকে কোনো সাহিত্যের পক্ষেই সম্ভব না ভৌগোলিক সীমা ভাঙার আন্তর্জাতিক রীতিকে উপেক্ষা করে চলা। এ কারণেই ঠাকুরের উপন্যাসগুলো সে ক্ষমা করতে পারত না। বাংলা ভাষায় সাহিত্য নামে চলমান অনেক কিছুই সে সাহিত্য হিসেবে মেনে নিতে পারত না। বাংলা ভাষায় তার কাছে সাহিত্য বলে মনে হত ত্রিশের দশকের কিছু কবিতা এবং ওয়ালীউল্লাহ ও জহিরের কিছু লেখা। সাহিত্যে সে ঘৃণা করত আঞ্চলিক অহম, নীতিকথা ও আবেগের ছড়াছড়ি। সে বলত এগুলো সব ভুয়া ও ভালমানুষির ভান। এগুলো সব মধ্যবিত্তের ভুয়োদর্শন ও ভ্রান্তি।
আমি খেয়াল করিনি কখন আমাদের টেবিলে লেমন জুসের জায়গায় চলে এসেছে সস্তা জঘন্য এক ভদকা। মনে হচ্ছিল কাটাবনে এটি একটি গোপন মৌতাত যেখানে রামকমলের মতো পরিচিত কিছু লোকের জন্যই এই আয়োজন রাখা হয়েছে।
রামকমলের ভাবনাগুলো একেবারে নতুন কিছু না। তবে সে ভাবনার গুরুত্ব ও ঐকান্তিকতা ছিল উত্তেজনাকর। আমি সারাজীবনই সাহিত্যঘেষা। সাহিত্য আমার সত্যিকার ভালবাসার জায়গা। দশ বছর বয়স থেকে আমি বই পড়ি ও সংগ্রহ করি। আমি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি পড়েছি। আমার ধারণা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণের মাঝে সাহিত্যের প্রতি এমনই ভালবাসা থাকবে। দেখলাম ধারণাটা ভুল। তাঁরা সেখানে উঁচু মেধাসম্পন্ন করণিক। তাঁরা ভালবাসেন বেতন এবং তাঁদের নিজেদের প্রফেসরদের উদ্ধৃতিযোগ্য বাণী। বয়স যখন বিশের কোঠায় তখন ঘুরলাম প্রকাশনা ও সম্পাদনার চেষ্টায়। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করলাম আমার নিজের বই বিক্রয় প্রতিষ্ঠান- আমার লাইব্রেরি। আমি জানলাম লেখা আমার কাজ না। তবে লেখার জগৎ থেকে আমার সম্পর্কটা চুকিয়ে দিতে পারলাম না। আবার এই জগতের লোকদের সহবৎ আমার যে খুব ভাল লাগল তাও না। দেখা গেল তারা প্রায়ই ভগ্ন মানসিকতার, অল্পতে তেতে ওঠা ধরনের এবং এক কথায় অসহ্যকর। অবশ্য তাদের এই অবস্থায় যতখানি ঘৃণা হয় তার চেয়ে দুঃখ হয় বেশি। তবে সব মিলিয়ে অসহ্যকর। রামকমলটা এইরূপ ছিল না। দেখা গেল সে এমন একজন যে চায় সৃষ্টি করবে একেবারে নতুন কিছু— এমন কিছু যা অন্তর্গতভাবে আত্মাবলম্বী ও পূর্ণ।
সে বলত আমাদের যা করতে হবে তা হল একবোরে নতুন এক কায়দায় শহরটাকে এবং উপন্যাসটাকে এক করে ফেলতে হবে। ঢাকা একেবারে নতুন এক ধরনের শহর। ঢাকাকে দেখলে বোঝা যায় কেয়ামত হয়ে যাওয়ার পর দুনিয়ার অবস্থাটা কেমন হবে। সেই দুনিয়ার বাস্তবতাটা ধারণের জন্য একটা উপযুক্ত ফরম বা আঙ্গিক আমাদেরকে খুঁজে পেতে হবে। আমরা আমাদের লাইব্রেরিতেই বসতাম। এটাকেই সে তার এ প্রকল্পের প্রাথমিক ভিত্তিভূমি হিসেবে ধরে কাজ শুরু করল। সে এখানে আসত। মাঝে মাঝে দিনে একাধিক বার। এখানে চাবি রেখে যেত। এখান থেকে অপরের রেখে যাওয়া চিঠি-চিরকুট সংগ্রহ করত। এখানে প্যাকেট রেখে যেত, ধোয়ার কাপড় রেখে যেত। এখান থেকে প্রয়োজনীয় ফোনগুলো সারত, লাঞ্চটা চালিয়ে নিত। এখান থেকেই গাড়ি ভাড়ার বা সিগারেটের টাকাটা নিতে আসত। আবার সেসব খুচরা ঋণের কিছু ফেরত দিতেও এখানে আসত। সেসব নিয়ে জটিল সব হিসাবপত্রও এখানে বসেই করত। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তার আড্ডাটাও সে এখানেই জমাত।  
বাহার ও জয়দীপ ছিল সে আড্ডার নিয়মিত সদস্য। বাহার একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিসংখ্যান কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরি করত। কিন্তু তারও আমাদের মতো কলজের সাথে সাহিত্য গাঁথা ছিল। জয়দীপের প্রকৃতিটা এই সময়ের সাথে যাচ্ছিল না। চাকুরিপাগল এই সময়ে সে ছিল একদমই চাকুরি বা বৃত্তিবিরোধী মানুষ। অন্যরা বেশিরভাগই ছাত্র অথবা কেবল পাস করা গ্রাজুয়েট। অনেকে লেখালেখির বিভিন্ন ধারার কর্মের সাথে যুক্ত। খবরের কাগজ, প্রকাশনা, লিটলম্যাগ, বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটিং ইত্যাদি। আমাদের সাথে পরিচয় হওয়ার পর এটি প্রথম বসন্তকাল। সেবারই একটি নতুন সহ সহস্রাব্দের শুরু। মনে হচ্ছিল ঐশী এক লক্ষ্যে পৌঁছার বেশ সম্ভব এক সময়। রামকমল রাত ধরে আড্ডা দেয়। প্রস্তাবিত মহাপাণ্ডুলিপিটির অপরিহার্যতা সম্পর্কে আমাদেরকে বোঝায়। সে বলত এই পাণ্ডুলিপি বা এই বই এই শহরের জন্য একটি গ্রামার উপহার দিবে। সেই গ্রামার অবশ্যই শুধু রাস্তার লাইট আর পৌর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে আসার নয়। আমরা যেটা লিখতে চাচ্ছি সেটি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যানুয়াল। এই ম্যানুয়াল গবেষকের মতো বলবে কীভাবে একটি মানুষ সত্যিকারের নাগরিক হয়ে উঠবে এমন একটি নগরীতে যে-নগরীর নগরী হয়ে উঠা চিরদিনের জন্য আটকে গেছে। 
তার এই ভাবনা কেমন তার চেয়ে বড় ছিল তার সেই উদ্দীপনা ও উষ্ণতা যার সাথে সে এই ভাবনাগুলোর পিছু নিয়েছিল। তার এই উদ্দীপনা ও উষ্ণতাই আমাদেরকে বেশি কাছে টানত। এছাড়াও ছিল তার অভিনব সব যোগ্যতা সে তার ব্যক্তিগত এক লক্ষ্যকে সকলের যৌথ এক কাজ বানিয়ে ফেলতে পারত। তার আশেপাশে যারা থাকত প্রত্যেকেই একটি দায়িত্ব পেয়ে যেত। আমি ছিলাম তার রক্ষণাবেক্ষণ কর্তা। তার কাপড়চোপড় আর টাকাকড়ির সবেরই রক্ষণাবেক্ষক ছিলাম আমি। এগুলো তার কাছে উল্টো পাল্টা কিছু বিষয় যা তার দিনগুলোকে এফোড় ওফোড় করে দেয়। ধীরে ধীরে সে আমাকে তার না-হারানো স্মৃতিগুলোরও রক্ষণাবেক্ষক করে তুলল। তার স্মৃতিগুলো এবং এমনকি তার নিজের গোপন কথাগুলোও আর সে নিজের কাছে রাখতে ভরসা পাচ্ছিল না। সেসবের মধ্যে দেখা যাচ্ছিল কমিউনের ওপর বিরক্ত হওয়ার আগে তার জীবনে এক গান্ধী গ্রামে প্রশিক্ষণ নেয়ার অনেক ঘটনা ও প্রসঙ্গের প্রতি বক্র ইঙ্গিত রয়েছে। অনেক বছর কেটেছে পূর্ব ইউরোপের কিছু কৃষি সরঞ্জামের এক পরিবেশক হিসেবে। একটি স্বল্পায়ু বামপন্থী দলের একজন হয়ে হাভানা ও হো চি মিন সিটিতে সে ভ্রমণ করেছিল।
এটা বলা খুব কঠিন কোনটা সত্য আর কোনটা রামকমলের সত্য বলে বিশ্বাস। আমি এমনকি একবার পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে কর্মরত আমাদের বন্ধু শামসুকে বলেছিলাম সে আমাদেরকে এ ব্যাপারে কোনো দিশা দিতে পারে কি না। এই লোকগুলো অবশ্যই নিজ থেকে তথ্য খুঁজতে নামে না। কিন্তু আমরা ততক্ষণে অনেকদূর চলে গিয়েছি। তাই সে আমাকে দীর্ঘ প্রশ্নের এক খত ধরিয়ে দিল: সে কি তোমার কাছ থেকে কখনো টাকা নিয়েছে? তার কি বন্ধুবান্ধব এমন যা তোমার মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে? এই লোকের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে তোমার কাছ থেকে কি কেউ টাকা পয়সা চেয়েছে? এই প্রশ্নের খত হতে ধরে হঠাৎই আমার মনে হল শামসুকে এর মধ্যে টানাই আমার ঠিক হয়নি। রামকমলকে বাঁচাতেই আমি তখন এই সব প্রশ্নের মিথ্যা-টিথ্যা উত্তর দিলাম।
উত্তরগুলো দেখে শামসু বলল— ‘সে যদি আদতেই ভাল হয়ে থাকে তবে আমাকে এ বিষয়ে তদন্তে নামালে কেন?’
‘বন্ধু রাগ করো না, তাকে এতটাই অস্বাভাবিক গোছের একজন মনে হয় যে ইচ্ছে হল তার সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে তোমাকে বলি’, আমি বললাম।
ইতোমধ্যে রামকমল আমাদের অনেক বিশ্বাসের এবং উৎসাহের ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। একের পর এক লোককে সে বিভিন্ন কাজ ভাগ করে দিচ্ছে। নিরলস ও সাহসী বাহার তার গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে। রোগা চেহারার জয়দীপ তার টাইপিস্ট ও এডিটর। কারো দায়িত্ব মাসের পর মাস, কারোটা আবার কয়েক সপ্তাহেই শেষ। কিন্তু যে কোন মুহূর্তেই কাজের জন্য আছে এক পুরো বাহিনী: ড্রাইভার এবং বডিগার্ড, দাপ্তরিক কাজকর্মে কিছু লোক, ছোটখাট ফাইফরমাস খাটার লোক, বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহে এক গ্রুপ এবং আরেক গ্রুপ তার শত্রুদের উপর নজরদারির জন্য এক গ্রুপ।  
আমার হওয়ার কথা সেই অভূতপূর্ব ম্যানুয়ালের প্রকাশক। আমরা বাস্তবে এই সকল দায়দায়িত্ব কোনো আলোচনা ছাড়াই গ্রহণ করেছি, কাগজেপত্রে লেখালেখির তো প্রশ্নই ওঠে না। এ নিয়ে আলোচনা বা লেখালেখি দুইই আমাদের অন্তর্গত বন্ধনকে অসম্মান করার সামিল হয়। সেই ভদকায় ভেজা প্রথম দেখার পর থেকে এই বন্ধনই তো আমাদেরকে একত্রে ধরে রেখেছে।
রামকমলকে এতখানি প্রশ্রয় দেওয়াটা এখন আমার কাছে এক ব্যাখ্যার অযোগ্য ফালতু কাজ মনে হচ্ছে। রামকমলের শিষ্যদের বেশির ভাগেরই বয়স ছিল বিশের কোঠায়। তাদের বৈচিত্র্যহীন ও লক্ষ্যহীন জীবনটিকে যোগ্য কিছুতে নিবেদিত করে দিতে তারা খুঁজছিল এমন মহৎ কোনো ডাক। কিন্তু আমি তখন অনেক ভেবেচিন্তে অনেক বিলম্বে এক আপাত সুশীলা তরুণীর সাথে বিয়ের পিড়িতে বসেছি। আমার সেই নববধূর উজ্জ্বল সুন্দর কপালটিতে আবার একটি বড় দাগ যা দেখতে অনেকটা ইংল্যান্ডের মানচিত্রের মতো। এসব নিয়ে আমার তখন কবিতার রাজ্যের প্রতি যথেষ্ট বিদ্বিষ্ট থাকার কথা। অথচ সেই সবের মধ্যেই আমি রামকমলকে আমার জগতে ঢুকতে দিলাম। শুধু ঢুকতে দিলামই না, আমি তার উদ্দেশ্য সিদ্ধির পথে একজন হয়ে উঠলাম। 
সেই সম্মোহিত শিষ্যজগতের সকলে ঠিক জানত না রামকমলের সন্দেহজনক আচরণাদি ও লেনদেনের সার্বিক বৃত্তান্ত যেগুলো আমার সাথে দেখা হওয়ার বছর খানেক পরে থেকে আমি শুরু হতে দেখেছি। অথবা হয়তো তার অমন আচরণ আগে থেকেই ছিল। শুধু আমি দেখতে শুরু করেছি পরিচয়ের বছরখানেক পর থেকে। আমি যদি বলতাম- ‘রামকমল, ঐ জাতীয় মানুষের সাথে আপনার লেনদেন বা চলাফেরা কেন’; সে তার পরিচিত হাসিটি দিয়ে উত্তর দিত- ‘সব জাতীয় মানুষের সাথে লেনদেন করতে না পারলে আপনার সত্যিকারের অর্থ উপার্জন সম্ভব নয়’।  
‘এর জন্য কিন্তু আপনার জেলে যাওয়া, ছিনতাই হওয়া কিংবা এমনকি খুন হওয়ার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে’, আমি বলতাম।
‘বার্গার, আপনি বড্ড বেশি দুশ্চিন্তা করছেন’। রামকমল আমাকে বার্গার বলেই ডাকত। ‘দুশ্চিন্তা আপনাকে কর্তব্যপরায়ণ নাগরিক করে তুলবে, সাথে আপনার ব্লাড প্রেসারটিও বাড়িয়ে তুলবে। মহিলাদের সাথে সুন্দর আচরণে সাহায্য করবে, তবে লোভনীয় গন্তব্যে পৌঁছতে দিবে না। এটি আপনাকে এক টেকো মাথার দোকানদার পর্যন্ত বানিয়ে তারপর ছাড়বে’, রামকমল হাসত আর জলদগম্ভীর কণ্ঠে বলত।
রামকমলই শুধু কাউকে নিয়ে তার মুখের ওপর মস্করা করতে পারত কিন্তু তাকে অপমানিত বোধ করার সুযোগ দিত না। আমরা বসতাম আমার বইয়ের দোকানে। আমি কাউন্টারে একটি উঁচু টুলে বসতাম, পাশেই রামকমল আরেকটি টুলে। আমার দোকানের এই পুচকে আয়তনে যেন রামকমলকে ধারণ করাই সম্ভব হত না। আর আমার দোকানের ক্ষুদ্রতাকেই বা কেন দায় দিচ্ছি, এই নগরীরই তো সেই আয়তন ছিল না যা দিয়ে রামকমলকে ধারণ করে। 
রামকমলের প্রতি সকলের মোহ তৈরি হওয়ার এটা ছিল আরেক দিক। নগরীর সব ধরনের নীতি নিয়ম চুলোয় দেয়ার বিষয়টি অনেকের কাছেই যথেষ্ট রোমাঞ্চকর। রামকমলের সাথে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকা ছিল আমার কাছে কংক্রিটের এক দৈত্যাকার নির্মাণ তবে বড়ই হতদরিদ্র। কোনো কিছুই এখানে ঠিকমতো নির্মিত নয় এবং ঠিক জায়গায় নির্মিত নয়। বিল্ডিংগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয় রিকেটস রোগাক্রান্ত কতগুলো হাতপা নিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, যে কোনো সময় ধপাস করে গুড়িয়ে পড়বে। হাতপা তো তবু কতগুলো আছে, গায়ে ছাল-বাকল রং চেহারা কিছু নেই। এই ভগ্ন হাত পায়ে আবার সব বিল্ডিংয়েরই চেষ্টা কী করে প্রাণান্ত ধাক্কাধাক্কি করে সামনের ঘুপচি গলিটা থেকে আরেক ইঞ্চি হাতিয়ে নেয়া যায়। শ্বাস ফেলার ফাঁকাটুকু কোথাও নেই। সর্বত্র লোভ আর লোলচর্মের গন্ধ। লাখে লাখে এরা সবাই যেন জঘন্য নিষ্ঠুর এক টেক্সটের পাতায় পাতায় সেঁটে যাওয়া অসহায় সব অক্ষর।
আমি ও সে অক্ষরের বাইরে নই। আমি কলাবাগানে থাকতাম। প্রতিদিন সকাল ১০টায় মিরপুর রোডে আমার বইয়ের দোকানে যেতাম। রামকমলের কথা— এই বইর দোকানই হয়ে দাঁড়াবে আমাদের নব সচেতনতার কেন্দ্রিক আলোকবিন্দু। এটি আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকানের মতো হবে না। খাদি আর লম্বা চুলে ভাব লওয়া জনতা এখানে আইডিওলজি ও দুঃখ বিলি করবে না। আমরা এখানে লিখব আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি এই ঢাকা নিয়ে যে গ্রন্থ এর আগে লিখিত হয়নি। সে গ্রন্থ এই ড্রেনরূপ শহরটিকে মহৎ করে তুলবে এবং আমাদেরকে উদ্ধার করবে। আমাদেরকে আমাদের ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক নামহীনতা তথা পরিচয়হীনতা থেকে উদ্ধার করবে।
রামকমল আর তার বক্তৃতার মাঝে কখনো কখনো এক ঘর্ঘরে সাংঘর্ষিক বৈপরীত্য টের পাওয়া যেত। একদিন সে আমার দোকানে আসল স্যুট জাতীয় এক বস্তু পরিধান করে। বলল— যেহেতু আনুষ্ঠানিক এক কর্তব্যের মাঝে আছি পোশাকটাও তো একটু আনুষ্ঠানিক হওয়া উচিত। ততদিনে আমাদের পরিচয় এক বছর পেরিয়ে গেছে। তার বেসুরো আচরণগুলোর সাথে অনেকটা পরিচয় হয়ে গেছে বলে এ ঘটনায় খুব অবাক হলাম না। একমাত্র তার পক্ষেই ঐ বস্তুকে আনুষ্ঠানিক পোশাক বলা সম্ভব। যথেষ্ট কুচকানো হালকা সবুজ এক কোট কোনোমতে গায়ের সাথে ঝুলে আছে। অন্য রঙের এক প্যান্ট পায়ের গোড়ালি থেকে অনেক উপরে। পায়ে একেবারে রামকমলীয় সেই কেডস। যত্নের ছাপ একমাত্র চুলে। বিভিন্ন অনুমানে বোঝা যায় বয়স চল্লিশের কম হবে না। অথচ এক ঝাকড়া চুল ঈর্ষণীয় উজ্জ্বলতা নিয়ে ঘাড় বেয়ে নিচে নেমে আছে।   
আমার দুশ্চিন্তা আমাকে টেকো মাথার দোকানদার বানিয়ে ছাড়বে— এ কথার উত্তরে আমি বললাম— ‘মরে যাওয়ার চেয়ে টেকো মাথার দোকানদার হয়ে বেঁচে থাকাও অনেক ভাল’। 
‘এটাই তো আপনার ভুল ধারণারে ভাই। বেঁচে মরে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই অনেক ভাল’, রামকমল উত্তর দিল।
‘মরাদের টাকা লাগে কেন?’, আমি খোঁচা দিয়ে বললাম।
‘নারে ভাই, প্রথমত, আমি মরাও নই, বেঁচে মরে থাকাদেরও কেউ নই। আমি যথেষ্ট তাকতের সাথে বেঁচে আছি বলেই আমার অনেক কিছু লাগছে। দ্বিতীয়ত, বছরে বছরে আমার অনেক ঋণ জমেছে। সেসবের মধ্যে আর্থিক ঋণগুলোর কিছু কিছু আমার পরিশোধ করাও প্রয়োজন। কেউ কেউ আছেন যাদের ঋণ আর কোনোদিন পরিশোধযোগ্য নয়। আমার গ্রন্থে উল্লেখ করে তাদেরকে আমি অমর করে রাখব। তৃতীয়ত, আমার এই বক্তৃতার শক্তির জন্য আমার এক কাপ চা দরকার।’—রামকমল এভাবেই বলত।
আমি ছোটকাকে ডাকতাম। ও বাইরে বসে থাকে, ঝাড়মোছ করে ও ফাইফরমাস খাটে। ও রাতে দোকানেই ঘুমায় এবং মাছরাঙার মতো শিকারী ঠোঁটে আমাদের বিল্ডিংয়ের করিডোরে যত গল্প হয় সব ধরে ধরে জমিয়ে রাখে। সেই ছোটকাও কিন্তু পারল না এই নয় মাসেও রামকমলের কোনো সংবাদ জোগাড় করতে।
‘আচ্ছা রামকমল, আপনার কি সত্যিই এমন কোনো ভাড়া-টাড়া বাকি আছে যা পরিশোধ করতে হবে?’
‘না, ঠিক সাধারণ অর্থে এমনটা নেই’, সে বলল।
‘খাওয়া দাওয়া? সেসব-ই কি টাকা পয়সা ছাড়াই জোগাড় হয়ে যায়?’
‘উপরওয়ালা বন্ধুবান্ধব ভালই দিয়েছে।’
‘আর কী জাতীয় খরচ? এই স্যুটও তো ধার করাই মনে হয়? আর সে ধার ও তো মনে হচ্ছে এক জনের কাছ থেকে নয়।’
‘না, একজনের উপর অনেক চাপ আমাকে দিতে হয় না।’
‘তাহলে, তারপরও আপনার টাকা দরকার হয় কেন, রামকমল?’
ছোটকার আনা নোংরা পুচকে চায়ের পেয়ালাটা ঠোঁটের কাছে তুলে রামকমল প্রফেসরসুলভ বিজ্ঞতায় বলল, ‘আপনার না-বোঝার পরিমাণটা দেখে আমার আশ্চর্য লাগে। বার্গার, আপনি যা বোঝেন না তা হল: খরচাপাতি ছাড়া একটা জীবন চালাতে যে পরিমাণ সময় যায় তা ঐ খরচাপাতি জোগাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের চেয়ে বেশি। দেখুন, আপনি দাম না দিয়ে যে দোস্তি হিসেবে জিনিসটা পাচ্ছেন সেটার জন্য আপনাকেও একটা বিনিময়-দোস্তি দেখাতে হচ্ছে। তাদের এই বিনিময়-দোস্তির প্রত্যাশাটা অবশ্যই খোলাখুলি নয়। আবার এটা একটার বিনিময়ে একটা তেমনটাও নয়। তবে এর মধ্যে একটা পরোক্ষ সমানুবর্তিতার প্রয়াস আছে। এক মহিলা আপনাকে তার বাসায় থাকতে দিলে তার ছেলেগুলোর লেখাপড়াটায় সাহায্য করতে হয় কিংবা তার অকেজো স্বামীটার সাথে ডিনারের পর কিছু সময় বসে বসে ব্যাজব্যাজটা চালাতে হয় যাতে সংসারের শান্তিটা ঠিক থাকে। এগুলো আপনা আপনিই চলে আসে। আপনার কি কোনো ধারণা আছে এতে কত ঘণ্টা যায়? শক্তি শ্রমের কথা না-ই বললাম। কষ্টটা সবচেয়ে বেশি হয় যখন এমন কারো জন্য করতে হয় যে এই শ্রম পাওয়ার যোগ্য না। এ করার চেয়ে মরুভূমিতে বেগুণ চাষ করাও সহজ। আর এদেরকে শিখাতে যাওয়ার মূর্খতার কথা বাদই দিলাম। আর আমি সারা জীবন এই কাজই করছি। সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমাকে দশ বছরের মধ্যে ঐ ম্যানুয়েল শেষ করতে হবে। আমাকে দশ বছর চলার মতো টাকার সংস্থান করতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা করতে হবে। হাতে সময় খুব কম।’ রামকমল বলল আর তার হাতের দিকে তাকাল যেন আর কতটুকু সময় আছে তা হাতে লেখা আছে।
‘একটি স্যাবাটিকাল ছুটির মতো নিয়ে কাজে নামুন। আমি টাকার ব্যবস্থা করব। আর ঐ আজে বাজে মানুষগুলোর সাথে চলাফেরা বন্ধ করুন।’ আমি বললাম।
‘আমার দরকার দশ বছর চলার টাকা, বার্গার। আপনি কত আর দিতে পারবেন?’
আমি একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, ‘এটা এক সম্মিলিত কাজ। এতে এতদিন কেন লাগবে?’
‘আমি এটা সম্মিলিতভাবে করতে চাচ্ছি এ জন্যই যে আমার মনে হয় আমার হাতে অনেক সময় নেই। যাতে আমি যদি নাও থাকি অন্যদের দ্বারা যাতে শেষ হয়। এছাড়াও আমি মনে করি এটা কোনো সংকীর্ণ সীমাবদ্ধ প্রজেক্ট না। এর চলা উচিত যতদিন এই নগরী চলে। এটি চলতে থাকা উচিত যাতে এর পরিবর্তন পরিমার্জনও চলতে থাকে। পুরনো সংস্করণ পরিমার্জন করে নতুন সংস্করণ বের হতে হবে। এটাকে হতে হবে এক জ্যান্ত ডকুমেন্ট।’
তার যুক্তিগুলো বৃত্তের মতো সম্পূর্ণ ছিল। এগুলো খণ্ডনের কোনো ফাঁক ছিল না। সে কোনা বড় উদার দানের প্রস্তাবও কোনো রকম ধন্যবাদ ছাড়াই প্রত্যাখ্যান কতে পারত। দাতার কষ্ট হত যে সে দানটি করতে পারছে না কারণ সে জানে রামকমলের এটি খুব প্রয়োজন। রামকমলের এই প্রকৃতি সম্পর্কে জানি বলেই আমি তার কথায় দোষ নিলাম না। আমি রামকমলের কথা বিশ্বাস করতাম এবং লেখা বা মুদ্রিত শব্দের জাদুকরী শক্তি বিষয়ে তার উপজাতীয় বিশ্বাসটি আমিও ধারণ করতাম :  যে কোনো জায়গাই শব্দের অক্ষরে বর্ণিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জায়গাটি নতুন এক রূপে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সত্যি বলতে সেই রূপ লাভের পূর্ব পর্যন্ত জায়গাটি অস্তিত্বশীলই হয়ে ওঠে না। এই বিশ্বাসসূত্রেই  আজকের ঢাকার যা কিছু আমাদেরকে খুব ছোট ও নিচ করে রেখেছে— যেমন রিকশাওয়ালাদের গাধার খাটুনি, খানাখন্দে ভরা রাস্তা, পানের পিক ফেলা হাটুরে জনগণ, জাঁকালো ভবনের ভুয়া-মার্বেল বহির্দৃশ্য, দোকানগুলোর রঙচঙা ভুয়া সব জিনিসপত্র, তাবৎ ভুয়ামির শিকার নাগরিকদের খাই-খাই ভাব- রামকমলের লক্ষ্যভুত গ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে এই সবকিছুর জন্য এক অভাবিত নতুন অর্থের জগৎ তৈরি হবে। 
রামকমল সেই চূড়ান্ত অর্থের কিছু নমুনা বিভিন্ন সময়ে আমাদেরকে দিয়েছিল। সেগুলোর কিছু কিছু আমাদেরও বোঝার ঊর্ধ্বে ছিল। একটি যেমন সে শুরু করেছিল এক প্রায় সাংকেতিক বাক্য দিয়ে- ‘পরীক্ষণগুলো হয়ে যাওয়ার পরেও একটি ব্রেন রয়ে গেল’। এই ধারায় তার লেখাগুলো ছিল চিন্তা বিন্যাসের এক অদ্ভুত প্রকাশ। রামকমলের বর্ণনামতে গ্রন্থটি হবে এই নগরীর, এর বিভিন্ন বসতি-অঞ্চল এবং অঞ্চলসমূহের প্রতিবেশ-অনুগ জনধারার এক বিশ্বকোষ। তার মতে মানুষ ও তার বসতিস্থান অন্তর্গতভাবে সম্পর্কিত যদিও পারস্পরিকভাবে বদলযোগ্য নয়।  প্রতিটি জনধারার বৈচিত্র্য বিশ্লেষিত হবে এক একটি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে। সে বিশ্লেষণে এমন স্পষ্টতা থাকবে এবং দায় ও দোষ বয়ানে এমন নির্ভুলতা থাকবে যে কোনোকিছু গোপন থাকবে না। ‘ব্যক্তিবর্গ’ শীর্ষক অধ্যায়ের স্পষ্ট সূচিবিভাজন থাকবে এবং অন্যান্য অধ্যায়ে এর রেফারেন্স ও ক্রসরেফারেন্স থাকবে। একইভাবে অধ্যায় থাকবে অনেক নামে যেমন ‘স্থান’, ‘দোষত্রুটি’, ‘ঐতিহাসিক পূর্ববর্তিতা’ ইত্যাদি।
আমাদের এই ক্ষুদ্র বিশ্বের প্রতিটি নতুন বিষয়ের জন্য হবে এক একটি নতুন অধ্যায় বা নতুন সংযোজন। গ্রন্থ পাঠের প্রতিটি আসরের খবর তখন ভক্তরা গভীর গোপন সংবাদের মতো রক্ষা করত। রামকমলের এইসব উল্টোপাল্টা ভাবনা  এতদিনে এতখানি আমাদের হয়ে উঠল যে আমরা দোকানদারির সময়সীমা পর্যন্ত পাল্টে দিলাম। আমরা তখন দোকান সন্ধ্যায় বন্ধ করে দেই এবং মধ্যরাতের পরে আবার খুলি এবং সবাই সেখানে একত্র হই। তবে শাটার বাইর থেকে বন্ধ রাখি যাতে বাইরের কেউ ঝামেলা না করতে পারে। ভিতরে বসে আমরা গ্রহণ করতাম রামকমলের ভাবনার নতুন কোনো কিস্তি। মাঝে মাঝে রামকমল গ্রন্থের নতুন কোনো অংশ তার জলদগম্ভীর কণ্ঠে নিজেই পড়ত। বেশিরভাগ সময় প্রিয়ভাজন অন্য কাউকে দিয়ে পড়াত। নিজে শুনত আর আয়েশ করে সিগারেট ফুকত। আসরের এই একজনকেই শুধু সিগারেট খেতে আমি বাঁধা দিতে পারতাম না, এমনকি চতুর্দিক বন্ধ থাকলেও না। সিগারেট ফুকত আর স্মিত হাসি মুখে নিয়ে তাকিয়ে দেখত পাঠ শুনে আমাদের অভিব্যক্তি কেমন। তার চেহারায় থাকত সেই বাবার আনন্দ যে তার শিশুকে কোনো উপহার দিয়ে দেখছে তার শিশুর অভিব্যক্তি, একই সাথে তার চেহারায় থাকত সেই শিশুর উৎকণ্ঠা যে কিছু একটা করেই এক অকুণ্ঠ প্রশংসার অপেক্ষায় বসে আছে। এর চেয়ে নির্মল মুহূর্ত আর আমার জীবনে কখনো আসেনি। এমনকি ছোটকা এক অক্ষরও না বুঝেও অনেক আনন্দ নিয়ে শাটারের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে এই পাঠ শুনত। 
পরের দিন রামকমল কিছুটা তিরস্কারের মতো করেই বলল- ‘দেখ, বার্গার, দেখ। আমরা যা চেয়েছি শুরু হয়ে গেছে। আমরা এই নগরীর পুরনো ব্রেইনটিকে একটি নতুন কর্টেক্স উপহার দিতে যাচ্ছি।’
শিষ্যদেরকে শুধু এই পড়ার দায়িত্বের মধ্যে রেখেই রামকমল সন্তুষ্ট থাকতে পারল না। সে তাদেরকে ইহা লেখার মধ্যেও টানল। সে বলল— ‘আমি একা এতবড় অন্তহীন টেক্সটটি একা লিখতে পারব না। তোমাদের প্রত্যেককেই এতে হাত লাগাতে হবে।’
রামকমল এই সম্মিলিত লিখন প্রয়াসের কথা বলার পর বাহার প্রথম বলেছিল, ‘এটি আপনার বই, আমরা কী করব?’
রামকমল বলেছিল, ‘এটা আমাদের বই এবং আমরা সবাই মিলে এটি লিখব’।
জয়দীপ বলল, ‘আমরা সবাই কেমনে বই লিখব, কমল দা? আমরা তো লিখতে জানি না, আমাদের যে দুয়েক জন জানে তারাও আপনার মতো তো আর কেউ জানে না।’  
‘তোমরাও যথেষ্ট ভাল লেখ। লিখতে লিখতে আরো ভাল হবে। আমি তোমাদেরকে শিখিয়ে দেব।’ রামকমল বলল। 
‘আমাদেরটা কখনো আপনার মতো হবে না’, জয়দীপ বলল। 
‘এটাই আসল কথা। আমরা লিখতে যাচ্ছি প্রথম বহুস্বরের আকর এক উপন্যাস। একটি নগরীকে তুমি একজনের স্বরে কেমনে লিখবে?’
‘আর যারা একেবারে লিখতেই পারে না?’ বাহার জিগ্যেস করল। 
 ‘লিখতে না পারলে তুমি গবেষণা করবে। সেটাও না পারলে তুমি ছবি, সাউন্ড, খবর এগুলো আনবে। তুমি নিরাপত্তা দেখবে, প্রয়োজনীয় রসদ সামগ্রী দেখবে। সর্প এবং ভণ্ড থেকে আমাদেরকে পাহারা দিবে। প্রত্যেকেরই এখানে করণীয় আছে— সেটা যত ধারে থেকেই হোক, আর যত দূরে থেকেই হোক।’
এভাবেই প্রকল্পটি সম্মিলিত প্রয়াসে রূপ নিল। তবে রামকমলের জন্য গবেষণা অত সহজ কাজ নয়। সে কী জানতে চাইবে তা কেউ বলতে পারে না: আমেরিকানরা যখন প্রথম ঢাকায় এসেছিল তখন তাদের মুদ্রা কী ছিল? এই শহরে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা কখন প্রথম শুরু হয়? বনগাঁওয়ে এখন বানরের সংখ্যা কত? 
রামকমলের জন্য লেখার কাজ আরো কঠিন। ড্রাফটগুলো সে দাগ দিয়ে ফেরত পাঠাত এবং তাতে একটি বাক্যও থাকত না যার নিচে নীল পেন্সিলের দাগ নেই। এভাবে দশ বার বার সংশোধনের পরে একটি কপি এই অবস্থায় পৌঁছাত যে তাতে কটি মাত্র গোল দাগের বাইরে আর কোনো দাগ থাকত না।
তারপর একদিন কাউকে বলত উত্তরার কোনো এক গুদামঘর থেকে আনা কতগুলো বাক্সবন্দী বোতল শহরের বিভিন্ন হোটেলে পৌঁছে দিতে। শিষ্যটা যদি সরল গোছের হত এবং জিগ্যস করত এ কাজ বইয়ের প্রকল্পের জন্য কী কাজে লাগবে তাহলে সে বলত, ‘মিশনটাকেও কখনো সন্দেহ করিও না, গুরুকেও কখনো সন্দেহ করিও না।’
এই জনতার মধ্যে সবচেয়ে সবচেয়ে বয়সী হিসেবে সন্দেহটা আমারই সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা। যখনই রামকমলের এইসব কৌশলাদি নিয়ে আমার মাঝে কোনো প্রশ্ন উঠত, তখনই সে কোনো নতুন অধ্যায় নিয়ে হাজির হত, যেমন:  ‘অপরাধ ও জীবিকা’, ‘সাহিত্যিক যোগাযোগ’, ‘গোরস্তান, ঘাট’ ইত্যাদি। সেই নতুন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে সে দেখাত মানুষ এবং বিষয়কে নতুনভাবে দেখার আরেক দৃষ্টিকোণ যা আগের অধ্যায়ে ছিল না এবং গল্পে যোগ হত নতুন এক মাত্রা। ঘটনার বয়ান এবং সে বয়ানে পরবর্তী ধাপে পৌঁছার উৎকণ্ঠা এবং সে বয়ানে বিষয় উন্মোচনের ধারা এমন ছিল যে রামকমলকে খোদা হাফেজ দেয়ার কোনো পথ ছিল না। 
গত শীত নাগাদ দেখলাম আমাদের সেই মহাগ্রন্থের কয়েকশো পৃষ্ঠা আমাদের জোগাড় হয়ে গেছে। কিন্তু আমি এর কোনো শেষ দেখছিলাম না। বছরের পর বছর যেন এ চলবে এবং হাজার হাজার পৃষ্ঠায় এ শুধু লিখিত হতে থাকবে। রামকমলের এটাই গর্ব যে এ প্রকল্পের কোনো শেষ নেই। আমার ভিতরে প্রশ্ন উঠল— এটি তাহলে আমরা বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করব কখন?
এ প্রশ্নের উত্তরে রামকমল হঠাৎই এক পরিভাষা আবিষ্কার করল এবং সে পরিভাষার কোনোরূপ ব্যাখ্যা ছাড়াই উত্তর দিল- ‘তুমি এটা বুঝতে পারবে যখন আমার এ গল্প তার প্রথম ‘ইনফ্লেকশন’ পয়েন্টে পৌঁছবে। আমরা এটাকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে অংশে অংশে প্রকাশ করব। অংশ বলেই তার চূড়ান্তহীনতা এবং চূড়ান্তের অনুমানহীনতা এর প্রতিরক্ষা রূপে কাজ করবে।
সেই ইনফ্লেকশন পয়েন্টের যদি আমি কিছু বুঝে থাকি তাহলে তা হয়ে দাঁড়াল রামকমল নিজে। তার সাথে দেখা হওয়ার পরে এই প্রথম দেখলাম যে রামকমল কিছুটা অন্য কিছুতে নিমগ্ন এবং সে বেশ নিঃসঙ্গ। সে দোকানে আসাও কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। পরিবর্তনটা বেশ সূক্ষ্ম ছিল। যারা তাকে প্রতিদিন না দেখে তাদের কাছে ধরা পড়ার মতো নয়। 
‘আমাকে কিছু টাকা ধার দিতে পার?’
রামকমলের কাছে ইতোমধ্যেই আমি কয়েক লাখ টাকা পাই। ভাড়া, খাবার, কাপড়-চোপড়, ট্যাক্সিতে ঘোরা, অফিসে ঘুষ দেয়া, প্রতিপত্তিশীল কাউকে উপহার প্রদান, কারোর জন্য স্কুলের বেতন বা কারোর জন্য চিকিৎসা সাহায্য ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে বা কাজে সে টাকাগুলো নিয়েছে। এসব টাকা সে নিজ হাতে কখনো নিত না। তার শিষ্যদের কেউ একজন নিত যেখানে যে পেমেন্টটা পাওয়ার তাকে পৌঁছে দিত।
সে নিজে সরাসরি কোনো ক্যাশ এর আগে কখনো আমার কাছ থেকে নেয়নি বলেই আমি বললাম, ‘তুমি তো এর আগে কখনো আমার কাছে টাকা চাওনি?’
সে বলল, ‘আমি এটি এক সপ্তাহের মধ্যেই ফেরত দিব’।
আমি জানতাম টাকাটা তার কেন দরকার তা জিগ্যেস করার কোনো মনে নেই। আমি জিগ্যেস করলাম কত দরকার। উত্তরটা আমার অনুমানের চেয়ে অনেক বড় ছিল। তবে আমার ক্যাশবাক্স থেকেই এটা দেয়া গেল। সময়টা শীতকাল। আমার পছন্দের সময়। সারাটা ঢাকা রাস্তা-ঘাট কুয়াশার চাদরে মুড়ে আছে— এর চেয়ে আর কোনো ভাল দৃশ্য আমার কাছে ছিল না। শীত বাড়ছে, কুয়াশা বাড়ছে, আমার ভাললাগাও বাড়ছে। ঢাকার এলোমেলো গলিগুলোয় ভারী ভারী পোশাকপরা অফিসবাবুদেরকে এবং দিনের বেলায় হেডলাইট জ্বালানো গাড়িগুলোকে দেখতে আমার বেশ ভাল লাগে। তখন একবোরেই কনকনে ঠাণ্ডা শীতের বিকাল। তারপরও আমি দোকানের শাটার নামাতে দিতাম না। আমি রুমহিটার কিনেছিলাম এবং সকলকে বলে দিয়েছিলাম বেশি করে কাপড় পরতে। রামকমল লেখা বন্ধ করে দিল। সে বলল, ‘আমি ঠিক করেছি এই শীতে আর লিখব না’।
অবাক জনতা একসাথে ঊর্ধশ্বাসে জিগ্যেস করল, ‘কেন?’
‘লেখারও নির্দিষ্ট সময় আছে, লেখা বন্ধ রাখারও নির্দিষ্ট সময় আছে, দুটোই শুদ্ধির অংশ’, রামকমল উত্তর দিল।
‘তাহলে শীতে আমরা কী করব?’
‘আমরা আলাপ আলোচনা করব।’
এ ঘোষণায় সবাই হতভম্ব। কিন্তু কেউ বুঝে উঠতে পারছে না রামকমলকে কী বলবে। একদিন রামকমলের আগাগোড়া ভক্ত বাহার এবং জয়দীপ একত্রে আমার কাছে আসল এবং বলল, ‘কমলদার কী যেন হয়েছে, তার মাথা ঠিক নেই’।
আমি বললাম, ‘প্রতিভাবানদের এমনটা হয়। তাদের মাঝে মাঝেই তাল বদলায় এবং কীভাবে বদলায় কেউ বলতে পারে না।’ আমি যা বললাম তার পুরোটা আমি নিজেও বিশ্বাস করছিলাম না। 
‘কীভাবে জানেন? প্রতিভাবানদের সাথে এর আগেও আপনার চলাফেরা ছিল?’ জয়দীপ জিগ্যেস করল।
এই প্রকল্পের শিক্ষানবিশদের মাঝে জয়দীপ ছিল সবচেয়ে বুদ্ধিমান। সে-ই ছিল একমাত্র জন এই প্রকল্পে কাজ করতে যার বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাগত যোগ্যতা দুইই ছিল। রামকমলের নিয়মিত নির্দেশনা ছাড়া কাজ করার যোগ্য ছিল সে-ই একমাত্র জন। কিন্তু তার মেজাজটা ছিল খিটখিটে। এর পিছনে দায়ী ছিল তার বদহজম এবং একই সাথে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা তার সন্দেহবাদিতার বাতিক।
‘না, না, আমি প্রতিভাবানদের সহচর না। ওটুকু মানুষের কথাবার্তা থেকে জানা।’ আমি মৃদুভাবে উত্তর দিলাম। রামকমলের সাম্প্রতিক ধার চাওয়া সম্পর্কে কিছু জয়দীপকে জানালাম না। টাকাটা সে অবশ্য এক মাসেও ফেরত দেয়নি। এতদিনে শুধু বাহার আর জয়দীপের মধ্যেই রামকমলের পরিবর্তন গোচরীভুত হওয়া আটকে থাকেনি। এক সপ্তাহ পরে এসবি অফিসার শামসু আমার সাথে দেখা করতে আসল এবং আমি একটু অস্বস্তি অনুভব করছিলাম। সে রামকমলের টুলটাতেই বসল এবং মুখের মধ্যে বেশ নির্ভুলভাবে তাক করে মুখের মধ্যে বাদাম ছুঁড়ে মারছিল। বাদাম খেতে খেতে আমার সাথে এক বন্ধুকে নিয়ে কথা বলছিল যে আমাদের তুলনায় অনেক ধনী হওয়ার কারণে আমাদেরকে কোনো ডাকে কোনো সাড়া বা পাত্তা দেয় না। শামসু বলছিল, ‘কিন্তু এই বাইনচোৎ যখন ঝামেলায় পড়ে তখন ওর পাশে আমি ছাড়া কে দাঁড়ায়? তবে তুমি ভেবো না ওকে এর জন্য পস্তাতে হবে।’
আমি আসলেই ভাবছিলামও না কারণ শামসুর অপকার করার ক্ষমতা সম্পর্কে আমি বেশ সচেতন ছিলাম। কিন্তু যে লোকগুলোকে আমরা ছেলেবেলা থেকে চিনি তারা আমাদের প্রতি যত খারাপই হয়ে যাক তাদের প্রতি একটা সহিষ্ণুতা রাখারই আমাদের ইচ্ছা। আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল শামসু আমার সম্পর্কেও অমনটাই ভাবছিল কিনা। নিশ্চিত সে আমাদের চেনাজানা অন্যদের বিষয়েও একই রকম ভাবছিল। তবে সেদিন তার কথাবার্তায় আমি বেশি উদ্বিগ্ন ছিলাম রামকমল সম্পর্কে তার নতুন রকম আগ্রহ দেখে। 
‘তুমি এই লোককে কতটা জান?’ সে আমার কাছে জানতে চাইল।
তার ক্ষতি না হোক সেই দায় থেকেই বললাম, ‘প্রায় প্রতিদিনই তো তার সাথে আমার কথাবার্তা হয়।’
‘এ দিয়ে মোটেই বোঝা যায় না তুমি তাকে কতখানি চেন’, শামসু উত্তর দিল। সে জানত যাকে ম্যানেজ করা যায় না তাকে কী করে থামিয়ে দিতে হয়।
‘সে এক চরিত্র যেমনটা লেখকরা হতে চায়। কেউ বলতে পারে না সে কোথায় খায় কোথায় ঘুমায়। সে রোজেরটা রোজ হিসেবেই চলে।’
শামসু বলল, ‘দেখ এগুলো নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। তবে তুমি পুরনো বন্ধু বলেই একটু হুশিয়ার করে দিতে বলা।’
‘কেন তুমি কিছু কিছু শুনেছ নাকি?’
‘আমার এই চাকুরিতে থাকলে অনেক কিছুই শোনা যায়। সেগুলো সব তো আর বিশ্বাসের না, যতক্ষণে সত্যিকারের কোনো তদন্ত না হয়। চূড়ান্ত রিপোর্টের পরে না বোঝা যাবে কোনটা সত্য আর কোনটা অসত্য।’
‘তাহলে কি কোনো তদন্ত চলছে?’
‘না, ঠিক এখনো এমন কিছু হয়নি। তবে তার নাম এবং তার সাথে যাদের চলাফেরা তাদের নাম বারবারই আমাদের কাছে আসছে।’
শামসু সেদিন আর কিছু বলল না। আমি আরো একটু উদ্বেগী ধরনের হলে এসবি ইনস্পেক্টর যেটুকু বলল তাতেই আমার দিশেহারা হওয়ার উপক্রম ছিল। তাও পরবর্তী কিছুদিন বেশ সতর্কই থাকলাম। মুখে কিছু না বললেও রামকমলকেও বেশ সতর্ক মনে হল। এমনকি আমার দোকানে আসাও সে কমিয়ে দিল। তখন একদিন খবর এলো বাহার জণ্ডিসে আক্রান্ত হয়ে বিছানায়। সে থাকে গোরান এলাকায় যেখানে এর আগে আমি কখনো যাইনি। এক ঝুড়ি ফল নিয়ে আমি বাহারের হস্টেলে হাজির হলাম। গিয়ে দেখলাম রামকমল আগে থেকেই সেখানে আছে এবং পাশে থেকে প্রায় সার্বক্ষণিক তার দেখভাল করছে। প্রায় এক মাস রামকমল আর কোনো কাজে নেই। আমার খুব খারাপ লাগল যে আমি এমন একটা লোককে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছি যে কিনা তার পাতানো বা কল্পিত এক পরিবারের মানুষের জন্য কোনোদিকে না তাকিয়ে নিজেকে এভাবে নিবেদন করতে পারে। 
আমি জয়দীপকে বললাম আমরা রামকমলের উপর অবিচার করেছি। দেখলাম জয়দীপেরও একই মত। আমরা একে অপরকে শোনালাম রামকমল মানুষের জন্য আরো করেছে সেসবের খবর। তার অপার্থিব এক ক্ষমতা ছিল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলার এবং সে নিরাশায় আশা ফুটাতে জানত। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ফেল করা হতাশ ছেলেদেরকে সে ফ্রি পড়াত এবং তার কাছে পড়ে তারা সিভিল সার্ভিসে পাস করত। যে প্রেমিক যুগল পারিবারিক অমতের কারণে বিয়ে করতে পারত না রামকমল কাজি এনে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করত, তাদের পালিয়ে যাওয়ার ও হানিমুনের টাকাপয়সার ব্যবস্থা করত এবং পরবর্তীতে মা-বাবার সাথে মিলিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করত। যাদের পাওনাদারদের ভয় থেকে আশ্রয় দরকার হত বা পাতি মাস্তানদের চাঁদাবজি ঠেকানোর উপায় খুঁজতে হত তারা রামকমলের কাছে হাজির হত। এমনকি সরকারের ছোটখাট কর্মচারীরাও পদোন্নতির জন্য পরামর্শ নিতে রামকমলের কাছে আসত।
সে তাদেরকে যে কোনো সময় যে কোনো সাহায্য করত না। সে বলত এ সব কাজের জন্য বিশেষ চিন্তাভাবনা বা ধ্যান-অনুধ্যানের প্রয়োজন আছে। গত শীতকালটায় দেখলাম সে মধ্য ইউরোপ ও সাব-সাহারান আফ্রিকার অনেক অপরিচিত দেশে ভিসা পাইয়ে দেয়ার বিষয়ে প্রচুর চেষ্টা তদবির করছে। তার উদ্যোগের অন্য অনেকগুলোর মতোই এটাও ছিল একেবারে অভিজ্ঞতাহীন এক নতুন উদ্যোগ। এ লাইনে ঢুকে অনেকটা ভুল করেছে এমনভাবেই সে বলল নেহায়েত কিছু মানুষের এ সংক্রান্ত ফরম পূরণে সাহায্য করার মধ্য দিয়েই তার এ লাইনে ঢোকা। ‘তুমি জান, আমি এদেরকে এড়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি’, সে বলল। এটা একদম সত্য কথা। আর এই সত্য কথার কারণেই তার জীবনে একটি বাসা ভাড়া করার যোগ্যতা হয়নি এবং একটি ব্যাংক এ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন পড়েনি। সে কাউকে না বলতে পারে না। এক হ্যাঁ থেকে তাকে আরেক হ্যাঁ-য়ে পৌঁছতে হয়। কমলদা আমাকে একটু ইন্টারভিউতে নিয়ে যাবেন, প্লিজ। একবার তো প্রার্থীর পক্ষে তাকে নিজেকেই ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল। ‘জানোই তো এই সেকেন্ড-রেট দেশগুলোয় একটু এদিক সেদিক করাই যায়’, সে বলল।
‘এমনটা কি নিরাপদ? এটা কি দরকার?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
সে বলল, ‘এ সবই কিন্তু আদতে আমাদের ঐ ম্যানুয়ালের জন্যই। লেখার জন্য আমার তো সবকিছু থেকে প্রথমে মুক্তি দরকার। সব রকম জরুরত থেকে মুক্তি দরকার . . . আমার একটি বাসস্থান দরকার, অনুগ্রহে নয়- ভাড়ায়, সেখানে একজন কেয়ারটেকার থাকবে যে আমার জন্য তিন বেলা খাবার-দাবার আনবে কিন্তু দিনে একবারও আমাকে ডিস্টার্ব করবে না। সে স্থান হবে কোনো পাহাড়ে, কিংবা সাগরের পাড়ে কিংবা কোনো ছোট শহরে, যেখানে কোনো ঝামেলা নেই এবং কৌতুহলীদের ভিড় নেই, এমনকি যেখানে আমি আমার নিজের কৌতুহল থেকেও মুক্ত থাকব। একবার সে স্থানে পৌঁছতে পারলেই আমি লেখাটা শুরু করতে পারি।’
আমার লেখার যোগ্যতাও ছিল না, এর পিছনে আমার ছোটাছুটিও ছিল না। তবুও এটা যে একটা বাসনা তা আমি অনুভব করছিলাম। সেই বাসনারই নাম রামকমল যাকে আমরা তখনো সকলে ভালবাসতাম এবং যাকে আমরা তখনো উদ্ধারের চেষ্টা করছি। সেই রামকমল তখনো আমাদের সাথে আড্ডাটা ধরে রাখছে। লেখা বন্ধ করার পরে তার সান্ধ্য আড্ডায় সে আরো নিয়মিত হয়ে উঠেছে। সে বলত, সময় এসেছে লিওপল্ড ব্লুম এবং ডন কুইক্সোটের ঘোরাঘুরির অন্তর্গত আদত কমেডিটুকু আমাদের বুঝতে হবে। সে এক একটি পাঠ ধরিয়ে দিত এমন এক প্রফেসরের মতো যিনি ভাবেন তার বিষয় বাদে আর কিছুরই কোনো গুরুত্ব নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-উপাসক প্রফেসরদের চেয়ে রামকমলের কাছ থেকেই সত্যিকারে আমরা কিছু শিখতে পেরেছিলাম। সে আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল কাফকার ত্রাসের জগতের সাথে এবং ভন ক্লিস্টের মোহনীয়তার সাথে। রামকমলের সুবাদেই আমরা বার্নহার্ডের রাগের রসিকতা এবং দানিলো কিশ-এর মর্মবাদিতা বুঝতে শিখেছিলাম। রামকমলের ভয়াবহ পক্ষপাত ছিল ইউরোপিয়ানদের প্রতি এবং এটাকে সে কখনো ভুল মনে করত না। অবশ্য কিছু ‘জরুরি’ আমেরিকানকে সে আলাদা করে রেখেছিল। তাদের মধ্যে বিশেষ করে ছিলেন দক্ষিণ আমেরিকার কার্পেন্তিয়ের এবং কোর্তাসার, বোর্হেস এবং রুলফো, এবং আরো কিছু জাদুবাস্তবতার লোকেরা। এছাড়া ইউরোপীয় হিসেবে কিছু প্রান্তিক জনকেও সে আলাদাভাবে গুনত। তাদের মধ্যে ছিলেন যেমন আলবেনিয়ার ইসমাইল কাদারে, এবং স্পেনের হুয়ান গয়তিসেলো প্রমুখ। এঁরা দূরদৃষ্টি ও সাহিত্যিক কারিগরি দ্বারা নিজেদেরকে এমন এক জায়গায় উন্নীত করেছেন যে এঁরা আজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে তার গণনায় কোনো বাঙালি লেখকের স্থান কখনো হয়নি। আড্ডায় যারা নবাগত থাকত তারা প্রায়ই বাঙালি সমাজতান্ত্রিক বা সেন্টিমেন্টালিস্ট লেখকদের পক্ষে তাকে তাকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চাইত। রামকমল তাদের দিকে তার দীর্ঘ ধূসর চাহনিতে তাকাত। যারা সে চাহনিতে ভীত হত তারা এ আড্ডা ত্যাগ করত, বাকিরা নিয়মিত হত। এখানের আলোচনা থেকে কেউ নোট নিতে পারত না। রামকমল বলত নোট লেখা মানেই মনটা আলোচনা থেকে অন্য দিকে সরিয়ে নেয়া। আড্ডাটা হত অনেক রাতে। তখন কোনো সাধারণ ক্রেতার আনাগোনা থাকত না। আমরা পাশের দোকানগুলো থেকেও বসার টুলগুলো নিয়ে আসতাম। পাশের গলি থেকে ছোটকা একের পর এক চা আনতে থাকত। শেষের দিকের আড্ডাগুলোয় দেখেছি রামকমল প্রশংসা করছে ইতালিয়ান লেখক দি ল্যাম্পেদুসার গ্রন্থ The Leopard এবং হাঙ্গেরিয়ান লেখক সান্দর মারাইর গ্রন্থ Embers। 
রামকমল এবং তার ভালবাসার জায়গাটুকু অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। তার মেধা ও কার্যজ্ঞানকে সন্দেহ করার উপায় নেই। অস্বীকারের উপায় নেই নিখাদ প্রাণশক্তি। তবে তার হারিয়ে যাওয়ার এই নয় মাস পরে তার কাহিনিগুলো পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। সব কাহিনির শেষ হল কোনো প্রলয়ঙ্করী কিছুর মধ্য দিয়ে নয়। বরং কিছু অ-ঘটনার মধ্য দিয়ে। প্রথমত এক সপ্তাহ আড্ডাটা চলল রামকমলকে ছাড়া। আড্ডাটা চলল বিদিশা ভক্তদের একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ির মধ্য দিয়ে। ভাবখানা এমন যে আমি হয়তো রামকমলকে কয়েকদিন ধরে দেখিনি, কিন্তু কেউ না কেউ ঠিকই জানে সে কোথায় আছে। মাঝে মাঝে যেমনটা গা ঢাকা দেয় এটাও অবশ্যই তারই একটি। তারপর একসময় সব জিজ্ঞাসা একত্র করে অর্থ দাঁড়াল যে, কেউই আসলে জানে না রামকমল কোথায়। শিষ্যরা এবার পাখার বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল। 
কেউ কেউ বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল কারণ তারা রামকমলের কাছে কিছু না কিছু টাকা পায়। অন্যদের উদ্বেগ আরো অন্তর্গত ও কঠিন। তারা খুঁজতে লাগল প্রতিটি ঘর যেখানে রামকমলের গেস্ট বা ভিজিটর যে কোনো হিসেবেই পা পড়েছে। হাবিজাবি ধরনের যেসব জায়গায় রামকমল কখনো না কখনো রাত কাটিয়েছে বলে শোনা গেল সেসব জায়গায়ও তারা তাকে খুঁজতে শুরু করল, যেমন: উত্তরার এক গুদামঘর ও একটি ম্যাসাজ পার্লার; এলিফ্যান্ট রোডে এক ডাক্তারের চেম্বারের প্রবেশকক্ষ; সদরঘাটের একটি রেস্টুরেন্টের উপরতলা ইত্যাদি। এসব জায়গায় রামকমল যেত বলে অন্তত আমি জানতাম না। এই সকল খোঁজাখুঁজির সব রিপোর্ট যখন একত্রিত হল, কিংবা রামকমলের শব্দ ধার করে বলা যায়, যখন এই সকল রিপোর্ট ইনফ্লেকশন পয়েন্টে পৌঁছল তখন তার শিষ্যরা বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীতে ভাগ হয়ে গেল।
অবিশ্বসীদের কাছ থেকে বেশ তড়িৎ গতিতে এলো এক হিংসাত্মক রায়: আমরা আগাগোড়াই জানতাম যে লোকটা একটা বাটপাড়। আমরা গাধা হয়ে সারা শহর ঘুরে তার ফরমাশ খেটেছি। সে আমাদের টাকাগুলো হাতিয়েছে। বিনিময়ে আমরা কী পেয়েছি? এই ছাইপাশ পৃষ্ঠাগুলো। কতগুলা হাবিজাবি যার কোনো অর্থ নেই। অবিশ্বাসীদের এই গ্রুপের প্রধান ছিল বাহার। অথচ কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত আমি জনিতাম বাহার হল রামকমলের গভীর ভক্তদের একজন। এমন বিশ্বাসত্যাগীদের একটি বড় সংখ্যা যাদের মধ্যে অনেকে ছিল যাদেরকে আমি চিনিও না তারা আমার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করল। প্রমাণ হিসেবে কাগজপত্র দাখিল করল যাতে এমন স্বাক্ষর ছিল যা আমার স্বাক্ষরের প্রায় কাছাকাছি। আপাতভাবে যে কেউ মনে করবে যে, এই সকল বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকাণ্ডে আমি রামকমলের দোসর। 
বিপরীতে বিশ্বাসীরা বলল— তোমরা বলতে পার না যে রামকমল পালিয়ে গেছে। সে যে কোনো মর্মান্তিক পরিণতিতে শেষ হয়ে যায়নি এমনটাও তোমরা বলতে পার না। এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে সে যে পরিমাণ টাকা নিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের মাঝে বিতরণ করেছে। তার মতো একজন গুরুর ব্যাপারে তোমরা এমন অকৃতজ্ঞ কেমনে হলে? জানার যোগ্য এমন কোন্ জিনিস তোমরা তার কাছ থেকে শেখনি?  
আমি এই সকল ঝগড়া-তর্কে ঢুকলাম না। আমি মামলাগুলো নিয়ে এক উকিলের সাথে কথা বললাম এবং এরপর শামসুর সাথে দেখা করলাম। সে ততদিনে একটা স্পেশাল ইউনিটে আগারগাঁওয়ে নতুন অফিসে বদলি হয়েছে। ঢাকার অনেক ভবনের মতো এটিও একটি অসমাপ্ত ভবন। সম্প্রতি সমাপ্ত রঙের কাজ থেকে উগ্র রাসায়নিক গন্ধ। তবে শামসুকে তার বিশাল ডেস্কে বেশ খুশি দেখা গেল। আমার কৌতূহল হল সরকারি কর্মকর্তা আর তাদের সামনে বসা লোকজনের মাঝে জন্য কেন দুর্গের দেয়ালের মতো এত বিশাল টেবিল দরকার হয়।  
‘বিষয়টা তাহলে রামকমল?’
তার এই আত্মতুষ্টিতে আমার আজ আর খুব রাগ হল না। এছাড়া আমার প্রতি তার অন্তত সেই দয়াটুকু আছে যাতে সে এই পরিহাস খুব দীর্ঘ করবে না।
শামসু বলল, ‘আমাদের কাছেও খুব নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। কেউই কোনো মানুষ হারানোর রিপোর্ট এখানে জমা দেয়নি। একজন হারানো মানুষের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ঋণখেলাপি ইত্যাদি কোনো মামলায়ই কিছু হওয়ার নেই। যারা এ মামলা করেছে তারাও এ বিষয় জানে। রামকমলের অতীত রেকর্ডে এমন ভারী কিছু নেই যা থেকে এর উপর আমাদের বেশ আগ্রহ দেখাতে হবে। আমাদের আগ্রহ বরং তোমাদের অন্য কিছু লোক নিয়ে। এরা ঠিক তুমি না বা তোমাদেরকে পরিবৃত করে রাখা বইপোকারাও না। এরা অন্য এবং আমার মনে হয় তোমাদের এই অন্য লোকগুলোর বিষয়ে তুমিও তেমন কিছু জান না। তবে এই লোকগুলোর সাথে রামকমলের সম্পর্কও এমন স্পষ্ট বা দীর্ঘস্থায়ী ছিল না যার ভিত্তিতে সেটাকে আমরা একটা বিষয় হিসেবে হাতে নিতে পারি।’
‘এ নিয়ে তোমার হাতে আর কিছু বলার মতো নেই?’
শামসু বলল, ‘কিছু আছে, তবে তা রামকমলকে খুঁজে পেতে কোনো কাজে লাগবে না। আমার মনে হয় সে চিরতরেই গেছে।’
শামসুর এই নিদয় ধরনের বলা আমার জন্য সহায়তাসূচক মনে হল। এক পিয়ন আমাদের জন্য দুকাপ চা নিয়ে এলো। শামসু মাশাল্লাহ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে এখন আর অখাদ্য একটু লিকার চা হাজির করতে হয় না, এখন তার সাথে একটু অখাদ্য কনডেন্সড মিল্কও সে যোগ করতে পারে। আমি যখন সেই ভয়ঙ্কর চায়ে মুখ লাগালাম এবং পশ্চিমদিকে অস্তগামী সূর্যের দিকে চোখ রাখলাম তখন শামসু বলে উঠল, ‘দেখ, তোমার জন্য এ অভিজ্ঞতা এই প্রথম, আমরা তো যা দেখি সব এই জাতেরই’। শামসুর কথা আমি তখন আর আদতে শুনছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল আমি কোনো স্বপ্ন থেকে জেগে উঠছিলাম। যদিও অনেকে এখনো মনে করছে যে রামকমল জাদুকরের মতো হঠাৎই একদিন আমাদের সামনে হাজির হয়ে যাবে, কিন্তু আমি মনে করি রামকমল যে জাদু আমাদেরকে প্রথম দেখিয়েছে সে জাদু সে নিজেও আর কখনো পুনঃসৃষ্টি করতে পারবে না। দিনে দিনে এ বিশ্বাস এখন আমার বেশ গাঢ় যে রামকমল আর কখনো আমাদের মাঝে ফিরবে না। মনে মনে এটা আমার কিছুটা আনন্দও যে সে আর কখনো ফিরবে না।
রামকমলের উধাও হয়ে যাওয়ার প্রথম বার্ষিকীটি উদ্যাপন করলাম আমার দোকানটি আরেকটু সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে। অনেক সম্প্রসারিত আমার বুকশেলফগুলো গর্বের সাথে ধারণ করে পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চলের সাহিত্যগ্রন্থ। সেখানে বাংলা সাহিত্যও আছে। তবে রামকমলের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ সেখানে রবীন্দ্রনাথের কোনো বই নেই। আমি পাশের দোকান পর্যন্ত স্পেসটুকু নিলাম এবং সেখানে চারটি বর্গাকার টেবিলে একটি ছোট ক্যাফে সাজালাম। এখানেই আমাদের নতুন আড্ডাগুলো হয়। ছোটকাকে সেই ক্যাফের ম্যানেজার বানিয়ে দিয়েছি। এই আড্ডা নিয়ে আমার কোনো মহান কল্পনা বা পরিকল্পনা নেই। এ আড্ডা আমার জন্য নয়, নতুন প্রজন্মের জন্য। আমাদের প্রত্যেককেই আমাদের সেই ম্যনুয়েলটি চর্চার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজতে হয়েছে। জয়দীপ সরাসরি ম্যানুয়ালটিই বাঁচানোর চেষ্টা করল। সে আরো অনেক পৃষ্ঠা লিখল। একটি নতুন অধ্যায়ই লিখে ফেলল। জনশ্রুতি আছে আমাদের কিছু বিচ্ছিন্ন গ্রুপ তাদের নিজ নিজ ভার্সনের ম্যানুয়ালের বের করছে। এটা বিষয় না যে কে আগে বের করল, কিংবা কে পারল আর কে পারল না। রামকমলের মহাপরিকল্পনাকে মাথায় ধরে কেউ যদি পারে সেটাই বিষয়। রামকমল যদি জানতে পারে এ প্রয়াসের কথা সে অনেক খুশি হবে। মাঝে মাঝে অনেক রাতে একাকী দোকানে বসে আমার এখনো মনে হয় রামকমল কাছেই কোথাও আছে এবং এসবই জানছে। সে জানছে যে তার ম্যানুয়ালটি এখনো বেঁচে আছে। সেটি বেঁচে আছে শুধু বইয়ের পৃষ্ঠারূপে নয়। সেটি বেঁচে আছে একজন পথনির্দেশক হিসেবে, আমাদের ভিতরে প্রাণস্পন্দন সম্পন্ন এক ডকুমেন্ট হিসেবে। সে বলছে অক্ষর বা বর্ণ ছাড়াও কীভাবে প্রাণবন্তরূপে বেঁচে থাকা যায়। 

 


মুহম্মদ মুহসিন : কবি প্রাবন্ধিক অনুবাদক এবং অধ্যাপক। বাংলাদেশ। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।