বিকাল ০৪:৩৮ ; মঙ্গলবার ;  ২১ মে, ২০১৯  

উলকিকর || মূল : তানিজাকি জুনিচিরো

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[তানিজাকি জুনিচিরো (১৮৮৬-১৯৬৫) আধুনিক জাপানি কথাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। এই গল্পটির মূল নাম শিসেই, যা তিনি লিখেছিলেন ১৯১০ সালে। হাওয়ার্ড হিবেট-এর ইংরেজি তর্জমাবলম্বনে : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী


সময়টা ছিল এমন যখন লোকজন তুচ্ছতার মহৎ গুনকেও সম্মান করত, যখন জীবন আজকের মত এতটা কঠিন প্রতিকূল না। রয়েবসে কাটত সময় তখন। সেই সময় পেশাদার বুদ্ধিদীপ্ত রসিকেরা ধনী বা অভিজাত বংশের তরুণ যুবাদেরকে সদা হাস্যোজ্জ্বল করে রাখতে পারত আর রাজদরবারের রমণী ও গেইশাদের মুখে হাসি লেগেই থাকত। সেই সময়ের সচিত্র রোমান্টিক উপন্যাসে, কাবুকি থিয়েটারে, যেখানে সাদাকুরো এবং জিরাইয়া-র মত ডাকাবুকো পুরুষ নায়কেরাও নারীরূপে আবির্ভূত হত— সৌন্দর্য আর শক্তিমত্তার মিশেল ছিল সবখানে। মানুষ যেভাবে পারে নিজেদেরকে সুন্দর করে তুলত, কেউ কেউ এমনকি তাদের দেহের মূল্যবান ত্বকে ইনজেকশন ঢুকিয়ে রং করত। পুরুষদের দেহে চটকদার রেখা ও রঙের নাচন খেলত। 
এদো-র মেয়েপাড়ায় যাওয়া পুরুষেরা পালকির বেহারা হিসেবে গায়ে দারুণভাবে উলকি-আঁকা লোকদেরকে ডাক পাঠাতো; ইয়েশিওয়ারা আর তাত্সুমি মহল্লার বারাঙ্গনারা উলকিধারী পুরুষদের প্রেমে পড়ল। গায়ে সেইভাবে উলকি-আঁকা পুরুষদের মধ্যে জুয়ারি, দমকলকর্মী বা ওইরকম লোকজনই ছিল না, উপরন্তু বণিক শ্রেণীর সদস্য এবং এমনকি সামুরাইরাও ছিল। থেকে থেকে নানা প্রদশর্নী হতে লাগল; আর পোশাক-আশাক খুলে তাদের কারুকার্যময় দেহ প্রদর্শন করা প্রতিযোগীগণ, গর্বভরে বাহবা দেয় নিজেদের, আপন আপন অভিনব নকশায় গরিমা দেখায়, আর একে অপরের গুণাগুণ ব্যাখ্যা করে।
একজন অসামান্য দক্ষ তরুণ উলকিকর ছিল যার নাম সেইকিচি। চারদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল এবং চারিবুন বা ইয়াতসুহেই-এর মত গুরুতুল্য আঁকিয়েদের পাশাপাশি তার নাম উচ্চারিত হতে লাগল। ডজন ডজন পুরুষের দেহের ত্বক তার তুলির আঁচড়ের জন্যে নিবেদিত হল। উলকি প্রদশর্নীর যে কাজগুলি সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছে তাদের বেশির ভাগই তার করা। অন্যদের কাজ যেখানে চোখে পড়ছে রঙের ছোপ কিংবা সিঁদুরের ব্যবহারের জন্য, সেখানে সেইকিচির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল তার শিল্পকলার তুলনারহিত সাহসিকতা আর ইন্দ্রিয়জ লাবণ্যতার জন্য। 
সেইকিচি এর আগে তোইয়োকুনি এবং কুনিসাদা বিদ্যালয়ের উকিওইয়ে চিত্রশিল্পী হিসেবে জীবনযাপন করেছে। একজন উলকিকর হিসেবে তার অবস্থান একটু নীচে নেমে যাওয়ার পরও যে অতীত-অভিজ্ঞতা তার শৈল্পিক চেতনাবোধ ও সংবেদনশীলতায় সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। যার ত্বক বা দেহ তাকে আকর্ষিত করতে ব্যর্থ হয় সে চাইলে অর্থের বিনিময়ে তাকে দিয়ে উলকি আঁকিয়ে নিতে পারে। যে মক্কেলদেরকে সে গ্রহণ করে তাদের দেহের ত্বকে কোন নকশা হবে আর খরচই বা কত পড়বে তা একমাত্র সে-ই ঠিক করে এবং এমনকি তারা এক কী দুই মাস পর্যন্ত তার সুঁচের অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে।
মনের গহীনে তরুণ উলকিকর একটি গোপন আনন্দ, একটি গোপন ইচ্ছে লুকিয়ে রেখেছে। পুরুষদের দেহে সুঁচ ফুটিয়ে সে আনন্দিত হয়, তাদের ফুলে-ওঠা, রক্তলাল ত্বকে সুঁচ ঢুকানোর পর তারা যন্ত্রণায় কাতর হয় আর তা দেখে সে উল্লাসিত হয়; তারা যত উচ্চস্বরে গোঙায় ততই সেইকিচির অদ্ভুত আনন্দ হয়। রঙের ছোপ মারা এবং সিঁদুর রঙে রঞ্জিত করা— বলা হয়ে থাকে যে এগুলি খুবই ব্যথাদায়ক— এই দুই পদ্ধতির প্রয়োগ যে প্রাণভরে করে। 
যখন কেউ গড়পড়তা দৈনিক হিসেবে সুঁচের পাঁচ-ছয়শো ফোঁড় খেয়ে গরম জলের স্নানে দেহ ভেজায় উলকির রং ফুটাবার জন্য, তখন সে আধামরার মত সেইকিচির পায়ে লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু সেইকিচি ভাবলেশহীনভাবে নিচের দিকে তাকায়। “আমি বলব অত ব্যথা হচ্ছে না”, এক ধরণের আত্মতৃপ্তি নিয়ে সে বলে। 
যখনই কোনো দুর্বলচিত্তের লোক যন্ত্রণায় হাউমাউ করে ওঠে কিংবা দাঁত কিড়মিড় করে এবং মুখ বেঁকিয়ে এমন ভঙ্গি করে যেন মরে যাচ্ছে, তখনই সেইকিচি তাকে বলে: “বাচ্চা ছেলের মত কোরো না। শক্ত হও— আমার সুঁচ তো এখনো তোমার দেহই স্পর্শ করেনি!” আর সে উলকি এঁকেই চলে, অতীতের চেয়ে আরও অবিচালিত ভঙ্গিতে, মাঝে মাঝে শুধু লোকটির অশ্রুভেজা মুখের দিকে এক পলক তাকায়।
কিন্তু কখনো কখনো প্রচণ্ড সহিষ্ণু ধৈর্যবান কোনো লোক চোয়াল শক্ত করে নির্বিকার থাকে, এমনকি ভুরুও কোঁচকায় না। সেইকিচি তখন হেসে বলে : “ওহ, তুমি দেখছি গোয়ারগোবিন্দ। কিন্তু অপেক্ষা করো। অচিরেই তোমার শরীর ব্যথায় কাতরাবে। তুমি সে কষ্ট নিতে পারবে কিনা কে জানে ...”

একজন সুন্দরী রমণীর ত্বকে একটি মাস্টারপিস উলকি আঁকার আকাঙ্খা সেইকিচির বহুদিনের। আর সেই নারী স্বভাবে ও দেখতে-শুনতে নানা গুণসম্পন্না হতে হবে। শুধু একটা সুন্দর মুখ আর মনোরম দেহই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়। এদোর মেয়েপাড়ার সকল সেরা সুন্দরীদের যদিও সে পরখ করেছে কিন্তু তাদের মধ্যে কাউকেই সে খুঁজে পায়নি যেরকম সে চাইছে। এভাবে কয়েক বছর কেটে গেল নিস্ফিলভাবে। কিন্তু নিখুঁত রমনীর মুখ আর দেহবল্লরী তাকে তাড়িয়েই মারল। সে আশা ছাড়ল না। 
সেই আরাধ্য রমণীকে খোঁজার চতুর্থ বছরে গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায় এদোর ফুকাগাওয়া মহল্লার হিরাসেই রেস্তোরাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল সেইকিচি। জায়গাটা তার বাসা থেকে দূরে নয়। চকিতে চোখে পড়ল এক নারীর দুধসাদা খালি-পা পথ চলতি এক পালকির পর্দার কাপড়ের নীচে উঁকি মারছে। তার তীক্ষ্ম চোখে, একজন নারীর পা তার মুখের মতই ভাবব্যঞ্জক। নিখাদ পদযুগল। ঈশ্বর বোধহয় নিজ হাতে গড়েছেন। চমৎকার কাটাকাটা আঙ্গুল, নখগুলি এনোশিমা বেলাভূমির চিত্রাভ শঙ্খের মত, মুক্তোবৎ সুডৌল গোড়ালি, ত্বক এতটা ঝকঝকে যেন দেখে মনে হয় পাহাড়ি ঝর্ণার ঝরঝরে জ্বলে ধোয়া—আদতেই, এই হল পা যা পুরুষের রক্তে পরিপুষ্ট হওয়ার জন্যে, তাদের শরীর এই পা দিয়েই পিষ্ট হবে। নিশ্চিতভাবে এই হল সেই বিরল রমণীর পা যা তাকে এড়িয়ে চলছিল। তার মুখশ্রী দেখবার জন্য মরিয়া হয়ে সেইকিচি পালকিটাকে অনুসরণ করতে লাগল। কিন্তু অনেকগুলি লেইন আর গলি ধরে পিছু নেয়ার পর একসময় সে ওটাকে বিলকুল হারিয়ে ফেলল। 
সেইকিচির বহুদিন ধরে পুষে রাখা ইচ্ছেটা আবেগঘন প্রেমে রূপ নিল। পরের বসন্তের শেষ দিকে এক সকালে সে ফুকাগাওয়ায় তার বাসার বাঁশের মেঝের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, এক দৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ওমোতো পদ্মের একটি টবের দিকে। হঠাৎ শুনল বাগানের দরজায় কারও আওয়াজ। ভেতরের বেড়ার কোণা দিয়ে একটি তরুণী এলো। সে সেইকিচির এক বন্ধুর জন্য বাজার-সওদা করতে এসেছে, কাছের তাতসুমি মহল্লার এক গেইশা হল তার সে বন্ধু।
“আমার কর্ত্রী বলেছেন এই জোব্বাটি পৌঁছে দিতে, আর তিনি বলেছেন এর লাইনিংটা আপনি অনুগ্রহ করে নকশা করে দিতে পারবেন কি না,” মেয়েটি বলল। সে জাফরান রঙের একটি কাপড়ের পোটলা খুলে তার ভেতর থেকে একটি মেয়েদের সিল্কের লম্বা ঢিলাঢালা জোব্বা (নায়ক তোজাকূর পোট্রেট আঁকা একটি মোটা কাগজে মোড়ানো) এবং একটি চিঠি বের করল।
চিঠিতে তার বান্ধবীর অনুরোধটি লেখা এবং এও লেখা আছে যে কাপড় আর চিঠির এই বাহিকা তার অধীনে সহসাই গেইশা হিসেবে জীবন শুরু করবে। তার বান্ধবীর আশা, পুরোনো সম্পর্কের রেশ ধরে, সেইকিচিও মেয়েটির প্রতি তার সহযোগিতার হাত বাড়াবে।
“আমার মনে হয় না তোমাকে এর আগে দেখেছি,” সেইকিচি বলল, তাকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে। মেয়েটির বয়স পনেরো কি ষোলো হবে, কিন্তু তার চেহারায় একটা পরিণত রূপের ছটা আছে, একটা অভিজ্ঞতার ভাব, যেন সে ইতোমধ্যেই মেয়েপাড়ায় অনেকগুলি বছর কাটিয়েছে এবং অসংখ্য পুরুষকে চমৎকৃত করেছে। এই বিশাল শহরে যেখানে জাতির পাপ আর সম্পদের পাহাড় জমেছে, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চটকদার পুরুষ ও নারীরা বাস করেছে আর মরেছে, তাদের স্বপ্নের প্রতিফলন মেয়েটির সৌন্দর্য।
সেইকিচি তাকে বারান্দায় বসালো, এবং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল তার নরম চারু পাযুগল, যেগুলি খালি, শুধু আছে পরনের রমনীয় খড়ের স্যান্ডেল। “গত বছরের জুলাই মাসের এক রাতে তুমি পালকিতে চড়ে হিরাসেই ছেড়েছিলে, তাই না?” সে জিজ্ঞেস করে। 
“আমার মনে হয়,” সে জবাব দেয়, এই অদ্ভুত প্রশ্নে হেসে ফেলে। “আমার বাবা তখনো বেঁচে ছিলেন, আর তিনি প্রায়ই আমাকে ওই রেস্তোরাঁয় নিয়ে যেতেন।”
“আমি পাঁচ বছর ধরে তোমার অপেক্ষায় আছি। এই প্রথম তোমার মুখ দেখলাম, কিন্তু তোমার পা আমার স্মরণে আছে। ... একটু আসো, আমি তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই।” 
মেয়েটি উঠে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু সেইকিচি তাকে হাত দিয়ে ধরে টেনে উপরে প্রশস্ত নদীমুখী তার স্টুডিয়োতে নিয়ে গেল। এরপর সে দুটি ছবির স্ক্রল বের করে একটি মেলে ধরল তার সামনে।
এটা এক চৈনিক রাজকুমারীর ছবি, শাঙ রাজবংশের নিষ্ঠুর সম্রাট চোউ-এর প্রিয় কণ্যার। আলস্যঘন ভঙ্গিতে একটি ব্যালকিনির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আছে, তার অলংকৃত ব্রোকেড-করা গাউনের লম্বা স্কার্টটি বাগানের দিকে নেমে যাওয়া সিঁড়ির ধাপের অর্ধেকটা পর্যন্ত ছড়ানো, তার ছিপছিপে দেহ প্রবাল আর নীলকান্তমণি খচিত সোনার মুকুটের ভার সইতে পারছে না। তার ডান হাতে একটি বড় মদের পেয়ালা, কাৎ করা ভঙ্গিতে আলতো করে ছুঁয়ে আছে তার ঠোঁট আর সে নীচে তাকিয়ে আছে একটি লোকের দিকে যাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাগানে নির্যাতন করা হবে। লোকটির হাত-পা শিকল দিয়ে একটি ফাঁপা তামার পিলারের সঙ্গে বাঁধা যেখানে আগুন জ্বালানো হবে। রাজকুমারী আর তার শিকার— লোকটির মাথাটা রাজকুমারীর দিকে নোয়ানো, চোখগুলি বন্ধ, তার নিয়তির জন্য অপেক্ষারত— ভয়ঙ্কর প্রাণবন্তভাবে আঁকা।
এই অদ্ভুত ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেয়েটির ঠোঁট কেঁপে ওঠে এবং তার চোখগুলি জ্বলজ্বল করে। আস্তে আস্তে তার মুখটি রাজকুমারীর মুখের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে গেল। ছবির মধ্যে সে তার গোপন সত্তাটিকে আবিষ্কার করল।
“তোমার নিজের অনুভূতিগুলি এখানে উদ্ভাসিত,” সেইকিচি আনন্দচিত্তে তাকে বলল তার মুখের দিকে তাকিয়ে।
“এই ভয়ঙ্কর ছবিটা আমাকে দেখাচ্ছেন কেন?” মেয়েটি জিজ্ঞেস করে, সেইকিচির দিকে তাকিয়ে। তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
“এই রমণী স্বয়ং তুমি। ছবির ওই রাজকুমারীর রক্ত তোমার ধমনীতে।” এরপর সে আর একটি স্ক্রল মেলে ধরল।
এই ছবিটির নাম “শিকার।” এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে একটি তরুণী একটি চেরি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে: তার পায়ের কাছে স্তূপীকৃত একসারি পুরুষের লাশের দিকে তরুণী হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। ছোট ছোট পাখি তার চারপাশে ডানা ঝাপটাচ্ছে, বিজয়ের গান গাইছে; তরুণীটির চোখ গর্ব আর আনন্দে বিচ্ছুরিত। এটা কি যুদ্ধক্ষেত্র না কি বসন্তকালীন কোনো বাগান? এই ছবিটি দেখে মেয়েটির মনে হল তার নিজের হৃদয়ের আঁধারে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা কোনো কিছু সে খুঁজে পেয়েছে।
“এই ছবিটি তোমার ভবিষ্যৎ দেখাচ্ছে,” সেইকিচি বলল, চেরি গাছের নীচের নারীটিকে দেখিয়ে— যেন মেয়েটিরই ছবি। “এই লোকগুলি তোমার জন্য তাদের জীবন ছারখার করে ফেলবে।”
“দয়া করে ছবিটি সরিয়ে ফেলুন!” ছবিটির পীড়াদায়ক টান উপেক্ষা করবার জন্য মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে অগত্যা সেইকিচির সম্মুখে উপনীত হল, কাঁপতে কাঁপতে। শেষমেষ সে আবার মুখ খুলল। “হ্যাঁ, আমি স্বীকার করছি আপনি আমার সম্পর্কে ঠিকই বলেছেন— আমি ওই নারীটির মত ... দয়া করে, অনুগ্রহ করে ছবিটি সরিয়ে নিন।”
“ভীতুর মত কথা বোলো না,” সেইকিচি তাকে বলল, তার খোলো হাসি নিয়ে। “আরও ভালো করে দেখো ছবিটা। খুব বেশিক্ষণ আর খারাপ লাগবে না ওটা।”
কিন্তু মেয়েটি মাথাটা তুলতে অস্বীকৃতি জানায়। এখনো অসহায় ভঙ্গিতে বসে, জামার আস্তিনে মুখ ডুবিয়ে, মেয়েটি বারংবার বলেই চলল যে সে ভয় পেয়েছে এবং চলে যেতে চায়।
“না, তোমাকে থাকতে হবে— আমি তোমাকে অপরূপ রূপে সাজাবো,” সে বলল, মেয়েটির কাছে এগোতে এগোতে। সেইকিচির কিমোনোর নিচে রাখা আছে একটি অনুভূতিনাশক শিশি যা সে এক ওলন্দাজ চিকিৎসকের কাছ থেকে কিছু দিন আগে সংগ্রহ করেছে। 

সকালের সূর্যকরোজ্জল নদী, আলোয় ভেসে যাচ্ছে আট-মাদুরপাতা স্টুডিয়ো। নদীর জলের প্রতিফলিত আলো  ছোট ছোট সোনালি ঢেউয়ের মালা বুনে দিচ্ছে কাগজের স্লাইডিং পর্দা আর মেয়েটির মুখে, যে অঘোরে ঘুমাচ্ছে।  সেইকিচি দরজা বন্ধ করে দিয়ে তার উলকি আঁকার সরঞ্জামগুলি নিয়েছে, কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকল, পুরোদমে মেয়েটির অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করল। তার মনে হল কোনও দিনই এই নির্মল লাবণ্যময়ী মুখের দিকে তাকিয়ে তার ক্লান্তি আসবে না। প্রাচীন মিশরীয়রা যেমন তাদের ভুমিকে পিরামিড আর স্ফিংক্স দিয়ে অলংকৃত করেছে, তেমনি সেও এই মেয়েটির নিষ্পাপ ত্বককে অলংকৃত করবে। 
সে তার তুলিটা নিল যেটা তার বুড়ো আঙ্গুল আর বাম হাতের শেষ দুটো আঙ্গুলের মধ্যে ধরা, উপুর হয়ে শুয়ে থাকা মেয়েটির পিঠে তুলির ডগাটা রাখল, আর, ডান হাতে ধরা সুঁচটা ফুঁটিয়ে সে একটা নকশা আঁকা শুরু করল। সে অনুভব করল যে কাঠকয়লা-কালো কালিতে মেয়েটির দেহ রঞ্জিত হচ্ছে তার চেতনা সে কালিতে গলে যাচ্ছে। ফোঁটায় ফোঁটায় মদের সঙ্গে রিউকিউ সিঁদুর মিশিয়ে মেয়েটির দেহে যা সে ঢুকিয়ে দিচ্ছে তা আসলে তার প্রাণরসের ফোঁটা। তার রঞ্জকের মধ্যে সে তার রক্তিম বাসনার আভা দেখতে পেল।
ঝুপ করেই বিকেল নামল, আর অমনি প্রশান্ত বসন্তের দিন শেষ হয়ে এল প্রায়। কিন্তু সেইকিচি একবারও থামল না, আর মেয়েটির ঘুমও একবারও ভাঙ্গল না। গেইশাবাড়ি থেকে একটি মেয়ে যখন তার খোঁজে এল, সেইকিচি তাকে ফিরিয়ে দিল, এই বলে যে সে অনেক আগে চলে গেছে। এবং কয়েক ঘন্টা পর, চাঁদ যখন নদীমুখী বিশাল বাসাটির উপর ঢলে পড়ল, স্বপ্নসম আলোর ছটায় নদীর ধারের বাড়িগুলিকে স্নান করালো, উলকিটা তখনো আধেকও আঁকা হয়নি। সেইকিচি মোমবাতির আলোয় কাজ করল। 
এমনকি একটা ছোট্ট রঙের ফোঁটা ঢুকানোও সহজ কাজ নয়। সুঁচের প্রতিটি ফোঁড়নে সেইকিচি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর তার কাছে মনে হয় সে যেন তার নিজের হৃৎপিণ্ডে ছুরি বসাচ্ছে। আস্তে আস্তে উলকির চিহ্নটা একটা বড়সড় কালো স্ত্রী মাকড়সার রূপ নিল; আর রাতের আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠতেই এই আজব, অসূয়া প্রাণীটি তার আটটি পা ছড়িয়ে দিল মেয়েটির সমস্ত পিঠটাকে আলিঙ্গন করার জন্যে।   
বসন্তের ভোরবেলাকার ভরাট আলোয় নৌকাগুলি উজান ও ভাটির দিকে দাঁড় টেনে চলছে, ভোরের নির্জনতায় তাদের বৈঠা ক্যাঁচক্যাঁচ করছে; বাসাবাড়ির ছাদের টালিগুলি সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে, আর সাতসকালের হালকা হাওয়ায় ফুলে-ফেঁপে ওঠা সাদা পালে পাতলা কুয়াশা মিহি হয়ে যেতে শুরু করেছে। অবশেষে সেইকিচি তার তুলি রেখে উলকি-আঁকা মাকড়সার দিকে তাকায়। এই শিল্পকর্মটি তার জীবনের সেরা প্রচেষ্টা। আঁকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন তার হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি শুকিয়ে গেল। 
তার দুটি আঙ্গুল কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে রইল। এরপর সেইকিচির নীচু, কর্কশ স্বর রুমের দেয়ালে অল্প অল্প কম্পনে প্রতিধ্বনিত হল: 
“তোমাকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে তুলতে এই উলকিতে আমি আমার আত্মাকে ঢেলে দিয়েছি। আজ জাপানে তুলনায় তোমার ধারেকাছে আসে এমন সুন্দরী কেউ নেই। তোমার অতীতের ভয়-ভীতি উবে গেছে। সকল পুরুষ তোমার শিকার হবে।”
যেনবা এ-কথার জবাব দিচ্ছে এমনভাবে মেয়েটির ঠোঁট থেকে একটি মৃদু গোঙানি শোনা গেল। আস্তে আস্তে তার জ্ঞান ফিরতে লাগল। তার প্রতিটি থর থর নিঃশ্বাসে, মাকড়সার পাগুলি নড়েচড়ে যেন তারা জীবন্ত। 
“তোমার নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে। মাকড়সাটি তোমাকে আঁকড়ে ধরেছে।”
এই কথায় সে তার চোখগুলি কিছুটা খোলে, নিষ্প্রাণ এক দৃষ্টিতে। তার তাকানো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়, সন্ধ্যার আকাশে চাঁদ যেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যতক্ষণ না তা সেইকিচির মুখে ঝলমল করে উঠল।
“উলকিটা একটু দেখি,” মেয়েটি বলল, যেনবা স্বপ্নে কথা বলছে কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে কিছুটা কর্তৃত্বের ভাব। “আমাকে আপনার আত্মা দেওয়ায় নিশ্চয়ই আমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।”
“প্রথমে তুমি স্নান সেরে নাও না হয় রঙ ফুটে বের হবে না,” সকরুণভাবে ফিসফিসিয়ে বলল সেইকিচি। “দুঃখিত, ব্যথা করবে, কিন্তু আর একটু সাহস সঞ্চয় কর।”
“সৌন্দর্যের জন্য আমি যে কোনো কিছু সহ্য করতে পারি।” অসহ্য এক ব্যথা তার দেহে ছড়িয়ে পড়ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও, সে হাসল।

“কীভাবে জল কামড় দেয়!” ... আমাকে একা থাকতে দিন—অন্য ঘরে অপেক্ষা করুন! কোনো একজন পুরুষ এভাবে আমার কষ্ট দেখছে তা আমার ভীষণ অপছন্দ।
স্নানাধার ছেড়ে যখন বের হল, এতটাই দুর্বল যে গা মোছারও শক্তি নেই, মেয়েটি সেইকিচির বাড়িয়ে দেওয়া দরদী হাতটি একপাশে সরিয়ে দিল, এবং নিদারুণ যন্ত্রণায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, গোঙালো যেন সে দুঃস্বপ্নতাড়িত। তার এলোমেলো চুল বুনো জটপাকানো অবস্থায় ঝুলে থাকল তার মুখের উপর। তার পায়ের সাদা তলা তার পেছনে থাকা আয়নায় প্রতিফলিত হল।
গতকালের লাজুক, নমনীয় স্বভাবের মেয়েটির মধ্যে এই পরিবর্তন দেখে সেইকিচি রীতিমত অবাক, কিন্তু সে মেয়েটির কথা মত স্টুডিয়োতে গিয়ে অপেক্ষা করল। এক ঘন্টা পর মেয়েটি ফিরে এল, সতর্কভাবে কাপড় পরা, তার ভিজেভিজে, কোমলভাবে আঁচড়ানো চুল কাঁধের উপর দিয়ে নেমেছে। বারান্দার রেলের উপর হেলান দিয়ে, সে চোখ তুলে আবছা হালকা কুয়াশায় ঢাকা আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখগুলি অতি উজ্জ্বল; ব্যথা বা বেদনার ছিটেফোঁটাটিও নেই। 
“এই ছবিগুলিও আমি তোমাকে দিতে চাচ্ছি,” সেইকিচি বলল, ছবির স্ক্রলগুলি তার সামনে রেখে। “ওগুলি নিয়ে চলে যাও।”
“আমার পুরোনো ভয়ভীতি সব কেটে গেছে— আর তুমি আমার প্রথম শিকার!” সেইকিচির প্রতি তলোয়ারের মত ধারালো উজ্জ্বল এক দৃষ্টি ছুঁড়ে মেয়েটি। তার কানে বাজে বিজয়ের গান। 
“আর একবার তোমার উলকি একটু দেখি,” সেইকিচি অনুনয় করে। 
নীরবে মেয়েটি সায় দেয় এবং তার কাঁধ থেকে কিমোনোটি ফেলে দেয়। ঠিক তখন তার আলোকোজ্জ্বল উলকি-আঁকা পিঠটিতে একটু সূর্যারশ্মি পড়ে আর মাকড়সাটি আগুনে পাকিয়ে যায়।

 


রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী : প্রাবন্ধিক অনুবাদক এবং অধ্যাপক। বাংলাদেশ। 

 

    
     

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।