দুপুর ০১:৪৬ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৭ অক্টোবর, ২০১৯  

সেলাই || আনসারউদ্দিন

প্রকাশিত:

ইদানিং খুব দ্রুত চারপাশের পরিবর্তন স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। যেদিকে তাকাই না কেন পরিবর্তন চোখে পড়ে। আর এটা দেখতে দেখতে এমন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে আমরা আর আশ্চর্য হই না। খুব বেশি হাঁ করে তাকিয়েও থাকি না। বর্তমান সময়ে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। অবশ্য বিশ্ব সংসারে পরিবর্তন তো হচ্ছেই প্রাকৃতিক নিয়মে। তা নইলে অত বড় হিমালয় পর্বত টেথিস সাগরের মধ্যে থেকে জেগে উঠবে কেন।

আমাদের বাড়ি থেকে গাছা যাবার দুটো পথ। যেকোন পথকে পছন্দ অনুযায়ী ব্যবহার করা যায়। বাড়ি থেকে নেমে দুটো পথ সাঁড়াশির মতো গাছার দিকে বেরিয়ে গিয়েছে। ডান দিকেরটা শালিগাঁয়ের মধ্যে দিয়ে আর বাঁদিকেরটা চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক হয়ে। তবে সড়ক হয়ে যেতে হলে দূরত্ব কিছুটা বেড়ে যায়। তার চেয়েও সমস্যা হলো বাস লরি চাপা পড়ার ভয়। দিনে দিনে এমনভাবে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে যে সেসব অতিক্রম করে বাড়ি ফিরে আসাটা সত্যিই ভাগ্যের। তাছাড়া এত ঘন ঘন দুর্ঘটনার খবর আসে তাতে রাস্তাঘাটে বেরুতে সত্যিই ভয় করে। তাই বলে ঘরে বসে থাকলে তো সংসার চলে না। যে জন্য গাছায় আমাদের যেতেই হয়।
গাছা যে কোনদিন একটা গঞ্জ হয়ে উঠবে সেটা কেউ ভাবতেও পারেনি। ‘গাছা’ এই নাম থেকেই বোঝা যায় এই এলাকা ছিল গাছগাছালিতে ভরা। সেইসব গাছগাছালি কেটে সেখানে বাজার বসানো হয়েছে। মানুষের হাত-পা সামান্য কেটে গেলে আহা! উহু! চিৎকার করে কিন্তু গাছা বাজারের অতগুলো গাছ-পালা কবে কবে মানুষ কেটে ফেলল কেউ টেরও পেল না। সেইসব গাছগাছালির ডালে কত শত পাখ-পাখালির কলতানে সকাল-সন্ধ্যা মুখরিত হতো সেসব আর কেউ ভেবেও দেখে না। কোথায় যে হারিয়ে গেল সেসব বিহঙ্গকুল!
যেখানেই থাক তারা আর এই বৃক্ষশূন্য গাছা বাজারে কোনদিন ফিরে আসবে না। তারা যদি ভুল করে উড়তে উড়তে কোথাও গিয়ে থাকে তাহলে শূন্যমার্গ থেকে মলত্যাগ করতে ভোলে না। তা নইলে হয়েনের মুদিখানার টিনে চালে গনেশের দোকানের টালির চালে কিংবা সোবহান গাজির দোকানের চালায় অত শত বিষ্ঠার দাগ আসবে কোত্থেকে?
হ্যাঁ, হরকিসিমের দোকানে দোকানে গাছাবাজার এখন জমজমাট। বাজার সম্প্রসারিত হতে হতে জাতীয় সড়কের ওপার পর্যন্ত চলে গেছে। রাস্তার ধারে ধারে সবজি দোকান। চটের বস্তার উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে আলু পটল ঝিঙে উচ্ছে বরবটি। পুবদিকে মাছের বাজার। মাছ বাজারের গায়ে গায়ে মাংসের দোকান। এক একটা দোকানে এক পোঁচ, আড়াই পোঁচের খাসি ঝুলছে। আসলে গাছা বাজারের আশপাশে মূলত হিন্দু এবং মুসলমান জনজাতির বসবাস। সংখ্যায় মুসলিমরা কিছুটা কম হলেও দেড় পোঁচ বেশি চালিয়ে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেয়। এদিগরে সেরা কসাই হলো আরজান কসাই। চোখে দেখেই বলে দিতে পারে কোন পশুর গায়ে কতটা ‘মাটি’ আছে। বাজারের সবচেয়ে বড় বৃত্তাকারে কাটা গুঁড়ির উপর তার মাংসের দোকান। গুঁড়ির উচ্চতা একটু বেশি বলে সেখানে বসে তার কাজ চালাতে বেশ সুবিধা হয়। কিন্তু সমস্যা ছিল প্রথমদিকে কাটা গুঁড়ির গা থেকে প্রায়শ পাতা গজিয়ে উঠত। এতে কখনো সখনো দোকানঘরটা এক আধটু আড়াল হয়ে যেত। কিন্তু কথা হলো, সেখানে বসে আরজান কসাই ফিদিন দু’চারটে প্রাণী জবাই দিচ্ছে সেই বটগাছের গুঁড়ি নতুন করে পাতা ছাড়ে কোন সাহসে।
সবজি বাজারে উত্তর দিকে মুদিখানার সারি। পাশাপাশি স্টেশনারী দোকান। স্টেশনারী দোকানের গলি পেরিয়ে কাপড়ের বাজার। ছোটবড় বেশকিছু দোকান গজিয়ে উঠেছে। এসব দোকানে জ্যান্ত মানুষের পোশাক আশাক থেকে শুরু করে মরা মানুষের কাফন পর্যন্ত কিনতে পাওয়া যায়। মানুষ কেনেও। ঈদ কিংবা পুজোর মরশুমে অত ভিড় হয় যে মানুষের গায়ে গা গলিয়ে দোকানে সেঁদোবার উপায় থাকে না। অন্য সময় কাপড়ের দোকানের মালিক খরিদ্দারকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। একটা কাপড় বিক্রির জন্য এমন সাধাসাধি করে যে মনে হয় দোকানদার তার কোন পরম আত্মীয়কে কাপড়টা বুঝি জোর করে উপঢৌকন দিচ্ছে।
আসলে এসব ব্যবসায়ী কারবার। ব্যবসায়িক লাভ এবং লোকসান এ দুটোর সঙ্গে নিয়মিত যুদ্ধ করতে হয়। খরিদ্দার অবশ্য কেনবার সময় যতটা সম্ভব যাচাই করেই কেনে। ঠকেও যায় অনেক পরখদার খরিদ্দার। ঠকবার ভয় বেশিরভাগ জুতো আর সুতোর কাছে। গাছাবাজারে জুতোর দোকানও আছে কয়েকটা। তুলনায় কাপড়ের দোকানের সংখ্যা অনেক বেশি। বেশি তো হবেই, জুতো কেবল পায়ের পাতা দুটোকে ঢেকে দেয় কিন্তু মাথা থেকে পায়ের পাতা অব্দি ঢাকা পড়ে কাপড়েই।
অন্যান্য দোকানের চেয়ে কাপড়ের দোকান খরিদ্দারকে আকৃষ্ট করে বেশি। যাদের কেনার সামর্থ্য নেই তারাও একবার ঝলমলে কাপড়ের দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাপড় মানুষকে সভ্য করেছে। আবার সেই কাপড়ই মানুষকে অসভ্য করে তুলছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের মেয়েমানুষদের। আগে বলতাম, মেয়েমানুষের বারোহাত কাপড়ে কাছা হয় না। আর এখন কাছা তো কাছা, এমনভাবে কাপড় পরে তাতে পেট, তলপেট উদোম থেকে যায়। আর উন্মুক্ত পিঠ দেখে যেকোন ভূমিহীন খেতমজুর তো ভাবতেই পারে আহা! ওই রকম উন্মুক্ত পিঠের মতো একখ- খাস জমি যদি পেয়ে যেতাম!
আমাদের গাছাবাজারে দীন এলাহি বস্ত্রালয় যেমন আছে তেমনি আছে শ্রীকৃষ্ণ বস্ত্রালয়। তাছাড়া মোহিনী বস্ত্রালয় আমিন বস্ত্রালয়ও আছে। বাজার যেভাবে দিনে দিনে বাড়ছে তাতে আরো কিছু কাপড়ের দোকান তৈরি হবে শিগগির। কাপড়ের দোকানের কথা এসে গেলে দর্জির দোকানরে কথা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। গাছাবাজারের সেরা দর্জির নাম ওসমান দর্জি। আমাদের এ দিগরের সবচেয়ে নাম করা দর্জি। এত সুন্দর হাতের কাজ যে বোঝা যায় না টুকরো টুকরো ছিট কাপড়কে কোন অদৃশ্য সুতোর বন্ধনে যুক্ত করা হয়েছে। ভাল কারিগরের কাজ তো এটাই। ওসমান দর্জির ওস্তাদ কে দেখতে হবে তো। ওস্তাদ হচ্ছে দিলজান খলিফা। কৃষ্ণনগরের সেরা কারিগর। কৃষ্ণনগর হলো নদীয়ার জেলা শহর। সেই শহরের সেরা খলিফা দিলজান। এখন অবশ্য বেঁচে নেই। জীবতকালে নাকি বলত, ডাক্তাররা কাটা ছেঁড়া রোগী সেলাই করে অজ্ঞান করিয়ে। আমরা ছিটকাপড় সেলাই করি বিনা অজ্ঞানে।
আসলে দুজনের কাজই হচ্ছে জুড়ে দেওয়া। তা সে পেশিতে পেশিতে হোক কিংবা ছিট কাপড়ে। ওসমান দর্জি দিলজান খলিফার অনেক শিষ্য শাবদদের একজন। তাকে চেনে না বা নাম শুনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। ওসমান বছর ত্রিশের স্বাস্থ্যবান যুবক। খরখরে চোখ প্রায় ছ’ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা, বুকের ছাতি ছত্রিশ পেরিয়ে সাঁইত্রিশের কাছাকাছি। এই মাপজোক দিয়ে অবশ্য তার জন্য পোশাক বানানো হবে না। বরং ওসমানই পোশাক বানায়। তার দোকানের নাম বেশ অভিনব, ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’। নাম থেকেই বোঝা যায় সে ছেলে এবং মেয়েদের পোশাক বানানোয় দক্ষ। আজকাল দক্ষতা ছাড়া কিছু হয় না। আনাড়ি, শিক্ষানবিশী কিংবা অদক্ষতাদের এই উত্তর আধুনিকতার যুগে কোন স্থান নেই।
এবার ওসমান দর্জির ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’-এর দিকে একবার চোখ ফেরানো যাক। একদিকে আমিন বস্ত্রালয় অন্যপাশে মোহিনী বস্ত্রালয়ের মাঝখানে তার দোকান। দোকানের সামনের অংশটা কিছুটা ফাঁকা। এই ফাঁকা জায়গায় গরমকালে একটা মাড়াইকল দাঁড়িয়ে থাকে। রোদে ঘামে জেরবার অনেক মানুষ ওই মাড়াইকলের সামনে হাজির হয়। একটা মাঝবয়সী হিলহিলে চেহারার লোক মাড়াইকলের হ্যাডেল ঘুরিয়ে আখের রস বের করে বিক্রি করে। এক গিলাস রস বের করতে যে কসরত করতে হয় তাতে তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসা ঘামের পরিমাণ কোন অংশে কম নয়। লোকটা যখন মাড়াইকলের হ্যাডেলে চাপ দিয়ে রস বের করে তখন ওসমান দর্জির দোকান থেকে তার পিঠ বরাবর ছেঁড়া গেঞ্জিটা দৃশ্যমান হয়।
ওসমানের অবশ্য ওদিকে তাকিয়ে থেকে সময় নষ্ট করার সময় নেই। ছোট অথচ সাজানো গোছানো দোকান। পাকা ইঁটের গাঁথুনি। বালি সিমেন্টের প্লাস্টার। তার উপর গোলাপি রঙের আভা। গোলাপি ছাড়া আরো কয়েকটি রঙের যথাযথ ব্যবহার আমাদের চোখকে আরো আকর্ষণীয় করে। দোকানে ঢুকেই ডাইনে এবং বাঁয়ে দুটো খোপ। ডানদিকের দরজার উপর একটা সুসজ্জিত পুরুষের ছবি। নিচে লেখা ‘শ্রীমান’। বাঁদিকের দরজার উপরে একইভাবে সাঁটা এক সুন্দরী মহিলার ছবি। নিচে অবশ্য লেখা আছে ‘শ্রীমতী’।
এসব দেখেই বোঝা যায় দোকানের নামকরণের যথার্থতা। বোঝা যায় এই ‘শ্রীমান-শ্রীমতী টেলার্স’-এ কেবল পুরুষ এবং মেয়েদের পোশাক আশাকই তৈরি হয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বেশ-বাশেরও পরিবর্তন হচ্ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয় দর্জিকেও। যে পারে না তাকে পিছিয়ে পড়তে হয়। ওসমান দর্জি দেশ ও কালের সঙ্গে এগিয়ে চলা মানুষ। বালিশের খোল তৈরি কিংবা ছেঁড়া ফাটা জামাকাপড় সেলাই করা, তাপ্পি মারার সময় কখন! এসবের জন্য আছে ঘেঁতুরাম দাস। চটকাগাছের নিচে সে সারাদিন সেলাই মেশিন নিয়ে বসে থাকে। তার কাছাকাছি কানাই ডাক্তারের ডিসপেন্সারি। ঘেঁতুরাম যখন সেলাই মেশিন চালায় তখন তার বিকট আওয়াজে ঝড় বয়ে যায়। এতে সবচেয়ে বিপদে পড়ে কানাই ডাক্তার। রোগীর রোগ-ব্যাধির খবর নিতে নিতে থেমে যায় সে। অপেক্ষা করে কখন ঘেঁতুরাম তার পা নাচানো বন্ধ করে। এ এক প্রাত্যহিক বিরক্তিকর পরিস্থিতি। রোগের খবর না জেনে দাওয়াই দিলে তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা ষোলআনা। সুতরাং কানাই ডাক্তারের অপেক্ষা, শুধু অপেক্ষা। অপেক্ষা ঘেঁতুরামের জন্য।
অবশ্য কানাই ডাক্তারের বিরক্তি চাপা থাকেনি। এ নিয়ে ঘেঁতুরামকে কয়েকবার বলেছেও। ঘেঁতুরামের একটাই জবাব। আমাকে কাছে পেয়ে বলছ বেশ। তা বলো। কিন্তু হাইরোড দিয়ে যখন সমানতালে বাস লরি টেম্পো অটো বিকট আওয়াজ করে রাস্তা কাঁপাতে কাঁপাতে ছুটে যাচ্ছে তার বেলা? ওসব শব্দ তোমার কানে যায় না? আমি গরীব মানুষ ডাক্তার, রোগের যন্তোনা থেকে খিদের যন্তোনা বেশি আমাদের। তোমার সমস্যার কথা বুঝিনে তা তো নয়, কী করব বলো?
সত্যিই ঘেঁতুরামের খুব অভাব। চার-পাঁচটা ছোটবড় ছেলেমেয়ে নিয়ে ছ-সাতটা পোষ্য। বাড়িতে বুড়ো বাপ। সদ্য চোখের ছানি কাটিয়ে বসে আছে। গাছা বাজারের সবাই জানে ঘেঁতুরামের অভাবের কথা। অভাবী না হলে এসব ছেঁড়া-ফাটা কেউ সেলাই করে? এতে মজুরি কম হলেও পা হাত চললে দিনান্তে পুষিয়ে যায়। অনেক বেহুদা মেয়েমানুষ আছে যারা বাজার করতে এসে হঠাৎ করে ঘেঁতুরামের সেলাই কলের সামনে চলে আসে। বলে, ও ঘেঁতু, পরনের শাড়িল মেঝেটা যে ফেঁসে গেল একটু সেলাই দে দিকিন। বলে শাড়ির ছেঁড়া প্রান্তটা ঘেঁতুরামের সেলাই মেশিনের উপর বাড়িয়ে দেয়।
ঘেঁতুরাম কী আর করে, গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েমানুষের পরনের শাড়ি সেলাই করে ফেলে। গাছাবাজারে যারা না গিয়েছে তারা এ দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য পাবে কোত্থেকে? কোন কোন বেমাক্কা মেয়েছেলে সেলাই করা শাড়ি কোমরে জড়িয়ে গা-বুকের কাপড় খুলে অন্যপ্রান্তটা বাড়িয়ে দেয় কলের দিকে। সেদিকেও ছেঁড়া ফাটা। বাজারের কোন কোন বে-আক্কেলে মরদ মাহিন্দার সরস মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়— ঘেঁতু, সেলাই যখন করছিস আসল জায়গাটা বাদ দিস কেন?
এসব টিটকারী ঘেঁতুর কানে যায় না। মেয়েমানুষের উন্মুক্ত গা বুকের দিকে চোখ যায় না। তার চোখ সেলাই মেশিনের সুঁচের উপর নিবদ্ধ। সে পাদনিতে ঘন ঘন চাপ দেয়, আর তাতেই র্ঘর্ঘ র্খর্খ আওয়াজের ঝড় ওঠে। তাতে মনে হয়, এ আওয়াজ ঘেঁতুরামের সেলাই মেশিনের নয়, তার বাড়ির একপাল ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তামাম গাছা বাজারে।
ওসমান দর্জির ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’ থেকে অবশ্য ঘেঁতুরামের সেলাই কলের আওয়াজ শোনা যায় না তেমনভাবে। চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর দিয়ে ছুটে চলা দুরন্তগতির যানবাহনের চাকার তলায় এ আওয়াজ পিষ্ট হয় অনেকটাই। বাদবাকি জমে ওঠা গাছাবাজারের ক্রেতা ও বিক্রেতার কলরব কোলাহলে চাপা পড়ে যায়। তবে ওসমান চোখ তুলে তাকালে চটকা গাছের মাথাটাকে দেখতে পায়। দেখতে পায় তার সবুজ পাতা। বছরের কোন কোন সময়ে হলদে এবং শুকনো পাতাগুলোকে ঝরে পড়তে দেখে। দেখে গাছের মগডালে বসে থাকা কয়েকটা বক শালিককেও। একটা সময় তারাও একসঙ্গে যুক্তি করে হঠাৎই উড়ে পালায়। যখন উড়ে পালায় তখন ওসমান দর্জি অনুমান করতে পারে এবার ঘেঁতুরাম সেলাই কলে পা রেখেছে।
ওসমান দর্জির ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’ বেশ চোখে পড়ার মতো। এখন গাঁ-গেরামে শিক্ষিতের হার বাড়ছে। ঝোঁক বাড়ছে বাইরে বেরুবার। বাইরে বেরুতে গেলে সাবেক আমলের লুঙি কিংবা হেটো ধুতি পরে বেরুনো যায় না। সবাই চায় একটু সভ্য ভব্য হয়ে বাইরে বেরুতে। যার ফলে প্যান্ট শার্টের চল বেশ রমরমা। হাটে বাজারে সস্তার প্যান্ট শার্ট পরে মানুষ জনমুনিষের কাজ করে। উঠতি বয়সের মেয়েরা আগেকার ঢলঢলে চুড়িদার বিশেষ পছন্দ করে না। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে চুড়িদারে সঙ্গে প্রাপ্ত ওড়না গাছের ডালে বেঁধে ঝুলে পড়ছে যখন তখন। এখন স্টিল টাইট পোশাক বাজার ছেয়েছে। পথে বেরুলেই দেখা যায় গ্রামের মেয়েরাও হাইহিল পরে উটপাখির মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমাদের পরিচিত মেয়েদের দেখন শোভা পোশাক আশাকগুলো হারিয়ে যাবে নাকি? লেগিংস, টপ মিডি, জিনস্ এসবের নাম আগে কখনো শুনিনি। এখন শুনছি। শুধু শুনছি না দেখছিও। দেখছি কাপড়ের দোকানগুলোতে বিভিন্ন রকম আধুনিক পোশাকের বিজ্ঞাপন। ওসমান দর্জির ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’ও একই বিজ্ঞাপন। কেউ সরাসরি দেখে, কেউ আড়ালে। একপাশে ছেলেদের গেঞ্জি জাঙ্গিয়া তো অন্যপাশে মেয়েদের ব্রা প্যান্টি। দেখে শুনে মনে হয় কেউ মানুষ মেয়েমানুষের গোপন কুঠুরি থেকে খুলে নিয়ে সযত্নে টাঙিয়ে দিয়েছে দোকানের মাথায়।
বাস্তবিকই তাই। আজকাল এসব বিজ্ঞাপন দেখে বোঝা মুশকিল কতটা তা পোশাক পরিচ্ছদের আর কতটা অঙ্গ প্রদর্শনের। ওসমান দর্জি গাঁয়ের মানুষ হলেও এমন পোশাক বানানোয় বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ের দল ভিড় করে এখানেই। লিঙ্গভেদে তারা কেউ শ্রীমান কেউ শ্রীমতী হতে চায়। শ্রীমানদের জন্য ডানদিকের আর শ্রীমতী হলে বাঁ দিকের খুপরিতে সটান ঢুকে যাওয়া। সেখানেই ওসমান দর্জির গলায় ঝুলিয়ে রাখা ফিতে মেপে নেয় তাদের শরীরের দৈর্ঘ্য প্রস্থ বেধ।
ছেলেদের প্যান্ট শার্ট বানানোতে তেমন সমস্যা হয় না, যতটা সমস্যা হয় মেয়েদের পোশাকে। পোশাকের ক্ষেত্রে মেয়েদের খুঁত-খুঁতুনি বড্ড বেশি। বিশেষ করে ব্লাউজের ক্ষেত্রে। পিঠের দিকটা বেবাগ ফাঁকা। গোলগলা ব্লাউজ কবেই উঠে গিয়েছে। এখন ‘ভি’ কাট। ওসমান দর্জির কাঁচি ছিট কাপড় কাটতে কাটতে প্রায় আস্ত ছিটটাই ছাঁটাই করে ফেলে। যে অংশটুকু থাকে তা দিয়েই বানাতে হবে একখামচা ব্লাউজ। এতেই হবে মেয়েদের লজ্জা নিবারণ। ওসমান দর্জির স্কেচ পেনসিলে ব্লাউজের নকশা ফুটে ওঠে। সেই ফুটে ওঠা নকশার দিকে বারবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিতে হয়। তার ওস্তাদ কৃষ্ণনগরের দিলজান খলিফা বলেছিল, সাবধানে কাঁচির পোঁচ চালাবা, পোঁচ চালানোর আগে সব হিসাব-নিকাশ তোমার কাছে। জানবা ভুল করে পোঁচ চালালে সেলাইয়ে তা জোড়া দেওয়া যায়। কিন্তু ছিট থেকে ছিটের দূরত্ব থেকেই যায়।
সেই কথা স্মরণ করে ছিটকাপড় কাটার আগে কপালে কাঁচি ছোঁয়ায় ওসমান দর্জি। তার পা দুটো এখন সেলাই মেশিনের পাদানি স্পর্শ করে আছে। চোখ দুটো মেশিনের সুঁচের ডগায় বিন্দু হয়ে মিশে গেছে। ওসমান দেখে ‘ভি’ কাট ব্লাউজের সামনের দিকটা বুকের তলদেশ অব্দি নেমে এসেছে। সে ভাবতে পারে তাদের ভূগোলের স্যার মদন মোহান্তি শিখিয়েছিল কেমন করে আঁকতে হয় গ্রস্থ উপতক্যা, ক্যানিয়ন। তখন সেটা অস্পষ্ট ও ভাসা ভাসা বুঝেছিল এখন কর্মজীবনে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে। যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে দু’পাশের পার্বত্য ঢাল বেয়ে নিচের দিকে প্রবলবেগে নেমে আসছে অসীম জলপ্রবাহ। তা থেকে ছিটকে আসা লক্ষ কোটি জলকণায় যেন কুয়াশা ঘনায়। তার কানে বাজে হুম হুম গুম গুম গভীর কলম্বন। এক মুহূর্ত থেমে যায় ওসমান দর্জি। তারপর যেন সে ঘোরের মধ্যে থেকে আস্তে আস্তে জেগে ওঠে। সে বোঝে জলপ্রপাত নয়, চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর দিয়ে যেসব ভারি যানবাহন দু’পাশের গ্রামগঞ্জ, শহর-নগর সেলাই করতে করতে ছুটে যাচ্ছে এ তারই শব্দ। এতক্ষণের পার্বত্য অঞ্চলের ভাবনায় থাকা দৃশ্যপট যে নেহাৎই নারী শরীর বই তো অন্য কিছু নয়। এই সত্য উপলব্ধ হয় ওসমান দর্জির। সে কিছুতেই ভাবতে পারে না এই সামান্য সময়ের ব্যবধানে কঠিন শিলাখ- কীভাবে কোমল নারী শরীরে রূপান্তরিত হতে পারে।
ওসমান দর্জি বাদবাকি শিল্পকর্মে মনোযোগী হয়। সামান্য একখ- তেনা ন্যাকড়া তার হৃদয় ও মননে কী গভীর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। চাপসেলাই মেশিনের তলায় ক্রমাগত পিষ্ঠ হয়, বিদ্ধ হয় বক্ষযুগল। লাল নীল হলুদ গোলাপি সুতোর আশ্চর্য কারুকার্যে জীবন্ত হয়ে ওঠে স্তনভার। সে শুধু অবাক চোখে নিষ্পাপ শিশুর মতো চেয়ে চেয়ে দেখে। দেখতে দেখতে একসময় ভাবতে পারে নারী শরীরের ভরাট স্তনযুগল নয়, তার সেলাই মেশিনের কেরামতিতে সে কোন এক বড় মসজিদের জোড়া গম্বুজ এঁকে যাচ্ছে।
টেলারিংয়ের দোকান হিসাবে ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’-এর বেশ নামডাক। ওসমান দর্জির নামের চেয়ে তার দোকানের নামটাই আড়ে দিকে অনেক বেশি প্রচার পেয়েছে। তার নেপথ্যে যে কারিগর সেই ওসমান দর্জিকে কেউ চেনে, কেউ চেনে না। না চিনলেও তার দোকানের মাহাত্ম্য প্রচারে ওসমান নিজেকে গর্বিত মনে করে। দরমার বেড়ার জায়গায় আরো আগে পাকা ইঁটের গাঁথুনি দিতে পারলে অনেক বেশি বেশি নাম ডেকে যেত। গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজারকে বলে কয়ে প্রায় লাখখানের লোন। তাতেও সমাধা হয়নি। শেষতক বউয়ের নাক-কান বন্ধক রেখে বালি সিমেন্টের প্লাস্টার আর রং চং। এটুকু না করলে খরিদ্দারের চোখে ধরে না। মানুষ শুধু ওপরটাই দেখে, ভেতরের খবর রাখে না। এখন ফি মাসে সুদ আর কিস্তির টাকা জমা করতে হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজার লোন দেবার আগে বলেছিল, লোন নিয়ে শোধ দিতে পারবে তো?
ওসমান এ কথায় থমকে গিয়েছিল। সে কী করে বলবে সত্যি সত্যি অতগুলো লোনের টাকা শোধ দিতে পারবে কিনা। ভবিতব্যের কথা কে বলতে পারে? সেখানে রাজার রাজত্ব ছেড়ে যায়, জমিদার ফকির হয়ে যায়, সে জায়গায় সে তো দাঁড়কে পুঁটি। বলেছিল, হাতের কাজ জানি ম্যানেজার বাবু, মনে হয় পারব। মনে তো অনেক কিছু হয়, বাস্তবে পারবে কিনা সেটাই আসল কথা। এ কথার কোন লাগসই জবাব ওসমানের কাছে ছিল না। অনেকক্ষণ নিশ্চুপ থাকা দেখে গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজার বলেছিলেন, বললে তো হাতের কাজ জানি, তাহলে আমাকে একসেট জামা-প্যান্ট বানিয়ে দাও। 
ম্যানেজারবাবুর শেষ কথাটায় দম ফিরে পায় ওসমান। হ্যাঁ যাবেন আমার দোকানে। দেখে নেবেন সত্যি সত্যি কাজ জানি কিনা।
ম্যানেজারবাবু অবশ্য যাননি ওসমানের দোকানে। তবে লোনটা করে দিয়েছিলেন। তা নইলে তো উঁই লাগা দরজার বেড়া। আজকাল কিস্তির টাকা জমা দিতে গেলেই ম্যানেজারবাবু বলে ওঠেন, কী ওসমান ভাই, ব্যবসা ভালই চলছে মনে হচ্ছে।
হ্যাঁ ছ্যার, তা ভালই চলছে। আপনাদের দোয়ায় করে খাচ্ছি।
আমাদের দোয়ার কথা বল কেন? উপযুক্ত লোককে লোন দেওয়াটা আমাদের কাজ।
ওসমান একটু সাহসের সঙ্গে বলে ওঠে, বাবু বলছিলাম কি—
হ্যাঁ বলো।
বলছিলাম লোন দেওয়ার আগে জামা-প্যান্ট তৈরি করার কথা বলেছিলেন একসেট। যদি করেন তো যাবেন দোকানে। দেখে আসবেন। না না আপনার কাছ থেকে মজুরি নিতে পারব না।
বলেছিলাম বটে। ওটা ওই কথার কথা। লোন দেবার আগে সঠিক লোককে যাচাই করতে হয়। বুঝলে? তোমার দোকানটা কোথায় যেন?
ঐ গাছা বাজারে ছ্যার। যাকে সামনে পাবেন বলবেন ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’।
দোকানের নাম শুনে ম্যানেজারবাবুর মুখের হাসি চওড়া হয়। আচ্ছা রকমারি নাম দিয়েছ তো! নামটা কি তোমার দেওয়া?
ওসমান কথা বলতে পারে না। স্মিত হাসে। অবশ্য উচ্চকিত হাসি সে হাসতে পারে না। ম্যানেজারবাবু বলেন— আমার তো বয়েস হয়েছে। হাতে গোনা ক’টা বছর চাকরিতে আছি। তোমার ঐ ‘শ্রীমান শ্রীমতী’তে আমাদের বয়সের মানুষদের মানায় না।
ম্যানেজারবাবুর নাম কেশব বিশ্বাস। কাটোয়া থেকে আসেন। গঙ্গা পেরুতে হয় যাওয়া আসায়। এতে দিনে দু’বার গঙ্গা দর্শনের মতো পূণ্য কর্মটিও হয়ে যায়। তার পর বাসে। এই সামান্য রাস্তা আসতে হাঁপিয়ে ওঠেন। আধঘণ্টা বিশ্রাম নিতে হয়। ভদ্রলোক দেখতে শুনতে মন্দ নয়, কিন্তু নামের সঙ্গে মেলে না। নামটা কেশব হতে পারে, কিন্তু একগোছা চুলও অবশিষ্ট নেই। এরকম কেশহীন মানুষ চট করে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। হঠাৎ করে মনে হয় লোকটার মাথায় বুঝি বাজ পড়েছে। রেগে গেলে মনে হতে পারে ওঁর কপাল থেকে চোখ উপড়ে আসছে। অবশ্য হিন্দুশাস্ত্রে কেশব মানে শ্রীকৃষ্ণ, যিনি অনন্ত শয়ানে শায়িত।
‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’-এর দৌলতে সংসারটা বেশ গুছিয়ে নিতে পারছে ওসমান দর্জি। মাসিক কিস্তির টাকা পরিশোধ, করার পর হাতে যা থাকে তা দিয়ে সংসারটা বেশ চলে। বাড়তি দু’ পয়সা থেকেও যায়। তা দিয়ে অবশ্য ছবিরনের নাকে কানে হাতে গলার গয়নাগুলো বন্ধকী দোকান থেকে খালাস করা যায়নি। এসব অলঙ্কার বিহনে ছবিরনের অবস্থা অনেকটা চোত্রের পাতা ঝরা গাছের মতো।
ছবিরন হলো ওসমান দর্জির বউ। বাবার বাড়ি আকন্দপুর। আকন্দপুর যেতে হলে দু’দুটো নদী পেরুতে হয়। পেরুতে হয় গেঁদুখালি। গেঁদুখালি আসলে খাল। বর্ষাকালে এই খালও নদী হয়ে যায়। সারা খাল কচুরিপানায় ভর্তি থাকে। এত কচুরিপানা কোত্থেকে যে আসে তা কেবল আল্লারসুলই জানেন। জ্যান্ত মানুষ মেরে ঐ পানার তলায় ঢুকিয়ে দিলে কাগে-বগে টের পাবে না। এমন অপঘাতে জানও হারায় কেউ কেউ। তা নইলে অখ্যান পৌষ মাসে কচুরিপানা সরিয়ে মাছ ধরবার সময় নর-কঙ্কাল বেরিয়ে আসবে কেন। যখন ক কঙ্কালের খবর চারপাশের গাঁ-গেরামে জানা জানি হয় তখন হয়ত ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে সেসব হতভাগাদের বাপ-মায়ের চোখের মণিতে ঘা হয়ে গিয়েছে। সেই গেঁদুখালি পেরিয়ে আরও দু’তিনটে গাঁ ছাড়িয়ে আকন্দপুর। ছবিরণের বাবার বাড়ির অবস্থা ভাল নয়। মোটামুটি। কোনমতে সংসার চলে। ছ’ছটা বোন ছয় গাঁয়ে বিয়ে হয়েছে। গায়ের রং একটু চাপা বলে খরিদ্দারের চোখে ধরেনি। সাত নম্বর মেয়ে ছবিরন। মেয়ের বাবা আর কত পারে। পাড়াগাঁয়ে ‘মেয়ে হয় গোর ভাল, নয় পর ভাল’।
অর্থাৎ মেয়েকে হয় পরের ঘরে বিয়ে দাও, নয়ত মেরে কবর দিয়ে দাও। এমন নিষ্ঠুর বিধানের কথা প্রবাদ হয়ে আছে। ওসমানেরও কপালে ছিল তাই কলমাছানি হয়ে গেল ছবিরনের সাথে। গায়ের রং ময়লা বলে কেমন কেমন মনে হয়েছিল। ঘটক বলেছিল মেয়ে ময়লা তো কী আছে গুণ থাকলেই সই। রূপ ধুয়ে কি পানি খাবি? বাবা মা’র ছোট মেয়ে, ছোট জামাইয়ের আদর পাবি।
এসব মেনে নিয়েও কিন্তু কিন্তু করে ওসমান বলেছিল— বড্ড টানাপাল্লার গাঁ হয়ে গেল না?
এ কথা শুনে সন্ধি ঘটক বলেছিল— ধুর বোকা, এমন কথা বলতে আছে? মেয়ে যত টানাদূরের হয় ততই ভাল। যত খুশী মারবি ধরবি পাকপেড়ে ঘরের ছাঁচে দাঁড়িয়ে থাকবে। দু’তিনটে গাঙ-গঙ্গা, খাল-বিল পেরিয়ে বাবার বাড়ি হড়পে যাওয়া সোজা কথা!
ছবিরনের তবু বাপ-মা ছিল। ওসমানের তাও ছিল না। মাধ্যমিক পরীক্ষা প্রথম দিনেই বাবা, শেষ পরীক্ষায় মারা গেল মা। এরপর জীবনের কোন পরীক্ষায় কেউ পাস করতে পারে? সবই নসিব। পড়াশুনা ছেড়ে দিলজান খলিফার কাছে কাজ শেখা। ওখানে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল দূর সম্পর্কের এক মামা। বলেছিল— খলিফা, মাওড়া ছেলে। তুমার কাছে থাকবে, খাবে। পয়সা-কড়ি কিছু দিতে হবে না, যতদূর পারো হাতের কাজ শেখাবা। আর খেয়াল করবা যেন গাড়ি ঘোড়া চাপা না পড়ে। তুমাদের কেসনগরে তো খুব বাস-নড়ির চাপ।
এখানে কেসনগর মানে কৃষ্ণনগর। নড়ি মানে লরি। গ্রাম্য মানুষের এমনই উচ্চারণগত বৈশিষ্ট্য। যেমন তারা নবদ্বীপকে বলে লবদ্বীপ। আবার লঙ্গরখানাকে বলে নঙ্গরখানা। গ্রাম্য মানুষজনের এমন উচ্চারণ বৈপরীত্য নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চালানো যায়। 
সে যাক গে। তবে কথা হলো সন্ধিঘটক কথার প্যাচে ওসমানকে রাজি করালেও মেয়ের বাবা হঠাৎ করে বেঁকে বসল তার কি? মেয়ে বলে কোন বাপ বানের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে বলে শুনিনি। ছবিরনের বাবাকে বলেছিল সন্ধি ঘটক, মুরুব্বি, কাচা কাপড় আর যাচা কন্যে কখনো না বলতে নেই।
ছবিরনের বাবা বলেছিল, শুনেছি বাপ-মা নেই, আত্মীয়স্বজন নেই তেমন, এখন আবার শুনছি জমি জায়গাও নেই। কোন ভরসায় আমার ছবি খাতুনের বে দিই বলো?
কোন ভরসায় দেবে মানে? ছেলে দেখে দেবে।
তা ছেলে কী করে?
সন্ধি ঘটকের মেজাজটা বোধহয় মেয়ে বাবার শতেক প্রশ্নে বিগড়ে গিয়েছিল। বললে, কী করে মানে? ছেলে বসে বসে পা নাচায়।
পা নাচায়? বল কী? কাজ কাম কিছু করে না? কুড়ের হদ্দ। বসে খেলে আজার ঘরেও টান লাগে। মেয়ে আমার খাবে কী? থাক্ থাক্, মেয়ের আমার কত জায়গায় বে হবে। 
কত জায়গা মানে কী বলছ? বাড়ি তো তোমার আকন্দপুর। একটা মেয়ের কত জায়গায় বিয়ে দেবে? ক’টা জামাই নেবে।
এ কথায় মেয়ের বাবা ধন্দে পড়ে যায়। কেন একটা।
তাহলে বলছ যে কত জায়গায় বিয়ে হবে।
ওটা ওই কথার কথা ঘটক। তবে বসে বসে পা নাচায় যে ছেলে তাকে মেয়ে দিতে বলছ কোন আক্কেলে?
আঃ মুরুব্বি তুমিও কথা বোঝ না। বসে বসে পা নাচায় মানে ছেলে দর্জিগিরি করে বুঝলে? দর্জিদের তো বসে বসে পা নাচালেই কাজ, তাই না?
এ কথায় মেয়ের বাবার মুখে হাসি ফোটে। খোলসা করে তা বলবে তো। তুমাদের মতো ঘটকদের কথার ঠার বোঝা বড় দায়।
তা ঠিক। তবে জান না— সব কাজে হাতে তালি/ ভীষণ কঠিন ঘটকালি।
অর্থাৎ অন্য কাজ হাতে তালি মেরে করা গেলেও ঘটকালির মতো কঠিন কাজ কোনটাই নয়। ওসমান দর্জির বিয়ে দিয়ে সেই কঠিন কাজটাই সমাধা করে ফেলল সন্ধিঘটক। সেই থেকেই আকন্দপুরের ছবিরন খাতুন ওসমান দর্জির বউ হয়ে গেল। বিয়ের পর ছবিরন খাতুন ছবিরন বিবি হয়ে গেল। যেমন হয়ে যায় অন্যেরা। বউ নিয়ে অন্যদের বলার কিছু ছিল না। বউ একেই বেশি রকমের শ্যামলা, চাপা রং। শ্বশুরবাড়ি কোথাকার কোন গেঁদুখালির বিল পেরিয়ে। যা মানুষের সমাজে বলা যায় না, কওয়া যায় না। তারপর ছ’মাস যেতে না যেতেই হঠাৎ করে যেন রং পাল্টাতে শুরু করল। গা গতরে মাস লাগল। মাসলাগা হাত-পা যেন বেলুনের মতো ফেঁপে উঠল। চোখের কোণের কালি মুছে গিয়ে দৃষ্টির প্রখরতা এল। গায়ের রংও ফর্সার দিকে। হাসলে তার সবকটা দাঁত ঝিকমিকিয়ে ওঠে। ওসমান দর্জি তাদের কুঠির পাড়া থেকে সাইকেল নিয়ে গাছা বাজারে বেরুবার সময় একবার থমকে দাঁড়ায়। ছবিরন হাসি হাসি মুখে বললে, দাঁড়ালে কেন?
দাঁড়ালাম তোমাকে দেখব বলে।
আমাকে আবার দেখার কী আছে।
অনেক কিছু আছে ছবি বিবি, অনেক কিছু। তোমাকে দেখি তোমাকে ভালবাসি বলে।
আজকাল দেখছি তুমি আমাকে খুব ভালবাস। কেন বল তো?
তোমাকে ভালবাসি ভালবাসি বলে।
এ কথার বোধহয় অন্য কোন জবাব হয় না। সারাদিনের কর্মব্যস্ততায় ছবিরনের অদর্শনে মনটা আঁকু পাঁকু করে ওঠে ওসমানের। রাতে শোবার বিছানায় ছবিরনের নরম শরীরের স্পর্শ তাকে উন্মনা করে তোলে। প্রগাঢ় ভালবাসায় পুরুষালি বাহুর বন্ধনে বেঁধে ফেলে তাকে। তার মনে হয় ছবিরনের শরীর শুধু শরীরমাত্র নয়, একখণ্ড নরম মখমলের নরম কাপড়, যে কাপড়টাকে চাপা সেলাই মেশিনের নিচে ফেলে অনবরত সেলাই করে যাচ্ছে সে।
এ বছর ঈদ আর দুর্গোপুজোর মরশুমে ভালই কাজ হয়েছে। এতটাই কাজের চাপ যে সেলাই কল থেকে মাথা তুলতে পারেনি। কাজ পেয়েছে ঘেঁতুরামও। তার ঠোঁটে হালকা হাসি ঝুলে থাকে। ওসমানের সঙ্গে ঘেঁতুরামের খুব একটা দেখা হয় না। কথাও হয় না বিশেষ। যে যার কাজ নিয়ে থাকে। কাজের সঙ্গে রুটি রুজির সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। এ মরশুমে এক নাগাড়ে কাজ করতে পেরেছে বলেই ছবিরনের গহনাগুলো বন্ধকী দোকান থেকে ছাড়াতে পারল। ব্যাংকের কিস্তির টাকাও অনেকখানি শোধ দিতে পারল। এসব হিসাব নিকাশের অংক কষতে কষতে মনের মধ্যে এক ধরনের সুখ অনুভব করে ওসমান। কখনো সখনো সে গুন গুন করে গান গেয়ে ওঠে। এ গান এমনই অনুচ্চ স্বরে গাওয়া সে তা কখনোই তার সেলাই মেশিনের খরখর আওয়াজকে ছাপিয়ে যেতে পারে না।
একটানা বেশিক্ষণ কাজ করলে ঘাড়টা টনটনিয়ে ওঠে। মাজা ধরে যায়। এরকম অস্বস্তিকর অবস্থা হলে ওসমান দর্জি মেশিন ছেড়ে সোজা উঠে দাঁড়ায়। ঘাড়টা এদিক সেদিক বারবার ঘোরায়। মাথাটা মাটির দিকে ঝুঁকে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কোমরটা ডাইনে বাঁয়ে বেঁকায়। তারপর গাছা বাজারের দিকে চোখ ছড়িয়ে দেয়। দেখে চটকাগাছের মাথা থেকে কয়েকটা বক হঠাৎ করে একসঙ্গে উড়ে গেল। তার মানে ঘেঁতুরাম তার সেলাইকল চালু করল আবার। তাহলে সেই-ই বা অনর্থক সময় নষ্ট করে কেন। এখন তার দু’দুটো মেয়ে। ছোটটার পাঁচ বড়টার সাত। গাঁয়ের ইস্কুলে ক্লাস টু এ পড়ে। কুটিরপাড়া ইস্কুলের হেডমাস্টার মেয়ে দুটোকে চেনে। নামাজি মানুষ। মুখে দাড়ি আছে। পান খাওয়া দাঁত বের করে বলেছিল— এ্যাই, তোর বাবার কাছ থেকে জবরদোস্ত টুপি বানিয়ে আনবি একটা।
ওসমান মাস্টার মশায়ের অনুরোধের মর্যাদা দিতে কসুর করেনি। টুপি একটা বানিয়ে দিয়েছিল ভাল মতো, কিন্তু দুর্ভাগ্য মাস্টার মশায়ের দুর্ভাগ্য ওসমান দর্জির, মাটিতে সেজদা গেলেই খুলে পড়ত। এমন হলে আবার বানিয়ে দিতে হয়। সামনে গুচ্ছেক কাটা ছিটকাপড়ের কুচি। এগুলোকে বস্তায় ভরে সরিয়ে রাখা দরকার। এসব ভাবতে ভাবতে মুখ উগলে হাই উঠে এল। শুধু হাই নয়, তার সঙ্গে বিশ্রী রকমের আওয়াজ। যেন কেউ কোন ঘেঁয়ো কুকুরকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে ওসমান কাজে বসবে এমন সময় একটা অচেনা মেয়ে এসে সামনে দাঁড়াল। গায়ের রং ফর্সা, লম্বা, গোল গোল হাত-পা, মাথায় একঢাল পাছা ছুঁই ছুঁই চুল, বয়স নয় নয় করে কুড়ি বাইশ তো হবেই। এরকম কোন মেয়ে হঠাৎ করে সামনে দাঁড়ালে যেকোন পুরুষ মানুষের জান দপকাপে এতে আর আশ্চর্যের কী। মেয়েটি বলল, এটা ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’ তো?
ওসমান বলল— হ্যাঁ। বাইরে দাঁড়িয়ে দেখুন সাইনবোর্ড। 
মেয়েটা বাইরে দাঁড়িয়ে আর দেখার কথা ভাবল না। নিশ্চয় দেখেশুনে এসেছে। বলল— আমি কিন্তু দোকানের নাম শুনে আসছি।
বাড়ি কোথায় আপনার?
মোহনপুর।
বাসে আসলে তো?
হ্যাঁ, আবার ফিরে যাব আমি।
কোন কিছু কি বানানোর আছে?
তা তো বটেই। বলে মেয়েটি তার হাতব্যাগ থেকে একটা শাড়ি বের করল। তারপর পুনরায় বলল— এই শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ পিস আছে। ওটা বানাতে হবে। সামনে শুক্রবার আমার বিয়ে, তার আগে ডেলিভারি দেওয়া যাবে তো?
মেয়েটি খলবল করে কথা বলে উঠল। ওসমানের মনে হলো বড়ঘরের মেয়ে। প্যাকেট থেকে শাড়িটা বের করতেই যেন চোখ ধাঁধিয়ে গেল। শাড়ির মেঝেতে হাত রেখেই তার মুখের দিকে তাকাল। বলল নিশ্চয়। শুক্রবারে বিয়ে যদি হয় তাহলে বুধবারে দিলে হবে? মধ্যিখানে একটা দিনমাত্র সময় নিচ্ছি।
মেয়েটি বলল— বুধবারই সই। বিষ্যুৎবার করলে কিন্তু হবে না। বলে গোটা বাজারটাকে চোখের মাপে দেখতে চাইল। তার দৃষ্টি ডাইনে বাঁয়ে সামনে পিছনে চরকির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আর এই অবসরে ওসমান শাড়ির ভাঁজ খুলে খুলে দেখছিল। অত্যন্ত দামি শাড়ি বলে মনে হচ্ছে। এমন শাড়ি সচরাচর দেখা যায় না। বিয়ের শাড়ি। তার বিয়ের সময় ছবিরনকে যে শাড়ি দিয়েছিল এর কাছে সেটা তো তেনা ন্যাকড়ার সামিল। ভাল শাড়ির সঙ্গে ভাল ব্লাউজ পিস না থাকলে শাড়ির আর মান্যতা কোথায়? যেমন গাইগোরুর সঙ্গে থাকে তার বাছুর, এও তেমনি। ওসমান দর্জি তার ধারালো কাঁচির খচ্চ করে পোঁচ চালিয়ে দিল। আর তখনই মেয়েটি ককিয়ে উঠল— এ আপনি কী করলেন! ব্লাউজ পিস না কেটে শাড়িতেই পোঁচ চালিয়ে দিলেন? এখন উপায়? মেয়েটি কাঁদো কাঁদো হয়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
আচমকা এরকম আর্তনাদে সেলাই মেশিনের উপর থেকে চমকে উঠল ওসমান। তৎক্ষণাৎ সম্বিত ফিরতেই বুঝতে পারল কী সর্বনাশই না করে ফেলেছে! ব্লাউজের পিস ভেবে শাড়ির আঁচলটাই সে কেটে ফেলেছে। সেই শাড়ি তার সামনে পড়ে রয়েছে। জীবনে এমন দুর্ঘটনা এই প্রথম। কী করে যে হলো! ওসমান ভাবতে পারে শাড়ি নয়, ছিটকাপড় কাটা কাঁচি দিয়ে সে যেন একটা আস্ত মানুষ খুন করে ফেলেছে।
যে যাই বলুক খুনই তো। একটা মূল্যবান বিয়ের শাড়ি নষ্ট করা আর মানুষ খুন করার মধ্যে তফাৎ কী থাকতে পারে? মেয়েটির চেঁচামিতে মোহিনী বস্ত্রালয় আমিন বস্ত্রালয় থেকে লোক ছুটে এসেছে। শুধু ওরাই নয়, ‘শ্রীমান শ্রীমতী টেলার্স’-এর পিছন থেকে ডিজেল মেশিন সারাইয়ের মিস্ত্রি খয়রদ্দিও ছুটে এসে ভীড় ঠেলে ঢোকার চেষ্টা করছে। তাকে অন্যেরা কুনুইয়ের গুঁতো দিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে। কারণ তার দু’হাতে পোড়া মবিলের কালি, যা জামা কাপড়ে লাগলে কোন সাবান সার্ফে ওঠবার নয়।
মানুষের একটাই দোষ ভিড় দেখলে ভিড় করার। ডিজেল সারাই মিস্ত্রি খয়রদ্দি যখন এসেছে তখন আলু পটলের ব্যাপারীরা আর বাদ যায় কেন। মানুষ এমনই আজব জীব যে চোখের পলকে একটা মিথ্যেকে বাজারময় রটিয়ে দিতে পারে। হলোও তাই। তামাম বাজারে রটে গেল, ওসমান দর্জি নাকি কোথাকার এক সোমত্ত মেয়েকে দোকানঘরে ধর্ষণ করেছে। ‘নাকি’ বলে প্রচারের রব উঠলেও নাকি কথাটা একদম দাঁড়াতে পারল না। তার মানে ধর্ষণের ঘটনা সরাসরি।
ধর্ষণ সম্পর্কে মানুষের কৌতুহল আদ্যিকালের। ধর্ষণ করলে ধর্ষিতার মানসিক ও শারীরিক অবস্থার কী রকমের রূপান্তর ঘটে। ধর্ষক বা কী বলতে চায়? কেমন করে এ অপরাধ সংগঠিত হলো? কোন ঘরে? দু’জনের সম্মতিতে হওয়ার পর কেউ দেখে ফেলায় ধর্ষণের দায় চাপানো হচ্ছে? 
কারো কারো নৈর্ব্যক্তিক মন্তব্য— এসব কত আর দেখব, দিনে দিনে মানুষ কুকুর শেয়ালেরও অধম হয়ে গেল।
শেষ মেষ যখন ঘটনার গোড়ায় পৌঁছানো গেল তখন জটলা অনেক হালকা হয়ে গিয়েছে। ওসমান দর্জি তখনো ঘোরের মধ্যে। এত মানুষের হৈ হল্লা কলবলানির মধ্যে সে একটা কথাও বলেনি। শ্রীকৃষ্ণ বস্ত্রালয়, দীন এলাহি বস্ত্রালয়ের দোকানদারদের কেউ কেউ তখনো মীমাংসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাহলে শোন মেয়ে, যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে, দর্জির মনের ভুলে ঘটে গিয়েছে। কিছু ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে মেনে নাও। কাটা অংশ জোড়া দিয়ে দেবে তার জন্য পয়সাকড়ি লাগবে না।
এতে যা প্রতিক্রিয়া হলো তাতে মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকাই ভার। এ যে দেখছি কাজির বিচার। সামনে শুক্রবারে আমার বিয়ে। বিয়ের শাড়ি। কলকাতার বড়বাজার থেকে কেনা। জামদানি। সাত হাজার টাকা দাম। এই রকম সেলাই করা শাড়ি পরে কেউ বিয়ের পিঁড়িতে বসে। আঃ কী ভাগ্য নিয়ে এখানে আসলাম! বলে কপালে করাঘাত করে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।
তার কান্নার ধরন দেখে সবাই বুঝে গেল আরেক প্রস্থ লোক জড়ো হবে। তার চেয়ে চুপ ভাল যার দ্বারা ক্ষতি হয়েছে সেই উপযুক্ত দাম দিয়ে কিনে নিক।
কী বলছ ওসমান? দীন এলাহি বস্ত্রালয়ের মালিক জিজ্ঞেস করল। ওসমান শুধু তাকাল মাত্র। তার সারা গা দিয়ে গল গল করে ঘামের নহর বইছে।
না ওভাবে চুপচাপ বসে থাকলে হবে না। কথা বল। নইলে এ নিয়ে হয়তো থানা পুলিশ হবে। তুমি ভাল দর্জি। সে হিসাবে যথেষ্ট মানসম্মান আছে। তবু ভুল একটা হয়ে গিয়েছে।
ওসমান বার দুই গলা ঝাড়া দিল। তারপর যতটা সম্ভব শক্তি এনে বলল— তাই হোক। আমার কোন আপত্তি নেই।
এ কথা বলে সাত হাজার টাকা দোকানের ড্রয়ার টেনে গুণে দিল।
টাকাটার এক অংশ সামনের মাসের কিস্তির পরিশোধের জন্য গ্রামীণ ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা। বাকিটা সংসার চালানো। কিন্তু মনের ভুলে সব দণ্ড গেল।
তার দোকান থেকে সব মানুষজন চলে যাবার পরও একা একা অনেকক্ষণ বসে থাকল ওসমান। অর্থ তো গেলই, কিন্তু কেলেঙ্কারি! মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হলো।
ফাল্গুন মাস। বেলা অনেকটা গড়িয়ে গেছে। রোদের তেমন ধার নেই। বসার জায়গা থেকে দোকানের দুই খোপের দরজার দিকে তাকাল। সেখানে দরজার পাল্লার উপর আঁকা শ্রীমান আর শ্রীমতীর ছবি। দুই অল্পবয়সী নারী পুরুষের সুন্দর মুখচ্ছবি ভেসে উঠছে। ওসমানের মনে হলো তারা একে অপরকে কোন কিছু বলতে চায়। কী বলতে চায় সে জানে না।
ঝিমিয়ে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে ওসমান যেন একটা শক্তি পেয়ে গেল। সে জামদানি শাড়িটার কাটা অংশ সেলাই মেশিনের সাহায্যে জোড়া লাগাল। তারপর এক প্যাকেট সন্দেশ নিয়ে তক্ষুনি সাইকেল চেপে সোজা বাড়ির দিকে রওনা দিল। ওসমানকে দেখে ছবিরন উঠোনের উপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কী গো আজ সকাল সকাল?
বলছি, নাও ধরো।
এতো কী?
সন্দেশ। মেয়ে দুটোকে দাও।
আর এ প্যাকেটে?
খুলে দেখ।
ছবিরন প্যাকেট খুলতেই চোখের উপর যেন বাহান্ন ছবির নাচ দেখতে পেল। শাড়ি! তুমি আমার জন্য এত ভাল শাড়ি এনেছ। আমি জানি তুমি আমাকে কত ভালবাস। বলে পুরো শাড়িটা মেলে ধরতেই হতাশ গলায় বললে- তুমি কী রকম মানুষ গো? এতদিন পর একটা ভাল শাড়ি দিলে, তা আবার সেলাই করা?
ওসমান দর্জি ছবিরনকে প্রবোধ দিয়ে বললে- কিছু মনে করো না। এ নিয়ে দুঃখ করো না। মনে জানবা তোমার আমার সম্পর্কটা তো সেলাইয়ের। নইলে ভেবে দেখ কোথায় তোমার বাবার বাড়ি আকন্দপুর আর আমার বাড়ি কুঠিরপাড়া। কতদিন ধরে একসঙ্গে আছি বল দিকিন।
যত দামিই হোক না কেন শাড়ি একদিন ফেঁসে যায় ছিঁড়েও যায়, কিন্তু সেলাই সহজে ছিঁড়ে যায় না। সেলাই সেলাই-ই থেকে যায়।

 


আনসারউদ্দিন : কথাসাহিত্যিক। ভারত। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।