দুপুর ১২:৪৪ ; বুধবার ;  ২২ মে, ২০১৯  

দায় || আফসানা বেগম

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

‘ওই যে মহিলা আসতেছেন।’
তেলাপোকার রঙের তেল চকচকে টেবিল থেকে কনুই উঠিয়ে পাশের মানুষটিকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে দেখায় একজন। তারপর ঘরের ছয়টি টেবিলে যে যার কাজে মনোযোগী। আজকাল তাকে দেখলেই কোর্ট বিল্ডিঙের মানুষেরা আঁতকে ওঠে, না দেখার ভান করে থাকে, এমন ভাব করে যেন সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই, যেন বহুদিনের কাজ জমে আছে তাদের। 
মহিলা বারান্দার সিঁড়িতে পা রেখেই তা বুঝতে পারেন। তবে তাকেও এমন ভাব ধরতে হয় যেন তিনিও তাদের মনোভাব বোঝেননি। তার উপস্থিতি সবার জন্য বিব্রতকর জেনেও তিনি হাসেন, কুশল বিনিময় করেন, বেশ কদিন বাদে দেখা হওয়ায় দু’একজনকে দেশ বা সংসারের হাল হকিকত জিজ্ঞাসাও করেন। বারবার আসতে আসতে এর-ওর ঘরের খবর জানা হয়ে গেছে। কোনোদিন একজন তো কোনোদিন আরেকজনের মন নরম থাকে, কাছে এসে দু’চার কথায় গল্প জুড়ে দেয়, চা-ও খাওয়ায় কেউ কেউ। খানিকক্ষণ কথা বলার পরে মহিলার আর খারাপ লাগে না, মনে হয় তিনি যেন বেড়াতে গেছেন আদালতে, আর তার সমস্যা তো সবাই জেনেই গেছে, সমস্যার গুরুত্বটাও নিশ্চয় ধীরে ধীরে বুঝবে। ওভাবে ভাবলে আর বিব্রত লাগে না তার, মন খুলেই হাসেন, আলাপ করেন। ছেলেমেয়ে নেই কিন্তু থাকলে যে বয়স হতো, ওখানে যারা কাজ করে বেশিরভাগই তেমন। মা আর সন্তানের মতোই গল্প চলতে থাকে, তারা তাকে ‘খালাম্মা’ ডাকে। ‘খালাম্মা, এবারে বাদ দেন।’ ‘খালাম্মা, আর আসবেন না তো এই বয়সে, আর কত?’ ‘অসুবিধা তো নাই খালাম্মা, কী আছে একটা নামে, ভুলে যান।’ এরকম আব্দার-উপদেশ বরাবর থাকে তাদের মুখে। কখনো মুচকি হেসে গভীর চিন্তায় উদাস চোখে অন্যদিকে তাকান। কখনো আবার দৃঢ় বিশ্বাসে উচ্চারণ করেন,‘কিন্তু আমাকে যে নামটা বদলাতেই হবে, বাবা।’ বলেই সেদিনকার মতো উঠে পড়েন, ধীর পায়ে সিএনজি ট্যাক্সির দিকে এগিয়ে যান। ফিরে আর তাকান না পেছনের মানুষটির দিকে।
বাড়ি যেতে এমনিতে এক ঘণ্টা লাগেই, জ্যাম থাকলে দেড়। বারবার এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে ভালো লাগে না। ফেরার পথে এক ঘণ্টাকে মনে হয় দুই ঘণ্টা। অথচ কারো কাছে যে ফিরে যাচ্ছেন, তা-ও নয়। বাড়িতে কেউ নেই, যে ছিল সে চলে গেছে বছর দেড়েক আগে। তিরিশ বছর ধরে তার ছবিটা টাঙানো আছে খাবার ঘরের দেয়ালে। সেই ছবির সামনে পৌঁছে বলতে হয়, ‘শোনো আজও হলো না, তবে তুমি ভেবো না, হয়ে যাবে।’ ছবির লোকটি ধৈর্য ধরার ভঙ্গিতেই থাকেন, গালে হাত আর প্রশান্ত ফটোজেনিক দৃষ্টি মানুষটার— সকালের রোদে ভেতরের বারান্দায় বসা। ছবিটা জাহানারারই তোলা। ভদ্রলোক ছিলেন সৌখিন, দরকারের জিনিস না কিনে একদিন দুম করে কিনে আনলেন একটা প্যান্টেক্স ক্যামেরা। জাহানারার বিস্ময় দেখে যুক্তি শুরু হলো, ‘ক্যামেরা কিনলে তো প্যান্টেক্স বা নাইকন, বড়োজোর ক্যানন, এর নীচে নামা উচিত না।’ জাহানারা যে খামাখা টাকা খরচের কথা বলবেন, তিনি তার ধারেকাছে দিয়েও যাবেন না। বললেন, ‘এই যে এখানে দাঁড়াও, মাথা থেকে আঁচলটা নামাও দেখি, ওরকম ঘোমটা টানা থাকলে পরে ছবি দেখে কী করে বুঝব আমার বউ নাকি অন্য কারো?’ বেশ কিছু ছবি তুলে ক্লান্ত হলে বললেন, ‘প্রিন্ট করে নিয়ে আসি, দেখবে চিনতেই পারবে না তুমি নাকি রুনা লায়লা। তখন বুঝবে প্যান্টেক্স কী জিনিস।’ পরদিন সকালে বারান্দায় বসে পেপার পড়ছিলেন আবিদুর রহমান। ক্যামেরায় হাত দিতে জাহানারার ভয় লাগছিল, কে জানে কীসে আঙুল পড়ে আবার কী নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তার সেই মনোযোগ দিয়ে পেপার পড়ার ভঙ্গিটা ধরে রাখার লোভও সামলাতে পারছিলেন না। ক্যামেরা সামনে নিয়ে দাঁড়াতেই তিনি পেপারের ওপরে কনুই রেখে গালে রেখেছিলেন আলতো করে। ‘বাহ্ বাহ্ তোলো দেখি কেমন পার’ বলে হাসিহাসি মুখ করেছিলেন। সকালের নরম রোদ পড়েছিল তার গালের একদিকে। তাই দেয়ালে টাঙানো সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো ছবিটা কেবল ছবি নয়, একটা আস্ত সময়; স্থির ছবিটাতে সারাক্ষণ সেই সময়টা অস্থির ঘোরাফেরা করে, কথা হাসি কানে বাজে। একা একা খেতে বসলে ডাইনিং টেবিলে জাহানারার চেয়ারটা থেকে আবিদুর রহমানের ছবিটা সোজাসুজি। কথা বলতে বলতে বেশ খাওয়া যায়। ‘ইস! ডাল নিতে গিয়ে একটু পড়ে গেল টেবিলে, দাঁড়াও এক্ষুণি মুছে দিচ্ছি। টিস্যু আনতে যাচ্ছি কিন্তু, এরই মধ্যে মুখ বেজার করো না যেন।’ টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে টিস্যু এনে আবার চেয়ার টেনে বসতে এই বয়সে বেশ খানিকটা সময় লেগে যায় জাহানারার। চেয়ারটাও আবার টানতে হয় নিঃশব্দে, খানিকটা আলগা করে। চেয়ার টানার শব্দ হলে আবিদুর রহমান ভীষণ খেপে যেতেন। বলতেন, ‘এটা কি মোড়ের পরোটা মিষ্টির দোকান নাকি? তুমি কি এখনই কাচের গ্লাসে আঙুল ঢুকিয়ে টেবিল থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে আর পানি ভরা গ্লাস এনে ঠাস করে টেবিলে রাখবে?’ ডালের হলুদ ফোঁটাগুলো টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে জাহানারা বলে, ‘ভাগ্যিস আজ টেবিল ক্লথটা ধোয়ার জন্য উঠিয়ে নিয়েছি, নইলে দাগ বসে যেত আর তুমি পেচিয়ে ফেলেই দিতে।’ খেয়ে উঠে টেবিল থেকে বাসন সরান জাহানারা, টেবিল মুছে আবিদুর রহমানের ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ান, ‘শোনো তুমি হতাশ হবে না, আমি কাজটা করেই আসব।’
এই আশ্বাসটা বহু পুরোনো। বছর দেড়েকের। কিন্তু তিনি কী করবেন, আর সবাই কখনো তেমন বলে, মিথ্যে বলে নাকি সত্য, বোঝা যায় না। তবে জাহানারার বিশ্বাস করতে মন চায়। বিশ্বাস না করলে এভাবে বিশ-বাইশ দিন বাদে কোর্টের সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়াতেন না। প্রথম দিকে যখন যেতেন, মানুষ আগ্রহ নিয়ে কাছে আসত, জানতে চাইত, ‘কী ব্যাপার? কার কাছে আসছেন?’
‘রেজিস্টার’
‘আপনি কেন, উকিল নাই?’
‘কোনো উকিল যে আসতে চাচ্ছে না।’ 
‘কেন, টাকা দেন নাই?’
‘দিলাম তো, তারা বলে এটা কোনো কেস হয় না। অপ্রয়োজনীয়।’
‘তা, কেসটা কী?’
‘একটা নামের বানান ঠিক করা। ডেথ সার্টিফিকেটে।’ 
সামনের লোকটির চোখমুখ চকচক করে ওঠে এটা বললেই। রসিয়ে রসিয়ে জানতে চায়, ‘তা, অনেক জমিজমা আছে মনে হয়! সেগুলা উদ্ধার করতে?’
‘না তো। কিছুই নাই।’
হতাশ হয়ে মানুষটা তখন বলে, ‘তাহলে আবার নাম বদলানো কেন? তা-ও আবার ডেথ সার্টিফিকেটে!’
শুনলে জাহানারার আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না। এক টেবিল থেকে উঠে আরেক টেবিলে গিয়ে বসেন কিংবা সোজা হাঁটা দেন ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে। কত মানুষ কত ধান্দায় ঘোরে এখানে। প্রথম প্রথম সবাইকে কাজেকর্মে ব্যস্তসমস্ত মনে হতো। ধীরে ধীরে বুঝলেন, মানুষকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পয়সা খাওয়ার ধান্দা করছে কেউ, কেউ করছে কল্পিত কেস সাজানোর চেষ্টা, কেউ সাক্ষী সাজাতে লোক খুঁজছে, কেউ  অপেক্ষা করছে যে কোনো কেসের সাক্ষী হতে...  কাছ থেকে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না, এমনই রঙ্গমঞ্চ। তারই মধ্যে একজন কাউকে কখনো মনে ধরলে জাহানারা বলেই ফেলেন ভেতরের কথা। কেউ হেসে জানতে চায়, ‘কোনো জমিজমা ক্লেইম করার নাই, তাহলে নাম বদলায়ে কী হবে, খালাম্মা?’
‘একটা সার্টিফিকেটে নামটা ভুল থাকবে, এটাইবা কী করে হয়, বাবা।’
 ‘কিন্তু সে তো ডেথ সার্টিফিকেট। মানুষটা তো আর নাই।’
‘তাতে কী! যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রতিটা বিষয়ে ছিলেন নির্ভুল। কাজে, কথায়— কোথাও কোনো ফাঁক রাখতেন না। পয়ত্রিশ বছরের সংসারে বলতে পারব না নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম, কোনো অনুচিত কাজ তিনি করেছেন। আজকে তিনি বেঁচে নেই বলে তার ডেথ সার্টিফিকেটে একটা ভুল রয়ে যাবে?’
‘আপনি ঠিকই বলছেন, খালাম্মা। তার ক্ষেত্রে ভুল থাকা ঠিক না। কিন্তু মানুুষটা যখন নাই, আপনি এই বয়সে বারবার এখানে আসেন কেন আর? এটা তো আপনার হাতে নাই।’
‘কী করব বলো, মরার সময় হয়ে যাচ্ছে, তার কাছে গিয়ে কী জবাব দেব? সে নেই বলে এত বড়ো একটা ভুল থেকে গেল? আমি রাখতে দিলাম! আমি কি তাকে চিনতাম না? তার সামনে মুখ দেখাতে পারব না।’     
সামনের মানুষটা প্রায়ই হাসে। কী যে ভীমরতি ধরেছে মহিলার! ডেথ সার্টিফিকেটে নাম ঠিক করে কোনো ইনসিওরেন্সের টাকা কিংবা জমি পেতেন— তা-ও ঠিক ছিল। এসবের কী মানে? ফালতু সময় নষ্ট। কেউ বিরক্তি ঢেকে সরে যায়, কেউ আবার নিজেও আবেগী হয়ে পড়ে, বলে, ‘ঠিকই বলছেন, যেমন মানুষ তার তো তেমনই প্রাপ্য হবার কথা। কিন্তু আপনি যা চাচ্ছেন তা এখন মোটামুটি দুঃসাধ্য।’ 
জাহানারার মন খারাপ হয়। দুঃসাধ্যই বটে। তার নিজেরই ভুল, আর এজন্যেই এটা মেনে নিতে তার এত কষ্ট। কিন্তু কী করার ছিল, আবিদুর রহমান মারা গেলেন মাঝরাতে, ঘুমের মধ্যে। ক্লিনিকে জাহানারা পাশের সরু বিছানায় শুয়ে ছিলেন, বাড়ির বাইরে কোথাও হুট করে ঘুমানো তার জন্য কষ্টকর, এপাশ-ওপাশ করছিলেন অথচ জানতেও পারেননি তিন ফুট দূরে থাকা মানুষটির নিশ্বাস কখন থেমে গেছে। আর সকালে সেটা বুঝলেও আন্দাজ করতে পারেননি সেদিন ওই ক্লিনিকে কী হতে যাচ্ছে। দিনে ওরকম বড়োসড়ো ক্লিনিকে পনেরো-বিশজন মানুষের মৃত্যু স্বাভাবিক। কিন্তু সেই চব্বিশ ঘণ্টায় মারা গিয়েছিল আটত্রিশজন। ব্যাপারটা স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক তা নিয়ে ভোরবেলা থেকে জোর গুঞ্জন চলছিল সেখানে। নিথর আবিদুর রহমানের মাথার কাছে বসে দরজার নীল পর্দার ওপারে মানুষের ছোটাছুটি আর চাপা কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলেন জাহানারা। ‘পুলিশ’ ‘পুলিশ’ শোনা যাচ্ছিল মাঝেমধ্যে। তার কিছুদিন আগে ওই ক্লিনিক থেকে নবজাতক চুরির একটা অভিযোগ এসেছিল। কিছু পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল খবরটা। পরে কী হলো জাহানারার আর মনে পড়ে না। বাচ্চাটা পাওয়া গিয়েছিল নাকি খবরটা ফলো আপ করা হয়নি অথবা মুখ বন্ধ করতে কোথাও কলকাঠি নাড়ানো হয়েছে জাহানারার জানা নেই। কিন্তু আবিদুর রহমান মারা যাবার দিনে মনে হলো পুলিশ আসবেই, তা না হলে খানিক পরে মৃতদের স্বজনেরা লাশ নিয়ে রাস্তায় মিছিল বের করবে। শেষে পুলিশ এসেছিল দুপুর নাগাদ। ক্লিনিক থেকে যাবতীয় ক্লিয়ারেন্স পেতে জাহানারাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। ওদিকে পুলিশ এল, এদিকে জাহানারাকে ধরিয়ে দেয়া হলো একটা ফাইল। ফাইল খুলে নার্স আঙুল দিয়ে কীসব দেখাচ্ছিল, লেখা ছিল ‘অ্যাকিউট রেসপিরেশন’, মারা যাওয়ার আনুমনিক সময়সহ আরো নানান কথা। জাহানারার সেসবের দিকে তেমন চোখ পড়েনি, কথাগুলো কানে যেতে যেতেও যায়নি। ডেথ সার্টিফিকেটও দেখিয়েছিল মেয়েটি, জাহানারা সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে যাবার জন্য গুছিয়ে রাখা ব্যাগের ভেতরে চালান করে দিয়েছিলেন ফাইলটা। তারপর মৃত্যু আর মৃত্যুর আনুসঙ্গিক কাজ, শোকের প্রাথমিক ঘোর কাটিয়ে ওঠা, সেসব সারতে আরো কয়েকদিন। একদিন বেলা করে ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত শরীরে ফাইলটা নিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে দেখছিলেন। মৃত্যুর কারণ কেবলই একটা ঘটনা, ডাক্তারের দৃষ্টিতে এক লাইনের ছোট্ট একটি কথা। জাহানারার কাছে সারাদিন মাথায় ঘোরার মতো ব্যাপার, অ্যাকিউট রেসপিরেশন, কিন্তু তার তো শ্বাসকষ্ট ছিল না! অক্সিজেন সিলিন্ডারের ওপরে হাত রেখে নার্স বলছিল, ‘কী আর করবেন, সবকিছু হাতের কাছে থাকলেও অনেক সময় কোনো কাজে আসে না।’ কাগজ ওলটাতেই ডেথ সার্টিফিকেটে চোখ পড়ল। বালিশ ছেড়ে ধড়মড় করে উঠে বসলেন তিনি। এ কী! আবিদুর রহমানের নামের শুরুতে দুটো ‘এ’ থাকার কথা কিন্তু আছে একটা ‘এ’। এখন কী হবে? সমস্যাটা জাহানারা পাঁচদিন পরে আবিষ্কার করলেও তিনি নিশ্চয় প্রথম থেকেই এটা জানতে পেরেছেন। রাগে-দুঃখে জাহানারার মরে যেতে ইচ্ছে হলো। আবিদুর রহমান নামের বানান আর উচ্চারণ নিয়ে ভীষণ কঠোর ছিলেন। কোথাও সামান্য ভুল সহ্য করতেন না। পড়তে গিয়েছিলেন আমেরিকায় তারপর ফিরে এসে এফিডেভিট করে নামের বানান ঠিক করিয়েছিলেন। সে গল্প বহুবার শুনিয়েছেন জাহানারাকে, ‘বুঝলে, গিয়ে দেখি সবাই ডাকছে ‘অ্যাবিডুর’।‘দ’ না-হয় তোদের নেই, তাই বলে শুরুতে ‘আ’ বলতে পারবি না? দু’চারজনের সাথে কথা বলে জানলাম, ডাবল ‘এ’ দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়, তবেই তারা বুঝতে পারেন যে ‘আ’ বলতে হবে।’ গল্পটি তখনই বারবার শোনাচ্ছিলেন যখন ব্র্যাক থেকে মোহাম্মদপুরে আড়ং চালু হলো। আড়ঙের নামের বানান দেখিয়ে বলছিলেন,‘দেখেছ, ডাবল এ না দিলে অ্যারং হয়ে যেত। বিদেশীরা আসবে ওরা জানে। তখন অ্যারং অ্যারং বলে ডাকলে ভালো লাগবে?’ ডেথ সার্টিফিকেট ফাইলে ঢুকিয়ে অস্থির পায়ে বিছানা থেকে নেমে আসেন জাহানারা, তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে নেন। তোয়ালে ঝোলানোর স্ট্যান্ডে একটা বড়ো তোয়ালে আরেকটা ছোটো। একরকম চেহারার। দুটোতেই লম্বালম্বি ভাঁজ করে ঝোলানো। আবিদুর রহমান এভাবে রাখতেন। ছোটোটা হাত মোছার, বড়োটা দিয়ে শরীর। ঝোলার সময়ে দুটোর নীচের দিকের স্ট্রাইপ থাকবে পাশাপাশি, এক ইঞ্চিও ওপরনীচে নয়। স্ট্রাইপটা সোজা করে বেসিনের পানির ফোঁটা মুছলেন তিনি। মোছার পাতলা কাপড়টি বারান্দায় মেলে জাহানারা ফাইল হাতে তড়িঘড়ি চলে গেলেন ক্লিনিকের উদ্দেশে। 
তখনো সন্ধ্যা হয়নি কিন্তু বিকেলটা ছিল এত মেঘলা যে মনে হচ্ছিল অন্ধকার। ক্লিনিকের সামনের জায়গাটা আরো অন্ধকার। ট্যাক্সিকে থামতে বলেও দ্বিধায় থাকেন জাহানারা। ক্লিনিকের সামনের দিকটায় বরাবর মানুষের ভীড় লেগে থাকে, অন্তত একটা অ্যাম্বুলেন্স বা বারান্দায় একটা অপেক্ষমান স্ট্রেচার ওখানকার স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু সে জায়গায় মোজাইক সিঁড়ির ওপরে একটা মনমরা ছাগল বসে জাবর কাটছে। ট্যাক্সির ভাড়া মেটাতে গিয়েও থেমে গেলেন জাহানারা, ক্লিনিকের চওড়া দরজায় তালা। সেখানে তাকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখে পাশের অফিসের দারোয়ান বলল,‘ক্লিনিক তো পুলিশ বন্ধ কইরা দিসে। মানুষ মরছে অনেক। এখন আর খুলবে না। অন্য ক্লিনিকে যান।’
জাহানারা বুঝতে পারেন না তার কী করার আছে, বিষয়টা যে কত জরুরি সেটা কাকে বোঝাবেন, কার কাছে যাবেন এই সমস্যার সমাধান করতে। বিছানায় একলা পড়ে থেকে থেকে কয়দিন পেপারও পড়া হয়নি তার, দিন-দুনিয়ার কোনো খবরই জানেন না। পরে ধীরে ধীরে জানলেন, ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ এবং সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। মালিক গা ঢাকা দিয়েছেন সেদিনই। ক্লিনিকের কেসের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সেটা খুলবে না। তাই সে পর্যন্ত ডেথ সার্টিফিকেটে নাম বদলানোর কোনো সুযোগ নেই। সমস্যা আর কারো নয়, ক্লিনিকের লোকেরা অন্য কোথাও চাকরি নিয়ে নিয়েছে, রোগীরা অন্য ক্লিনিকে যাচ্ছে, মালিকও হয়ত পালিয়ে কোথাও নতুন ব্যবসা পেতে বসেছে, সমস্যা যা তা কেবল জাহানারার। আবিদুর রহমানকে কী জবাব দেবেন তিনি! বহুদিন অপেক্ষার পরেও যখন কেসের কোনো অগ্রগতি হয়নি, তিনি কোর্টে গিয়ে খবর নেয়া শুরু করেছেন। সবাই বলেছে, ‘কবে সে কেস শেষ হবে আর কবে তাদের কাগজপত্রের ওপরে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে তার তো কোনো ঠিক নাই।’ তবু ক্লিনিকের কেসের তারিখ পড়লেই তিনি আদালতে গেছেন, মেগা সিরিয়ালের এপিসোডের মতো সময় চলে গেছে, কাহিনি আগায়নি, কেবল নানান সম্ভাবনার টুইস্ট তৈরি হয়েছে। শেষে জাহানারা নিজেই কেস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু কার বিরুদ্ধে করবেন তার নাই ঠিক আর অভিযোগটাও এত দুর্বল যে কেউ পাত্তা দেয়নি। কোর্টের রেজিস্টারের অফিসে ছিল এক আমুদে ছেলে, নাম রিপন। সে বলল,‘দামিনি সিনেমায় সানি দেওলকে বলতে শোনেননি খালাম্মা, তারিখ পে তারিখ তারিখ পে তারিখ... কোনো কেসেরই তো সমাধান হয় না। এদেশে কার কেসের সহজে সমাধান হইছে, দেখাইতে পারবেন?’ জাহানারা তার কথায় হাসেন। কোনোদিন সোজা চলে যান তার কাছে তারপর খানিক গল্পগুজোব করে বাসায়। ছেলেটা মজার মজার কথা বলে বলে। বলে, ‘নামে কী যায় আসে, বলেন? এক অফিস চিনি সেখানে ইশতিয়াক রহমান নামে এক লোকের ইনটারনেট বিল আসতেছে ইন্তেজার রহমান নামে, তিন বছর ধরে। ইশতিয়াক রহমান বলেন, আরে বাদ দাও, বিলটা দিয়া দিলেই হইল, লাইনটা যেন না কাটে। আরেকজন আছেন সরফরাজ হোসেন। ফোনে কেউ তারে বলে, মিস্টার সর্পরাজ বলছেন? কেউ বলে, ফসফরাস সাহেব আছেন? ভদ্রলোকের কোনো বিকার নাই, সবার সাথে কথা বলতেছেন।’ জাহানারা হাসতে হাসতে উঠতে চাইলে সে বলে, ‘আরেকটা শোনেন, একজন আছে মুনাসিফ হক, কলোনির লোকজন সমানে তারে মুসাফির ভাই ডাকতেছে, সে জবাবও দিতেছে। কে আজকাল এগুলা নিয়া ভাবে বলেন তো? আর আপনার সমস্যা হইল খালি একটা এ কম পড়ছে। বাদ দেন, খালাম্মা। ওই ক্লিনিক খুলবে না।’ জাহানারা তখন আর হাসেননি। সাদা সুতি শাড়ির সরু নীল পাড়টা আঙুল দিয়ে ঘাড়ের কাছে সোজা করে বসিয়ে ধীরে আঁচল টেনেছেন। ‘যাই তাহলে আজকে, শরীরে কুলায় না আজকাল, জায়গাটা দূর আর এসে কোনো ফায়দাও হয় না। আর কয়দিন যে আসতে পারব কে জানে।’ সবসময় হাসি তামাশা করা রিপনের সেদিন কেন যেন চোখ ভিজে যায় জাহানারার যাওয়া দেখতে দেখতে। পরের মাসে জাহানারাকে আরো দুর্বল দেখায়, হাতের ব্যাগটা টানারও শক্তি নেই অথচ ঘোরগ্রস্থের মতো আদালতের লম্বা বারান্দায় হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা যেন তার নেশা হয়ে গেছে। রিপনের আর সহ্য হয় না, একদিন বলেই ফেলে, ‘দেন দেখি কাগজপত্র, কেস-টেস তো হবে না, কোনোভাবে পার্মিশন করায়ে চেঞ্জ করাইতে পারি নাকি সার্টফিকেটটা।’
জাহানারা জানেন সেটা সম্ভব নয় কিন্তু যেন রিপনের কথার বাইরে অন্য কিছু ভাবার ক্ষমতাই নেই তখন। হাসিমুখে দিয়ে দেন ফাইল।
নীলক্ষেত থেকে নকল সার্টিফিকেটটা বানাতে এক দিনের বেশি সময় লাগে না রিপনের। টাকা খরচ হয়ে যায় কিছু, বেশ ঝামেলায় যাবে মাসের পরের দিনকয়েক। কিন্তু অবিকল ডেথ সার্টিফিকেটটা, নামে শুধু একটা ‘এ’ বেশি, হাতে নিয়ে অদ্ভুত আনন্দ হয়। তবে অত তাড়াতাড়ি জাহানারাকে জানানোর কিছু নেই। ম্যাজিকের মতো হয়ে গেল দেখলে তিনি সন্দেহ করতে পারেন। তাই অপেক্ষা করে সে। যথারীতি জাহানারা দুই সপ্তাহ পরে হাজির। তাকে দেখে রিপন হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে টেবিলের ড্রয়ার খোলে, ‘ভালোই হইছে আজ আসছেন, এই নেন, কালই হাতে আসল, ফোন করতে ভুলে গেছিলাম।’
সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকেন জাহানারা, বাম চোখে পানি গড়িয়ে পড়ে, হ্যাঁ, এবারে মৃত্যু সংবাদটা ঠিকমতো গ্রহন করা যায়। সব ঠিক আছে। কোথাও কোনো ভুল নেই। আবিদুর রহমান মারা গেছেন, অ্যাবিডুর রহমান না। রিপন বলে, ‘আপনার আনন্দ দেখে ভালো লাগতেছে।’
‘কী বলে যে ধন্যবাদ দেব বাবা তোমাকে! তা কী করে করলে বলো তো?’
‘সে অনেক ঝামেলা। অফিশিয়াল কাজ কি আর অত সহজে হয়? বাদ দেন। বাড়ি যান, আর আসতে হবে না।’
‘তা, টাকা কত খরচ হলো?’ চোখ মুছে ধাতস্ত হন জাহানারা। রিপন তার দৃঢ়তা দেখে বোঝে টাকা না নিলে বিষয়টিতে সন্দেহ রয়ে যাবে, বলে, ‘হাজার তিনেক লাগছে।’
‘মাত্র!’
‘আরে, খালাম্মা, ঠিক কোথায় কলকাঠি নাড়তে হবে জানলে খরচ কমই হয়। কিন্তু আপনি আরো বেশি দিতে চাইলে আলাদা কথা।’
জাহানারা হাসেন। 
কোর্টে আসেন না আর তিনি। রিপন ভাবে বাড়ি গিয়ে একদিন দেখে আসলে কেমন হয়। টাকা তো নেয়া হয়েছিলই বেশি, কিছু ফল কিনে নিয়ে যেতে অসুবিধা নেই। বাড়ি খুঁজে বের করতে অসুবিধা হয়নি, কিন্তু দরজায় বেল বাজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো বহুক্ষণ। একসময় পাশের ফ্ল্যাট থেকে একজন বেরিয়ে বলল,‘ ওই বাড়িতে তো কেউ নাই।’
‘আমি খালাম্মার কাছে আসছিলাম,’ কাগজে লেখা ঠিকানাটা বাড়িয়ে দেয় রিপন। 
‘উনি তো দিন বিশেক আগেই মারা গেছেন। একাই থাকতেন তবে যখন মারা যান তখন এক আত্মীয় ছিল। তিনি চলে গেছেন। আপনি ওনার কে?’
‘আমি কেউ না।’
রাস্তায় নেমে ফলগুলোর দিকে তাকায় রিপন। অদ্ভুত শূন্যতার মধ্যে কোথায় যেন একটা তৃপ্তি, এখন আর আবিদুর রহমানের কাছে মুখ দেখাতে ওনার লজ্জা লাগবে না নিশ্চয়।

 


আফসানা বেগম : কথাসাহিত্যিক এবং অনুবাদক। বাংলাদেশ। 

           
   
                                                               
          

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।