রাত ০৯:২৩ ; সোমবার ;  ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯  

প্রিন্স উইলিয়ামের আংটির খোঁজে || মোস্তফা কামাল

প্রকাশিত:

ব্রিটিশ রাজপরিবারে প্রিন্স উইলিয়াম আর কেটের বহুল আলোচিত বিয়ের কথা কে না জানে। কিন্তু সেই বিয়ের নেপথ্যে যে চাঞ্চল্যকর কাহিনী রয়েছে তা কি কেউ জানে! সবার জানার কথাও না। তাছাড়া রাজপরিবারের বিয়ের খবর প্রজারা রাখবেন কোন দুঃখে! তবে রাজপরিবারের অন্ধরমহলের রহস্যময় কাহিনী শোনার আগ্রহ কিন্তু সবারই। জগদ্বিখ্যাত গোয়েন্দা ফটকুমামার গোয়েন্দাগিরিতে বেরিয়ে আসে উইলিয়াম ও কেটের বিয়ের চাঞ্চল্যকর সেই রহস্য। 
প্রিন্সেস কেটের জন্য কেনা প্রিন্স উইলিয়ামের পাঁচ লাখ পাউন্ডের হিরার আংটিটি হঠাৎ উধাও! কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ লুকিয়ে রাখল, নাকি চুরি হয়ে গেল তা কেউ জানে না। আংটি হারানোর ঘটনায় পুরো রাজদরবারে হৈচৈ পড়ে গেল। উইলিয়াম মহাটেনশনে পড়লেন। তিনি বার বার মনে করার চেষ্টা করেন, কেনার পর কোথায় রাখলেন আংটিটা? তিনি প্রথমে কাউকে কিছু না বলে নিজে নিজেই খুঁজতে শুরু করলেন। নিজের ঘর, সাজঘর, দরবার হলসহ সমস্ত রাজদরবার তিনি তন্য তন্য করে খুঁজলেন। কিন্তু কোথাও আংটির কোনো হদিস পাওয়া গেল না! 
বিষয়টা নিয়ে কার সঙ্গে কথা বলবেন? কাউকে বলা মাত্র তা রাণীর কানে চলে যাবে। তখন তো কেলেঙ্কারি ঘটে যাবে! কি করবেন তা নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যান উইলিয়াম। তার মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করে। কাউকে তিনি বলতেও পারছেন না। আবার না বলেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। তার অস্বস্তিকর অবস্থা দেখে সহযোগীরা নানা ধরনের প্রশ্ন করে। অস্বস্তিতে থাকার কারণ জানতে চায়। উইলিয়াম তখন আলাবোলার মতো তাকিয়ে থাকেন। কী বলবেন, কী বলে আবার বোকা বনে যাবেন!  
উইলিয়াম আবারও মনে করার চেষ্টা করেন। আংটিটি কেনার পর তিনি কী করেছিলেন। তার স্পষ্ট মনে আছে, কেনার পর রাজদরবারে এসেই তিনি আংটিটা রাণীকে দেখান। আংটি দেখে রাণী খুবই সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমার খুবই পছন্দ হয়েছে আংটিটা। তোমার বাবা ডায়ানাকে যে ধরনের আংটি দিয়েছিলেন এটা সেরকমই! 
কথাটা শুনে চমকে উঠেছিলেন উইলিয়াম! মনে মনে ভাবলেন, আমার মা’র মতোই কি কেটের পরিণতি অপেক্ষা করছে! না না! তা হতে পারে না! আমি তা হতে দেবো না!
উইলিয়ামের চেহারা দেখে রাণী হয়তো কিছু আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি উইলিয়ামের কাছে জানতে চাইলেন, কি ব্যাপার উইলিয়াম, মাই প্রিন্স! আমার কথা শুনে তোমার চেহারাটা কেমন যেন হয়ে গেলো? 
উইলিয়াম সহজ সরল ভঙ্গিতে বলল, না না! তেমন কিছু না দাদীমা!
রাণী বললেন, শোন, আমি চেহারা দেখেই বলে দিতে পারি, কার মনে কি আছে। তুমি আমার কথা শোনার পর মনে মনে কি ভাবছ বলবো?
উইলিয়াম কি বলবেন ঠিক বুঝতে পারছেন না। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, দাদীমা, আপনি মনের কথাও বলতে পারেন!
হুম পারি মাই প্রিন্স। শোন শোন; আমার কথা শোন। তুমি তোমার মা’র কথা ভাবছিলে না?
উইলিয়াম অবাক বিস্ময়ে রাণীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি আর কোনো কথা বলেন না। রাণী উইলিয়ামকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যাও, এবার আংটিটা তোমার বাবাকে দেখাও। তারপর রেখে দাও। সাবধান! এই আংটি যেন কিছুতেই না হারায়! এ বাড়িতে বিয়ের আংটি হারানোর একটা শঙ্কা আছে। আর তা যদি ঘটে যায় তাহলে মহাবিপদ!  
রাণীর কথা শুনে উইলিয়াম কিছু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তারপরও তিনি রাণীর নির্দেশ অনুযায়ী তার বাবাকে আংটিটা দেখালেন। আংটি দেখে ফিলিপও ভীষণ খুশি হন। তবে তিনি রাণীর কথার কোনো পুনরাবৃত্তি করলেন না। অবশ্য সে সময়ও দেননি উইলিয়াম। ফিলিপ মাত্র দুই মিনিট আংটিটা হাতে রেখেছিলেন। তারপর উইলিয়াম হাত বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফিলিপ তাকে দিয়ে দেন। বাবার কাছ থেকে তিনি সরাসরি নিজের রুমে যান। সেখানে তার একান্ত ব্যক্তিগত যে কেবিনেট রয়েছে, তার মধ্যে ছোট্ট সিন্দুকে খুব যত্ন করে রেখে দিলেন আংটিটা। 
উইলিয়াম মনে মনে ভাবেন, রাখার সময় কেউ কি তাকে ফলো করেছিল? কেউ কি ইচ্ছা করে সরিয়ে রেখেছে? নাকি এটা স্রেফ চুরির ঘটনা! এমন ঘটনা তো আগে কখনো ঘটেনি। রাজপরিবারে চুরি! তাছাড়া বিয়ের আগ মুহূর্তে আংটি হারানোর ঘটনা একটি অশুভ লক্ষণ! আমাদেরকে নিয়ে কেউ কি কোনো ষড়যন্ত্র করল? কে নেপথ্যে থেকে আমাদের বিয়েটা ভেঙে দিতে চায়! 
আংটি হারানোর ঘটনা নিয়ে রাজপরিবারে তুমুল আলোচনা। পাইক পেয়াদাদের মধ্যে আতঙ্ক। হিরার আংটি চুরির ঘটনায় আবার কোন ঝড় শুরু হয়! আর এই ঘটনাটি এক কান দুই কান করতে করতে চলে যায় রাণী এলিজাবেথের কানে। তিনি শুনে তো মহা ফায়ার! তিনি মনে মনে ভাবেন, এই অলুক্ষুণে কান্ডটি কেন ঘটাল? কে এর নেপথ্যে কাজ করছে! এর আগে প্রিন্সেস ডায়ানার আংটিটিও হারানো গিয়েছিল। সেই আংটি নিয়ে কত কাহিনী! উইলিয়াম যেদিন আমাকে আংটিটা দেখার সেদিনই ডায়ানার কথা মনে পড়ল। সেই ঘটনায় রাজপরিবারে কতজন যে চাকরি হারাল আর কতজন যে অপমানের শিকার হল? পরে জানা গেল, সেই আংটি লুকিয়ে রেখেছিল চার্লসের এক বান্ধবী। সে কিছুতেই ডায়ানার সঙ্গে চার্লসের বিয়ে মেনে নিতে পারেনি।  আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! এর পেছনেও কি কোনো নারীর হাত!
রাণীর নির্দেশ, যে করেই হোক মহামূল্যবান আংটিটি খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য যদি রাজকোষের সব অর্থও ব্যয় হয়; তাহলে তা করা হবে। বিশ্বের সবচেয়ে সাহসী ও মেধাসম্পন্ন গোয়েন্দাদের নিয়োগ করতে হবে। ব্রিটিল রয়েল পুলিশের প্রধানকে ডেকে রাণী নির্দেশ দিয়েছেন, আংটি অনুসন্ধানের জন্য তারা যে কোনো দেশের গোয়েন্দা হায়ার করতে পারবে। 
রয়েল পুলিশের আইজি আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তায় ফটকুমামার সন্ধান পেলেন। ইন্টারপোলের ভাষ্যমতে, ফটকুমামা বিশ্বের নাম্বার ওয়ান গোয়েন্দা। তিনি ছাড়া আর কারো পক্ষে আংটি রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়। তাকেই দিতে হবে এই গুরু দায়িত্ব। 
রয়েল পুলিশের প্রধান বিষয়টি রাণীকে অবহিত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে রাণী বললেন, তোমার বিখ্যাত গোয়েন্দাকে আমার সামনে হাজির কর। দেখি তার পক্ষে আংটি খুঁজে বের করা সম্ভব হবে না! সে কতটা বুদ্ধিমান সেটা বুঝতে হবে না! 
পুলিশ প্রধান আর দেরি করলেন না। তিনি ফটকুমামাকে রাণীর সামনে হাজির করলেন। রাণী খুব ভালো করে ফটকুমামাকে দেখলেন। তারপর তিনি তাকে বললেন, আমার দুর্ভাগ্য আপনার নাম আমি কখনো শুনিনি। অথচ আপনি নাকি পৃথিবীর সেরা একজন গোয়েন্দা। আপনি কোথায় কোথায় গোয়েন্দাগিরি করেছেন? 
ফটকুমামা রাণীর সামনে অত্যন্ত নম্র ভঙ্গিতে বললেন, আমি ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ; এমনকি বাংলাদেশেও গোয়েন্দাগিরি করেছি। 
রাণী আবার প্রশ্ন করলেন, বাংলাদেশে কোন ঘটনার গোয়েন্দাগিরি করেছেন? 
ফটকুমামা বললেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড।
সত্যি!
জ্বি। আপনি কি বিডিআর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অবগত?
রাণী মুসকি হেসে ইতিবাচক মাথা নাড়লেন। 
বিস্ময়ের সঙ্গে ফটকুমামা বললেন, মহামান্য রাণী, আপনি জানেন!
রাণী আবারও মুসকি হাসলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, সব খবরই রাখতে হয়। 
ফটকুমামা বললেন, এজন্যই আপনি মহামান্য রাণী। 
আপনার কোনো ফাইন্ডিংস কাজে লেগেছিল?
জ্বি। বিচার প্রক্রিয়ায় কাজে লেগেছিল। 
আপনি কি হারানো আংটি খুঁজে বের করতে পারবেন?
আশা করি পারব। 
ধন্যবাদ। আপনি কাজ শুরু করুন। আপনাকে রয়েল পুলিশ সব সহায়তা দেবে। তবে মনে রাখবেন, গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে কারো আত্মসম্মানে যেন আঘাত না লাগে। কেউ ঘুণাক্ষরেও যাতে টের না পায় যে, আপনি রাজদরবারে গোয়েন্দাগিরি করছেন।  
জ্বি মহামান্য রাণী। তবে এক্ষেত্রে আমাকে এবং আমার চার সহযোগীকে রাজদরবারে চাকরি দিতে হবে। তা না হলে আমরা রাজদরবারে ঢোকার অনুমতি পাবো না। 
সিওর! আমাদের পুলিশ প্রধান আপনাদের চাকরির ব্যবস্থা করবেন। ও নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। 
মহামান্য রাণী, আপনি আমাকে যে গুরুত্বপূর্ণ সময় দিলেন এরপর আর আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। আমি অবশ্যই প্রিন্স উইলিয়ামের হারানো আংটি উদ্ধার করতে সক্ষম হব বলে আমার বিশ্বাস। 
ওকে। সেটা পারলে আমি নিজ হাতে আপনাকে পুরস্কার দেবো। তাহলে আর কথা নয়। মন দিয়ে কাজ করুন। 
ফটকুমামা কুর্ণিশের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকল। রাণী চলে যাওয়ার পর পুলিশ প্রধান ফটকুমামার হাত ধরে বললেন, আপনার আর কি চাই বলেন? বড় পুরস্কার তো পেয়েই গেছেন!
ফটকুমামা প্রথমে থতমত খেয়ে গেলেন। তারপর বোকা বোকা একটা হাসি দিয়ে বললেন, জ্বি জ্বি ঠিক বলেছেন। 
তো, কবে থেকে কাজ শুরু করবেন?
আপনার নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর থেকেই করি!
সে তো মাত্র এক ঘণ্টার ব্যাপার। আসুন আমার সঙ্গে। আমি সব ব্যবস্থা করছি। 
ঠিক আছে বলুন। 
রয়েল পুলিশ প্রধানের সঙ্গে রাজদরবার থেকে বের হলেন। রাণীর সঙ্গে কথা বলতে পারার আনন্দে উদ্বেলিত ফটকুমামা। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হয়, তার পা যেন আর মাটিতে পড়ছে না। 
   
২.

জনি অস্থির ভঙ্গিতে হোটেল রুমে পায়চারি করছে। আর বিড় বিড় করে কী সব বলছে! তার অস্থিরতা টের পায় রুবেল। সে কিছুক্ষণ ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তারপর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, কিরে, কি হয়েছে তোর? কোনো সমস্যা?
রুবেলকে এড়াতে চায় জনি। সে ওর দিকে না তাকিয়ে বলে, না না, তেমন কিছু না।
তেমন কিছু না মানে! তেমন কিছু না হলে ওমন অস্থিরভাবে হাঁটাহাঁটি কেন করছিস?
জানি না। আমি নিজেও জানি না। কেন জানি অস্থির লাগছে। 
এটা আবার কেমন কথা! তোর কেন অস্থির লাগছে তুই জানিস না!
না রে! জানি না। সত্যি জানি না। 
জুনায়েদ গভীর মনোযোগে মোবাইলে গেম খেলছিল। সে মাথা তুলে জনির দিকে তাকাল। তারপর বলল, আমি বলব?
রুবেল বলল, ওর মনের কথা তুই জানিস?
হুম। জানি বলেই তো বলছি। 
জনি বলল, জানলে বল না! আমার কোনো আপত্তি নেই। 
রুবেল জনিকে উদ্দেশ্য করে বলল, তাহলে তোর বলতে অসুবিধা কি? 
জনি বলল, জুনায়েদই বলুক না! দেখি ওর আইকিউ কতটা সার্প। 
তুই ফটকুমামাকে নিয়ে ভাবছিস। ঠিক?
জনি বলল, বল না; বলতে থাক। 
রাণীর সঙ্গে আজ ফটকুমামার বৈঠকটা কতটা ফলপ্রসু হলো কিংবা আদৌ বৈঠকটা হলো কিনা তা নিয়ে ভাবছিস। 
ইয়েস, ইউ আর রাইট! জনি বলল। 
রুবেল বলল, এটা নিয়ে অস্থির হওয়ার তো কিছু নেই। কাজটা হলে আমরা ব্রিটিশ রাজপরিবারে ঢোকার একটা সুযোগ পাবো। এ ধরনের সুযোগ সারাজীবনেও হয়তো পাওয়া যায় না। ফটকুমামা দীর্ঘ বছর ধরে গোয়েন্দাগিরি করছেন। তিনি এখনো এ ধরনের গোয়েন্দা কাজে যুক্ত হতে পারেননি। 
তা তো ঠিকই। 
জুনায়েদ বলল, আমার মনে হয় কি জানিস?
কি মনে হয়? জনি জানতে চাইল। 
আমরা রাজপরিবারে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছি। 
তোর মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। 
পড়বে, অবশ্যই পড়বে। 
কিন্তু আমরা যদি সফল না হই? রুবেল বলল। 
জনি বলল, শোন, আমরা এ পর্যন্ত কোনো কাজে ব্যর্থ হয়েছি? হইনি। ফটকুমামার মতো একজন খ্যাতনামা গোয়েন্দা থাকতে আমরা ব্যর্থ হব না। ব্যর্থ হওয়ার সুযোগই নেই। 
অনেকক্ষণ পর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বললি। জুনায়েদ বলল। 
আমি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ কথাই বলি। 
হো হো করে হেসে উঠল রুবেল। সে জনিকে উদ্দেশ্য করে বলল, সে জন্যই তো তুই ওমন করে পায়চারি করছিলি! তাই না?
হুম, তাতে সমস্যা কি? 
না না, সমস্যা নেই। জুনায়েদ বলল। 
আমি বিষয়টা নিয়ে বেশি বেশি ভাবি। সেজন্যই আমার এমন হয়। তোদের তো কোনো কিছু নিয়েই ভাবনা নেই। 
রুবেল বলল, তোর মতো ওতো ভাবারও কোনো দরকার নেই। শুধু শুধু মাথা নষ্ট করা!
জুনায়েদ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। এ সময় ডোর বেল বেজে উঠল। জনি দ্রুত এগিয়ে গেল দরজা খোলার জন্য। তার মনেই হচ্ছিল, ফটকুমামা এসেছেন। নিশ্চয়ই তিনি আজ একটা সুখবর দেবেন। দরজা খুলেই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সে মামা, বলেন কি সুখবর নিয়ে এসেছেন?
জনি হঠাৎ নির্বাক। ভূত দেখার মতো অবস্থা হয়েছে তার! চিৎকার দিতেও যেন ভুলে গেছে সে। এদিকে জুনায়েদ ওকে দরজা গলায় ডাকছে। জনি জনি! কি ব্যাপার! দরজা খুলতে গিয়ে উধাও হয়ে গেল নাকি! জনি!
জনির সামনে তখন চারজন সশস্ত্র কমান্ডো। একজন ওর মাথার পেছন দিক থেকে পিস্তল ঠেকিয়ে আছে। আরেকজন সামনের দিক থেকে জনির বুকে পিস্তল ধরে যন্ত্রের মতো কথা বলছে। কি বলছে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। জুনায়েদ দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরের দৃশ্যটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। আর কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করছে। সে মনে মনে ভাবে, এ মুহূর্তে বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। তাহলে আমার অবস্থাও জনির মতোই হবে। রুবেল জুনায়েদকে ডাকতে গিয়েও জুনায়েদের হাত এবং চোখের ইশারায় থামিয়ে দিল। ফলে রুমের মধ্যে আপাতত পিনপতন নীরবতা। 
কথা বলতে বলতে হঠাৎ জনি দুই হাত ওপরে তুলে ধরল। তাকে বড্ড অসহায় লাগছে জুনায়েদের। নিশ্চয়ই সামনের লোকটা তাকে হ্যান্ডসআপ বলেছে! পারলে সে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াত। কিন্তু লোকগুলোর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, এখন সামনে গেলেই গুলি করে দেবে। কাজেই জেনেশুনে কে মৃত্যুর মুখে ঝাপিয়ে পড়বে! ইস! এখন যদি একটা মোবাইল থাকত! ফটকুমামাকে খবর দেয়া যেত। ফটকুমামাকে কতবার বললাম, এতোদূর এসেছি। যে কোনো সময় একটা বাজে পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তাই নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকা দরকার। তাহলে হয়তো যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব! এখন উপায় কী!
রুবেল মনে মনে ভাবে, মূর্তির মতো কতক্ষণ বসে থাকা যায়! যাই, জুনায়েদের কাছে যাই। পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করি! তারপর রুবেল বিড়ালের মতো পা ফেলে জুনায়েদের কাছে এলো। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে বলল, কিরে, ঘটনা কি? জনি কোথায়? কোনো সমস্যা?
হুম। বিরাট সমস্যা। 
কেন, কি হয়েছে?
সামনের দরজার ফাঁকটা দিয়ে বাইরের দিকে তাকা। 
রুবেল বাইরের দিকে তাকাল। জুনায়েদ বলল, কিছু দেখতে পাচ্ছিস?
রুবেলের চোখ দুটো বড় হয়ে গেল। গলাটা শুকিয়ে একেবারে কাঠ। জুনায়েদের কাঁধের ওপর রুবেল যে হাতটি রেখেছিস সেটি থর থর করে কাঁপতে শুরু করল। জুনায়েদ বুঝতে পারল, রুবেল ভয় পেয়েছে। সেও তার কাঁধে হাত রেখে সান্ত¦না দেয়। অস্পষ্টভাবে বলে, ছেলেটা কত বড় বিপদে আছে দেখলি তো! 
রুবেল মাথা নেড়ে ওর কথায় সায় দিল। তারপর বলল, এখন উপায়?
কোনো উপায় নেই। আমরাও কিন্তু ভয়াবহ বিপদে আছি। ওরা যে কোনো মুহূর্তে রুমে ঢুকে যেতে পারে। জুনায়েদ বলল। 
রুবেল বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, ও মাই গড! আচ্ছা, ফটকুমামা এতো দেরি করছেন কেন? উনি এলেও তো একটা সলিউসন বের হতো। 
জুনায়েদ বলল, কিভাবে বের হতো? ফটকুমামার কাছে কি অস্ত্র আছে? এরা তো অস্ত্রধারী। সরাসরি গুলি করে দেবে। রুবেল, তুই একটা কাজ কর। দ্রুত ইন্টারকমে ফ্রন্ট ডেস্কে খবরটা দে। 
কি বলব?
উই আর আন্ডার এ্যাটাক বাই দি কমান্ডো। 
ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি। তুই খেয়াল রাখিস। 
রাখছি। তুই যা। দেরি করিস না। 
রুবেল টেবিফোনের কাছে ছুটে যায়। টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, হ্যালো! ফ্রন্ট ডেস্ক? আই এ্যাম কলিং ফ্রম রুম নাম্বার ১১০১; ফ্লোর নাম্বার ১১। উই আর আন্ডার এ্যাটাক বাই দি কমান্ডো। উই আর ইন ডেঞ্জার পজিশন। প্লিজ হেল্প আস। 
ফ্রন্ট ডেস্ক সঙ্গে সঙ্গে বিপজ্জনক সাইরেন বাজিয়ে দিল। আরেকজন পুলিশ বিভাগে ফোন করে খবরটি জানাল। মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ এসে পুরো হোটেল ঘিরে ফেলল। হোটেলে সাইরেনের শব্দে সবাই রুম থেকে বের হতে শুরু করল। চার কমান্ডো নিজেদের বাঁচাতে ভিন্ন পথ বেছে নিল। অস্ত্রগুলো লুকিয়ে ফেলল। আর জনিকে ধাক্কা মেরে রুমে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা লক করে পালিয়ে গেল। আসলে তারা ওই হোটেলেরই উঠেছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা তাদের রুমে ঢুকে পড়ল। 
পুলিশ ভেবেছিল, কমান্ডোরা হয়তো পালানোর চেষ্টা করবে। তাই তারা হোটেলের চারদিকে অবস্থান নিয়েছিল। কেউ কেউ হোটেলের ভেতরে বিভিন্ন সন্দেহভাজন জায়গাগুলোতে খোঁজাখুঁজি করল। কিন্তু পুলিশ কমান্ডোদের কাউকে খুঁজে বের করতে পারল না। ফলে ঘটনার সত্যাসত্য নিয়েই পুলিশ প্রশ্ন তুলল। আর এতে চাপের মুখে পড়ল কর্তৃপক্ষ। বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের কাছে দাবি জানাল। ততক্ষণে ফটকুমামা হোটেলে এসে পৌঁছলেন।  
পুলিশ যখন ১১০১ নাম্বার রুমটি রেকি করছিল তখন ফটকুমামাও সেখানে হাজির হলেন। তিনি দেখলেন রুমটি বাইরে থেকে লক করা। ফটকুমামা সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর পুলিশের জেরার মুখে পড়লেন। পুলিশ তার কাছে জানতে চাইল, কোথা থেকে কবে এবং কেন হোটেলে উঠেছেন। অবশ্য পুলিশ ফটকুমামার পরিচয় জানার পর কিছুটা ক্ষান্ত হল। তবে পুলিশ রুমের ভেতরে কারা আছে না আছে তা দেখতে চাইল। ফটকুমামা তাদের অনুমতি দিলে হোটেল কর্তৃপক্ষ রুমটি খোলার ব্যবস্থা করে। ভেতরে ঢুকে পুলিশ তিন কিশোরকে দেখে তো অবাক! 
পুলিশ অফিসার হ্যারি মনে মনে ভাবলেন, এই কিশোররা নিশ্চয়ই মিথ্যা বলবে না। তারা সত্যি সত্যিই বিপদে পড়েছিল। তা না হলে হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে ফোন করে বলার কথা না। হ্যারি জনিদের কাছে পুরো ঘটনাটি জানতে চাইল। জনি পুরো ঘটনাটি যখন বলল, তখন হ্যারি বলল, মুহূর্তের মধ্যে ওরা কোথায় হাওয়া হয়ে গেল। সত্যিই রহস্যজনক ব্যাপার তো! 
   
৩.

লন্ডনের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে কেটের জন্ম। ছাত্রী হিসেবে ভীষণ মেধাবী। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে গ্লোরিয়াস রেজাল্ট করে সে। তার ভালো রেজাল্টই তাকে নিয়ে যায় উঁচুস্তরে। শতভাগ বৃত্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায় কেট। সেখানেই পরিচয় হয় রাজপুত্র উইলিয়ামের সঙ্গে। তারপর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দুজনের। এক পর্যায়ে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।  
উইলিয়ামের সঙ্গে বিয়ের কথা পাকাপাকি হওয়ার থেকে কেটের পরিবারে আনন্দের বন্যা বইছে। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়েও সে রাজরাণী হবে। সাধারণ পরিবারের মেয়ের রাজপরিবারে যাওয়ার ঘটনাটি ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের এক অনন্য সৌন্দর্য। এটা বিশ্বের আর কোনো রাজপরিবারে খুব একটা দেখা যায় না। কেটের পরিবারের জন্য এর চেয়ে বড় খবর আর কী হতে পারে। কেটের পরিবার পরিজন তো বটেই, তার কাছের এবং দূরের আত্মীয়স্বজনও আনন্দ করছে কেটকে নিয়ে। 
আগেকার দিনে রাজার ছেলের সঙ্গে রাজার মেয়ের বিয়ে হতো। ব্রিটিশ রাজপরিবারই সেই প্রথা ভেঙে একটি সাধারণ পরিবারের মেয়েকে তুলে আনছে রাজপরিবারে। কেটের পরিবার যখন আনন্দের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল ঠিক তখনই কেটের কাছে খবর এলো, তাদের বিয়ের আংটি খোয়া গেছে। এ নিয়ে উইলিয়ামের মাথা খারাপ অবস্থা। দুদিন আগেও তিনি ছিলেন বিয়ের আনন্দে মাতোয়ারা তিনি এখন মনমরা হয়ে বসে থাকেন। তার মনে কোনো আনন্দ নেই। তিনি ভীষণ চিন্তিত। তিনি কারো সঙ্গে কথা বলেন না। খাওয়া দাওয়াও ঠিক মতো করছেন না। 
উইলিয়ামের খবর কেটের কাছে পৌঁছার পর তিনিও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তিনি কেটের সঙ্গে দেখা করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে উইলিয়ামের সঙ্গে দেখা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাজপরিবার এটা কিছুতেই এলাউ করবে না। ফলে টেনশনটা আরো বাড়ল। কেট মনে মনে ভাবে, উইলিয়ামের সঙ্গে দেখা করতে হলে তার স্টাফ অফিসার ড্যানকে ধরতে হবে। ও ছাড়া কেউ দেখার করার সুযোগ করে দিতে পারবে না। 
তারপর কেট ড্যানের ফোন নাম্বার জোগাড় করল। ড্যানের কাছে ফোন করে কেট। হ্যালো! হ্যালো ড্যান! আমি কেট।
জ্বি! 
আমি কেট।
কেট শব্দটি বজ্রপাতের মতো মনে হলো ড্যানের। ভয়ে তার হাত থেকে রিসিভারটি পড়ে গেল। কাঁপতে কাঁপতে সে রিসিভারটি তুলে কম্পিত কণ্ঠে বলল, হ্যালো ম্যাডাম!
কেট বলল, ড্যান তুমি কি ভয় পাচ্ছ?
জ্বি! জ্বি না!
আরে! আমাকে ভয় পাওয়ার কি আছে? তুমি ভয় পেও না তো! একদম ভয় পেও না। 
না মানে আমি কি ফোনটা স্যারকে...
না না! তুমি শোন ড্যান। তুমি আমার কথা শোন। 
জ্বি জ্বি!
আমাকে একটা হেল্প করতে হবে ড্যান। 
জ্বি জ্বি!
উইলিয়ামের সঙ্গে দেখা করা আমার খুব দরকার। কখন কিভাবে দেখা করতে পারি বল তো! তুমি ব্যবস্থা কর। 
জ্বি জ্বি! 
কবে, কখন দেখা করাবে?
ম্যাডাম, স্যারের মনের অবস্থা খুব খারাপ। কদিন ধরে তার কাছে যেতে পারছি না। কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করতে পারছি না। 
কেন, আংটি হারিয়ে গেছে বলে! আচ্ছা, কি করে হারালো তুমি কি জানো?
ড্যান জিহ্বায় দাত চেপে রাখে কতক্ষণ। তারপর বলে, ম্যাডাম আপনি কি করে এসব কথা জানলেন?
তোমার স্যারই আমার কাছে খবরটা দিয়েছেন। এজন্য আমারও ভীষণ টেনশন হচ্ছে। এই আংটি হারানোর কারণে যদি বিয়েটা ভেঙে যায়!
না না! আপনি এসব চিন্তা করবেন না। এ কারণে বিয়ে ভাঙবে না। 
আরে না! তুমি রাজপরিবারকে চেন না। আংটি হারানোর ঘটনাটি তো অনেক বড় ব্যাপার। ঠুনকো কারণেও বিয়ে ভেঙে দিতে পারে। 
ম্যাডাম, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি স্যারের সঙ্গে আপনার দেখা যাতে হয় সে ব্যবস্থা করছি। 
থ্যাঙ্ক ইউ ড্যান থ্যাঙ্ক ইউ! 
ফোন রেখে শান্ত হয়ে বসল কেট।  এ সময় কেটের মা জানতে চাইলেন, কিরে, কার সঙ্গে কথা বললি?
উইলিয়ামের এক স্টাফ অফিসারের সঙ্গে।
সে কি বলল?
উইলিয়ামের সঙ্গে দেখা করানোর ব্যবস্থা করবে। 
তাই! কিন্তু এটা কি রাজপরিবার এলাউ করবে?
না, করবে না। আমরা গোপনে দেখা করব। 
দেখ, তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। 
কেন মা?
হয়তো গোপনে দেখা করার কারণেই রাণী বলবেন, এ বিয়ে হবে না।
না না মা! এসব কথা বল না!
আমি বলি কি, তুই একটু ধৈর্য ধর। 
কেট কিছু বলার আগেই ফোনের রিং বেজে উঠল। কেট ফোনের রিসিভারটা তুলে হ্যালো বলতেই উইলিয়ামের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো তার কানে। কেট মাই লাভ! আমি জানি তুমি আমার জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। আংটি খোঁজার জন্য বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা লাগিয়েছি। বের করে ফেলবে। আমি নিশ্চিত বিয়ের আগেই আংটি খুঁজে পাবে। তারপরও বলছি, যত যা কিছু ঘটুক, বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক থাকবে। একটুও নড়চড় হবে না। একটুও না। 
থ্যাঙ্ক ইউ উইলিয়াম। খুব খুশি হলাম। 
উইলিয়াম ফোন রাখার পর কেটও ফোন রাখল। তারপর সে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তার মাকে জড়িয়ে ধরল। 

৪.

ফটকুমামা ও তার তিন কিশোর গোয়েন্দার বিপদের কথা জেনে ব্রিটিশ পুলিশ তাদেরকে হোটেল থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিল। রাজপরিবারের স্টাফ হিসেবে নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে সরকারি বাসায় থাকার সুবিধা পেল। ফলে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করতে হলো না। তারা দেরি না করে নেমে পড়ল রাজপরিবারের গোয়েন্দাগিরির কাজে। সেখানে তারা তিনজনই ক্লিনার হিসেবে কাজ শুরু করল। আর ফটকুমামা তাদের কিøনিং কাজ তদারকির দায়িত্ব পেলেন। তাদের সাজগোজ এমন ছিল যে, রাজপরিবারের ক্লিনার হিসেবে শুধু তারাই মানানসই। 
সকাল দুপুর রাত তিন সময়েই তাদের কিøনিং কাজ করতে হয়। তাদের কাজকর্ম, আচার ব্যবহার চালচলন সবকিছুর ওপরই রাজপরিবারের সদস্যদের দৃষ্টি পড়ে। আর এই পজেটিভ দৃষ্টি তাদের গোয়েন্দা কাজের জন্য সহায়ক হয়। অন্দরমহল ছাড়া আর সর্বত্র প্রবেশের অনুমতি পায় তারা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারা আংটি খুঁজতে থাকে। নানা কৌশলে রাজদরবারের কর্মচারিদের কাছে আংটির খোঁজখবর নিতে থাকে। এভাবে একদিন দুইদিন তিনদিন যায়। সপ্তাহ ঘুরে সপ্তাহ আসে। কিন্তু আংটির খোঁজ কোথাও পায় না। বরং দিন দিনই বিষয়টি জটিল আকার ধারন করে। 
ফটকুমামা ভাবেন, আংটিটা কিভাবে খোয়া গেল তা প্রিন্স উইলিয়াম ভালো বলতে পারবেন। তার সঙ্গে একবার সিটিং দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু তার সঙ্গে সিটিং দেয়ার সুযোগ কোথায়? তিনি কি সিটিং দিতে রাজি হবেন? এজন্য নিশ্চয়ই রাণীর সহযোগিতা লাগবে। তিনি না বললে প্রিন্স উইলিয়াম রাজি হবেন না। 
এ সময় কোথা থেকে যেন জনি হন্তদন্ত হয়ে ফটকুমামার সামনে এসে দাঁড়ায়। তাকে দেখে ফটকুমামা বলেন, কি রে জনি! কোনো সুখবর আছে নাকি? 
মামা, একটা ক্লু পেয়েছি। 
তাই নাকি! কি ধরণের ক্লু বলতো?
মামা, প্রিন্স উইলিয়ামের রুম যে কিøন করে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। আমি তার সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বলেছি। আমার ধারনা, তার কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যেতে পারে। 
সত্যি! 
তিন সত্যি মামা।  সে কি নারী না পুরুষ?
সে নারী।
তার সঙ্গে কি বন্ধুত্ব করা সম্ভব?
জনি কিছুক্ষণ ভেবে বলে, সম্ভব মামা। 
তাহলে তুই তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোল। যাতে সে কোনো ভাবেই বুঝতে না পারে যে, এর পেছনে তোর কোনো উদ্দেশ্য আছে। বুঝতে পারছিস? শোন, ব্রিটিশরা কিন্তু খুবই চতুর। খুব সাবধানে হ্যান্ডেল করতে হবে। 
ঠিক আছে মামা। আমি চেষ্টা করব। 
সম্ভব হলে আমার সঙ্গে মিট করিয়ে দিস।
জ্বি মামা। 
রুবেল, জুনায়েদ ওরা কোথায়?
এ মুহূর্তে কোথায় আছে তা আমি বলতে পারব না মামা। 
ঠিক আছে তুই যা। আমি দেখছি। 
ফটকুমামা দরবার হলের দিকে এগিয়ে গেলেন। রুবেল অন্য দিক থেকে ফটকুমামার দিকে আসছিল। রুবেলকে দেখে তিনি তার হাত চেপে ধরে বললেন, এই রুবেল! কি করছিস কিছুই তো বলছিস না! তোর কাছে কি কোনো তথ্য নেই নাকি!
মামা, খবর আছে। আর সেজন্যই তো আপনার কাছে যাচ্ছিলাম।  
তাই, আমার কাছে যাচ্ছিলি! কি খবর বল তো?
আমার মনে হয় কি; আমাদেরকে যারা কিডন্যাপ করতে চেয়েছিল তাদের সঙ্গে প্রিন্স উইলিয়ামের আংটি চুরির কোনো যোগসূত্র আছে। 
তোর কথাবার্তা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। পরিস্কার করে বল তো!
মামা, আমরা যে প্রিন্স উইলিয়ামের আংটি খুঁজে বের করার জন্য লন্ডনে এসেছি এটা হয়তো ফাঁস হয়ে গেছে। সে কারণেই একটা গ্রুপ, মানে যারা চুরির সঙ্গে জড়িত তারা আমাদের পেছনে কমান্ডো লাগিয়েছে। 
হঠাৎ তোর এ কথা মনে হল কেন?
বিষয়টা আমার ভাবনায় এলো। আমাদের ব্যাপারে আগাম তথ্য না থাকলে তারা জানল কি করে আমরা গ্র্যান্ড হোটেলে উঠেছি। তারপর তারা আমাদের রুম নাম্বারও খুঁজে বের করেছে। ব্যাপারটা কেমন না?
হুম। কিন্তু ওসব ভাবনা এখন আর ভেবে কি লাভ? 
মামা, ওই কমান্ডো গ্রুপটার খোঁজ পাওয়া গেলে অনেক রহস্য বেরিয়ে যেত। 
তোর কি তাই মনে হয়?
হ্যাঁ মামা, আমার তাই মনে হয়। 
বিষয়টি তুই আরেকটু বিস্তারিত বল তো রুবেল।
মামা, ওরা কেন আমাদেরকে কিডন্যাপ করতে চাইল? আমরা তো এমন টাকাওয়ালা লোক নই যে, আমাদের কিডন্যাপ করলে বিপুল অংকের টাকা পাবে। 
হুম। 
তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কোনো কারণ ছিল!
থাকতে পারে। 
থাকতে পারে না মামা; কারণ আছে। ওরা নিশ্চয়ই আমাদেরকে গোয়েন্দা কাজ থেকে বিরত রাখতে চাচ্ছে। আমার মনে হয়, কমান্ডো খুঁজে বের করার দায়িত্বটা পুলিশ বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করা উচিত।  
ঠিক আছে। আমি তোর ভাবনাটা নিলাম। আমি পুলিশ প্রধানের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি বলব। আর এখানের আর কোনো খোঁজ আছে কিনা বল।
বলার মতো কিছু নেই। সে রকম কোনো অগ্রগতি হলে বলব। ঠিক আছে?
জ্বি মামা।
সাবধানে কাজ করিস। 
রুবেল ইতিবাচক মাথা নাড়ল। ফটকুমামা এবার জুনায়েদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। জুনায়েদ তখন ক্লিনিং কাজে ব্যস্ত ছিল। ফটকুমামাকে দেখেই সে এগিয়ে গেল তার কাছে। তার কাছে গিয়ে বলল, মামা কোনো কুলকিনারাই তো পাচ্ছি না। 
তাই? চেষ্টা কর। পেয়ে যাবে। 
তা তো করছিই মামা। 
কারো সঙ্গে তোমার সম্পর্ক হয়েছে? 
জ্বি মামা। দুজনের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে। 
তাদের সঙ্গে বেশি বেশি কথাবার্তা বল। আংটি চুরির ঘটনাটা জানার চেষ্টা কর।  
এ বিষয়ে কেউ কথা বলে না মামা! সবাই যেন মুখে কুলুপ এটে আছে। এ রকম অবস্থা আমি কোথাও দেখিনি। 
শোন, যে যত কঠিন সে তত নরম। তুমি বুঝতে পারছো ব্যাপারটা? যত চাপা স্বভাবের মানুষই হোক, কথা বলে বলে তার পেট থেকে কথা বের করতে হবে। সেটাই তো গোয়েন্দাদের কাজ।
জ্বি মামা। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বেশি বেশি কথা বলার চেষ্টা করছি। 
আবার বেশি বলতে গিয়ে নিজের পরিচয় ফাঁস করে দিও না!
না না মামা! সেটা কেন করব?
হুম। তাই যেন মনে থাকে! 
থাকবে, অবশ্যই থাকবে মামা। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। 
ফটকুমামা আশ্বস্ত হয়ে আপন মনে ছুটলেন অন্য দিকে। 
  
ফটকুমামা পুলিশ প্রধানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। রুবেলের পরামর্শটা খারাপ না। কমান্ডোদের খুঁজে বের করতে পারলে আংটি হারানোর অনেক রহস্য বেরিয়ে যেতে পারে। পুলিশ প্রধানকে বিষয়টি বলতে হবে। পুলিশের সহায়তা ছাড়া কিছুতেই ওদের খুঁজে বের করা যাবে না। 
পুলিশ প্রধান মহাব্যস্ত মানুষ। যখন তখন সময় দেয়া তার জন্য কঠিন। তারপরও তিনি ফটকুমামাকে সময় দিতে সম্মত হলেন। কারণ একটাই, যে কোনো মূল্যে প্রিন্স উইলিয়ামের আংটি খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে বিয়ে আটকে যাবে। রাণী কিছুতেই সেটা চান না।
রাণী স্বয়ং পুলিশ প্রধানকে তাড়া দিয়েছেন। আর কতদিন লাগবে? কেন এখনো আংটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? 
পুলিশ প্রধান রাণীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এরা বেশ ঘাগু গোয়েন্দা। আংটি খুঁজে বের করা কোনো ব্যাপারই না। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পাওয়া যাবে। অথচ এরমধ্যে দুই সপ্তাহ চলে গেছে। পুলিশ প্রধান নিজেও বিষয়টা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনিও ফটকুমামার সঙ্গে কথা বলার তাগিদ অনুভব করছিলেন। আর তাই, ফটকুমামা তার রুমে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, কি ব্যাপার! আংটির কোনো খোঁজ পেলেন? বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে ফটকু সাহেব। 
ফটকুমামা ইতিবাচক মাথা নেড়ে বললেন, জ্বি, তা হয়েছে। 
এতো দেরি হলে চলবে? 
জ্বি না। আর বেশি দেরি হবে না। 
আমি কিন্তু ভীষণ চাপে আছি। রাণী স্বয়ং খোঁজ নিচ্ছেন। 
জ্বি গুরুত্বটা আমি বুঝতে পারছি। 
তাহলে একটা টাইমফ্রেম বলেন। কবে নাগাদ আমরা সুখবর পেতে পারি?
খুব দ্রুতই পাবেন। তবে এ মুহূর্তে আপনার হেল্প দরকার। 
কি ধরনের হেল্প বলেন তো?
সেই কমান্ডোদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের কাছ থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারি। 
রিয়েলি!
জ্বি। 
ওকে। আমি তাদের পেছনে পুলিশ লাগাচ্ছি। তাদের হয়্যারএবাউট বের করে ফেলব। 
আমি তাহলে আসি?
হুম, আসুন। 
ফটকুমামা চলে গেলেন। পুলিশ প্রধান দেরি না করে তখনই পুলিশ বিভাগের গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে কথা বললেন। কমান্ডোদের খুঁজে বের করার জন্য তাকে দায়িত্ব দিলেন। 
 
৫.

ন্যান্সি জনিকে অনেকক্ষণ ধরেই ডাকাডাকি করছিল। কিন্তু সে তার ডাক শুনতে পাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে সে বিরক্তির সঙ্গে বলল, জনি, তুমি কি আমার ডাক শুনতে পাচ্ছ না? এই জনি!
জনি ন্যান্সির কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, স্যরি ন্যান্সি, ভেরি স্যরি। আমি আসলে তোমার ডাক শুনতে পাইনি। কি বলবে বল? 
না না! তেমন কিছু না। আমার কাজ শেষ তো! তাই তোমার সঙ্গে গল্প করার জন্য তোমাকে ডেকেছি। 
আমার মনে হচ্ছে, তুমি কিছু একটা বলবে। 
তাই! সত্যি তোমার তাই মনে হচ্ছে?
হুম। 
বল কী! তুমি মনের কথাও বলে দিতে পার!
বলে দিতে পারি বললে একটু বেশি বলা হবে। তবে ধারনা করতে পারি। 
তোমার ধারনা সত্যি। শোন, আমি পেটের ভেতরে একটা বিশাল বড় বোম নিয়ে ঘুরছি। 
জনি বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, মানে!
বোমটা না ফাটালে আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো। 
কি বল!
সত্যি বলছি। আমি কিছুতেই আর বোমটাকে পেটের ভেতরে রাখতে পারছি না। 
প্লিজ একটু খুলে বল। তা না হলে আমিও অস্থিরতায় মারা যাবো। 
ন্যান্সি হাসল। ওর কথায় বেশ মজা পেল। হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই সে বলল, আরে! একটা গোপন কথা তোমাকে বলব। প্রিয় মানুষদের কাছে আমি কোনো কিছু গোপন রাখতে পারি না। আমার পেটে একটা গোপন কথা আছে। সেটা তোমাকে না বলা পর্যন্ত আমি স্বস্তি পাচ্ছি না। 
ইট ইজ মাই প্লেজার!
হুম। কিন্তু একটা শর্ত আছে। 
কি শর্ত?
কাউকে তুমি কথাটা বলতে পারবে না। নিজের ভেতরেই রাখবে। 
সিওর সিওর! 
মনে থাকবে?
হুম থাকবে। 
শোন, তুমি আমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছিলে না? ওই যে, প্রিন্স উইলিয়ামের আংটি হারানোর ঘটনা!
হুম। 
ঘটনাটা আমি জানি। 
তুমি জানো! 
হুম। 
বল না প্লিজ! 
আংটিটা আমি সরিয়েছি। 
তাই নাকি! কোথায় সরিয়েছ?
আমার বাড়িতে নিয়ে গেছি। 
বল কি!
হুম। এতো চমৎকার একটা জিনিস! আমি কিছুতেই নিজের লোভটা সামলাতে পারিনি। 
কেন, হঠাৎ তুমি আংটির লোভে পড়লে কেন? আরো কত দামি জিনিসই তো এখানে আছে। সেগুলোর প্রতি চোখ পড়ল না!
অন্য কিছুর প্রতি আমার কোনো লোভ নেই। বিন্দুমাত্র নেই। বিশ্বাস কর। কিন্তু আমি কেন জানি এই আংটিটার লোভ সামলাতে পারিনি। 
আংটির প্রতি তোমার এই বিশেষ দুর্বলতার কারণ কি?
কারণ নিশ্চয়ই আছে। 
আমাকে বলা যাবে?
ন্যান্সির কণ্ঠস্বরটা ভারি হয়ে উঠল। সে বলল, আমার বাবা খুব দরিদ্র ছিলেন। অনেক কষ্টে তিনি আমাদের সংসার চালাতেন। কিন্তু কোনো দিন কোনো অসৎ কাজ করেননি। তার সততা দেখে আমরা অবলীলায় ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতাম। বাবা আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। একবার আমার দশম জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে বাবা সখ করে একটা আংটি কিনেছিলেন। সেটা ছিল বাবার দীর্ঘদিনের শ্রম ঘাম ঝরানো টাকায় কেনা। 
তারপর!
আংটিটা কিনে বাবা বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু রাস্তায় তাকে হাইজ্যাকাররা আক্রমন করল। আংটিটা নেয়ার জন্য তারা বাবাকে খুন করল। বাবার কেনা আংটিটা আমি দেখিনি। কেটের জন্য প্রিন্স উইলিয়ামের কেনা আংটিটা দেখার পর আমার কেন জানি মনে হল, এই আংটির ভেতরে বাবার স্বপ্ন, বাবার ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। ওই আংটির মধ্যে আমি বাবাকে খুঁজে পাই। 
জনি কি বলবে ঠিক বুঝতে পারে না। সে এক দৃষ্টে ন্যান্সির দিকে তাকিয়ে আছে। ন্যান্সের দুই চোখের কোটরে পানি জমেছে। তার কষ্টটা জনি উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে।  

উইলিয়ামের রুম গোছানোর কাজ করছিল ন্যান্সি। জনি রুমে ঢুকেই বলল, ন্যান্সি তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল। তুমি কখন আমার কথা শুনবে?
তুমি যখন বলবে তখনই শুনব। এখন বলবে?
বলতে পারি। 
তাহলে দেরি করছ কেন? বলে ফেল। 
ন্যান্সি, আমাকে তোমার বাড়িতে নেবে?
হঠাৎ আমার বাড়িতে!
এমনি। দেখতে যাবো। নেবে?
নিতে আপত্তি নেই। কিন্তু বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?
না না! এমনি। দেখতে যাবো। আর কিছু না। 
ঠিক আছে। কবে যাবে? ছুটি ছাড়া তো যাওয়া যাবে না।
তা আমি জানি। তোমার ডে অফ কবে?
পরশু। 
হুম। তাহলে আমি ওই দিন ছুটি নিয়ে নিই? 
ঠিক আছে নাও। শোন, তুমি যে আমাদের বাড়িতে যাচ্ছ এ কথা কেউ যেন না জানে!
আমি তোমাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমি কাউকে বলবো না। 
তাহলে পরশু ভোরে মেট্রো স্টেশনে আমাদের দেখা হবে। 
ঠিক আছে। আমি তাহলে আসছি। টেক কেয়ার। 
ন্যান্সিও বলল, টেক কেয়ার। 
জনি স্বপ্নেও ধারনা করেনি ন্যান্সি এতো দ্রুত রাজি হবে। সে মনে মনে ভীষণ খুশি। কিন্তু খুশির কারণ সে কাউকে বলতে পারে না। কখনো কখনো খুশির খবরও যে মানুষের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে তা জনি আজ টের পাচ্ছে। 

৬.

রাণী এলিজাবেথের সামনে প্রিন্স উইলিয়াম দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখেমুখে হতাশার ছাপ। উইলিয়ামকে এ রকম হতাশাগ্রস্ত আগে কখনো দেখা যায়নি। বিয়ের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই তার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বাড়ছে। এ সময় রাজপরিবারটি আনন্দের বন্যায় ভেসে যাওয়ার কথা। অথচ সেখানে কোনো আনন্দে নেই। সবাই যেন হতাশার সাগরে নিমজ্জিত। ব্যাপারটা রাণীর কাছেও অস্বস্তিকর লাগছে। তাই তিনি উইলিয়ামকে ডেকে পাঠিয়েছেন। বিয়ের ব্যাপারে প্রিন্স উইলিয়ামের ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত আছে কিনা তা জানতে চান তিনি। 
প্রিন্স উইলিয়াম সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগছেন। তিনি কি করবেন তা ঠিক বুঝতে পারছেন না। তিনি প্রিন্সেস ডায়ানার মতো কেটকেও হারাতে চান না। কিন্তু আংটিটা না পাওয়া পর্যন্ত তিনি কি করে সিদ্ধান্ত নেবেন! রাণী সিদ্ধান্ত দিলে ভিন্ন কথা। সেটা কি তিনি রাণীকে মুখফুটে বলবেন? রাণীকে কি বলা উচিত না নিয়ে উইলিয়াম ভাবছিলেন। তার আগেই রাণী তার কাছে জানতে চাইল, উইলিয়াম মাই ডিয়ার! তোমার আংটিটা খুঁজে বের করার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চলছে। হয়তো বিয়ের আগে পেয়েও যাবো। কিন্তু আংটির জন্য তো আর অনির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা যায় না! আবার বিয়ের দিনক্ষণও পেছানো বোধহয় ঠিক হবে না। তাই বলছি, আংটিটা যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে না; সেহেতু আমি আরেকটা আংটি তোমাকে কিনে দিই। তুমি আর মন খারাপ করে থেক না। প্লিজ মাই প্রিন্স! তোমার মন খারাপ দেখলে আমার মনটাও খুব খারাপ হয়। তুমি কি চাও; তোমার কারণে আমার মনও খারাপ থাকুক?
রাণীর কথায় আবেগাপ্লুত হলেন উইলিয়াম। তিনি রাণীর কাছে এগিয়ে গেলেন। রাণী তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, দুই চোখের কোটরে পানি জমেছে। তিনি উইলিয়ামের চোখের পানি মুছে দিলেন। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ডোন্ট ক্রাই! তুমি দেখ, বিয়ের আগেই তোমার আংটিটা আমরা খুঁজে পাব। আমি বিকল্প হিসেবে আরেকটা, মানে তুমি যে রকমটি কিনেছ ঠিক সেই রকম একটা আংটি কিনে আনছি। আর আমি তো তোমার স্ত্রীকে আংটি দিতামই। তুমি ভালোবেসে তার জন্য কিনেছ বলে আমি কিনিনি। 
প্রিন্স উইলিয়াম চুপ করে আছেন। তিনি কোনো কথা বলছেন না। তাকে নীরব থাকতে দেখে রাণী আবারও বললেন, মাই প্রিন্স! কিছু বল। চুপ করে আছ যে!
জ্বি দাদীমা! আপনি যা বলবেন। আপনার কথা শিরোধার্য।
রাণী মুসকি হাসলেন। তারপর বললেন, ইট ইজ নট মাই অর্ডার; ইট এজ মাই উইশ!
দাদীমা আপনার কথাই তো আমাদের কাছে অর্ডার। 
এভাবে বল না মাই প্রিন্স। তোমার বিয়ে বলে কথা! তোমার জীবনের একটা একটা উৎকৃষ্ট সময়। এ সময় তুমি কোনো বিষয় নিয়ে ডিস্টার্ব থাকো সেটা আমি চাই না। 
থ্যাঙ্ক ইউ দাদীমা। 
তারপরও আমরা আর কিছুদিন অপেক্ষা করি, কি বল? এখনো তো সময় আছে!
জ্বি দাদীমা। 
তাহলে তুমি আর টেনশন কর না। আর শোন, তুমি আমাদের এক গোয়েন্দা ফটকুমামাকে একটু হেল্প কর। তোমার সঙ্গে সে কিছু কথা বলতে চায়। তোমার আংটি খুঁজে বের করার স্বার্থে তোমার সহযোাগিতা দরকার। তোমার সহযোগিতা পেলে সে নাকি খুব দ্রুতই অর্থাৎ তোমার বিয়ের অনুষ্ঠানের আগেই আংটি পেয়ে যাবে। সত্যি সত্যিই পেয়ে যাবো।
সত্যি! সত্যি দাদীমা! 
আমার দৃঢ় বিশ্বাস।  
আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক দাদীমা। 
আবারও হাসলেন রাণী এলিজাবেথ। কুর্ণিশের ভঙ্গিতে রাণীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে উইলিয়াম চলে গেলেন। তিনি নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তার সমস্ত ভাবনাজুড়ে কেট। কেটের মনটা কি অস্থির? সে কি আমাকে নিয়ে ভাবে? আমি যে তাকে নিয়ে ভাবি তা কি সে টের পায়? আমার মনের অবস্থা কি সে জানে? হঠাৎ তিনি বিরক্তির সঙ্গে বলে ওঠেন, গোয়েন্দারা কি কাজ করছে? এখনো একটা আংটি খুঁজে পায় না! আমাদের পুলিশ! নামেই শুধু রয়েল পুলিশ! কোনো কাজের না। আমার আর ভালো লাগছে না। কবে যে আংটিটা খুঁজে পাবো! 
প্রিন্স উইলিয়ামের এই ভাবনাগুলো মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তার রুমের সামনে এসে হাজির হয় ডেনিয়েল। ডেনিয়েল তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। সেই তার দিনের কর্মসূচি ঠিক করে। ডেনিয়েল ডোর বেল চাপার সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্স উইলিয়াম এগিয়ে এসে বললেন, কি ব্যাপার ডেনিয়েল? তুমি এ সময়?
আপনার সঙ্গে ফটকুমামার একটা বৈঠক আছে। বৈঠকের নির্ধারিত সময় এখন থেকে ঠিক পাঁচ মিনিট পর। আপনি সম্মতি দিলে ওনাকে ওয়েটিং রুমে বসতে বলি। 
ফটকুমামা কে?
উনি একজন গোয়েন্দা। আপনার আংটি খুঁজে বের করার কাজে নিয়োজিত। 
উনি এখন কোথায় আছেন?
রাজদরবারেই আছেন স্যার। 
কিন্তু আমার সঙ্গে উনি কি কথা বলবেন? ওনার কাজ গোয়েন্দাগিরি। উনি ওটাই করুক না! উনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন কি জন্য? 
রাণীমা যে আপনাকে বলে দিলেন!
ও আচ্ছা আচ্ছা! ঠিক আছে। তুমি তাকে বসাও। আমি আসছি। 
 ডেনিয়েল চলে গেল। সে ফটকুমামাকে ওয়েটিং রুমে বসতে দিয়ে বলল, আপনি প্লিজ বসুন। স্যার এখনই আসছেন। 
ফটকুমামা বসলেন। টি টেবিলের ওপর রাখা কিছু পত্রিকা। টাইম, নিউজউইক এবং দ্য ইকনোমিস্ট। তিনি ইকনোমিস্ট প্রত্রিকাটা হাতে নিয়ে একটা একটা করে পাতা ওল্টাছিলেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি রিপোর্ট। প্রিন্স উইলিয়ামের আংটি হারানোর ঘটনা নিয়ে রিপোর্ট। রিপোর্টটি তিনি পড়তে শুরু করলেন। রিপোর্টের শেষ দিকে লেখা হয়েছে, ফটকুমামা নামে এক বাংলাদেশী গোয়েন্দা আংটি খুঁজে বের করার কাজে নেমেছে। তারপর তার অতীত কাজের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ফটকুমামা দেখে অবাক। এতো কিছু এরা জানল কি করে? 
ফটকুমামা পত্রিকার ওপর থেকে চোখ ডেনিয়েলকে কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন; ঠিক তখনই তিনি দেখলেন তার সামনে প্রিন্স উইলিয়াম। তিনি এসেই বললেন, আপনি নিশ্চয়ই ফটকুমামা?
ফটকুমামা দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর খুব সমীহ করে বললেন, জ্বি। আমি ফটকুমামা। 
শুনেছি আপনি একজন বিখ্যাত গোয়েন্দা। আমার আংটি খুঁজে বের করতে এতো সময় কেন লাগছে?
আসলে এটা কেউ চুরি করেছে নাকি কোথাও পড়ে আছে তা ঠিক নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে আপনি চিন্তা করবেন না। খুব দ্রুতই বের করে ফেলবো।
আর কিন্তু সময় বেশি নেই। 
আপনার সহযোগিতা পেলে আমাদেরও খুব একটা সময় লাগবে না। 
ওকে। কি সহযোগিতা চান বলুন।
আপনি খুব ভালো করে মনে করুন তো, আংটিটা আপনি কোথায় রেখেছিলেন? সময় নিন। একটু চিন্তা করুন। গভীরভাবে চিন্তা করুন। তারপর বলুন। 
প্রিন্স উইলিয়াম সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ তিনি চোখ বন্ধ করে রইলেন। ফটকুমামা বিপুল আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।   
কিছুক্ষণ পর প্রিন্স উইলিয়াম চোখ খুললেন। তারপর তিনি বললেন, আমার রুমে আমার যে ব্যক্তিগত কেবিনেট আছে সেখানে রেখেছিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে। 
ফটকুমামা উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, ঠিক আছে। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি খুব শিগগিরই আপনাকে সুখবর দেব। 
প্রিন্স উইলিয়াম সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ফটকুমামা নেই। 

 
৭.

ন্যান্সির সঙ্গে তার বাসায় গেল জনি। ন্যান্সি তার মা’র সঙ্গে জনিকে পরিচয় করিয়ে দিল। ন্যান্সির মা তাকে আপ্যায়ন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আর ন্যান্সি ব্যস্ত হল আংটি দেখানোর জন্য। জনি ড্রয়িং রুমে বসে আছে। সে বসে বসে ভাবে, কী করে ন্যান্সির কাছ থেকে আংটিটা উদ্ধার করা যায়। এই আংটিকে ঘিরে ন্যান্সির যে আবেগ তৈরি হয়েছে তা কিছুতেই স্পর্শ করা যাবে না। তাকে কষ্ট দিয়ে আংটিটা নিয়ে নেয়াও আরেক ধরনের অপরাধ হবে। আবার বিষয়টা কাউকে বলাও যাবে না। কারণ ন্যান্সিকে আমি কথা দিয়েছি। কিন্তু এখন উপায় কি? 
হঠাৎ ন্যান্সি এসে জনির পাশে বসল। তারপর সে জনির কাছে জানতে চাইল, কি হল জনি? কোনো কিছু নিয়ে খুব বেশি ভাবছ নাকি? 
না না! তেমন কিছু না। 
সত্যি বলছ? আমার তো মনে হচ্ছে তুমি কিছু একটা ভাবছ। 
তোমার এমনটি মনে হওয়ার কারণ?
আমি যে তোমার পাশে এসে বসলাম, তুমি কি তা টের পেয়েছ?
হুম। 
না না! টের পাওনি। টের পেলে তুমি নির্লিপ্ত থাকতে না। 
বাব্বা! তুমি তো দেখছি অনেক কিছু বুঝতে পারো! 
হা হা হা! তুমি কি ভেবেছ? আমি খুব ছোট?
তা ভাবিনি। 
এ সময় ন্যান্সির মা নাশতা নিয়ে আসেন। দুজনকে নাশতা দিয়ে তিনি চলে যান। ন্যান্সি জনির সামনে নাশতার প্লেটটি এগিয়ে দিয়ে বলল, জনি, আগে নাশতা নাও। মা অনেক কষ্ট করে তোমার জন্য নাশতা তৈরি করেছেন। 
ওরে বাবা! এতো কিছু কেন?
এ এমন বেশি কি? তুমি আমাদের নতুন অতিথি না! নাও নাও!
থ্যাঙ্ক ইউ ন্যান্সি। তোমার আংটিটা দেখাবে না?
আগে নাশতাটা শেষ কর না!
ওকে ওকে! তোমাদের বাড়িতে আর কে কে আছেন?
মা আর আমি ছাড়া কেউ নেই। 
ওহ তাই! তোমার মা কিছু করেন?
হুম, উনি একটা প্রাইভেট কম্পানিতে আছেন। এবার দেখ আংটিটা। 
আংটিটা হাতে নিয়ে জনি বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, ও মাই গড! এতো সুন্দর আংটি!
ন্যান্সিও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। কিছুক্ষণ পর জনি বলল, এই আংটির জন্য একটা মেয়ের বিয়ে আটকে আছে। অতি সাধারণ একটা মেয়ের রাজরাণী সুযোগ হাতছাড়া হতে চলেছে। মেয়েটির সব স্বপ্ন ভেঙেচুড়ে খান খান হয়ে যাচ্ছে। তুমি কি চাও একটা মেয়ের জীবন তছনছ করে দিতে! চাও তুমি?
না না! কিছুতেই না! আমি চাই না। তুমি কেটের কথা বলছ তো? কেট অনেক ভালো মেয়ে। অতি সাধারণ হয়েও অতি অসাধারণ! তাকে আমি কষ্ট দিতে চাই না। সত্যিই চাই না!
তাহলে তুমি এই আংটিটা আমাকে দিয়ে দাও। এর বিনিময়ে আমি তোমাকে আরেকটা চমৎকার আংটি দেবো। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। 
সত্যি! সত্যি দেবে!
এই তোমার হাত ধরে বললাম, সত্যি দেবো। 
আচ্ছা, এটা যদি প্রিন্স জানতে পারেন আমি তার আংটি চুরি করেছিলাম! তাহলে তো আমাকে মেরে ফেলবে! 
না না! তুমি নিশ্চিত থাক। কিছুতেই প্রিন্স কিংবা রাজপরিবারের কেউ জানতে পারবে না। 
দেখ, আমার চাকরিটা যেন থাকে। আমার যেন কোনো বিপদ না হয়!
বললাম তো! তোমার কথা কেউ জানবে না। কেউ না। 
ঠিক আছে। তাহলে তুমি আংটি নিয়ে চলে যাও। আমি আজ আর যাবো না। কাল যাবো। কাল তোমার সঙ্গে দেখা হবে। 
জনি ইতিবাচক মাথা নাড়ল। সে আংটি নিয়ে রাজদরবারে চলে গেলো। 

আজ রোববার। ছুটির দিন। আজকের সকালটা অন্য দিনের মতো নয়। সকাল থেকেই রাজদরবারে হৈচৈ আর আনন্দ উল্লাসে মেচে উঠেছে সবাই। অনেক দিন পর আনন্দের সাগরে যেন ভাসছে রাজদরবার। এতো আনন্দের কারণ ফটকুমামার আংটি খুঁজে পাওয়ার ঘোষণা। তিনি বলেছেন, প্রিন্স উইলিয়ামের হারানো আংটি পাওয়া গেছে। পরে তিনি সেই আংটি রাণীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দিলেন। রাণী আংটি হাতে নিয়ে বললেন, তোমরা সবাই আমার প্রিন্স, তোমাদের সবার প্রিন্স উইলিয়ামের বিয়ের সানাই বাজাও!
তারপর রাজদরবারে বেজে উঠল বিয়ের সানাই!


 

মোস্তফা কামাল : কথাসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। বাংলাদেশ। 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।