বিকাল ০৫:১৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

শিক্ষায় ‘কর’ নয় বরং ‘ভর্তুকি’ চাই

প্রকাশিত:

নাজমুল আহসান॥

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ ভাবেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের সন্তানরাই পড়ালেখা করে, যাদের অর্থবিত্ত চুইয়ে পড়ে। ধারণাটি ভুল। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের রেজিস্ট্রার কর্নেল (অবঃ) ফয়জুল আলমের মতে, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীর পরিবার সচ্ছল! এর কারণ মূলত দু’টি। যে পরিমাণ শিক্ষার্থী প্রতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় শেষ করে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত আসন আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীই বিভিন্ন কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। আবার আমি একজনকে চিনি, যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘প্রথম শ্রেণি’র বিষয় পেয়েও ভর্তি হয়নি। কারণ, ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার ইচ্ছা তার নেই।

আসন কম থাকলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কিন্তু একেবারেই কম নয়। কিন্তু একজন ভুক্তভোগী হিসেবে দেখেছি, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভাগ্য যাচাই’ করার সুযোগ শিক্ষার্থীদের হয় না। দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গিয়ে ভর্তিযুদ্ধে (পড়েন মল্লযুদ্ধে) অংশ নেওয়ার মানসিক শক্তি অনেকের থাকে না। অনেকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেও, শারীরিক অবস্থার কারণে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পরীক্ষার সাংঘর্ষিক সময়সূচি ও সংখ্যাধিক্যের কারণে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া অসম্ভব।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এজন্যই সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই সময়ে ভর্তি পরীক্ষা চালুর আহ্বান জানিয়েছিলেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন একবারের বেশি দু’বার ভর্তিপরীক্ষায় অংশ নেওয়া যায় না। কোনও কারণে, যদি কেউ প্রথমবার অংশ নিতে না পারে, বা প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকে, তার আর কোনও সুযোগ নেই! তাই এটি বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, আমাদের চলমান ভর্তিপরীক্ষার পদ্ধতিতে মেধার শতভাগ মূল্যায়ন না-ও হতে পারে। যেসব শিক্ষার্থী এ মল্লযুদ্ধে টিকতে না পারে, অথবা স্রেফ ভাগ্যের কাছে হেরে যায়, তাদের জন্য আমাদের রাষ্ট্র কোনও পথ খোলা রেখেছে? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়? থাক্‌, আর না-ই বললাম।

প্রচুর শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে, কিংবা বেছে নিচ্ছে। যারা বাধ্য হয়, তাদের সবার পরিবারের অর্থ যে অঢেল তা নয়। দু’-চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদ দিলে বাকি সবগুলোতেই শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশ পরিবারই মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত। অনেকে জমি অথবা মূল্যবান কিছু বিক্রি করে হলেও ছেলেমেয়েকে পড়াতে পাঠান।

এবছরের বাজেটে সামগ্রিক ব্যয় বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। খুব স্বাভাবিকভাবেই নতুন অনেক খাতে কর বসানো হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ৭.৫% (প্রাথমিকভাবে ১০%) মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। আমার একটি সম্পূরক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার আছে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে। কর্পোরেট কর কমিয়ে ধনীদের আরও ধনী হবার সুযোগ দিয়ে, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের ওপর এমন বোঝা না চাপালে তিনি কি পারতেন না? ভ্যাট সাধারণত বসানো হয় ‘মূল্য’ আছে এমন কোনও পণ্যের ওপর। মাননীয় অর্থমন্ত্রী কি শিক্ষাকে এমন কোনও পণ্য হিসেবেই ভাবছেন?  

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়েও কিছু না বললেই নয়। প্রতি সেমিস্টারে যখন নতুন শিক্ষক ক্লাস নিতে আসেন, তখন তিনি প্রতি ক্লাস বাবদ আমাদের কত টাকা খরচ হচ্ছে, সেটি মনে করিয়ে দেন। এরপর প্রতিটি ক্লাসে উপস্থিত থাকার প্রয়োজনীয়তা ব্যখ্যা করেন। সব কিছুই ভালো। অনেকে হয়তো মন থেকেই বলেন।

সারা পৃথিবীতে এখনও শিক্ষার পেছনে বাজেটের বিশাল অংশ ব্যয় করা হয়। আমাদের সরকারগুলো শিক্ষায় বরাদ্দ দিতেই সবচেয়ে বেশি সঙ্কোচবোধ করে। তাদের আগ্রহ ‘উন্নয়ন প্রকল্পে’। কেননা, এখানে একাধারে দুর্নীতি করা সহজ, নেতাকর্মীদের তুষ্ট রাখা সহজ, ‘দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে’ প্রচারণা চালানোও সম্ভব। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ বিশ্বের সেরা ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে স্থান পায় না। এর অন্যতম কারণ, গবেষণা কম হওয়া। অথচ, গবেষণার পেছনে সারাবিশ্বে যত ব্যয় করা হয়, অবকাঠামো খাতে তত করা হয় কিনা সন্দেহ রয়েছে। সারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের তুলনা করতে চাই না।

আমাদের সংবিধান অনুসারে, শিক্ষা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা কোনও পণ্য নয়। শিক্ষার ওপর সরকার কোনও করা আরোপ করতে পারে না। কোনও নৈতিক আইনেই এমন অযৌক্তিক করা আরোপ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই হলুদে ছবিতে ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ লেখা প্রোফাইল পিকচারে ছেয়ে গেছে ফেসবুক। কার্টুনে কার্টুনে ভরে গেছে টাইমলাইন। কেউ একজন আখ্যায়িত হয়েছেন ‘ভ্যাটম্যান’ নামে।

আমাদের আজ একটি দাবি নয়, দু’টি। শিক্ষার ওপর যেকোনও ধরণের কর প্রত্যাহার করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গলাকাটা টিউশন ফি বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি ভর্তুকি দিয়ে কিংবা বিভিন্ন ধরণের বিশেষ করের আওতা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাইরে রেখে এটি করা সম্ভব। তার আগে অবশ্যই ন্যুনতম মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করতে হবে। ইউজিসি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান স্যার সম্প্রতি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার এখতিয়ার ইউজিসির নেই, আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে, উচ্চ আদালতে আটকে যায়। এতসব জটিলতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা কেন হবে? যে করে হোক, এ সমস্যার সমাধান জরুরি। যেসব শিক্ষার্থী প্রতারণার শিকার হয়েছে, তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে, এ সঙ্কটের সমাধান হওয়া জরুরি। তাই ‘মূল্য সংযোজন কর’ নয়, শিক্ষায় বরং ভর্তুকি চাই।

লেখক: একজন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।