রাত ১০:২৫ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

যা আমি পার হয়ে এসেছি, আর দ্বিতীয়বার পার হতে হবে না : আল মাহমুদ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[কবি আল মাহমুদ ৮০-তে পা রাখলেন। তাঁর এই বিপুল জীবনে তিনি ঈর্ষা, খ্যাতি ও সমালোচনা—সব কিছুরই শীর্ষ ছুঁয়েছেন। আধুনিক বাংলা কবিতায় সোনালী কাবিন তাঁর নিজের নামেরই প্রতিশব্দ; এমনকিপানকৌড়ির রক্ত গল্পগ্রন্থও। শিশুসাহিত্য এবং উপন্যাসেও তাঁর রয়েছে অতুলনীয় উচ্চতা। তিনি জন্মেছেন ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে। তার সঙ্গে কথা বলেছেন সজল আহমেদ।]  

 

সজল আহমেদ : সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি; জীবনানন্দ দাশের সাথে কি আপনি একমত?
আল মাহমুদ : আমি সম্পূর্ণভাবে একমত নই। আমার মনে হয় যে, মানুষ মাত্রই কবি। কল্পনা ছাড়া এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। আমরা খানিকটা স্বপ্নে বাঁচি, খানিকটা বাস্তবে; ঘাত-সংঘাতের মধ্যে কল্পনায় বাঁচি।

সজল আহমেদ : বাঙালিদের ভিতর ভালো কবি আছেন, কিন্তু কবিতার সৎপাঠক কম। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
আল মাহমুদ : কবিতার পাঠক সব সময়ই স্বল্প ছিল। কবিতা তবুও সর্বযুগেই বেঁচে থাকে। কবিতা না হলে মানুষের চলে না।

সজল আহমেদ : একজন কবি এবং দার্শনিকের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?
আল মাহমুদ : পার্থক্যই বেশি। কবিতায় দর্শন উঁকি দিলে সেই কাবিতার স্বাদ গ্রহণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে।

সজল আহমেদ : কবির স্বাধীনতা বলতে কি বোঝেন বা মনে করেন?
আল মাহমুদ : আমি কবির স্বাধীনতা বলতে দেখার স্বাধীনতা এবং লেখার স্বাধীনতা বুঝি।

সজল আহমেদ : বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা  পত্রিকায় আপনার কবিতা প্রকাশের পর আপনার অনুভূতিটা কেমন ছিল, সেই সময়?
আল মাহমুদ : অসাধারণ একটা অনুভূতি হয়েছিল। মনে হয়েছিল আমিও কবি। এরপর থেকে মাথা উঁচু করে হাঁটতাম।

সজল আহমেদ : এপার বাংলার কবিতার ভাষা এবং ওপার বাংলার কবিতার ভাষার মধ্যে পার্থক্য কতটুকু এবং কোনো?
আল মাহমুদ : পার্থক্য খানিকটা আছে।

সজল আহমেদ : রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিৎ ছিল, এমন কাউকে কি আপনি মনে করেন?
আল মাহমুদ : নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতন মহৎ কয়েকজন লেখক বাংলা ভাষায় সব সময়ই ছিলেন। এসব নিয়ে অভিযোগ করে লাভ নেই। যিনি নোবেল পুরস্কার পান, তিনি ভাগ্যবান। কেউ, কেনো পেলেন না, এ অর্থহীন।

সজল আহমেদ : আপনার প্রিয় কবি কে?
আল মাহমুদ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সজল আহমেদ : কবিতায় নারীর প্রসঙ্গ কমবেশি সবার কবিতায় এত বেশি কেনো? 
আল মাহমুদ : কারণ নারীকে তারা ভালোবাসে।

সজল আহমেদ : আপনি যদি কবি না হতেন, তাহলে কী হতেন?
আল মাহমুদ : আমি কবিই হতাম। আর কোনো কিছু হবার যোগ্যতা আমার নেই।

সজল আহমেদ : রবীন্দ্রনাথ যে বাংলাকে দেখেছেন আপনিও কি সেই বাংলাকে দেখেছেন কল্পনায় অথবা কবিতার খাতায়?
আল মাহমুদ : দেখেছি কিনা সেটা বলতে পারব না। কিন্তু তিনি যে বাংলায় পদচারণা করে গেছেন, আমি তো সেখানেই জন্মগ্রহণ করেছি।

সজল আহমেদ : আপনি একজন মার্কসবাদী ছিলেন। এখন এটাকে কিভাবে অনুভব করেন?
আল মাহমুদ : আমার চিন্তার ঈষৎ পরিবর্তন হয়েছে। তাহলেও মার্কসের অনেক তত্ত্ব ও তথ্য এখনো আমি নানা সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করি।

সজল আহমেদ : আপনার গদ্য সাহিত্যে যেমন-‘পানকৌড়ির রক্ত’ অথবা ‘নিশিবিড়ালীর আর্তস্বর’ ইত্যাদি প্রসঙ্গে তো অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে আপনার মতবাদ কি?
আল মাহমুদ : আমি অশ্লীল লেখক নই। প্রয়োজন ছাড়া সাহিত্যে কোনো কিছুই আমি নিজে লিখতে চাইনি।

সজল আহমেদ : কবির খাতায় কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি না?
আল মাহমুদ : আমার পক্ষে নেই।

সজল আহমেদ : শিল্প-বিশ্বাসের সাথে ধর্ম-বিশ্বাসের পার্থক্য কোথায়?
আল মাহমুদ : এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়া আমার জন্য সঠিক হবে না। কারণ আমি নিজে একজন বিশ্বাসী মানুষ।

সজল আহমেদ : আপনার কবিতায় আঞ্চলিক শব্দের সুনিপুণ ব্যবহার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। আপনি কি মনে করেন এটা একান্তভাবে আপনার মৌলিকতা এনেছে?
আল মাহমুদ : সে অবশ্য আমি মনে করি না। তবে অনেক আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করে আমি বাংলা ভাষায় প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছি। 

সজল আহমেদ : কবি আল মাহমুদ এবং কথাশিল্পী আল মাহমুদ-এই দুই জনের মধ্যে কে বেশি শক্তিশালী?
আল মাহমুদ : আমার তো মনে হয় কবি আল মাহমুদকে কথাশিল্পী আল মাহমুদ বেশ জব্দ করেছে।

সজল আহমেদ : বেশির ভাগ পাঠক মনে করেন য়ে, ‘সোনালী কাবিন’ বইটিই আপনার শ্রেষ্ঠ রচনা-এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত কী?
আল মাহমুদ : আমার অবশ্য দ্বিমত নেই। তবে ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ আমি মনে করি তিরিশের কবিদের প্রভাব ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে।

সজল আহমেদ : অনেক সমালোচকরা মনে করেন, আপনি আপনার প্রথম দিকের চেতনাকে বদলাতে শুরু করেছেন। আপনার মতো আপনার কবিতাগুলো মৌলবাদী হয়ে গেছে।
আল মাহমুদ : যারা আমার দুর্নাম রটাতে চায়, তাদের ছলের কোনো অভাব হয় না। তবে এসব দুর্নাম থাকে না। থাকে শুধু কবিতা এবং কথাশিল্পীর দুর্মর রোমান্টিকতা। 

সজল আহমেদ : একটি পত্রিকায় আপনি বলেছিলেন, “আমি হলাম সেই মানুষ, যে যা দেখে তা বিশ্বাস করে, আবার যা দেখি না তাকেও বিশ্বাস করি।’’ না দেখে কেনো বিশ্বাস করেন?
আল মাহমুদ : পৃথিবীতে অনেক অদৃশ্য ব্যাপার আছে যা মানবিক চর্ম চোখে দেখা যায় না। তবে অনুভব করা যায়। যারা এই অনুভব করে তারা তো আমার মতো সকলেই কবি। না দেখেও বিশ্বাস করতে হয়। এর মধ্যে সুখ আছে।

সজল আহমেদ : আপনার কবিতা লেখা শুরু কিভাবে?
আল মাহমুদ : অল্প বয়সে। সপ্তম শ্রেণীতে যখন পড়ি তখন নজরুল ও জীবনানন্দের বই হাতে আসে। মনে হয়েছিল আমিও এমন লিখতে পারব। এভাবেই শুরু।

সজল আহমেদ : আপনার আত্মজীবনীমূলক গদ্য ‘যে ভাবে বেড়ে উঠি’ কি-‘আবহমান জীবনের প্রক্রিয়ায়’-কোনো অংশ গ্রহণ? যদি একটু ব্যাখ্যা করেন।
আল মাহমুদ : ‘হ্যাঁ’। তবে এর অন্য বিশ্লেষণও আছে। আমি জীবনকে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিশ্লেষণও করতে পারি। ‘যে ভাবে বেড়ে উঠি’ জীবনের কোনো ব্যাখ্যা নয়, শুধু অতিক্রমের একটা সময় মাত্র। যা আমি পার হয়ে এসেছি, আর দ্বিতীয় বার পার হতে হবে না।

সজল আহমেদ : আপনার একটা পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা আছে কিনা?
আল মাহমুদ : একটা পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা আছে। যদি ভালো পৃষ্ঠপোষকতা পাই তাহলে শুরু করব।

সজল আহমেদ : কবি না কবিতার মৃত্যু ঘটে?
আল মাহমুদ : আমি মনে করি, কবি এবং কবিতার কারও মৃত্যু ঘটে না। কিন্তু একটা সময়ে এসে ঠেকে যায়। কিন্তু ইতিহাস কবির মৃত্যু স্বীকার করে না। 

সজল আহমেদ : তরুণ কবিদের প্রসঙ্গে কিছু বলুন-
আল মাহমুদ : অনেক তরুণই ভালো লিখছেন। সবাই যখন ভালো লেখেন তখন বুঝতে হবে, সাহিত্যে পুনরাবৃত্তি প্রবেশ করেছে, আমি এর বেশি কিছু বলতে চাই না।

সজল আহমেদ : আপনার কবিতার উপর কারও প্রভাব পড়েছে কিনা-
আল মাহমুদ : আমি তো সারা বিশ্বেরই কবিতা পড়তাম। স্পেনীয় কবিতা আমার উপর খুবই প্রভাব বিস্তার করেছিল কিছুকালের জন্য। স্থায়ী প্রভাব বলে কিছু নেই। আমি রবীন্দ্রনাথ অবসরে, ক্লান্তিতে, অবসন্নতায় পড়তে থাকি, হৃদয় তৃপ্তিতে ভরে যায়। এর বেশি আর কি বলব?

সজল আহমেদ : কবিরা কি ভালো গদ্য লিখতে পারে?
আল মাহমুদ : দ্যাখো কবিরাও ভালো গদ্য লেখে। আমি সব সময়, গদ্যের চর্চা করে এসেছি।

সজল আহমেদ : ঈশ্বর ও আস্তিক্য বিষয়ে আপনার ধারণা কি?
আল মাহমুদ : আমার ধারণা আত্মসর্মপনের সাথে সর্ম্পকিত। আমি বিশ্বাসী মানুষ।

সজল আহমেদ : কবি কি কোনো ভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ হতে পারেন?
আল মাহমুদ : না, পারেন না।

সজল আহমেদ : শামসুর রাহমান ও আপনাকে নিয়ে প্রায়শই একটি তুল্যমূল্য আলোচনা হয়ে থাকে। বিষয়টি আপনি কী ভাবে দেখেন?
আল মাহমুদ : আমি মনে করি, শামসুর রাহমানের সাথে আমার কোনো তুল্যমূল্য আলোচনা চলতে পারে না। কারণ, আমরা দুই জন দুই মেরু থেকে বেরিয়ে কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলাম; কিন্তু তিনি আর এগুতে পারেননি, পথের মধ্যে ক্ষান্ত হতে হয়েছে। আর; আমি তো থামিনি।

সজল আহমেদ : শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বের অভিজ্ঞতা-
আল মাহমুদ : ভালো নয়। শক্তি একটু ঈর্ষাকাতর মানুষ ছিলেন। এখন যা বলবেন তা পরক্ষণে অস্বীকার করে দেন। এ কেমন লোক? বরং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে অনেক অন্তরঙ্গ।

সজল আহমেদ : দাউদ হায়দারের সাথে জেলে থাকাকালীন আপনার অভিজ্ঞতা। ‘কালো বিড়ালিনী’-প্রসঙ্গ।
আল মাহমুদ : দাউদ হায়দার জেলে থাকতে বিড়ালকে ভয় পেতেন। এই লোক আবার এমন সব কাজ করেছেন যা আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না।

সজল আহমেদ : জীবনানন্দের প্রকৃতিবোধের সাথে আপনার মিল বা অমিল-
আল মাহমুদ : কোনো মিল নেই। জীবনানন্দ ‘না’ বাচক কবি ছিলেন। আমি ‘হ্যাঁ’ বাচক।

সজল আহমেদ : নজরুল সম্পর্কে বলুন।
আল মাহমুদ : এ বিষয়ে বলতে গেলে বাংলা কবিতার সমস্ত নমনীয়তাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাকে বিদ্রোহী কবি বলা হতো। কিন্তু আমার ধারণা, তিনি ছিলেন প্রেমের কবি। বাংলা কবিতায় সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি তাঁকে।

সজল আহমেদ : পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বাংলাদেশের বাংলা কবিতা একটু বেশি মাত্রায় আবেগ প্রবণ। অথচ আপনার কবিতা অসম্ভব ঘননিবদ্ধ, রহস্যটা কী?
আল মাহমুদ : বাংলাদেশের কবিতায় সাধারণত আবেগের ঘন কম্পন একটু বেশি আছে। তবে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসবে। কারণ এখানে তারুণ্য কোনো বাঁধার সম্মুখীন হয় না। খুশি মতো লেখা হচ্ছে। ভালো মন্দের বিচার করার সময় এখনো আসেনি।

সজল আহমেদ : আপনার শৈশব সম্পর্কে কিছু বলুন?
আল মাহমুদ : আমার শৈশব নানা জায়গায় নানাভাবে কেটেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে বলতে গেলে আমার একটি মধুর সময় কেটেছে কুমিল্লার একটি গ্রাম জগৎপুরে। জগৎপুর আসলে একটি গ্রাম। একটি আদর্শ গ্রাম বলতে যা বুঝায়, সবই ছিলো ঐ গ্রামে। নাপিত, ধোপা, মেথর, জেলে ইত্যাদি প্রায় সব শ্রেণীর মানুষ। এখানে প্রকৃতির রূপও আদর্শ বাংলার। আমার লোকজ কবিতার অনেক উপাদান এই গ্রাম হতেই নেওয়া। আমি আমার চাচার সাথে থাকতাম। তিনি সরকারি চাকরি করতেন বলে বিভিন্ন জায়গায় বদলি হওয়াতে বিভিন্ন জায়গায় আমার অবস্থান ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমার শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে। বছর খানিক ছিলাম শীতাকুণ্ডে। ওখানকার প্রকৃতি বৈচিত্রে ভরপুর। ভালোলাগত ঘুরে বেড়াতে। আমরা যেখানে থাকতাম তার পাশেই হিন্দুদের মেলা হতো। তাও ছিল খুবই আনন্দদায়ক। এটি হতো ট্রেন লাইনের পাশে। সেখানে ‘চন্দ্রনাথ’ নামক পাহাড়ের চূড়ায় একটি শিবলিঙ্গ ছিল। বহু মানুষ ছুটে আসতো তা দেখার জন্য। এটা ছিলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি তীর্থস্থান। 

কবি আল মাহমুদের সঙ্গে সজল আহমেদ

সজল আহমেদ : তার মানে বলতে পারি আপনার শৈশব ছিলো আনন্দময় এবং বৈচিত্রময়?
আল মাহমুদ : হ্যাঁ। সুমধুর ছিলো সেই সময়গুলো।

সজল আহমেদ : আপনার কবিতা লেখা শুরু কবে থেকে? এবং প্রথম প্রকাশিত কবিতা সম্পর্কে আপনার কোনো সমধুর স্মৃতি থাকলে বলবেন।
আল মাহমুদ : আমি খুব ছোটবেলা থেকে কবিতা লেখা শুরু করি। আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তখনকার সময়ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন দৈনিক আমাদের মফস্বল অঞ্চলে আসতো। যতটুকু মনে আছে, সত্যযুগ বলে একটি সুন্দর ঝকঝকে মুদ্রিত দৈনিক আমাদের এখানকার দোকানেও রাখা হত। এর ছোটদের পাতায় আমার প্রথম প্রকাশিত কবিতা ছাপা হয়। যখন পত্রিকাটি এলো তখন পাড়ার সকল লোককে দেখিয়েছিলাম। সে কী আনন্দ। তেমন আনন্দ আর কখনও পেয়েছি বলে আমার মনে হয় না।

সজল আহমেদ : তখন কি কবিতা পড়তেন? মানে বই পড়ার প্রতি আগ্রহ কেমন ছিলো।
আল মাহমুদ : হ্যাঁ পড়তাম। জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তাম। মহাপৃথিবী নামক কাব্যগ্রন্থটি পড়ে শেষ করেছিলাম। তার পরেই তো কবিতা লেখার ইচ্ছা জাগে। এ ভাবেই শুরু আর কি।

সজল আহমেদ : আপনি যখন বিয়ে করেন তখন আপনার বয়স অল্প ছিলো এবং আপনার স্ত্রীরও-
আল মাহমুদ : হ্যাঁ, আমার একুশ বছর এবং আমার স্ত্রীর ছিলো চৌদ্দ বছর। তবে ওর শারিরীক গঠন ছিলো একটু এডাল্ট এডাল্ট।

সজল আহমেদ : সাহিত্য সাধনায় আপনার স্ত্রীর ভূমিকা কতটুকু?
আল মাহমুদ : ওর ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত-গুরুত্বপূর্ণ। আমাকে ও সব সময় গুছিয়ে রাখত। যেমন বলা যায় আমি হাতের নখ কাটতে পারতাম না, আগে আমার বোনেরা কেটে দিতো। বিয়ের পর এসব আমার স্ত্রীই করতো। আমি সারাদিন কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতাম এবং বাড়ি ফিরে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। দেখা যেতো ও আমার পাশে বসে থাকতো। কতদিন দেখেছি ও আমার পাসে বশে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। সব মিলে আমার প্রেরণার মূল উৎস ছিলো আমার স্ত্রী।

সজল আহমেদ : শামসুর রাহমান আপনার সমসাময়িক সময়ের একজন প্রধান কবি। বর্তমান সময়ের প্রধান দুই কবিও হলেন শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ। অনেকেই একসাথে উচ্চারণ করে এই দুটো নাম- এ প্রসঙ্গে কিছু বলুন
আল মাহমুদ : শামসুর রাহমান অসাধারণ অক্ষরবৃত্ত মাত্রার ছন্দের সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। তিনি এটি খুব সহজেই রপ্ত করেছেন। তিনি বাংলা সহিত্যের একজন প্রধান কবি। তার লেখা আমি খুব গুরুত্ব সহকারে পড়তাম। নানা রকম নতুন কৌশল ব্যবহার করতেন তার কবিতায়। তিনি লিখেছেনও অনেক বেশি। তবে তিনি তার লেখার মধ্যেই বেঁচে আছেন অন্য কোথাও নেই।

সজল আহমেদ : পদ্য ও গদ্য দু’টোতে এমন সাফল্যতা অর্জন করলেন কিভাবে?
আল মাহমুদ : আমি মনে করি, একজন প্রকৃত কবি ভালো গদ্যকার। বাহিরের বিশেষ করে ইউরোপীয় সহিত্য অঙ্গনে দেখা যায় যে প্রকৃত সকল কবিরা ভালো গদ্য লিখছেন।

সজল আহমেদ : আপনার উপন্যাসের পাঠকও অনেক বেশি এর কারণটা কী?
আল মাহমুদ : আমি আসলে খুব সহজেই চরিত্র তৈরি করতে পারি। কিন্তু পরিণতি কি হবে তা নিয়ে এতো ভাবি না। আমার উপন্যাসের নায়ক ও নায়িকার মিলন ও বিরহ পর্ব খুব জটিল না। তাই হয়তো পাঠক বেশি পছন্দ করে, এই আর কি।

সজল আহমেদ : জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে আপনার অতৃপ্তি কী? কী পেয়েছেন এবং কী পাননি?
আল মাহমুদ : আমি মনে করি সকল কবি ও লেখকের অতৃপ্তি থাকে, আমারও আছে। তবে খুব পেয়েছি যা হয়তো আশা করিনি। সারা জীবন নিঃসঙ্গের মত সাহিত্যের পাশাপাশিই হেঁটেছি। কবিতার সীমনা ছেড়ে কখনো কোথাও যাইনি। এর মধ্যে কোনো পাওয়া না-পাওয়ার দ্বন্দ্ব নেই আমার ভিতর। তবে এটুকু বলতে পারি পেয়েছি অনেক অনেক...।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।