সকাল ১১:৪৩ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

দুই আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজম : One Hundred Years of Solitude, The House of the Spirits ও Beloved-এ রাজনীতির ভূত

প্রকাশিত:

[বেশ আগে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উপর BOOM একটি সংখ্যা করে। সেখানে মার্কেসকে নিয়ে লেখেন বিশ্বখ্যাত লেখক-সমালোচকরা। এই লেখাটি সেখানে প্রকাশিত হয়। এই লেখায় ম্যাজিক রিয়ালিজমকে ব্যখ্যা করা হয়েছে মার্কেসের One Hundred Years of Solitude, ইসাবেল আয়েন্দের The House of the Spirits এবং টনি মরিসনের Beloved এই বই তিনটিকে সামনে রেখে। মূল লেখক স্টিফেন এম. হার্ট। বাংলায় অনুবাদ করেছেন মাহমুদ মিটুল।] 

 

ম্যাজিক রিয়ালিজম সম্পর্কে জুলিয়ান বার্নসের রসাত্মক বক্তব্য আসলে প্যারোডিকরণের এক সূত্র মাত্র— যেখানে বোঝা যাচ্ছে যে বিংশ শতাব্দীর তিরিশ বা চল্লিশের দশকে লাতিন আমেরিকায় ম্যাজিক রিয়ালিজম আবির্ভাবের পর আমরা (বর্তমানে) কতো দূরে চলে এসেছি। এবং বর্তমান সময়ে ম্যাজিক রিয়ালিজম সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্রধারা হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও এখনো এর সংজ্ঞায়নে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে, বিশেষ করে যেভাবে (ধারণাতীতভাবে) তা জাতি, ভাষা ও রীতির গণ্ডি পেরিয়ে গেছে। স্প্যানিশ-আমেরিকান সীমা পেরিয়ে এর প্রয়োগ ঘটেছে পশ্চিম আফ্রিকায় (Cooper 1998), জার্মানভাষাভাষী দেশগুলোতে, ইলিয়ান, ফ্লেমিস, স্প্যানিশ, ফরাসী, পোলিশ ও হাঙ্গেরিয় সাহিত্যে (Weisgerber 1987a)। এ ছাড়াও এর প্রয়োগ দেখা যায় ভিজ্যুয়াল আর্ট, চিত্রকলা এবং সিনেমায় (Jameson 1986, Delvaux 1987, Gerard 1987, Hadermann 1987)। প্রকৃতপক্ষে ভিজ্যুয়াল আর্টেই এর বেশ শক্তিশালী প্রয়োগ দেখা যায়; যার মূল খুঁজে পাওয়া যায় জার্মানির আর্ট মুভমেন্টে, বিংশশতকের বিশের দশকে যা Neue Sachlichkeit নামে পরিচিত ছিলো (Weisgerber 1987b)।

ম্যাজিক রিয়ালিজমের বিষয়ে অনেক বই-পুস্তক আছে। এখানে আমি সেগুলোর কোনোটির রিভিউ না করে বরং একটি কার্যকরী সংজ্ঞা প্রদান করবো এবং নিন্মোক্ত অনুমানগুলো নীরিক্ষা করবো : কথাসাহিত্যে ম্যাজিক রিয়ালিজমের ভূত হলো সাবঅল্টার্ন শক্তির ভাবগত বিক্ষিপ্ত সত্ত্বাকে অন্তর্হিত করে রাখার অভিক্ষেপ (প্রকল্প) যাতে তারা রাজনীতি, লিঙ্গ বা জাতীয়তায় ভুল পথে চালিত হয়। আমি এই অনুমানকে তিনটি উপন্যাসে প্রয়োগ করে ব্যাখ্যা করবো— গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের One Hundred Years of Solitude (১৯৭৮/১৯৬৭) ইসাবেল আয়েন্দের The House of the Spirits (১৯৮৮/১৯৮২) এবং টনি মরিসনের Beloved (১৯৮৭/১৯৮৭)।

One Hundred Years of Solitude এখন বিশ্বসাহিত্যে ক্লাসিক উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করেছে, New Yorker এর ভাষায়— লাতিন আমেরিকার Don Quixote। উপন্যাসটিতে বুয়েন্দিয়া পরিবারের পাঁচ পুরুষকে(প্রজন্ম) ধারাবাহিকভাবে দেখানো হয়েছে যারা একশ বছর যাবত পৌরাণিক নগর মাকোন্দোতে বসবাস করছে। উপন্যাসটি শুরু হয় আদিপুরুষ হোসে আরকাদিও বুয়েন্দিয়াকে দিয়ে এবং শেষ হয় শুয়ারের লেজ(যা অজাচারের ফসল, বুয়েন্দিয়া পরিবারের নিয়তীর চূড়ান্ত পরিণতি) নিয়ে জন্মানো শিশু অরেলিয়ানোকে দিয়ে। এই উপন্যাসে একটি গুরত্বপূর্ণ দিক হলো যা উন্নতবিশ্বে অলৌকিক (যেমন- ভৌতিক অবয়ব, মানুষের উড়তে পারা বা শূন্যে ভেসে থাকা, ইচ্ছের দ্বারা মুহূর্তেই অদৃশ্য হওয়া বা ওজনবৃদ্ধি ইত্যাদি) তাকে তৃতীয়বিশ্বের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক হিশেবে দেখানো এবং যা উন্নত বিশ্বে স্বাভাবিক তাকে ক্যারিবিয় বাস্তবতায় অলৌকিক হিশেবে দেখানো হয়েছে।

গার্সিয়া মার্কেজ বলেছেন যে কথাসাহিত্যের এই রীতি তিনি তাঁর দাদীর কাছ থেকে শিখেছেন : ‘One Hundred Years of Solitude-এ গল্পগুলো আমি ওই রীতিতে উপস্থাপন করেছি যেভাবে আমার দাদী গল্প বলতেন। তিনি যা বলতেন তা শুনে অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক মনে হলেও তিনি একেবারে স্বাভাবিকভাবে বলে যেতেন।’ এই রীতির অন্যতম উদারহণ ঘটে যখন উপন্যাসে দেখা যায় যে সুন্দরী রেমেদিওস চাদর শুকানোর জন্য ঝুলাতে গেলে চাদর হাতে সে উড়ে যায়। বিভিন্ন বাস্তব বর্ণনা ও পরিবেশের চিত্র অঙ্কনের মাধ্যমে ঘটনার যাদুময়তা ঢেকে রাখা হয়। মার্কেজ রেমেদিওসের স্বর্গগমনের ভূমিকা হিশেবে বাতাসে দোলায়মান চাদরের বর্ণনা দিয়েছেন। চাদরের এই বর্ণনা রেমেদিওসের কাল্পনিক স্বর্গগমনকে আমাদের সামনে বাস্তবতার আদলেই এনে হাজির করেছে। এছাড়াও, মার্কেজ আরো অনেক কিছুর সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন, যেমন— আমারান্তার জরির পেটিকোট, ভূমিস্থ বোনদের প্রতি রেমেদিওসের বিদায় সম্ভাষণ, বাগানের পোকামাকড় ও ফুল এবং ঘটনার সময়কাল (চারটা)— যা পুরো ঘটনাকে বাস্তবতায় জড়িয়ে রেখেছে। শেষপর্যন্ত আমরা সেই চরম দৃশ্যে উপনিত হই— রেমেদিওসের বোনের প্রতিক্রিয়া— ‘ফার্নান্দা ঈর্ষায় জ্বলতে জ্বলতে অবশেষে অলৌককত্ব লাভ করলো এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলো যেনো তাকে পুনরায় চাদরের কাছে ফেরত পাঠানো হয়’(Garcia Marquez 1978 :195)। তার এই ঈর্ষা এবং চাদরের কাছে ফেরত আসার প্রত্যাশা, উভয় বর্ণনাই উক্ত অলৌকিক ঘটনাকে বাস্তবতার বৈধতা প্রদান করেছে।

মার্কেজ অবশ্য তাঁর দাদীকেই গল্প শেখার একমাত্র উৎস বলেননি। বিষয় হলো তিনি (দাদী) যে স্বতস্ফূর্ত গল্প বলতেন তার মূল প্রোথিত আছে ওই সংস্কৃতির বিশ্বাসের (প্রথাগত) মধ্যে যাকে Florencia Mallon বলেছেন, `buried treasure of popular imaginings’ (1995:329)। মার্কেজ বলেছেন যে ক্যারিবিয় লোকালয়ই তাকে জীবনের যাদুকরী দিকটি দেখতে সহায়তা করেছে : ‘ক্যারিবিয় অঞ্চলের আমি যেখানে বাসকরি সেখানে আফ্রিকান নিগ্রোদাসদের লাগামহীন কল্পনা কলম্বিয়ার পুরানো বিশ্বাসের সাথে মিশে গেছে এবং সেই সাথে মিশেছে আন্দালুসিয়ার কল্পবিশ্বাসগুলো’(quoted in Hart 1994:12)। মিনগুয়েল বার্নেট কর্তৃক সম্পাদিত উদ্বাস্তু দাস ইসতেবান মন্টিহোর আত্মজীবনী Biografia de un Cimarron (১৯৬৬) পাঠ করে মার্কেজের বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। ১৯৬৩ সালে ১০৩ বছর বয়স্ক ইসতেবান মন্তেহোর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিলো। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে উদ্বাস্তু দাস হিশেবে কিউবাতে বসবাস করতেন। ইসতেবান মন্তেহো পাঠকদের যে গল্প বলেন তা এরকম— মাথাহীন ঘোড়সওয়ার, পেত্নী, ভ্যাবাগঙ্গারাম, দুষ্টু ভূত, গোরস্থানে অস্বাভাবিক আলোর আনাগোনা, এমনসব ভূত/পেত্নী যারা ইচ্ছে করলে নিজেদের চামড়া খুলে উড়তে পারে, এবং যাদুকর যে মুহূর্তেই কিউবা থেকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে উড়ে যেতে পারে। এবং তার এই গল্পগুলো বলার ধরনে মনেই হয় না যে তা অস্বাভাবিক কিছু। একটি উদাহরণ দেয়া যাক: 
             রহস্যপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে পেত্নী ছিলো অন্যতম। আরিওসাতে আমি দেখেছি তিল ও সরিষাসহ তারা (পেত্নীরা) একজনকে ধরে ফেলে এবং তাকে আটকে রাখে। কিন্তু যতোক্ষণ পর্যন্ত মেঝেতে তিল ছিলো তারা(পেত্নীরা) কেউ নড়তে পারলো না।

কিন্তু তারা তাদের চামড়া ফেলেই উড়ে যেতে পারতো। দরজার পেছনের দিকে ঝুলে তার চামড়ার খোলশ ফেলে শুধু মাংসল দেহ নিয়ে উড়ে চলে গেলো। [...] তারা সবাই ছিলো ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দা। প্রত্যেক রাতে তারা ওই দ্বীপ থেকে হাভানায় চলাচল করতো (মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই)। আমি কিউবায় কখনো কোনো পেত্নী দেখিনি। 

এমনকি বর্তমান সময়ে মানুষ যখন আর ওসবে ভয় পায় না, তারা মানুষের ঘরে অস্বাভাবিক আলো ফেলে যায়। তবে যে ঘরে ছোটো শিশু আছে সেখানে তারা বিরক্ত করে না। যদি তারা ওদের (শিশুদের) বিরক্ত করে তাহলে তারা ধ্বংশ হবে, কারণ পেত্নীরাও একই আত্মায় তৈরি।(Barnet 1988:125-26)

এসব জনপ্রিয় কল্পগল্পগুলো নিশ্চয়ই মার্কেজের লেখায়ও এসে ভর করেছে এবং এ ভাবনা থেকেই আমি One Hundred Years of Solitude উপন্যাসের পনেরোতম অধ্যায় থেকে একটি দৃশ্যের অবতারনা করতে চাই— আপনিও স্মরণ করুন— কলা উৎপাদনের তিনহাজার কর্মী কীভাবে সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়। বাস্তব ওই ঘটনা ঘটে ১৯২৮ সালের ৬ ডিসেম্বর ১টা ৩০ মিনিটে জেনারেল Carlos Cortes Vargas এর আদেশে। বাস্তব জীবনে মার্কেজ ১০ বছর পর নিজের উৎসাহে ওই স্থান পরিদর্শনে যান, কিন্তু সেখানের অধিবাসীরা কেউই এমন কোনো ঘটনা স্মরণ করতে পারে না। উপন্যাসের প্রতিক্রিয়া বাস্তব ঘটনার সাথে সাংঘর্ষিক—

           মহিলা করুণার দৃষ্টিতে তাকে আগাগোড়া দেখে বললো— এখানে ওরকম কোনো মৃত্যুর              ঘটনা ঘটেনি। আপনার কর্নেল চাচার সময় থেকে মাকোন্দোতে তেমন কিছু ঘটেনি। ঘরে              ফেরার সময় হোসে আরকাদিও সেগুন্দো যে তিন রান্নাঘরে থেমেছিলো, সেখানেও একই              অবস্থা, কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। (Garcia Marquez 1978:251)

রাজনৈতিক কারণে গণহত্যার অভিযোগ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের এমন মন্তব্য খুবই ক্ষতিকর : 
           অফিসার বললো, ‘আপনি হয়তো কল্পনার মধ্যে আছেন। মাকোন্দোতে কিছু ঘটে না,                  কখনো ঘটেনি এবং কিছুই ঘটবে না। এটা একটি সুখী শহর’। (Garcia Marquez 1978:252)
এই অর্থে ঘটনার দুই সাংঘর্ষিক সংস্করণ বা দ্বিকেন্দ্রিকতা একই সাথে উক্ত গণহত্যার মূল দর্শক হোসে আরকাদিও সেগুন্দোর মধ্যে সমবেত হয়েছে, কিছুক্ষণ পরে তাকে এমন অবস্থায় আবিষ্কার করা হয় যাকে স্বাভাবিকভাবে আমরা ‘ভূত’ বলে থাকি।

পনেরোতম অধ্যায়ের এক জায়গায় আমরা দেখি যে হোসে আরকাদিও সেগুন্দো মেলকুইয়াদিসের কক্ষে লুকাচ্ছে এবং সেনাবাহিনী যখন বুয়েন্দিয়া ঘরে তল্লাশি চালাতে আসে তখন আমরা ধরে নেই যে সে ধরা পড়ে যাচ্ছে। অফিসার মেলকুইয়াদিসের কক্ষ খোলার নির্দেশ দেয় এবং তখন পরিবারের সবাই তাকে বিছানার পাশে বসে থাকতে দেখলেও ওই অফিসার স্পষ্টতই তাকে দেখতে পায় না। আমরা পড়ি : ‘সে অফিসার তাকিয়ে থাকে যেখানে অরেলিয়ানো সেগুন্দো বসে আছে এবং সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ তখনো তাকে দেখছে এবং একটু পরে বোঝা যায় যে সেনারা সারাঘর তল্লাশি করলেও তাকে দেখতে পায়নি’(Garcia Marquez 1978:254)। মার্কেজের উপন্যাসটির এই স্ববিরোধী দৃশ্যটি কার্পেনতিয়ারের The Kingdom of This World (1990/1948) এর একটি দৃশ্যের সাথে মিলে যায় যেখানে আমরা একই ঘটনার দ্বৈতরূপ প্রত্যক্ষ করি (did Macandal's soul fly out of his body, or did it not?; for further discussion, see Hart 2001)। উভয় ক্ষেত্রেই সাবঅল্টার্নরা ভূতের অবয়ব দেখলেও রাষ্ট্রপক্ষ তা দেখতে পায় না। যেখানে ভূতের প্রমিত সংজ্ঞা হলো ‘একটি আত্মা বা মৃতব্যক্তির অবয়ব যা ওই অঞ্চলের মানুষ সাধারণত বিশ্বাস করে এবং ওই আত্মা বা ভূত জীবন্ত মানুষের আকার ধারণ করতে পারে’ (EB 1995:242); ম্যাজিক রিয়ালিজমে ভূতকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেখানে সাবঅল্টার্ন জনতা বিদেহী আত্মার স্মৃতিচারণ করে এক ধরনের করুণরসের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এর মাধ্যমে নন-সাবঅল্টার্নরা (রাষ্ট্রপক্ষ) শোষণের জ্ঞান লাভ করে। এতে অবাক হবার কিছু নেই যে স্বৈরাচারের কাছে কোনো ধরনের ভূতের অস্তিত্ব নেই। পরবর্তীতে ভূত সমাজ দেহে ভাঙন ধরিয়ে বিভক্তি রেখা টেনে দেয় এবং ম্যাজিক রিয়ালিস্ট কথাসাহিত্যে তা কেবল সাবঅল্টার্ন জনতাকে স্মৃতিচারণে ব্যস্ত রাখতেই ব্যবহৃত হয়। কেনো আমি বিশ্বাস করি যে ম্যাজিক রিয়ালিস্ট কথাসাহিত্যে আমরা ‘রাজনীতির ভূত’ নিয়ে আলাপ করতে পারি, তার এই হলো কারণ।

আমার উল্লেখিত ‘রাজনীতির ভূত’ ইসাবেল আয়েন্দের The House of the Spirits-এ ভালোভাবে আবির্ভূত হয়েছে। সেখানে আমরা পাবো ওই চিত্র যাকে আমি বলি ÔSubalternised Supernatural’। John Beverley মনে করেন- ‘সাবঅল্টার্ন অধ্যয়নে যাকিছু মনোযোগ আকর্ষণ করে, যেভাবে তা অন্য ইতিহাস, অন্য উৎপাদনের ধারা, অন্য মূল্যবোধ ও পরিচয়ের থেকে আলাদা করা হয় তা বাস্তবিক অর্থেই জাতীয় (রাষ্ট্রীয়) আখ্যান থেকে বিচ্ছিন্ন চরিত্রের’ (১৯৯৫:১৬), এবং অন্য ইতিহাস বলতে এখানে যা বলা হয়েছে আয়েন্দের রচনার আলোকে তাকে আমরা ইতিহাস না বলে নারীবাদী ইতিহাস বলতে পারি। ইসাবেল আয়েন্দে তাঁর সব সাক্ষাৎকারে একটা ভাবনার কথা উল্লেখ করেন, তাহলো, তিনি তীব্র আশা পোষণ করেন যে একদিন ‘পৃথিবী আরো বেশি নারীকেন্দ্রীক হবে, যেখানে নারীবাদী মূল্যবোধগুলো মর্যাদাপ্রাপ্ত হবে’ (See www.motherjones.com/mother_jones/SO94/allende.html)। তাঁর কথাসাহিত্য যে এই চেতনাকে ঘিরেই রচিত তা বোঝার জন্য উপরোক্ত উক্তিই যথেষ্ট। এটা অনস্বীকার্য যে The House of the Spirits-এর মূল উদ্দেশ্য হলো নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে চিলির অদূর ইতিহাস উপস্থাপন করা।

গার্সিয়া মার্কেজের ফরমুলা আয়েন্দের রচনায় যে সফলতা লাভ করেছে এই উপন্যাসে তার পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। কলম্বিয়ার অন্যান্য অগ্রজদের মতো আয়েন্দেও এমন পৃথিবী রচনা করেছেন যেখানে লৌকিক ও অলৌকিক পাশাপাশি অবস্থান করে। উদাহরণস্বরূপ— সুন্দরী রোসাকে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে সে যদি সত্যিই বাস্তব দুনিয়ার হয় তাহলে আমরা বিস্মিত হবো। তার চুল সবুজ, সে হাঁটলে তা ঢেউ খেলে যায় এবং তার সৌন্দর্য যেকোনো পুরুষকে সম্মোহিত করতে পারে (Allende 1988:22)। দিব্যদৃষ্টিপ্রাপ্ত শিশু ক্লারা সম্পর্কে জানা যায় যে তার চারপাশে আত্মারা উড়তে থাকে, সে টেলিপ্যাথি ক্ষমতাসম্পন্ন  যেমন— সে পুলিশি তদন্তের আগেই জানতে পারে কারা স্কুলছাত্রদের হত্যা করেছে [১৯৮৮:৭৭] এবং সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারে (১৯৮৮:৭৪-৫) । এছাড়ও ক্লারার ভবিষ্যৎ বাণী করার ক্ষমতা আছে। সে তার পিতার মৃত্যু, নিজের বিয়ে, এমনকি তার বাবার হার্নিয়া রোগ সম্পর্কে ভবিষ্যৎ বাণী করে। তার সবচেয়ে লক্ষণীয় ক্ষমতা হলো, সে কোনোকিছু না ছুঁয়ে তা একজায়গা থেকে অন্যত্র নাড়াতে পারে। এবং উপন্যাসে আমরা দেখি যে উপরোক্ত ক্ষমতাগুলো নাতনীদের (নারী শিশু) উপরে আরোপিত হয়েছে। নাতনী আলবার নোটবুকপাঠ (ক্লারার নোটবুক) থেকে দেখা যায় যে তার পৃথিবীটা এমন ‘বস্তুবাদী নীরস সত্যগুলো আবেগী স্বপ্নবাস্তবতার সাথে মিলেমিশে গেছে এবং প্রায়ই দেখা যায় পদার্থবিদ্যার সূত্র ও যুক্তিকে গ্রাহ্য করা হয়নি’ (১৯৮৮:৮২)।

কিন্তু এখানে মনে রাখার বিষয় হলো তিনি ম্যাজিক রিয়ালিস্ট নারীবাদ উপাস্থন করেছেন, যেখানে দেখা যায় নারীদেরই কেবল ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে কিন্তু পুরুষের তা থাকে না। অধিকন্তু, ইস্টেবান ট্রুয়েবা তার প্রতিবেশীদের ক্লারা ও ব্লাঙকার অলৌকিক ক্ষমতার কারণ অনুসন্ধান থেকে নিরস্ত করতে চেষ্টা করে, কারণ (তিনি মনে করেন) এটা শ্রেফ লোকজনের ভ্রান্ত প্রচার। অনুরূপভাবে উপন্যাসে নির্দিষ্টভাবে নারীর অলৌকিক ক্ষমতাকে প্রকাশ করার হয়েছে যা তাদের মধ্যে নতুন সংহতি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে এবং ফলে তারা পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বে টিকে থাকার ছাড়পত্র পাবে। উদাহরণস্বরূপ ক্লারার বন্ধু মোরা বোনেরা ‘মানসিক শক্তি আদান-প্রদানের কৌশল আবিষ্কার করে [...] যার ফলে তারা পার্থিবজীবনের চরম বা দূর্দশাগ্রস্থ মুহূর্তে একে অন্যকে মানসিক সহায়তা করতে পারবে’ (১৯৮৮:১২৫)। পরবর্তীতে ওই জ্ঞান কাজে লাগে যখন আলবাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং সেখানে সে প্রাত্যহিক নির্যাতনের শিকার হয়। দাদী ক্লারার আত্মা ও সঙ্গী আনা ডায়াজ তাকে ওই অবস্থা সহ্য করতে সাহায্য করে, ফলে সে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়(১৯৮৮:৪২৫-৭)। আনা ডায়াজের সমর্থন ক্লারার ক্ষমতার বিম্বস্বরূপ কারণ এটাই তার অলৌকিক ক্ষমতাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে— আরো কিছু মানুষের সমর্থন নিশ্চিত করা ম্যাজিক রিয়ালিজমের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। আমরা বলতে পারি যে ক্লারার ভূত হলো ‘রাজনীতির ভূত’র আরেকটা উদাহরণ যা ম্যাজিক রিয়ালিজমের ঘরেই বসবাস করে। ভূতটি আলবার কাছে ফিরে আসে এবং তাকে উৎসাহ দেয় যাতে সে পিনোশের বর্বর শাসনকালে মৃতদের উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিশৌধ নির্মাণ করে যা শেষ পর্যন্ত The House of the Spirits এ রূপান্তরিত হয়। এভাবে উপন্যাসে নারীদের মুখ্যতা পুনর্ব্যক্ত করে এবং দেখায় নারীর অনুভূতিকে শুধু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নয় সেই সাথে রাজনীতির খোলশে কীভাবে রহাস্যাবৃত করে রাখা হয়। এটা পরিষ্কার যে আয়েন্দের ভূতেরা প্রথমত সব নারী চরিত্র এবং দ্বিতীয়ত, তারা শুধু দৃশ্যের বাইরেই থাকে না, বন্দিও বটে।

আমি এখন আলোচনা করবো প্রবন্ধের তৃতীয় তথা শেষ উপন্যাস টনি মরিসনের Beloved নিয়ে, এটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে এবং এর মধ্যেও লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজমের চারিত্রিক সাদৃশ্য প্রকাশ পেয়েছে। মার্কেজের One Hundred Years of Solitude ও ইসাবেল আয়েন্দের The House of the Spirits উপন্যাসের সঙ্গী হিশাবে Beloved কে প্রাথমিক পাঠে কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। Deborah M. Madsen মনে করেন, মরিসনের রচনাকে কোনো ছাঁচে ফেলা সহজ ব্যাপার নয় এবং মাত্র কতিপয় সমালোচকই তাঁর লেখায় লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজমের সাথে সাদৃশ্য দেখিয়েছেন Madsen 1998) । Stelamaris Coser আমেরিকাসহ লাতিন আমেরিকার লেখকদের তাঁর ভাষায় ‘বিস্তৃত ক্যারিবিয়ান’ হিশেবে দেখার প্রস্তাব জানান এবং তিনি এদের মধ্যে বেশকিছু সাদৃশ্য চিহ্নিত করেন, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে তাঁর ভাষায়, ‘আমেরিকার আফ্রিকান শিকড়’ (১৯৯৪:১০)। কোসারের উল্লেখিত ধারণাকে আমি তুলে ধরতে চাই যেখানে তিনি বলেছেন যে মরিসন ‘লাতিন আমেরিকার উপন্যাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিগ্রোনারীদের দৃষ্টিভঙ্গি’কে লটকে দিয়েছেন (১৯৯৪:২)। এবং দেখবো এই বিষয়টা Beloved, The House of the Spirits Ges One Hundred Years of Solitude এ কতোটা জড়িত আছে। (এখানে যোগ করতে চাই যে কোসার কেবল মরিসনের Song of Solomon, এবং One Hundred Years of Solitude এর মধ্যেই আন্তঃসংযোগ দেখিয়েছেন, কিন্তু তিনি One Hundred Years of Solitude ও Beloved এর মধ্যে কোনো সাদৃশ্য দেখাননি।)

Beloved উপন্যাসটি কেনটাকির মার্গারেট গার্নার নামক এক দাসীর জীবনের বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত। ১৮৮৫ সালের ২৭ জানুয়ারি রবিবার আনুমানিক সকাল দশটার দিকে Archibald K. Granes এর জমিদারী থেকে আটজন দাস পালিয়ে যায়। উত্তর কেনটাকির কোভিংটন শহরের ১৬ মাইল দক্ষিণে Boone Country-র রিচমন্ড স্টেশনে এই ঘটনা ঘটে। তাদের পালানোর ঘটনা শুনে মি. গ্রেইনিস পিছু ধাওয়া করে ওহিও নদী পার হয়ে সিনসিনাতিতে এসে পড়ে এবং উদঘাটন করে যে তারা মিল ক্রেক ব্রিজের পাশে কেট নামের এক নিগ্রোদাসীর বাড়িতে লুকিয়ে আছে। পুরোবাড়ি ঘিরে ফেলা হলো কিন্তু দাসীরা ধরা পড়ার আগে মার্গারেট গার্নার তার দুইবছর বয়সী মেয়ের গলা কেটে ফেলে এবং অন্য দুই ছেলের গলা কাটার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় (তাদের কিছুটা জখম করে কেবল)। ধরা পড়ার পর সে বলে যে সে তার সন্তানদের দাস হিশাবে কেনটাকি ফেরৎ পাঠাবার বদলে হত্যা কার শ্রেয় মনে করে। এই ঘটনা পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে স্পর্শ করেছে এবং মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষবাদীদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে (for more discussion of the legal ramification after the murder, see May 1999)। তাঁর এলাকা ওহাইওর গল্প হিসেবেই শুধু মরিসন এই গল্প বলেননি, এ গল্প ছুঁয়ে আছে সারা আমেরিকার মানসপ্রকৃতি।

দাসপ্রথা ইতিহাসের একটি অধ্যায় যা যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই ভুলে গেছে। যেমনটা মরিসন তাঁর Beloved এ বলেন (সঠিকভাবে নয়) : আমার রচিত গ্রন্থগুলো বেশ কম পঠিত হয়েছে কারণ ওগুলো এমন কিছু নিয়ে রচিত যা মানুষ স্মরণ করতে চায় না, আমি স্মরণ করতে চাই না, নিগ্রোরা স্মরণ করতে চায় না, শাদারা স্মরণ করতে চায় না। অর্থাৎ এটা এক ধরনের জাতীয় বিস্মৃতি (quoted in Heinze 1993:180)। এই উপন্যাসে মার্গারেট গার্নারের আখ্যানের যে উল্লেখ হলো তা-ই এ উপন্যাসের বাস্তবতা এবং এর মূল প্রোথিত আছে আমেরিকার ঐতিহাসিক ঘটনাবলিতে। উপন্যাসের সবচেয়ে অস্বাভাবিক ঘটনাটি ঘটে যখন মরিসন বাস্তবের সাথে অলৌকিক বিষয়কে মিশিয়ে দেন এবং খুন হওয়া শিশু পুনরায় বেঁচে ওঠে। নিজের অভিজ্ঞতার উপর ভর করে তিনি এটা করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন যে শৈশবে ‘আমরা অলৌকিকত্বে পরিবৃত্ত ছিলাম’ (quoted in Foreman 1995:300)। তাঁর গ্রন্থগুলো একই রকম। আমি Song of Solomon থেকে উদ্ধৃত করছি, ‘নিগ্রোদের নিয়ে রচিত যারা উড়তে পারে। যা আমার পল্লীজীবনে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলো;  উড়তে পারার ক্ষমতা আমাদের উপর বর্ষিত একটি আশীর্বাদ’ (quoted in Foreman 1995:300)। এটা প্রমাণিত যে এগুলো কেবল শৈশব বিশ্বাসই নয়; প্রকৃত বিষয় হলো মরিসন নিজেই বলেছেন যে তিনি তাঁর মৃত বাবার সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন (quoted in Heinze 1993:159-60)।

যদিও কল্পগল্পগুলো তাঁর সাহিত্যকর্মে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সরাসরি বললে, Beloved খুবই ক্রান্তিস্পর্শী, বলা যায় আলো-আঁধারির কথাসাহিত্য। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট আঠারো শতকের মাঝামাঝি কেনটাকির শান্ত বাড়ি ও মৃত্যুদণ্ড বিরোধীদের স্বর্গভূমি, উত্তরের জীবন-মৃত্যুর মধ্যবর্তী কোনো স্থান। বিলাভেড, যাকে তার মা হত্যা করে, ১২৪ নাম্বার বাড়িতে তার মায়ের সাথে বসবাস করতে আসে। এই চরিত্রটিও বেশ ক্রান্তিস্পর্শী, না সে বয়প্রাপ্ত (যেহেতু সে মা সিথির ভালোবাসায় নির্ভশীল), না সে শিশু  (যেহেতু পল ডির সাথে তার যৌন সম্পর্ক আছে)। Sunday Times পত্রিকায় প্রকাশিত এক আলোচনায় বলা হয়েছে যে কীভাবে মরিসন ‘ভয় ও সৌন্দর্য মিশিয়ে গল্প উপস্থাপন করেছেন যা পাঠকমনে চিরকালিন দাগ রাখে’ (quoted in Heinze 1993:178)। এবং যেহেতু কেনটাকির গৃহযুদ্ধ চলাকলিন সময়ে যথাযথভাবে দাসীদের ভুতুড়ে ও অবিশ্বাস্য চিন্তা ও কথন নিয়ে এ উপন্যাসটি চমৎকারভাবে রচিত, আমি কেবল এর ভয়ার্ত দিকটি চিহ্নিত করার চেষ্টা করবো যা সিথি’র বিকৃত মনে নিহিত আছে। প্রকৃতপক্ষে এই ভয়ের ব্যাপারটিই হলো (ওই) সংস্কৃতির মূল বিষয়। হেইনজি মত প্রকাশ করেন যে বিলাভেড চরিত্রটি এখানে ‘শুধু সিথির কন্যার আত্মাই নয়, সে অবহেলিত মানুষের নিগ্রহের সামগ্রীক প্রতীকী প্রকাশও’ (quoted in Heinze 1993:179) এবং আমি এই ধারণাকে আরো গভীর থেকে দেখাতে চাই।

কিছু সংখ্যক বিষয় আছে যাতে Beloved এর কাল্পনিক চরিত্র One Hundred Years of Solitude এর সাথে মিলে যায় : ১. জাগতিক ব্যাপারে ভূতকে চিত্রায়ন করা, ২. বঞ্চিতদের অলৌকিকত্বের নজির দেখানোর জন্য ভূতের চরিত্র ব্যবহার, ৩. নির্দিষ্ট একটি সমাজের আদর্শিক অবক্ষয়ের দিকে মনোযোগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে আলৌকিক বিষয়কে ব্যবহার এবং যা দ্বারা কোনো কিছুকে দৃষ্টিগোচর করা যে এক সম্প্রদায়ে যা উপস্থিত অন্য সম্প্রদায়ে তা অনুপস্থিত। আমাদের দেখা মতে এই বিভেদতন্ত্রই হলো ম্যাজিক রিয়ালিজমের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। মরিসনের উপন্যাসে অপার্থিব বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে (উপন্যাসটির সিনেমা ভার্সনে কিছু ঢিলা বিষয় রাখা হয়েছে)। ১২৪ নাম্বার বাড়িতে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে এটা শেষ পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারি যখন পল ডি একটা কক্ষের সামনে যাওয়ার উপক্রম করে :
           পল ডি একটা জুতার সাথে অন্যটা বাঁধলো, কাঁধে ঝুলালো এবং তাকে অনুসরণ করে                  দরজা দিয়ে ঢুকে একটা লাল পুকুর পর্যন্ত এলো এবং আলো নাড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করলো              যে সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
           তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলা, ‘তুমি কি সঙ্গী পেয়েছিলে?’
           সিথি উত্তর দিলো, ‘মাঝেমাঝে’।
           ‘হায় আল্লাহ!’ বলে বারান্দা ধরে দরজার বাইরে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলো ফের, ‘তা                সেখানে কোন শয়তানের দেখা পেলে, শুনি?’।
           ‘সে শয়তান ছিলো না, ব্যাপারটা দুঃখজনক। আসো, এটা ধরে আগাও।’ (১৯৯৭:৮)

লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজমের বৈশিষ্ট্যের মতো এ উপন্যাসের ভিতরকার মানুষেরা অতিপ্রাকৃত বিষয়কে (নিজেদের অংশের মতো কিছুএকটা) নিজেদের সাথে অবিচ্ছেদ্য মনে করে। পল ডি ভূতের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে। ভ্রাতাযুগলও এটা (ভূত) অনুভব করেছে এবং এটা ছিলো উপেক্ষার অযোগ্য এক উপস্থিতি যার ফলে তারা ঘর ছেড়ে দৌঁড়ে দূরে চলে যায়, আর কখনোই ফিরে আসে না। বেবি সাগ্স এটাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে এবং এমনকি যুক্তি দেখায় যে এটা অতো খারাপ না, যতোটা হতে পারতো : ‘এ অঞ্চলে একটাও বাড়ি নাই যে বাড়ির আড়ায় কিছু নিগ্রোর বেদনা গাঁথা নাই। আমরা ভাগ্যবান এই ভূতটি একটি শিশু ছিলো’ (১৯৯৭:৫)। বেবি সাগ্সের একজন প্রতিবেশী স্ট্যাম্প পেইড ঘর থেকে সৃষ্ট গায়েবি শব্দ শুনতে পায় : ‘সে রাতে রাস্তা থেকে তাদের (ভূতের) কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন’ (১৯৯৭:১৭)। মানুষজন ১২৪ নাম্বার বাড়ি সম্পর্কে এতো ভয় পোষণ করে যে কেউ ভেতরে যায় না (১৯৯৭:১৭১)। এবং শেষতক, উপন্যাসের শেষদিকে মহিলারা বাড়ির ভেতরে দেখতে যায় যে সত্যিই মৃতশিশুটি ফিরে এসেছে কি না এবং না কি সিথিকেই চাবকানো হয় নিয়মিত। এই অংশে বিলাভেডকে পাওয়া যায় না এবং আমরা (পাঠক) দেখি যে নদীর পাড়ে নিচে ঝুঁকে একটি ছেলে দেখে ‘অদ্ভুতভাবে এক উলঙ্গ নারীদেহ পড়ে আছে’ (১৯৯৭:২৬৭), এখন সম্ভবত নদীর পাড় থেকে সে দৌড়ে ফেরত আসছে।

Beloved উপন্যাসের অলৌকিক বিষয় উপস্থাপনের ব্যাপারে যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ তাহলো সাবঅল্টার্নদের বাস্তবতা, যা এখানে সমাজতাড়িত নিপীড়নকে প্রকাশ করেছে এবং উনবিংশশতকে আমেরিকায় বসবাসরত আফ্রিকানদের ওপরে অত্যচারকে তুলে ধরেছে : ‘শাদালোকজন বিশ্বাস করতো যে আচরণ যেমনি হোক কালো চামড়ার নিচে কেবল অন্ধকারই (Jungle) থাকে— অলঙ্ঘনীয় জলধারা, চিৎকার ও লাফালাফিতে মত্ত বেবুন, ঘুমন্ত সাপ, লাল মাড়িগুলো শাদাদের রক্তপানের জন্য সর্বদা প্রস্তুত। সে ভাবছে যে কোনো না কোনো ভাবে তারাও (শাদারা) সঠিক’ (১৯৯৭:১৯৮)। লোমহর্ষক বাস্তবতা হলো ১২৪ নাম্বার বাড়ির অধিবাসী মাহিলার দুর্বোধ্য ভাবনাগুলো : ‘বাড়িতে ঘিরে থাকা মিশ্র ধ্বনি ছিলো ১২৪ নাম্বার বাড়ির মহিলার অব্যক্ত অন্তরভাবনা, ধ্বনি শোনা গেলেও তা স্ট্যাম্প পেইডের কাছে দুর্বোধ্যই থেকে যায়- সে ভাবনা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়, ভাষায় প্রকাশিত হয়নি কখনো’ (১৯৯৭:১৯৯)। আমরা দেখতে পাই উপন্যাসটি সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার নিপীড়নে এক মহিলার অবচেতনের সাংগঠনিক জাল তৈরি করছে এবং শেষ পর্যন্ত  (দেখা যায়) ভূত আসলে ওটাই যাকে বেবি সাগস ‘কিছু মৃত নিগ্রোর দুঃখ’ বলেছে। সর্বোপরি Beloved এ উপস্থিত অলৌকিক বিষয় হলো আদিবাসী অধ্যুষিত সাবঅল্টার্ন অঞ্চল যা শাদা ও নিগ্রোদের মধ্যে বিশাল ফাটলকে চিহ্নিত করে। শাদারা ভূত দেখতে বা তাদের আওয়াজ শুনতে পায় না এই কারণে নয় যে তারা অবৈজ্ঞানিক আবহে বসবাস করতে পারে না, বরং এই কারণে যে তারা (শাদারা) নিজেরাই প্রথমসারির নিপীড়ক (ভূতের স্রষ্টা)। এটা মানতে হবে যে তারা (যেখানে বা যতোটুকু জায়গা দখল করে) অবস্থান করে ঠিক ততোটুকু পরিমাণ সামাজিক নিপীড়ন তৈরি হয়। জাতিবিদ্বেষের কথা বলা হয় এই আশায় যাতে নিগ্রোভূতকে মানবহীন মৃত্যুপুরীতে আটকে রাখা যায়। উপন্যাসে সতর্কতার সাথে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিলাভেডের হত্যাকাণ্ডের ট্রাজেডি হলো অমানুষিক পীড়নের সরাসরি ফল যা কেনটাকির শান্ত বাড়িতে বসবাস কালে সিথি পেয়েছে, এমন কিছু বিষয় ছিলো যে সে চায়নি তার সন্তানও সেই অভিজ্ঞতা লাভ করুক, বরং (পিছু ধাওয়া করা) মনিবের কাছে ধরা পড়ে ফেরৎ যাবার বদলে সে তাদের হত্যা করে মুক্তি দেওয়ার পথ বেছে নেয়। চালার নিচে হত্যাকা- দেখে স্কুল শিক্ষক যেমন বলে: ‘তুমি সৃষ্টির প্রতি এমন নির্দয় হয়ে কখনোই সফলতা লাভ করতে পারবে না।’(১৯৯৭:১৫০)।

Beloved এ সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো এর ভাষার ব্যবহার। এটা সম্ভবত মরিসনের মেজাজ নির্দেশক যে তাঁর উপন্যাসের প্রথমেই স্বীকৃতি পাওয়া উচিৎ এর ভাষা। তিনি নির্যাতন সম্পর্কে যে ভাষায় বলেছেন সে ভাষার মধ্যে নিহিত থাকে যা ‘জ্ঞানকে সীমায়িত’ করে, ‘বিজাতীয় লুটতরাজকে তার সাহিত্যের মুখশে লুকিয়ে রাখে’ যার মাধ্যমে ‘দাম্ভিক-ছদ্মভাষা সৃষ্টিশীল মানুষদেরকে হীনতা ও হতাশার খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিলো’ (১৯৯৪:১৮)। ‘অর্থপ্রদানকারী, পথনির্দেশক বা ভালোবাসা প্রকাশক’ হওয়ার পরিবর্তে ভাষা এখানে এমনরূপ ধারণ করেছে যাকে তিনি বলেছেন ‘জিহ্বার আত্মহত্যা’ (১৯৯৪:১৫)। ভাষাকে আদেশের ডিভাইস হিশেবে ব্যবহার করাকে মরিসন প্রত্যাখ্যান করেছেন; যেমন তিনি দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেন : ‘কতো বড়ো সাহস যে তুমি আমাদের কর্তব্যজ্ঞান দিচ্ছো যখন আমরা তোমাদেরই সৃষ্ট বিষাক্ত অতীতের মধ্যে কোমড় অব্দি ডুবে আছি?’ (১৯৯৪:২৭)।

এটা হলো সেই ‘অতীত বিষ’ মরিসন তাঁর উপন্যাসে যেটির ভূত ছাড়ানোর প্রয়াস পেয়েছেন। এবং অনেক সমালোচক Beloved-কে নীরস উপন্যাস হিশেবে দেখলেও অদ্যাবদি এটা হলো ভূত ফিরে আসার গল্প— ভূতের গল্পের একজন জোম্বির মতো, যে তার মাকে চুল ধরে বাইরে ফেলে এবং চাবকায় প্রত্যহ— এটা স্মরণ করা জরুরী যে নারী সংহতির ফল স্বরূপ আমেরিকার অতীতভূত বিতাড়িত হয়েছে। এবং আমি যোগ করতে চাই যে এখানে Beloved এবং The House of the Spirits এর মধ্যে সাদৃশ্য আছে। ইলা এবং তার ত্রিশ বা ততোধিক সঙ্গী মিলে ১২৪ নাম্বার বাড়ি ঘেরাও করে এবং শয়তান তাড়াতে সমস্বরে গান করে; বিলাভেডকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। সিথি দ্বিতীয় কোনো হত্যাকা- ঘটায় না (ইস্কিলাসের ট্রাজেডি হলে ঘটতেও পারতো)। সে এডওয়ার্ড বোডউইনকে হত্যার চেষ্টা চালায় (কোনো সন্দেহ নাই যে বিলাভিডের প্ররোচনায়) যে লোকটি তাকে প্রথমে ফাঁসিকাষ্ঠে যেতে বাধা দেয় (যথেষ্ট শ্লেষাত্মক বিষয়) কিন্তু ইলাও তো সিথিকে ঘুষি মেরে তার মৃত্যু রোধ করে। তাই আমরা বলতে পারি যে ঘাত-প্রতিঘাতের চক্র শুরু হয়েছে। এবং এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে উপন্যাসটি সিথি ও পল ডির পুনর্মিলনের দৃশ্যের মাধ্যমে শেষ হওয়া উচিত। সিথিকে বলা পল ডির শেষ কথা হলো, ‘তুমি আমি যে কারোর চেয়ে গতোকাল বেশি পেয়েছি। আমাদের কিছু আগামীকাল দরকার’ (১৯৯৭:২৭৩), ভবিষ্যতের জন্য এক আশার বাণী প্রকাশ করেছে, যদিও দেখি যে সিথি আর এক পা হারিয়ে অন্যপায়ে ভর করে আছে। এবং শেষ সংলাপে (এপিলগ) ভূতের মতো ঢুকেছে একটি কথা  ‘এটা অপরের কাছে বলার মতো কোনো গল্প নয়।’ (১৯৯৭:২৭৫)। এর মধ্য দিয়ে প্রতিধ্বনিত হয় লেখকের এই ভাবনা যে, প্রতিটি মানুষ তার দাসত্বের অতীত ভুলতে চায়। এই বাক্যের সত্যিকার অর্থে বলতে হয় যে গল্পটি বাস্তাবিকই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে  চলে আসছে। এবং আমেরিকার ইতিহাসে ‘রাজনীতির ভূত’ কে শেষ পর্যন্ত বিশ্রামের জন্য শুইয়ে দেয়া হয়েছে। তবে তারপরও...

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।