রাত ১১:১৩ ; শুক্রবার ;  ২২ জুন, ২০১৮  

অল্প কথায় ‘কবির হুমায়ূনের ৫০ কবিতা’ || রহমান মতি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[এ বছর পয়লা বৈশাখে প্রকাশিত হয়েছে ‘কবির হুমায়ূনের ৫০ কবিতা’ নামে একটি কাব্য সংকলন। গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত কবিতা নিয়ে এটি একটি স্বতন্ত্র্য গ্রন্থের রূপ পেয়েছে। কবির হুমায়ূন একুশে বইমেলা কেন্দ্রিক বই প্রকাশের বাইরে পয়লা বৈশাখে বই প্রকাশ করছেন। কবির হুমায়ূনের জন্ম ১৯৭১-এর ২৮ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার ফতেপুর গ্রামে। নব্বই দশকের অগ্রগণ্য এই কবির কবিতার বইয়ের সংখ্যা আটটি। এই কাব্যসংকলন নিয়ে লিখেছেন রহমান মতি। সঙ্গে ১৫ টি কবিতাও প্রকাশ করা হলো। ]  

আটটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে ‘কবির হুমায়ূনের ৫০ কবিতা’র ব্যাপ্তি। এই সংকলন দেখে বোঝা যায় সংখ্যায় বেশি লেখার পক্ষপাতী নন তিনি। এ গুণটি অনেক কবির মধ্যেই অনুপস্থিত। লেখার মানের কথা ভেবেই কবির হুমায়ূন এ কাজটি করেন। তাঁর কাব্যভাষা ও অনুভূতির বাইরেও কবিতার বিষয় নির্বাচন এবং প্রকাশভঙ্গিতে অভিজ্ঞতাময় আবহ আছে, যাকে ভিন্ন ভিন্ন কল্পনা ও বাস্তবের সাথে মেলানো যায়। এগিয়ে যেতে যেতে তিনি পৌঁছে যান রূপান্তরের দিকে। ফলে তাঁর সমসাময়িকতা থেকে তাকে আলাদা করা যাচ্ছে এভাবেই।

নিজ সময় ও সমকালকে দেখে কবির হুমায়ূন প্রবেশ করেছেন ব্যক্তিক উন্মুক্ত জগতে। তাঁর দেখা দৃশ্যগুলো, দৃশ্যের বাস্তবতা, দৃশ্যের কাল্পনিক পরিবেশগুলো সবসময় একরকম থাকেনি। কবিতার স্বরে স্বতন্ত্র হয়ে বহুমাত্রিকতা পেয়েছে। নিজস্ব প্রতিবেশ নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন বিশ্বচৈতন্যে প্রভাবিত হয়েও। ফলে তার কবিতা প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে প্রসারিত। যার মূলে রয়েছে ব্যক্তি চেতনা।  

কবির নির্বাচিত ৫০ কবিতা মোটা দাগে বহুমাত্রিক কবিতা। ব্যক্তিবোধ সব কবিরই প্রাথমিক উৎস কারণ ব্যক্তি না থাকলে সামষ্টিকতায় পৌঁছানো অলীক হবে। কবি বলছেন- ‘তার মানে আমরাও মৃত নগরীর সন্ধ্যাবিলাসে হাঁটা-হাটি মানতে শুরু করেছি/ তার মানে বিধি মোতাবেক মৃত্যু আমাদের রংধনু দেখালে অভিমান যাবে না করা আর/ তার মানে বিধিসম্মত মানুষ হতে শুরু করেছি’(বিধিসম্মত মানুষ)। ব্যক্তিকে ভাঙলে এ রকম আত্মবিশ্লেষী কথাবার্তা পাওয়াই যায়।কথার মধ্যে নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে রাখে ব্যক্তিরূপী কবি। নিঃসঙ্গতা থেকে তার ঘরবন্দী অবস্থা থেকে বাইরের জগতে যাবার ইচ্ছা- ‘আমার অতি অল্প চাওয়া/ নিদেনপক্ষে একবার আকাশটাকে ছুঁয়ে দেখা/ আর কিছু নয়…আর কিছু নয়’ (ঘোর লেগেছে ঘোর লেগেছে)। ‘আকাশ’ উন্মুক্ত ভুবনের প্রতীক যে আকাশের জন্যই ব্যক্তিগত জীবনের পর্যায় থেকে নেমে আসে এমন কথা- ‘সবকিছু বিশ্রুত হয়/ গ্লাসের শব্দ, জলের শব্দ, মুখের রেখা/ পারি না কিছুই ঠেকাতে’(প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস)। ব্যক্তি যখন কবি নিজে তার মত আরো অনেক ব্যক্তির কথা ভেবেই কবি লেখেন তাদের কথা।এভাবেই কবি ও কবিতা সর্বময় হয়ে পড়ে। ব্যক্তি কথা বলতে বলতে অনেকের মধ্যে প্রবেশ করেই সামষ্টিক হয়। সামষ্টিক জগতে ঢুকে কবির হুমাযূন নানা কথা বলেন। ‘মা’ নিয়ে তাঁর কবিতার বিষয়গুলোতে পাওয়া যাচ্ছে সে সুর- ‘আমাদের শব্দগুলো চুরি গেছে শিকড়ের মাটির ভাষায়/ নাড়ির কিনারে ঘাম/ মা তুমি উনুনে জেলে দাও এবার শতাব্দ শোকের পার্বণ’(নিঃসঙ্গতা ভেঙে ভেঙে)। অন্য একটি কবিতায়- ‘প্রণম্য মাটিরে বলি মা,/ নাড়িছেঁড়া চিৎকারে মা তুমি/ কোন নৈঋতে প্লাবনের ফেনায় মাখা শিশিরের সুখ’(প্রণম্য মাটিরে বলি মা)- এ বিষয়গুলো এক থাকছে না। ব্যক্তিক মা ও স্বদেশ-স্বকালের মা আলাদা কণ্ঠে বলছে ভেতরের কথা। শেকড়ের খোঁজ থেকে মাটির খোঁজে আত্মপরিচয় অনুসন্ধান শেষে হিশেবনিকেশ হয়ে যাচ্ছে এভাবে- ‘সভ্যতার যেন শেষ নেই/ টেরাকোটা নকশায় বসে পড়ে মুখ/ খোদাই খোদাই স্মৃতি/ মার্জনা করো মাগো/ যে জন্ম পাখিদের/ সে জন্ম মানুষের না’(যে জন্ম পাখিদের সে জন্ম মানুষের না)। জন্মের হিশেব করে মানুষ ও পাখির তফাত করা চারটিখানি কথা নয়। পাখিদের জীবনও কোমল নয় আবার যতটা কোমল ততটা কোমল মানুষের জীবন নয়। ব্যক্তিক মা, স্বাদেশিক মা, ঐতিহ্যিক মা সব একাকার হয়েও আলাদা হয় কবির হুমায়ূনের কলমে।

সম্পর্ক নিয়ে শুধু কী কবিতা লেখা হয়েছে, লেখা হয়েছে আরো অনেক কিছু। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কাব্যনাট্য, মহাকাব্য। কবিতায় সম্পর্ক কবিতার মতই ছান্দিক, সুন্দর, বেদনাময়। সম্পর্ক বিষয়ক শিল্প অনেকটাই ব্যক্তিক কেন্দ্র থেকে আসে। ডালপালা অবশ্য অন্যদিকেও ছড়ায় তবে ব্যক্তিক দিকটা জ্বলজ্বল করে বেশি। প্রেমিকসত্তার কথামালা কবিদের নিত্য ব্যবহারিক উপাদান।কবির হুমায়ূন বলেন তাঁর মত করেই, যেটা সব কবিই যার যার নিজেদের মত করে বলেন। কবির হুমায়ূনের বলাতে আকুতি বা নিবেদিত ভঙ্গি আছে। যা স্বকীয়-পরকীয় বিষয় সম্পর্কের জন্য বড় উপাদান। ব্যক্তিগত বিশ্লেষণের জায়গা থেকে কবির অভিব্যক্তি- ‘আমার স্বকীয়া-পরকীয়া কিংবা/ অবৈধকীয়া কোনটাই নেই/ সংসার-সন্তান তাও নেই/ কিন্তু বাড়ি ফিরতে ভালো লাগে, বাড়ি ফিরি’(বাড়ি ফেরা)। পরম একাকীত্ব অনুভব করলেই এভাবে বলা যায়। ‘বাড়ি’ একটা আশ্রয় সে আশ্রয়টি একাকী বাসের জন্য উপযোগী নয়। যে একাকী সেও তার একাকীত্ব থেকে মুক্তি চায় বলেই একাকীত্বের কথা বলে আর সেজন্যই দরকার সম্পর্কের বন্ধন। প্রেমিকসত্তার কথা যেমন- ‘কানেট নির্মাণকলা নাচতে নাচতে মুছে গেল কখন/ হিমালয় জল কখন মুছে গেল সেবিকার নিদ্রাহীন চোখ/ আর মৃত্যুর খুব পাশে দাঁড়িয়ে আজন্ম ‍ঋণী প্রতারক চুম্বনের গল্প’(পরকীয়া)। স্বকীয় থেকে পরকীয়র যন্ত্রণা বেশি আর প্রেমিকসত্তা তা ভালোই অনুভব করে।সম্পর্কগুলো নানা দিকে প্রবাহিত বন্ধুর দিকে, নিখোঁজ কারো দিকে, নিজের দিকেও। বন্ধুর দিকে সহমর্মীতার জন্য- ‘পত্র লেখি যত্রতত্র পত্র লেখি পাত্রে/ পত্র লেখি বন্ধু আমার ঘৃণা ভরা গাত্রে’(বন্ধুর বাড়ি যাবো)। বন্ধুর পাশাপাশি মন খারাপের হিশেবগুলো নিজের দিকেও যাচ্ছে। অচেনা বা নিখোঁজ কারো দিকেও যাচ্ছে মন খারাপের পঙক্তি- ‘কে তুমি হাতের কব্জিতে মিহিন স্পর্শ রেখে তড়িৎ অতিক্রম করো বিস্ময়ের বিরক্তি’(স্পর্শ সিরিজ- সাত)।

নিঃসঙ্গতা, জাগতিকতার বাঁক নিয়ে সম্পর্কগুলো কবির হুমায়ূন নাম ধরেও বলেন আবার সর্বনামেও বলেন। যেমন- ‘মালতী আমারে একবার বল, শ্মশানের ঠাণ্ডা ছাইয়ের কালো গহবর ‘কানন’ এখন কেমন আছে’(স্পর্শ সিরিজ- পাঁচ)। খুব নিবিড় অনুসন্ধানও করেন যা শুনতে ভালো লাগে- ‘কালো আর ছাই রঙ একসঙ্গে দেখলে খুব বেশি মনে পড়ে তোমাকে’(তোমাকে হু হু মনে পড়ে)। ‘হু হু’ মনে পড়া নিবিড় নিঃসঙ্গচেতনার প্রকাশ। আকাশকে ফুটো করে পালাতে চাওয়া বা চারপাশের জল-বাতাস, আলো-মাটি বা নানা বর্ণের ত্বক দেখে তাদের পতনের কথা ভাবেন যাকে তিনি বলেন ‘ব্যক্তিগত ভয়’। এ ভয়টি জাগতিক ভয়।

বৈশ্বিক ব্যাপ্তির বলয় আছে কবির হুমায়ূনের কবিতায়। ‘ওয়াংফুচি’ নিয়ে কবিতা আছে যেটি চৈনিক সভ্যতার অংশ। কবির ব্যক্তিগত পরিভ্রমণ বা অভিজ্ঞতারও দিক। সভ্যতার বিলুপ্তি বা ক্ষয়ে যাওয়া অবস্থা দেখে কবি যখন ব্যথিত তখনই তিনি অনুভব করেন কবিতার সর্বব্যাপী বিস্তার। বলেন- ‘তবু মাটি আর জলের স্তরে এখন অনেক হাড়ের কথা/ আর হাড়েরা বাঁশি বাজায় সভ্যতার ঝিমমারা কানে’(সভ্যতা)। সভ্যতা মানেই ভূখণ্ড যা নিজ ও অপর দুটোরই মিশ্রণ।

স্থানিক গুরুত্ব কবিতার বড় উপাদান। স্থানকে মানুষের মনের একটা এককও বলা যায় কারণ স্থানভেদে মানুষের স্মৃতি-বিস্মৃতি থাকে। বিশেষ কারণে হয়তোবা ব্যথা বেজে ওঠে কোথাও।ব্যক্তির অভিজ্ঞতা জুড়ে স্থানিক অবস্থানের সাথে আত্মগত হিশেব কড়া নাড়ছে- ‘আজিমপুর মনে পড়ে/ হাতিরপুল মনে পড়ে/ কলাবাগান, কাঁঠালীবাগান, জাফরাবাদ, শান্তিনগর, রামপুরা!ঝিগাতলা থেকে শহীদবাগ হয়ে কাজিপাড়াও মনে পড়ে/ মনে পড়ে বেগুনবাড়ি-শুক্রাবাদ/ এই এতো মনে পড়াপড়ি খুব ভালো ঠেকছে না!(এতো মনে পড়াপড়ি ভালো ঠেকছে না)। স্থানগত স্মৃতি এখানে অসাধারণ হয়ে ব্যক্তিগত হিশেবের খেরোখাতা যেন।

নিরীক্ষাধর্মী কবিতাকে কবির হুমায়ূন নাম দিয়েছেন ‘চরিত্র কবিতা’। সুনির্বাচিত নাম। চরিত্রের মাধ্যমে কথোপকথনে ইতিহাস, ঐতিহ্য সহযোগে কাতর প্রেমিকের অনুরণন।কমল, সেজানা, সাইকি, জিরান, রিনটিন, নিরটিন এই কল্পিত মানব-মানবীরা সাইকোলজিক্যাল ডকুমেন্টেশন হয়ে ভীষণভাবে প্রেমে, বিচ্ছেদে, কাতরতায়, কামনায় আর্ত। সবগুলো ঘটে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আবার বৈজ্ঞানিকভাবেও। ইগোকেন্দ্রিক ফ্রয়েডীয় নিরীক্ষায় কমলকে সেজানা বলছে- ‘আচ্ছা, তুমি কি বলবে ইগোর কতটা ভয়াল ক্রোধ তোমাকে তাড়াবে আর শূন্যতার ধূসর জগতে?/ তোমাকে জীবনের কথা বলবে না/ পুঁজি, যন্ত্র কিংবা বিজ্ঞানের কথা বলবো না/ এমনকি ভোগবাদ নিয়েও তুলবো না কোনো প্রশ্ন’। চারিত্রিক আবহে মনন দেখার পাশাপাশি থেকে গেছে সভ্যতার কঙ্কাল যেখানে ভোগবাদী ব্যবস্থা বিশ্বকে গিলে খাচ্ছে। ‘চরিত্র কবিতা’র উন্মোচনে দেখা যাচ্ছে এদের কারো মানসিকতা বিচিত্র আবার কারো টাইপকেন্দ্রিক।

কবির হুমাযূনের ৫০ কবিতা  রকমফেরে দেখার মত শিল্প। কবিতাগুলোতে ‘বিষয়’ সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন এরপর তার উপস্থাপনা। কবির কাব্যরুচিতে বহুমাত্রিকতা পুরোদমেই আছে। বইটি পড়ার পর পাঠক একথা বলতে পারবেন যে, দুই মলাটে অনেক কবিতা পড়া হল।

কবির হুমায়ূনের ৫০ কবিতা || প্রথম প্রকাশ বৈশাখ ১৪২২ || প্রকাশক পুনশ্চ || প্রচ্ছদ তৌহিন হাসান || মূল্য ৩০০ টাকা। 

 

 

                           কবির হুমায়ূনের ৫০ কবিতা  থেকে ১৫টি

কবির হুমায়ূন

 

বিধিসম্মত মানুষ

রঙতালের রেখাআঁকা-ছায়ারেখা হাওয়ারও আগে বুদ্বুদ্...  

এই সেই পরিচিত সহজন আকাশ; এই সেই
আড়ি রাখা ঘুম ভেঙে
ফর্সা সকালে আমরাও হেসেছিলাম 
নবজন্ম ধীবরের নিঃশ্বাসে।
দ্রুতযান গতির ত্বকে মিলিয়ে যেতে যেতে
ভুলমনে কতোবার হাতপ্রণাম রেখেছি চিহ্ন,
রাতের গাঢ় ওড়নায় কল্যাণ রেখা—
ভুলেও ভাসে না বুভুক্ষু দুনিয়ায়।

আমরাও ভুলে যেতে যেতে আরবার, স্মৃতির ফিরোজা রোদ
ছিটাতে ছিটাতে— বুকের নিকটে শুনেছি মৎসের তড়পড়...
আমরাও শীততাপ জোছনায় টুংটাং সুর তুলে উৎসব করেছি
জলতলের বিচিত্র সুন্দর...

এতো অল্প; এতো ক্ষণবাস মুহূর্তগুলো দেখতে দেখতে
আমরাও পৌঁছে যাই মৃতদের উৎসব নগরীর খুব পাশে।
চোখ রাখি মৃত চোখে, হাত রাখি মৃতদের পাড়ভাঙা থান-থান
পোশাকের উত্তাপে। তার মানে আমরাও মৃত নগরীর
সন্ধ্যাবিলাসে হাঁটা-হাঁটি মানতে শুরু করেছি। তার মানে বিধি মোতাবেক
মৃত্যু আমাদের রঙধনু দেখালে অভিমান যাবে না করা আর।
তার মানে বিধিসম্মত মানুষ হতে শুরু করেছি...


এই প্রথম প্রেমের কবিতা

ঠাকুর বাড়ির ফটক থেকে রোদ মেখে হেসে গেলো
রুদেভার মুখ। ফের আবার ল্যুভর মিউজিয়ামে 
মুখোমুখি হলে অবিকল হেসে চলে গেলো 
টেমস্ জলের শাম্পান মাঝির ঘরে।

বকুলের ঘর ছিলো, লাবণ্যেও ঘর ছিলো, মিসেস
সেনেরও ঘর ছিলো। আর আর যাদের ঘর ছিলো
তার প্রতিচ্ছবি গেঁথে আছে মৃণালিনীর ফ্রেম
আটকানো গ্লাসে। গ্লাসের তরঙ্গ তরঙ্গে
আর কী কী আটকানো থাকে?

এমন কারো নেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি দক্ষিণের বারান্দা।
তার মানে কারোতো ছিলো, তার মানে
শূন্য বুকের শূন্য শূন্য হাহাকার...

রুদেভার হাত থেকে আঙুলগুলো শিথিল হলে
একটি দেহ ফের ফিরে ঘরে,
একটি দেহ জোনাকপোড়া রাতে...


নিঃসঙ্গতা ভেঙে ভেঙে

আমাদের শব্দগুলো চুরি গেছে শিকড়ের মাটির ভাষায়
নাভির কিনারে ঘাম
                    মা তুমি উনুনে জ্বেলে দাও এবার 
                     শতাব্দ শোকের পার্বণ।

নিঃসঙ্গতা ভেঙে ভেঙে ফেনাধরা গ্লাস
আকাশের নীল ছুঁয়ে খ’সে পড়ে বিরান জোছনায়।
গত আয়ু ক্রোধ
আমাদের ঘরের পাষাণে বেঁধেছে মহান ঘর
শুভ্রতার খরগোশ।
 কে জানে কোথায় আমাদের ব্রতের প্রাসাদ
পথ ভুলে 
          প্রণামে ভাসায় শখে সুখের কোরাস।
একফোঁটা জল— চোখের 
                       ঠাকুর
তোমার দৃষ্টির শীর্ষ বেয়ে গ্লাসের উলকি 
ঝনাৎ আছড়ে পড়ে দেয়ালের গায়।

জন্ম তবে বৃথা হলো
বেজন্মার গালে এসে দখল বসায় 
                    সর্বনাশের ইসরাফিল হুঙ্কার,
কাহারে বলি সেই সর্বনাশা জলের খবর...!

আমাদের স্বপ্নগুলো হাত মেলে নিশিরে শাসায়
উলঙ্গ কান্নার তোড়ে চাপা যায় 
                       শয়তানের নকশাকাটা খাঁজ
মুছে যায় ভোর
                   শুদ্ধতার প্রাণভরা নিঃশ্বাস।
এইসব রেখে পথ ফিরে ঘরে
ফিরে যেতে হয়
               মেঘের শুভ্রতা নীলে।

মা—
তারার উৎসবে শূন্য থেকে শূন্যে
রীতার আরতি ভেসে যায়
                       এক আকাশ সপ্তম সিঁড়ি...


পরকীয়া

সিলভার চোখে শরণার্থী পথ, আমি কার কাছে যাবো?
এমন স্বকীয়া দুঃখ তোমার তো কোনো উদ্বাহু শূন্যতা নেই,
কানেট নির্মাণকলা নাচতে নাচতে মুছে গেছে কখন
হিমালয় জল, কখন মুছে গেছে সেবিকার নিদ্রাহীন চোখ,
আর মৃত্যুর খুব পাশে দাঁড়িয়ে— আজন্ম ঋণী প্রতারক 
চুম্বনের গল্প।

আমি চাই খুব গোপনে অপ্রকাশ্য নীল খামের টোটেম,
গলিপথ অতিক্রম করে বসে পড়ি গাইড মঞ্চের
পরিচারিকা দৃশ্যে,
যদি কথা বলে ওঠে মারাঠা কন্যা,
যদি আলোর ভিতর দিয়ে হেঁটে আসে নন্দন-কানন সখি।

কোথাও পাথরে জলরঙ ধরে না দূষিত মেঘে,
শরণার্থী পথ— প্রতিবন্ধী দৃষ্টিতে রাখে
রাত্রির ব্যয়বহুল শোক।
         এতো যে অসমাপ্ত কষ্ট—
                 তাহলে আমি কার কাছে যাবো? 

 

ভ্রম 

খুব দরকারি কথাগুলো কখনো আর বলা হবে না
খুব দরকারি আসবারের মতো এইসব চাইও না,
আজ রোদের ভিতর মৃত্যু হেঁটে গেছে
শীতদেহ নিয়ে
                 চারদিক পাহাড়ে।
আমার কেবল মন পোড়ে
                        আমার কিন্তু দেহ পোড়ে না।

শরীরের যে ভাঁজে ক্লান্তি দানা বেঁধে আছে
আমি তারে ব্রত করে ভালোবাসি,
সিঁড়িতে ভ্রম হয়;
               করিডোরে ভ্রম হয়—
এক জীবন ভ্রম হতে হতে গেলো;
আমার তবু চোখ পড়ে থাকে
                          প্রতীক্ষার হাতপাখায়।

এতো অনিবার্য সময়— আমি তারে অবহেলায় রাখি;
এতো হুলস্থূল হাওয়া— আমি তারে পাশকেটে হাঁটি,
আমি আমি আমি—
আমি যারে খুব ভালোবাসি
                    তারে একটুও মনে রাখি না,
আমার মনের ভিতর শুধু ভ্রম খেলা করে।

চোখের মধ্যে একটিও রেখা নেই
বুুকের মধ্যে একটিও স্পর্শ নেই
অসম্পূর্ণ থেকে থেকে আমি পরিপূর্ণ হবো ভাবি!

 

আবার দেখাব রাধার নৌকা বিলাস 

কম্পন তারের দিন; কার কুশলে কড়া নেড়ে আচম্বিতে নীল অর্কিড নতজানু হবে? কেঁপে দ্রুত শিশ্নের রোদ মরে-রয় পোড়া-রাত তামাকের ঘরে। বড়োবেশি নিদ্রাকাতর ফুরফুরে ভঙ্গুর কাচের খোঁয়াড়। কে ওখানে গ্রিলের শূন্যতায় ওসাকা পায়ের খড়ম-শব্দ পরিমাপে বেদানার শোকে! কে তুমি তারবাহী বিস্মরণ বৃষ্টির কথায় খরগোস অস্থির থামের স্থিরতা লুকাও! সবটাই জানি। টমাস গ্রেসামের ছককাটা আদরে ভুলের বৈঠক কোচ্ছাবড়া জিহ্বায় সবুজ রুয়ে নেয় রগের ভৌতিক উত্তাপে। পরাজিত হয় হাতপাখা। তোষকের কানারাত মোরগ লড়াই জলের অতলে শুয়ে থাকে জংধরা অচল আধুলি। এ্যাডিও বড় দয়াল ভণ্ড প্রতারক হিজড়া।
কে তুমি হাতের কব্জিতে মিহিন স্পর্শ রেখে তড়িৎ অতিক্রম করো বিষ্ময়ের বিরক্তি! চণ্ডালের রক্তচোখ ধুয়ে নেয় নগ্ন শূন্যতার অস্পর্শ লজ্জা। কোনোদিন হবে না বলা ঘরগুলো কী তালে ছোরঙ পাল্টায় দম ফাটা হত্যার সানঝরা তলোয়ারে! এ কেমন মধ্য-পথের বিশ্রাম!
যখন জিহ্ববা চুলকিয়ে ওঠে; ব্লাকহোল অহংকার ছুড়ে মারে হাজরে আসোয়াদের বুভুক্ষু চুম্বন। কৈলাস টিলার সাঁওতাল হলানু-কুসুম, ডেপা নদীর শ্যাওলা জলে ঘাঘরার লাল ভয় যদি চলে যায়, শিশু হয়ে কান্তজীর নয়টি গম্বুজে টেরাকোটায় আবার দেখাব রাধার নৌকা বিলাস। কেন স্পর্শ করে যাও নীরব মস্তকের বিভাজ্য ঘুমের ভ্রমণ! কবরের কান্নায় বাঙলা প্রতীক যখন ধ্বংস হতে থাকে আকবর বাদশার ক্রোধে, কেন নাড়াতে এলে বেগুনি রোদের চতুর তারায়! কেন বনেদি কাঠের সিঁড়িতে বেজে ওঠে হত্যাকাণ্ডের পাগলা তানপুরা!
পুনর্ভবা ছেড়ে এসে দাঁড়িয়েছিলাম রামসাগর দিঘির জলে। ও আমার নিয়ন্ত্রিত ঝিনুকের সুতোখেলা, আমি কী রাম নাথের লম্পট অবাধ্য সন্তান যে, আমাকে বিসর্জন দিলে পাললিক মাটির খননে! আমি কি সাফা মারোয়া যে ট্যাবুর উৎসাহে বিচিত্র পাথর মেনে নেবো হকিংয়ের বর্ণিত তার্কিক ঘৃণায়! ঠাট্টার রিডে নড়ে ওঠে বৃন্দাবন ধাম। আমিতো জীবন-ঋণের চুক্তিতে জিহ্বা থেকে খুলে নিতে চাই নারদ কোন্দল। রাধাকু-; শ্যামকু- এতো পানখ সূক্ষ্ম কেন তুলে ধরো কসাইকাটা নির্বোধ চোখ? মাইগ্রেনে হারিয়ে যায় প্ল্যানচেট শোকের অযুত বছর। এ বড় যত্ন পাওয়া বহুকোণ কম্পাসের নিটোল বর্জন! আমি তারে প্রাণ বলি, আমি তারে থেঁতলে দেয়া লৌহ অগ্নির শূন্য ডিগ্রি হিমাঙ্কের ব্যর্থতা বলি...


ব্যক্তিগত ভয়

একটা আকাশকে ফুটো করে কতোটুকু পালানো যায়! চারপাশে জল-বাতাস, আলো-মাটি আছে কি নেই; বুঝতে পারছি না! ত্বক শুধু; নানা বর্ণের ত্বক! অনেক হাত, অনেক পা, মুটি মুটি চোখ, গুচ্ছ গুচ্ছ আক্রোশ মুখ, ভয় করে! পতন হবে কিছু।
এটা আমার ব্যক্তিগত ভয়। এটা আমার ব্যক্তিগত স্বপ্নদোষ। মশারি সরালে বৃক্ষ আমার বারান্দায় থাকে না। রোদ মিষ্টি করে কানন দিদি হাসে না। হাওয়ায় হাস্নুহেনা টের পাই না। আমার ভয় করে। ভীষণ ভয় করে।
বঙ্গের চারপাশ জুড়ে যে রেখাচিত্র আছে, তা স্থির। অস্থির শুধু হাত, পা, চোখ আর আক্রোশ মুখ। বাড়ছে। প্রতিযোগিতায় বাড়ছে। দৈর্ঘে-প্রস্থে নয়, গণনায়। থামছে না, থামাচ্ছে না। কে?
দাবি দাওয়া জানাতে বড় লজ্জা লাগে। এতো হাত, এতো পা, এতো চোখ আর এতো এতো আক্রোশ মুখ! আমার শুধু ভয় করে! ভয় পেতে পেতে ভালোবাসা নিষিদ্ধ করে রাখি। ঘুম পায়।
ঘুমালে স্বপ্ন আসে। ঘুমাতে পারি না। রঙিন রুমালের স্বপ্ন নয়, নিকোটিন জ্বলা তামাটে রক্তের স্বপ্ন! যদি বিদ্রোহ জেগে ওঠে! যদি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে! মানুষ নয়, মানুষের ভারে নতজানু এ বঙ্গ প্রকৃতি! 

 

তোমাকে হু হু মনে পড়ছে 

কালো আর ছাই রঙ এক সঙ্গে দেখলে খুব বেশি তোমাকে মনে পড়ে। মাসের পর মাস ছাই রঙ আকাশ মাথার উপর লটকে থাকলে তুমি কালো পোষাকে ধোয়া ওড়াতে বারের কর্নারে। বাইরে লেক। হতে পারে ওয়েস্ট কিংবা হোহাই লেক। জলের পিঠেও তখন ধোয়ার কুণ্ডলি। হীমে হীমে জমে ঘরে ফিরলে হিটারের মধ্যেও ঠকঠক কম্পন। একলা ঘরে সে কম্পন কেউ দেখেনা বলে দরজা বন্ধ করে দিলেই শেষ। কিন্তু উত্তাপ যদি জরুরি হয়ে পড়ে?
আমার শহর গেল তিনদিন ছাই রঙ মুখ করে আছে। তোমার মতো কোথাও কালো রঙ পোশাক না দেখলেও তোমাকে হু হু মনে পড়ছে। এ শহরে কোথাও হিটারের প্রয়োজন নেই। কারণ ঠকঠক কম্পনের কোন ঘটনা এ শহরে ঘটে না। কিন্তু ছাই রঙ মুখের ঘটনা ঘটলো। আমি ঠকঠক কাঁপছি। উত্তাপ খুব জরুরি। তুমি কোথায়?
কম্পনের কথা মনে পড়ায় আরো একটা কথা মনে পড়লো। সামারে ইয়ার্কি মারতে মারতে হাওয়ারা মাঝেমধ্যে ধর্মঘট ডাকে। তেমন দুপুরে পুকুরের নিস্তব্ধ জলে কম্পন উঠলে তুমি বললে সরিসৃপ...। আমি ফিরি, তুমি ফেরো... সামারের মধ্যদুপুরে আমরা ঠকঠক কাঁপতে থাকি টি-বাগানের টিনের চালায়।
এইসব বেহায়া কাঁপাকাঁপি রেখে তোমাকে আজ কোন জনপদে খুঁজি? এখন আমার শুধু তোমাকে মনেই পড়ছে না, কথাও বলতে ইচ্ছা করছে। ছাই রঙ আমার দেশে দরজা বন্ধ করার মতো একটি দরজা অন্তত আমার আছে। তার ভিতর গোপনে কাঁপি। কিন্তু দরজাবিহিন জনপদের হীম কম্পন কি করে থামাই?


মা

হেমন্তেই ঝরাপাতা ঝরে। মানুষ ঝরাপাতা নয় যে
হেমন্তেই ঝরবে। সুতরাং ঝরে সারাটি বছর।
ভোরে, মধ্যরাতে, মধ্যদুপুর কিংবা সন্ধ্যায়।
এতোসব ঝরাঝরি রেখে তাঁকাই,
কেউ হাসে; মলিন মুখে মাথাসহ অবনত হয়,
হবেইতো...মানুষ যে!

এসেছিলাম বলে আমিই কিন্তু প্রথম নয়
তারো তারো আগে কতোশত এসেছিলেন এখানে!
কলাপাতা মুখ, জলপাইপাতা মুখ
দ্রাবিড়-সাঁওতাল-তামাটে
মা, বন্ধু, সহজন-প্রিয়জন...
একটু আড়ালে গেলে যদি বলো 
তিনি আর আমাদের মাঝে নেই
বুঝে ওঠি; তিনি কতো বেশি আমাদের মাঝে আছেন,
রক্তে, স্বেদে, গোপন আবেগঘন তিরতির রোমকূপের কম্পনে।
তিনি মানে মা, বন্ধু, সহজন-প্রিয়জন...

এই যে আছি; আমরা, জোনাক আলোয়
কাচকাটা চোখের জলে জ্বলি
টানেলের কুপে আটকে
একথা সেকথা কতো কথা বলি
কিন্তু কী জ্বলি; কিংবা বলি?
প্রিয় প্রিয়... প্রিয়তি মুখ
কোনও কিছুই হারায় না। প্রবল প্রবালে জড়িয়ে থাকে
বলে ঈর্ষায়, মর্মবেদনায়, ব্যর্থতায় সুর তুলি
তিনি আর আমাদের মাঝে নেই...
তিনি মানে মা, বন্ধু, সহজন-প্রিয়জন!

 কেউ কেউ কাজের ঘরে থাকে; পিতা শষ্যের ক্ষেতে
                             কেউ কেউ বিমানের পাখনায় উড়াল; মা নিকানো উঠনে 
তুমি তুমি তুমি...
এই যোগ সেই যোগ কতো যে প্রতিযোগ
সকাল নেই; বিকেল নেই; ঘূর্ণিরকালে নিদ্রাও নেই!
সবকিছু আছে বলে শুধু তুমি নেই। তুমি কী জানো ?
ঘরের পাশে বন্ধুর বাড়ি
পা ফেললে মা
সময় নাইরে সময় নাইরে
ওরে আমার শ্যামা!

অক্ষর আছে। একটি সন্ধ্যা; মধ্যদুপুর কিংবা খুব ভোরও আছে।
আছে বলে হাহাকার সংক্রমিত হয়,
আদ্রতা জাগে বুকে; চোখে; তোলপাড় হয়ে যাওয়া রক্তের শিরায়
মা, বন্ধু, সহজন-প্রিয়জন যে!

এতো এতো... এতো অধিক যারা থাকেন
ফলে জোনাক আলোয় তাদের দিকে যাই, বাতিল
সভ্যতায় জলপাই-কলাপাতা মুখ খুঁজি
সন্ধ্যার আকাশে তীক্ষ্ম ছুরির ফলায় জল কাটি
হেই... জগতের রঙ্গ নাটাই হাতে আর কতো খেলিবে তুমি!
আজকে আমার মন পুড়েছে চোখ পুড়েছে
আজকে আবার আকাশ পথে রঙ উড়েছে
আজকে তোমায় দিলাম আমি ছুটি
তুমিও দেখি মায়ের সঙ্গে বেঁধে নিলে ঝুটি!!

ঝরাপাতা ঝরবেই হেমন্তে
আর মানুষেরা সারাটি বছর।
তার মানে এই নয় তিনি আর আমাদের মাঝে নেই
তিনি মানে মা, বন্ধু, সহজন-প্রিয়জন
ঝরে গেলে তারাই সবচেয়ে বেশি থাকেন 
মানুষের নীলবর্ণ রক্তের শিরায়...

 

বাড়ি ফেরা

সন্ধ্যা হলে পরে কিংবা তারো আগে বাড়ি ফিরি। অকারণে 
বাড়ি ফিরতে ভালো লাগে। কারন হয়তো আছে ধুলোয় 
মোড়া মাকড়শার ঝুল জালের ছায়ায় লুকানো, আর দশ
জনের যে রকম থাকে। আমার স্বকীয়া-পরকীয়া কিংবা 
অবৈধকীয়া কোনটাই নেই। সংসার-সন্তান তাও নেই। কিন্তু
বাড়ি ফিরতে ভালোলাগে, বাড়ি ফিরি।

প্রতিদিন ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরলে ফুরফুরে লাগে মন।
আমার জন্য কেউ দরজা আগলে অপেক্ষায় থাকে না।
প্রশ্ন কিংবা উৎকণ্ঠাও নেই কারো। বাড়ি না ফিরলে
আমার জন্য কেউ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে না। 
কিন্তু আমি বাড়ি ফিরি।

শীতের আবেশ লেগেছে। তীব্র রোদের পর বৃষ্টি 
হলো দুদিন। নিঃসঙ্গতা আমি ভালোবাসি না। 
তার মানে স্বশব্দ হলাহলও পছন্দ নয়।
আড্ডারু বন্ধুদের মনে পড়ছে। সন্ধ্যার পানশালায়
আমারও বছর বছর কেটেছে। আমারও সহস্র রাত
আধো আলো; আধো অন্ধকারে গেছে। কিন্তু বাড়ি ফিরেছি।
ফিরিয়েছি আরো আরো কতো সহজনকে!

এখন সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরা মানে পুলিশ-র‌্যাব আর
উটকো নিরাপত্তাকে ফাঁকি দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফেরা।
নিরাপদে বাড়ি ফিরেছি। কাল ফিরতে পারবো কি-না 
জানি না। এই ঘর থেকে ওই ঘরে উঁকি দিচ্ছি। পাশের 
বাড়ির পানির ট্যাঙ্ক পূর্ণ হয়ে ঝুম বৃষ্টি নামলো যেন।
এতোটাই স্তব্দতায় আছি, এই শহরে বড় বেমানান
আমার বাড়ি। হাওয়ার শব্দও বুকে লাগে যেন।

আমার সহজনেরা কি চমৎকার নাগরিক হয়ে উঠেছে।
সকালে হাটতে বেরনো, সন্ধ্যায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ডিনার
পার্টি। ছুটিতে খুঁজে ফেরা বিরল রিসোর্ট...
আমি কিছুই পারি না। শুধু বাড়ি ফিরি। আমার জন্য
বাড়িও অপেক্ষায় থাকে না। আমিও না। তবু ফিরি...বাড়ি ফিরি।


কিচ্ছু ভালো লাগে না 

খুব পুরনো হয়ে উঠছি। অকেজো। ভার্সন পাল্টে গেলে 
প্রসেসর যেমন কাজ করে না, আমার বেগ আর আবেগ
তেমন সীমানায় পৌঁছে গেছে। থমকে আছি।
এমন কি তোমার হাহাকার আকুলতাও  ঘরমুখো করে না
আমায়। ঘরে ঘরে শিল-পাটায় বিপ্লব ঘটে গেছে।
শামুক-ঝিনুক এখন বৃষ্টির অপেক্ষায় না থেকে
প্রয়োজনে মেলে ধরে তৃষ্ণার হা।
এতো বড় হা— কাফন কাপড়ের শুভ্রতায় শুধুই 
মরুর কাকর, শুধুই বর্বর মুখের বিকৃত ব্যবচ্ছেদ।
প্রয়োজন মুছে দিচ্ছে  হাজার বছরের টোটেম-ট্যাবু।
প্রয়োজনে মুছে যাচ্ছে মাশরুমের আশ্রয়ে থাকা জল, থেতলে 
যাচ্ছে কাঁচকাটা রোদের হাসি, হাত পাখার ভোগাছ প্রতিক্ষা।

খুব অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছি। এবং স্থবির। সিম-রিম পাল্টানোর
মতো দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যগুলো। এতো দ্রুত; দৃষ্টি বদলে
নেয়ারও অধিক দ্রুত। তরঙ্গ জালে খুঁজে নিচ্ছি রাতের আশ্রয়,
দেহের উষ্ণতা, তৃষ্ণার আইসক্রীম।
বাতিল হয়ে যাচ্ছি, অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছি
আমার আর ঘর ভালো লাগে না— কিচ্ছু ভালো লাগে না!


প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস

সবকিছু বিশ্রুত হয়। গ্লাসের শব্দ,
জলের শব্দ, মুখের রেখা...
পারিনা কিছুই ঠেকাতে

অনার্যের পদরেখা— খোলাবুকে ছাপ নেই
সহস্র বছরের ধ্যানী পথ
ন্যুব্জ দেহে ঠকাস ঠকাস ধ্বনি তোলে
ঘোড়ার খুরের শব্দ, হাতলাঠির শব্দ
তোমার নীরব দৃষ্টির শব্দ... 

সহস্র সহস্র বছর শুধু রেখাপথ
মাথার চুলে কতোকাল বিলি কেটে দেয়নি মা
মহাস্থানগড়ে কুণ্ডলি পাকানো নিদ্রা
তার আর শেষ হয় না।

সবকিছু চিনি, সবকিছু জানি, কিছুই বুঝি না
আরাধ্য আকাশের জখমে অশ্রু ঝরে, রক্ত ঝরে
বৃষ্টি, রোদ, মেঘ আর হাওয়া।

কোথা থেকে নেমে এলো পথ
অনার্য আদিম রঙে বয়ে গেলো আরাকান
হয়ে নীল পাথরের পুরীর দিকে

শূন্যতা ওড়াতে ওড়াতে দৃষ্টির শেষ বিন্দুও
কীভাবে যে মিশে যায়... 


যে জন্ম পাখিদের সে জন্ম মানুষের নয়

বিষাদের ছায়া কার; ঘর ভাঙে জোছনা আলোয়
এতো অপচয়; হাহাকার শব্দ জুড়ে 
পিরামিড সভ্যতা আসে।
এইসব চোখগুলো; হাতগুলো; মাথা আর মেধাগুলো
রাত জাগে দিন যায়— রোদের উলকি এঁকে
ভেসে যায়
          যায়
                        কোথায় যে যায়...

আসলে আসতে থাকে,
বেলুন সভ্যতা ঠোঁট নাড়ে— আর নাড়ে দুধের কম্পন।
কিছুই হারায় না কারো বুকের বিশাল
ত্রিশালের পথ ধরে প্রাচীন বাতাস
                              কড়া নাড়ে পুরনো কপাটে।
অচেনা অজানা লাগে পরিচিত মুখ,
হায় সুখ— রোমকূপের জ্বালায় তীব্র হয়
দেরাদুন চৌচির আকাশ।

সভ্যতার যেনো শেষ নেই
টেরাকোটা নকশায় বসে পড়ে মুখ,
খোদাই খোদাই স্মৃতি
মার্জনা করো মাগো—
যে জন্ম পাখিদের
            সে জন্ম মানুষের নয়...


প্রণম্য মাটিরে বলি মা

হাতজোড় আকাশ নেমেছে 
                    ভুবনেশ্বর পাড়ায়,
দখিন হাওয়া উত্তরে পাঠায় সমুদ্রের নীল
কানে-কানে চোখের উচ্চারণে বলা হলো
                                    ভালোবাসি।

প্রণম্য মাটিরে বলি মা,
নাড়িছেঁড়া চিৎকার মা— তুমি
কোন নৈঋত প্লাবনের ফেনায় মাখা 
শিখরের সুখ?

কালোহাঁস পাখনায় মেখে ভেসে এলো
পাখিরাজ ডিম্বের উত্তাপ।
সেইখান থেকে ফেটে— ছুটে আসে রশ্মির
জ্যোতি। সেইখান থেকে হিজলের তলায়
ব্রীড়ানত কৃষ্ণের ছায়া।
                       তারপর সুখ—
তারপর শীৎকারের বৈয়াম ভেঙ্গে 
চক্রের শেষ— চক্রের শুরু...


তাকিয়েছি সামনেরও সামনে

জন্ম আমারে পেছনে ফেরায়নি; তাকিয়েছি সামনেরও সামনে,
বশ্যতা মানেনি হোলিরঙ রক্তের অসীম
পুড়ে ক্ষার সাধের রুমাল।

মধ্যপথ— তুমি শেষপথ; বারবার পেছনে ফিরেছো,
চোখের আকাঙ্ক্ষা ব্রাশ মেরে গেছে পথশূন্য ধূলির হাওয়ায়।
আমার ঘুম; হার্ট-এ্যাটাক শেষে জেগে ওঠে,
হাতড়াই; এগুতে এগুতে রোমকূপের শিরা বেয়ে নামে 
কষ্টজল, চোখ কাঁদে না— কেঁদে ওঠে ঘৃণার সিংহাসন।
আমার অস্তিত্ব যে মিশেছিলো জলবাষ্প 
                        মাটির কণায়;
তার ওপর ব্রাশ মেরে গেছে চোখ; চোখের ক্যানভাস।

বিশ্বস্ত কোন স্মৃতি নেই আমার, পিছনে ফিরি না।
কৌমের গর্ভ থেকে বের হয়ে এসে রক্তের অনার্য শব্দে
বিসর্জন দিয়ে ফেলি কৌমার্য। কাঁদি— কুমার আমি
কৌমার্যের শোকে প্রার্থনায় নত হই। ঈশ্বর আসন
ছুঁয়ে টান মারি সপ্তমণ্ডল নাড়ির বন্ধন।
আমার রক্তস্বেদ শুষে নিয়েছে
বন্দর খালাসির বেনিয়া বন্ধন।

প্রার্থনার জায়নামাজ হেরে গেছে ঘৃণার কৃষ্ণ পাথরে,
শ্যাওলা ত্বকের শিরায় ফোসকা ফেলে আবাবিল প্রস্তর।
আমিতো প্রস্তর বাহিত কেউ নই, তামাটে যুগের শেষে
চোখ যায় পাস্তুরিত এনামেল দরোজায়।

এতো ঘৃণা— জন্ম মানি না; অথবা বিধান,
তুমুল-তুখোড় সুন্দর হাহাকার
তুমি আমার যাত্রাপথে ঝুলিয়ে রেখেছো
অবিনশ্বর মরণফাঁস— গোলবৃত্ত চাকতি... 

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।