দুপুর ০৩:০৯ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৫ নভেম্বর, ২০১৮  

জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা কার পকেটে?

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জাকিয়া আহমেদ।।

অনেক আশা আর কাজ করার প্রত্যয় নিয়ে শুরু হলেও ব্যাপক দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ আত্মসাতের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিল বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ গত ছয় বছরে রাজস্ব খাত থেকে এই তহবিলে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৯০০ কোটি টাকা!

মোট বরাদ্দের ৩৪ ভাগ টাকা স্থায়ী আমানত হিসাবে জমা রাখা হয়েছে। বাকি টাকা দিয়ে কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, কিছু চলমান। তবে এসব প্রকল্প মানুষের কী উপকারে এসেছে তা নিয়ে বিতর্ক চলছে তিন বছর আগে থেকেই। সেই সঙ্গে রয়েছে তহবিলের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। নামসর্বস্ব প্রকল্প দেখিয়ে কর্মকর্তারা পকেটে ভরেছেন কোটি টাকা।

এসব কারণে এই ট্রাস্ট ফান্ড আশানুরূপ ফল দেয়নি। উল্টো এটা এখন 'বোঝা’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি বলেই এখন এ অবস্থা। প্রজেক্টে কোনও বিশেষজ্ঞ প্যানেল নেই, কারা মনিটর করবে সে বিষয়ে কোনও দিক নির্দেশনা নেই। অথচ এখানে নিজস্ব এক্সপার্ট টিম থাকা উচিত ছিল। অন্যথায় জনবল নিয়োগ দেওয়া উচিত ছিল শুরুতেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যেকটি প্রজেক্টে স্থানীয়দের 'ওয়াচ ডগ' হিসেবে রাখা যেত। তারা রিপোর্টও করতো। এখানে কিছুই করা হয়নি। এ সব কারণেই জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের এ অবস্থা।

বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০১৩ অনুযায়ী, আগামী ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিতে অবস্থানকারী শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও ক্ষতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশলপত্র এবং কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) ২০০৯ প্রণয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় রাজস্ব বাজেটের তহবিলে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) এবং অ্যানক্সভুক্ত উন্নত দেশসমূহ প্রদত্ত জলবায়ু পরিবর্তন বাবদ উন্নয়ন সহায়তার অতিরিক্ত ও নতুন তহবিল ব্যবহারে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ড (বিসিসিআরএফ) গঠন করে।

অপরদিকে, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ডেও (বিসিসিআরএফ) বিশ্ব ব্যাংক আর সহায়তা করবে না বলে জানা গেছে। এমনকি উন্নত দেশগুলোও ২০১৩ সালের জানুয়ারি ‌‌‌থেকে এখানে বরাদ্দ দিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।

খোদ সরকারই জলবায়ু তহবিলে দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মনের প্রমাণ পেয়েছে। গত জানুয়ারিতে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কেউ টাকা মেরে দিয়েছে, কেউ শুধু নামেই কাজ করেছে কেউবা আবার প্রকল্পের দেওয়া শর্তের বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করেনি। সরকারের জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল থেকে বরাদ্দ পাওয়া ৫০টি প্রকল্পেরই এ চিত্র পাওয়া গেছে।

এ ছাড়াও, ২০১৩ সালে পরিকল্পনা কমিশনের বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনে সরকারি ব্যয় নামে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু তহবিলগুলোর মাধ্যমে ব্যয় করা অর্থের বিশাল অংশই ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি ও সমন্বয়হীনতার কারণে ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছায় না।

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট সূত্র থেকে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলে ২০০৯-২০১০ থেকে ২০১১-২০১২ পর্যন্ত তিন বছরে ২১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর ২০১২-১৩ অর্থবছরে সেটি কমিয়ে ৪০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের নির্দিষ্ট কোডে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে দেওয়া হয়েছে ১০০ কোটি টাকা।

জানা গেছে, গত ১ এপ্রিল বন ও পরিবেশমন্ত্রী যিনি আবার জলবায়ু ট্রাস্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তিনিসহ সব সদস্যের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেখানে বলা হয়েছে, 'বর্তমানে যেভাবে তহবিলটি চলছে তাতে এটি আর বহাল রাখার কোনও যৌক্তিকতা আমি দেখতে পাই না।’একইসঙ্গে ফান্ডটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জানালা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হযেছে বলেও অর্থমন্ত্রী চিঠিতে উল্লেখ করেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. জাকির হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বছর বাজেটে ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য টাকা কমে গেছে। বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ড (বিসিসিআরএফ)-এ ২০১৬ সালের পর আর বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবে না। আর সরকারিভাবে ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে এখানে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ হাজার কোটি টাকা এই ট্রাস্ট ফান্ডে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রজেক্ট ২৯৩ কিংবা ২৯৪টি।

২১০০ কোটি টাকা খরচ হলেও আশাপ্রদ কোনও ফল পাওয়া যায়নি। অপরদিকে এখানে ঝুঁকি ও দুর্যোগকে প্রাধান্য না দিয়ে মন্ত্রণালয়গুলো কাজ নিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন জাকির হোসেন খান।

জলবায়ু তহবিলের মূল্যায়নপত্র কিংবা ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত কখনই প্রকাশ করা হয় না বলেও জানান তিনি।

জাকির হোসেন খান আরও বলেন, সব ধরনের জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত যেখানে সব ধরনের স্টেক হোল্ডারের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্যসূত্রে জানা যায়, শুরুর দিকে এই তহবিল ভালোই কাজ করছিল। কিন্তু ২০১১ সাল থেকে এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম অভিযোগ উঠতে থাকে, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে নানা প্রকল্পে আর তারপর থেকেই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই তহবিল বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেয়।

দুর্নীতি জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জ্ঞান রঞ্জন শীল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এগুলো সব প্রোপাগান্ডা। বেসরকারি উন্নয়নসংস্থাগুলো (এনজিও) কাজ পাচ্ছে না বলে এ ধরনের কথা রটাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘এখানে অনিয়মের কিছু পাইনি। দুর্নীতি-অনিয়মের সুযোগ নেই। কিছুদিন আগেও তিনটি প্রজেক্ট আমি নিজে পরিদর্শন করেছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়গুলো বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করছে, আমরা শুধু তাদের টাকা দিচ্ছি।’

অর্থমন্ত্রীর চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না জানান বাংলা ট্রিবিউনকে।

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।