সকাল ১০:১৮ ; রবিবার ;  ২১ এপ্রিল, ২০১৯  

ক্যাম্পাস ধানমণ্ডি লেক!

প্রকাশিত:

ইরতিজা নাসিম।।

ব্যস্ত শহর ঢাকার প্রসিদ্ধ এলাকা ধানমণ্ডি। বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে আধুনিক শপিংমল, রেস্তোরাঁ, মেগাশপ এখানে হাতের নাগালে। পাশাপাশি দেশের বেশ কয়েকটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ধানমণ্ডিকে দিয়েছে বাড়তি জৌলুস। এই এলাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ভবন, তথ্য-প্রযুক্তিসহ নানা সুযোগ সুবিধার ঘাটতি না থাকলেও নেই সবুজে ছাওয়া মনোরম ক্যাম্পাস। তবে ‘বিকল্প ক্যাম্পাস’ আছে ঠিকই। শিক্ষার্থীদের এক টুকরো ক্যাম্পাসের অভাব পূরণ করছে ছায়াঘেরা প্রকৃতির বিস্ময়-ধানমণ্ডি লেক। বিশেষ করে রবীন্দ্র সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই কমন ক্যাম্পাস।

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে চলে জম্পেশ আড্ডা, খানাপিনা, ঘুরে বেড়ানো ও দল বেঁধে পড়াশোনার পর্ব। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এ মিডিয়া স্টাডিজ এন্ড জার্নালিজম বিভাগের ছাত্র সজল বার্নাবাস রোজারিও বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অনেক অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা পাই। ধানমণ্ডিতে আমাদের ক্যাম্পাসই তুলনামূলকভাবে ভালো। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বড় খোলামেলা জায়গা নেই। এখানকার কোনও বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই। ভবনগুলো অনেকটা বাসার মতো। তাই ধানমণ্ডি লেকের বিভিন্ন জায়গা, বিশেষ করে রবীন্দ্র সরোবরসহ আশেপাশে আমরা মাঝে মাঝে সময় কাটাই।’ 

জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে ৮ নম্বর রোড হয়ে কলাবাগানের পাশ ঘিরে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর পর্যন্ত লেকের বিস্তার। ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর সড়ক পর্যন্ত গেছে এর শেষাংশ। লেকের বিভিন্ন পয়েন্টে গড়ে উঠেছে আড্ডা দেওয়ার দারুণ কিছু স্পট। এর মধ্যে ৮/এ এলাকায় অবস্থিত রবীন্দ্র সরোবরে মানুষের সমাগম বেশি। যাদের বড় একটি অংশেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

সরোবরের পাশঘেঁষা ধানমণ্ডি ৮ নম্বর ব্রিজের ওপর নবনির্মিত ফুটওভার ব্রিজটি এলাকায় এনে দিয়েছে বাড়তি নান্দনিকতা। এতে সবসময়ই চলে গল্প, আড্ডা আর ছবি তোলা। সন্ধ্যায় এর আলোর কারুকার্য মুগ্ধ করবে যে কাউকে। শুধু যে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকলে আড্ডা চলে তা নয়, রাতেও আসেন অনেকে। অনেক শিক্ষার্থীই থাকে ধানমণ্ডির আশপাশের এলাকাগুলোর মেসে বা বাসা-বাড়িতে। তবে নতুন শিক্ষার্থীরাই লেকে বেড়াতে আসে বেশি।

লেক ভ্রমণের ষোলকলা পূরণে রবীন্দ্র সরোবরে আছে বেশ কিছু খাবারের দোকান। পসরা সাজানো থাকে কাবাব, চটপটি আর ফুচকার। শিক্ষার্থীদের কাছে গরুর দুধের চা-ই যেন বড় আকর্ষণ। বিশেষ করে রবীন্দ্র সরোবরের এসে এ চায়ে চুমুক না দিয়ে পারা যায় না। খাবার মুখরোচক হলেও কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত তা নিয়ে অবশ্য নাক কুঁচকান অনেকেই।

সহপাঠী, অগ্রজ, অনুজদের জন্মদিন, র‌্যাগ ডেসহ নানা অনুষ্ঠানের মিলনায়তন এই রবীন্দ্র সরোবর। পুরনো শিক্ষার্থীরা পুনর্মিলনির জন্য বেছে নেয় সবুজে ঘেরা এ স্থান।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক ছাত্র নাফিজ হাসান বলেন, ‘আমরা পুরনো সহপাঠীরা মাঝে মাঝে রবীন্দ্র সরোবরে মিলিত হই। এই বদ্ধ শহরে মনোরম পরিবেশে সময় কাটানোর দারুণ জায়গা এটি। এ ছাড়া লেক আছে, পার্ক আছে, মুক্তমঞ্চ আছে। সবমিলিয়ে ভালো লাগার মতো একটি জায়গা।’

তবে লেকের রক্ষণাবেক্ষণ এমনভাবে হওয়া উচিত যেন পরিবারের সবাই স্বাচ্ছন্দে এখানে আসতে পারে- এমন প্রত্যাশা নাফিজের।

শুধু ধানমণ্ডি এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাই নয়, মাঝে মাঝে অন্যান্য এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও মিলিত হন স্থানটিতে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ করে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র আনিসুল ইসলাম তুহিন জানান, ‘আমার বন্ধুমহলের অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক, ইউল্যাব, বুয়েট, ইউআইইউ, আইইউটি, ড্যাফোডিল, স্ট্যামফোর্ড, জগন্নাথ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। হঠাৎ করেই কয়েকদিন আগে সবাই একসঙ্গে মিলিত হওয়ার পরিকল্পনা করি। চেয়েছিলাম যানজট ও কোলাহলমুক্ত মনোরম পরিবেশ। আর তাই রবীন্দ্র সরোবরকেই বেছে নিই। ঢাকা শহরে লেক আর গাছের এমন পরিবেশ আর কোথায় পাবেন!’   

বিকেলে রবীন্দ্র সরোবরে কানে আসবে বাঁশির সুর। কেউ মগ্ন হয়ে সেটাই শুনছে। কেউ বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানোর খেলায় মজে আছে। কেউ নিজেরা গান করছে। কেউ আড্ডায় বাদাম চিবোচ্ছে। কোনও এক পাশে হয়তো চলছে নাটক সিনেমার শ্যুটিং। এমন কি ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলোপমেন্ট অল্টারনেটিভ এর চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের ল্যান্ডস্কেপ আকার  প্র্যাকটিসটাও কিন্তু এখানেই চলে নিয়মিত।

বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখ সহ প্রায় সব দিবসেই রবীন্দ্র সরোবর সাজে উৎসবের আমেজে। চলে কনসার্ট, পিঠা উৎসবসহ হরেক অনুষ্ঠান।এ ছাড়াও প্যাডেল নৌকায় ঘুরে লেক উপভোগ করা তো আছেই।

শিক্ষকরাও কখনও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আড্ডাকে করেন আরও প্রাণবন্ত। তখন এটি যেন হয়ে যায় আরেক টিচার্স স্টুডেন্টস সেন্টার তথা টিএসসি।

লেকে শরীরচর্চার সরঞ্জামও আছে। কোনও ফি ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। শিক্ষার্থীরা সাধারণত সুযোগটি হাতছাড়া করে না।

রাজধানীর বদ্ধ পরিবেশে কর্মব্যস্ত একঘেয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে একটুখানি প্রকৃতির চাদরে গা এলিয়ে দিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন প্রবীণরাও। আড্ডায় মেতে ফিরে যান শৈশবে।

শিক্ষার্থীসহ অনেকেই মনে করেন লেকের সৌন্দর্য আরও বাড়তো যদি এর রক্ষণাবেক্ষণে যত্ন করা হতো। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা, সন্ধ্যার পরে লেকের অনেক স্থানেই আলোর স্বল্পতা, নেশাখোরদের আড্ডা ও নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ অনেকের।

ধানমণ্ডি লেককে দেশের অন্যতম একটি সম্পদ আখ্যায়িত করে বেড়াতে আসা অ্যাডভোকেট আবদুল লতিফ বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে এ রকম একটি স্থানকে অনেক ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। আর আমরা সেখানে ময়লা ফেলি। লেকের পরিবেশ দূষিত করি। আবর্জনার কারণে লেকের পানিও দিন দিন নোংরা হচ্ছে।’

/এফএ/এফএএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।