রাত ১০:৫৮ ; রবিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৮  

চামেলি || মূল : কাজী আনিস আহমেদ || অনুবাদ : মুহম্মদ মুহসিন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

গলির একেবারে মাথায় বাড়িটি। চতুর্দিক গাছপালায় ঢাকা। দীর্ঘ লেকের বেশ প্রশস্ত একটি অংশ বাড়ির ঠিক সামনেই। বাড়িটির নির্মাণকাজ তখনও অসমাপ্ত। ১৯৭০-এর হেমন্তে অনেক লোকজন আসল, নির্মাণ সরঞ্জাম নিয়ে মই বেয়ে উপরে উঠল এবং ধেয়ে কাজ শুরু করল। একতলা দালানটি হালকা নীল রঙে নেয়ে উঠল। গলির আরো অনেক বাসায় কাজ করা প্রায় অন্ধ এক মালি বাড়ির জংলা আঙিনাটা পরিষ্কার করল।  
গালিব ছাড়া গলির আর কোনো ছেলেরই ঘটনাটি খুব একটা চোখে পড়েনি। বাড়ির চেয়ে মূলত বাড়ির মানুষগুলোই গালিবের চোখ টেনেছিল। প্রথমে সে দেখেছিল বাড়ির মালিককে। দূর সীমানার দিকে চোখ রেখে হাঁটা এক দৈত্যাকার লোক। পরের দিন গালিব ফুটবল ম্যাচ থেকে ফিরে তাদের বাড়ির দরজা খোলার মুহূর্তে হঠাৎই দেখল গোধূলির আলো-আঁধারি রাস্তায় ছায়ার মতো কেউ যাচ্ছে। নীল জামা, সাদা শরীর এবং দীর্ঘ দোলোনো এক চুলের বেণীর সেই ছায়াশরীর ঐ নীল বাড়িটির মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। দেখাটা মাত্রই এক মুহূর্তের। তবে মুহূর্তটা গালিবের মাঝে দীর্ঘ হতে চাইলো এবং ‘আরো যদি দেখা যেতো’ এমন একটি অনিঃশেষ আগ্রহ জাগিয়ে তুলল।
এই মুহূর্তের আগে পর্যন্ত গালিবের নিত্যদিনের আগ্রহের বস্তু ছিল ফুটবল। ফুটবল ছাড়াও খেলনা গাড়ি, ঘুড়ি, স্ট্যাম্প সংগ্রহ, মুদ্রা সংগ্রহ ইত্যাদি নিয়েই থাকতো তার মনোরাজ্যের সকল ব্যস্ততা। একবার এক খেয়ালি আবেগে বাড়ির মালিকে ওস্তাদ ধরে সে পূর্ণ ব্যর্থতায় একটি পূর্ণ ঋতু অতিবাহিত করেছিল পাখিদের ডাক নকল করে পাখিদেরকে নিজের কাছে টেনে আনার চেষ্টায়। স্কুলের দেয়া বাড়ির-কাজে তার কখনও মন ছিল না। ফলমূল আর ভিটামিনযুক্ত খাবারদাবারেও একইরকম অনাগ্রহ ছিল। তবে এ ক্ষেত্রে তার অনাগ্রহের চেয়ে বড়দের আদেশ ও আগ্রহের শক্তি বেশি হওয়ায় পরাজয় মেনে সেগুলো গিলতে হত। হালে তার ভিতরে গজাতে শুরু করছিল নারীর শরীর নিয়ে একটি ঝামেলা-জাতের আগ্রহ। অবশ্য সে আগ্রহজাত আনন্দকে উপলব্ধির জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানরাজ্য পর্যন্ত সে তখনো পৌঁছায়নি। 
পাশের বাড়ির এই ছায়াশরীরি মেয়েটিকে দেখার মুহূর্তের পর থেকে তার জীবনটি যেন হঠাৎই একক থেকে দ্বৈত হয়ে উঠল। এই দ্বৈতরূপের এক রূপে সে চাচ্ছিল তার পিছনের ফুটবল, ঘুড়ি ইত্যাদি ধরে রাখতে। কিন্তু দ্বিতীয় রূপটি প্রথম রূপের এই কর্মটি বেশ কঠিন করে তুলছিল। কয়েকদিন পরে তার চোখের ভাগ্যে আবার সেই তন্বীমূর্তির সন্দর্শন ঘটল। তারপর চিত্রটি এমন হল যে গালিব সকাল সাতটায় গেট থেকে বের হয় আর মেয়েটিও একই সময় তার গেট থেকে বের হয় যদিও তার স্কুলে যাওয়ার সময় আরো অনেক পরে।
ইতোমধ্যে গালিব মালির কাছ থেকে জানতে পেরেছে যে মেয়েটির নাম চামেলি, সে জাতিতে পাঞ্জাবি এবং তার মা নেই। পাঞ্জাবিদের এমন নাম হয় না এবং গালিব ভাবতেও পারছে না যে মেয়েটি পাঞ্জাবি। প্রত্যেক সকালে বাবা-মেয়ে একত্রে বের হয়। বাবার গায়ে সাদা শার্ট আর টাই। মেয়ের গায়ে স্কুলড্রেস। গালিবকে দেখলেই মেয়েটি তার চুল ঠিক করা বা কোনোকিছু আঙুল দিয়ে দেখানোর ছুতায় তার হাতটি বাবার হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়। এই ছোট্ট অর্থবহ আচরণটুকু গালিবের বারো বছরের বুকটুকু পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার জন্য আশায় ভরিয়ে রাখে। 
দুই সপ্তাহ পরের কথা। গালিব স্কুলের সিঁড়ির উপর দিয়ে লাফ দিয়ে নামার বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে পায়ের গোড়ালিতে মোচড় পেয়েছে। প্রথমে এই বলদামির জন্য নিজের ওপর তার বেশ বিরক্তিই লাগল। পরে দেখল এ শাপেও বর আছে। তার এখন আর চামেলির সাথে দেখা হওয়ার আগের জীবনের ফুটবলের যন্ত্রণায় বিকাল হলেই দৌড়াতে হয় না। বরং, এখন যখন খুড়িয়ে হাঁটার মতো যোগ্যতাটুকু অর্জিত হল তখন সে চামেলিদের আর তাদের বাড়ির মাঝখানের নিরাপদ এলাকাটায় এসে দাঁড়ানোর বা লেকের পাশে হাঁটাহাঁটির একটা সুবিধা অর্জন করল। ইতোমধ্যে তাদের চোখের ভাষার যোগাযোগ শুরু হয়েছে। কিন্তু আরো আগানো কেমনে যায় তা তার মাথায় কুলোচ্ছিল না। তার স্কুলটি পুরোপুরি একটি ছেলেদের স্কুল হলেও সে যে জীবনে কখনও মেয়েদের সাথে কথা বলেনি এমনটা না। পারিবারিক বিবাহ, জন্মদিন ইত্যাদি অনুষ্ঠানে অনেকবারই মেয়েদের সাথে তার ছিটেফোটা কথা হয়েছে। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু টাবুর বোনের সাথেও সে কথাবার্তা অনেক বলেছে। তবে দাঁতফাঁকা আর চড়া-গলার এই মেয়ের প্রতি খুব আগ্রহ গালিবের কখনোই হয়নি। ‘টাবু এখন কোথায়’— তার সাথে কথাবার্তা অনেকটা এইটুকুই।
প্রত্যেক বিকেলেই বাসা থেকে বের হওয়ার সময় গালিব মনে মনে রিহার্সেল দেয় চামেলির সাথে দেখা হলে সে কী বলবে এবং কী করবে। সময়টুকু পার হয় এবং সেই বলা বা করার দৃশ্যটুকু কখনও সম্ভব হয়ে ওঠে না। কোনো কোনো দিন চামেলি বাসা থেকেই বের হয় না। আর যেদিন বের হয় সেদিন সাইকেলখানা ভোঁ দৌড়ে গালিবের থেকে অন্যদিকে নিয়ে ছোটে। গালিবের চোখে চোখ ফেলতে অবশ্য তাকে এখনও আগ্রহীই মনে হয়। তবে চোখাচোখি পর্যন্তই। এর বেশি কিছুর প্রতি তার কোনো আগ্রহ অনুমিত হয় না। এই চোখাচোখিটুকু যখনই হয় গালিবের কাছে তখন এর বাইরে দুনিয়ার সবটুকু যেন অন্ধকার হয়ে যায়। সেই অন্ধকার আকাশে তখন গালিবের একটিই তারা— চামেলি। গালিব বুঝতে পারে না চলমান ধারণায় না-মেলা এমন এক মেয়ের সাথে সে কীভাবে একটু কথাবার্তা শুরু করতে পারে। প্রতিদিনই দিনের শেষ আলোর রেখাটুকু তার এই ভাবাভাবি আর একা বসে লেকের পানিতে গঙ্গা-যমুনা খেলায় অর্থাৎ পাতলা পাথর বা চারা ছোড়াছুড়ির মধ্যে হারিয়ে যায়।
গালিবের পায়ের গোড়ালি সেরে গেছে। কিন্তু সে এখনো অল্প অল্প ব্যথা আছে বলে ভান ধরে বসে আছে এবং ফুটবল মাঠে যাচ্ছে না। তার ভাবনা এক বিকেলে সে চামেলির সাথে ঠিকই কথা বলে ফেলবে। আর তা না হওয়া পর্যন্ত বিকেলের ঘণ্টাগুলো নিয়ে তাকে তো অপেক্ষায় থাকতে হবে। সে ফন্দি করল কাজটায় সে মালির সাহায্য নেবে। বিকালে এই সময়টায় মালি সাধারণত বাগানের দেয়ালের পাশটায়ই কোথাও থাকে। পুরু প্রায় অস্বচ্ছ কাচের চশমাটা আর মাথাঢাকা মোটা ক্যাপটা পাশে রেখে দিব্যি ঘুমিয়ে আছে— এমন অবস্থাতেই হয়তো তাকে পাওয়া যাবে। জোঁক-পোকের কিছুতেই গা না-করা লোকটিকে বেশখানিক গুতিয়ে ঘুম থেকে তোলার পর লোকটি হয়তো তেমনই ‘কেনো, কে ওঠালো’— সেদিকে গা না করে প্রথমেই একটি বিড়ি ধরানোর আয়োজনে লেগে যাবে। তারপর বিড়িটা ধীরে ধীরে টানবে আর বলতে থাকবে চামেলির সাথে যোগাযোগের লক্ষে গালিবের কোন পথে আগানোটা ভালো হবে। অনেক চিন্তার রেখা কপালে ফুটিয়ে মালি বলবে: ব্যাপারটা অত সহজ নয়, এটি একটি বাগানের যত্নের মতোই বেশ সাধনার কাজ। বিড়িটা বটা হয়ে গেলে সে হয়তো এর থেকে দুই টান গালিবকে দিয়ে দিবে, আবার মুড ভালো থাকলে পুরো বিড়িটাই দিয়ে দিতে পারে।
একদিন মালির কাছ থেকে এমন সাধনা শেখার এক অধিবেশন চলছিল। অধিবেশনটা চলছিল গালিবদের বাড়ির বাহির-পাচিলের পাশে। এমন সময় চামেলিকে লেকের ধারে এই দিকটায় দেখা গেল। চামেলি অবশ্য এদেরকে লক্ষ্য করেনি। চামেলি অন্যমনস্কভাবে একটি ঢিল তুলে লেকের দিকে ছুড়ল। মালি গালিবের হাত থেকে বিড়িটা আস্তে ছাড়িয়ে নিল কারণ মালির মনে হল বিদিশা বেচারার হাতের মধ্যে জ্বলন্ত বিড়িটার ভর্তা হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। বিদিশা গালিব কাঁপতে কাঁপতে আগাতে থাকল যেদিকটায় চামেলি দাঁড়ানো সেদিকটায়। চামেলির পিছন দিকটায় মাত্র দু’তিন কদম দূরে সে দাঁড়াল। গালিব দেখল ঢিল ছোড়ার ক্ষেত্রে চামেলির শুধু টেকনিকেই সমস্যা না, তার তোলা ঢিলগুলোও সঠিক সাইজের ছিল না। সে দেখল চামেলির ছোড়া পাথর বা ঢিলগুলো পানির ওপর অনেক কষ্টে দুয়েক লাফ দিয়েই দম্বলের মতো ধপাস করে ডুবে যায়। গালিব একটি সঠিক সাইজের ও শেইপের পাথর বা হাড়িভাঙ্গা চারা জাতীয় বস্তু তুলে হাতে নিয়ে গিয়ে চামেলির সামনে ধরল এবং বলল: এটা দিয়ে চেষ্টা কর, আর বাহুর নয় বরং কব্জির মোচড়ে মারার চেষ্টা কর।
চামেলি জিনিসটা তার হাত থেকে নিল তবে যার কাছ থেকে নিল তার দিকে তাকাল না। জিনিসটা হাতে নিয়ে সে যেন পানিটাকে ভালো করে নিরীক্ষণ করছিল আর গালিব নিরীক্ষণ করছিল সেই নিরীক্ষককে। গালিব চামেলির এত কাছে কখনও দাঁড়ায়নি। কিছু একটা যেন গালিবের ইন্দ্রিয়গুলোকে অবশ করে তুলছিল। সেটা হতে পারে চামেলির গায়ের পাউডার কিংবা সুগন্ধি। হতে পারে কোনো কেমিক্যাল। কে জানে এই বয়সের মেয়েরাও মানুষকে অবশ করে দিতে কি-সব কেমিক্যাল ব্যবহার করে! চামেলি এক পা পিছনে গিয়ে দুই পা দৌড়িয়ে বস্তুটা পানিতে ছুড়ল। এটি পানিতে চারখানা বিশাল ঝম্ফ খেলিয়ে পানিতে ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল। চামেলি আনন্দে লাফ দিয়ে উঠল এবং বলল: দারুণ তো! তুমি তো ঠিক জিনিসটাই দিয়েছ!!!
গালিব আরেকখানা চারা বা পাথর এনে দিল। চামেলি এবারও সফল। এরপর প্রতি বিকালে চলল চামেলির পাতলা পাথর বা চারা দিয়ে গঙ্গাযমুনা খেলার প্রশিক্ষণ। গালিব তাকে শেখাচ্ছে ছোড়ার সময় কীভাবে কোমর বাঁকাতে হবে এবং কোমরের মোচড় কীভাবে গিয়ে কাঁধ হয়ে কব্জিতে গিয়ে শক্তি যোগাবে। এক সপ্তাহ পরে একদিন পাথরটি ছোড়ার সময় হাতের ভাঁজটি কেমন হবে দেখাতে গিয়ে চামেলির বাহুটার ওপর গালিবের হাত রাখতে হল। এই ছোঁয়া থেকে তার মনের মধ্যে যে তড়িতায়ন ঘটল তাতে গালিবের রাতের ঘুম ব্যাহত হল। চামেলির স্নিগ্ধ ত্বকের ছোঁয়া, তার নিঃশ্বাসের ছন্দময় ওঠানামা রাতভর তার হৃদপিণ্ডটিকে ঘুমাতে না দিয়ে জাগিয়ে রাখল। চামেলি এখন তার হৃদপিণ্ডে পুরো ভক্তির আসনে বসে গিয়েছে। তবে চামেলির নিশ্বাস আর ছোঁয়া গালিবের শরীরে আবার এমন এক অনুভব জাগাচ্ছে যা ঠিক ভক্তির সাথে যায় না। চামেলিকে নিয়ে গালিবের আত্মার সাথে শরীরের কেমন যেন বনিবনা হচ্ছে না। 
পরদিন গালিব যখন গেট খুলে বের হচ্ছে তখন সামনে টাবু দাঁড়িয়ে। টাবুর কাঁধে ফুটবল খেলার বুট ঝুলছে আর মুখে চুইংগাম। ‘খেলার প্রাকটিসে কবে থেকে আসতেছ?’ ‘জানি না, যখন থেকে ডাক্তার বলবে’ গালিবের কিছুটা গম্ভীর উত্তর।
টাবু বলল— ‘এতদিনে পা তো নিশ্চিত ভালো হয়ে যাবার কথা। তোমাকে ছাড়া আমাদের কোনো স্ট্রাইকার নেই, আবার ম্যাচের তারিখও আগামী সপ্তাহে।’
‘সমস্যাটা তো পায়ে নয়, গোড়ালিতে। মনে হচ্ছে বেশ বড় ডাক্তার হয়ে উঠছ। এটা কতদিনে ভালো হওয়ার মনে হচ্ছে তা ডাক্তারের চেয়েও ভালো বুঝতেছ!’
‘না, ডাক্তার হয়তো হইনি। কিন্তু তোমার তো দেখছি লেকের ধারে চারা খেলতে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না’। টাবু কথাটি বলল এবং কিছু বোঝানোর মতো করে হাসল। টাবু দেখতে যে এত কদর্য তা গালিবের চোখে এর আগে কখনো পড়েনি। আজই চোখে পড়ল টাবু কী বেটে, কালো আর শুয়োরের মতো গন্ধা চামড়ার এক ছাওয়াল। তবে যা চোখে পড়ল তা মুখে না এনেই বলল— ‘যা- যা- গিয়ে নিজের কাজ কর। বলেই গালিব গেটটি জোরে নাড়িয়ে উঠল যেন গেটটিই টাবুর গায়ে ছুড়ে মারে। টাবু লাফ দিয়ে গেট ছেড়ে পিছন ফিরে বলল— ‘হ্যাঁ, আমাকে তো তোমার কাজ থেকে দূরেই পাঠাতেই হবে, কারণ তোমার কামখানা যে মাশাল্লাহ বেশ সুন্দর গোছের। তা অপেক্ষা করো— অগো সবাইরে গিয়া বলতেছি। তারপর সবাই এসে তোমার সাথে লেকের পানিতে চারা ছোড়াছুড়ি তথা গঙ্গা-যমুনা খেলি।’
গালিব আচানকই অনুভব করল তার চোখ রাগে যন্ত্রণায় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে আর তার গলাটা আটকে যাচ্ছে। টাবুকে বলা সম্ভব না চামেলি সম্পর্কে তার অনুভব। টাবু কিংবা অন্য কোনো বন্ধুরাই এখনো এ বোঝার অবস্থায় পৌঁছায়নি। ওরা এ বিষয়ে এখনো যথেষ্ট হাদারাম। জীবনের পবিত্র এই অনুভবের গৃহে এখনো ওদের পা পড়েনি। ফলে এ নিয়ে ওদের ভাষা এখনও নোংরা জগৎ পার হয়নি। তাই গালিব কোনোভাবে চাচ্ছিল না টাবুদের নোংরা শব্দগুলো চামেলির নামটা নোংরা করে ফেলুক। তবে এমন ভাবনা গালিব কোনোভাবেই টাবুদের কাছে খোলাসা করতে পারবে না। তাতে নোংরা হয়ে উঠবে আরো অনেক কিছু। তাই কোনোমতে নিজের এই আড়ষ্ট কণ্ঠের কাঁপাকাঁপি চেপে ধরে বলল— ‘চেষ্টা করব আগামী সপ্তাহ থেকেই খেলায় আসতে’।
টাবু হাঁটতে হাঁটতেই কাঁধ ঘুরিয়ে বলল— ‘ঠিক আছে চারা-খেলোয়াড়, আগামী সপ্তাহ থেকে তাহলে দেখা হচ্ছে’।
গালিবের এই গোপন জগতের খবর শুধু টাবু একাই এখন আর জানে না। গালিবের মা নিজেই একদিন তার কাছে ‘গলির ওপারের মেয়েটি’ সম্পর্কে জানতে চাইল। অবশ্য তার জানতে চাওয়াটা একটু অন্যরকম ছিল। সে বলল— ‘মেয়েটিকে একদিন বাসায় চায়ের দাওয়াত দিলে হয় না?’ মায়ের এই টেকনিকাল বলায়ও অবশ্য কাজ হল না। মনে মনে বলল— ‘না, আমি দাওয়াত দেব না। আমি চাই না তোমাদের কারোর সাথে ওর দেখা হোক। আমার আর ওর জগৎটা একেবারে আলাদা থাক, শুধু আমাদের থাকুক।’ গালিবের সে জগতে তার বাবা মা কেউই ঢুকতে পারল না। কেউ তার স্পর্শকাতর জগৎটি ছুঁয়ে ফেলে লজ্জাবতীর পাতার মতো গুটিয়ে দিতে পারল না।
এখনো মালিই তার এ জগতের একমাত্র মিত্র। বেশ নিষ্ঠার সাথে সে এখনো গালিবকে সবশেষ আপডেট দেয়: ‘চামেলি মেম আজ বের হবে না, বাবা খুব রেগে আছেন’, কিংবা ‘চামেলি মেমের ভীষণ মন খারাপ, তার কলমটা ভেঙে গেছে’, কিংবা ‘চামেলি মেম জানতে চেয়েছেন আপনি এই দুই দিন কোথায় ছিলেন’ ইত্যাদি।
কিন্তু চামেলির অবস্থাও কি গালিবের মতো এমন? সে কি জানে গালিব তাকে নিয়ে কত ভাবে? তার কি কোনো ধারণা আছে গালিব তাদের দুজনকে নিয়ে ভবিষ্যতের কতদূর পর্যন্ত তার কল্পনার ময়ুরপঙ্ক্ষী সাজিয়ে ফেলেছে? সেও কি এমনটাই সাজাচ্ছে, নাকি তার কাছে গালিব শুধু গলির ওধারের একটি ছেলে যে জানে পানিতে ছুঁড়ে একটি চারাকে পানির ওপর কীভাবে এগারো বার লাফ খাওয়াতে হয়?
চামেলির চিন্তা এভাবে গালিবকে প্রায় গিলে খাচ্ছিল। তার কোনো চিন্তা ছিল না তার নিত্যদিনের দুনিয়াটি নিয়ে যেটি রীতিমত প্রায় ভেসে যাচ্ছিল। নতুন বছর শুরু হতেই দেখা গেল বাসায় প্রতি সন্ধ্যায় অনেক লোক জড়ো হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। মাঝে মাঝে দুয়েকজন আসত এবং বিশ্বস্ততার সাথে দেশের অনেক ভিতরের খবর দিত। গালিবের কাছে সেসব আলোচনার মূল কথা হল: বঙ্গবন্ধু নামে একজন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার নেতা যাঁকে গালিব সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে তাঁর অসাধারণ ধূমপানের পাইপটির জন্য— তিনি নির্বাচনে জিতেছেন কিন্তু জেনারেলরা তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হতে দেয়নি। গালিব প্রতিদিন সকালে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার ছবিগুলো দেখে। দেখে নেতারা আলোচনা করছেন, পুলিশ মানুষ মারছে, কিন্তু এই সমস্যার জট কখন খুলবে তা বুঝে ওঠা তার সাধ্যের বাইরে। পক্ষে বিপক্ষে প্রচুর কথা, আর বড়দের এইসব কথার ভিতরের কথা কী তা একেবারেই আল্লাহ-মালুম।
এই সংকট নিয়ে কাজে অকাজে তখন গালিবদের মতো প্রতি ঘরেই নিত্যদিনের আলোচনা। এগুলো তার কানে আসত ঠিকই কিন্তু কলবে খুব একটা পৌঁছাত না, কারণ তার কলবে তো অন্য জিকির। অবশ্য সে তার বাবাকে একবার বলতে শুনেছিল যে, গুজব যখন পত্রিকার খবরের চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন বুঝতে হবে কোনো কঠিন সংকট সমাসন্ন। সে শুনত লাখ লাখ লোক রাস্তায় নেমে এসেছে এবং মাঝে মাঝে পুলিশের হাতে মারাও যাচ্ছে। তবে সেসবই দূরের সব রাস্তায়। তাদের গলিটি পুরোই নিরুপদ্রব। হয়তো এই লেকের ভেতর মহাক্ষমতার কোনো শুভশক্তি রয়েছে যে নিয়মিত এই গলিটি আর এই এলাকাটি এসকল উপদ্রব থেকে পাহারা দিয়ে রেখেছে।
গালিব তার তড়পানো বুক নিয়ে অপেক্ষায় আছে চামেলির সাথে তার পরের দেখা কবে সেই নিয়ে। গণপ্রতিবাদের বিভিন্ন প্রোগ্রামের কারণে স্কুল প্রায়ই বন্ধ থাকে। স্কুল বন্ধ থাকলে গালিব অনেক বেলা পর্যন্ত পড়ার ভান নিয়ে টেবিলে বসে থাকে, এতে তার মা খুশি হয়। এরপর আস্তে বের হয় চামেলির উদ্দেশ্যে।
তাদের কেউ কাউকে এখন পর্যন্ত বাড়িতে ডাকেনি— বিষয়টি গালিব তাদের অটুট সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে মনে করে। এ বিষয়ে চামেলিকে কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে সে মনে করে না। সম্পর্কের এটাও তো বড় প্রমাণ যে, এই পুরো গলিতে চামেলি তার বয়সী শুধু তার সাথেই কথা বলে। আর কোনো বন্ধুর প্রয়োজন আছে বলে চামেলি মনে করে না। যারা গালিবকে এ নিয়ে টিপ্পনী কাটে তারাও তো কেউ চামেলির সাথে কথা বলার সাহস কখনও করেনি। চামেলি গালিব এখন আর শুধু লেকের এই পাড়েই নিজেদেরকে আটকে রাখে না। লেকের পাড় ধরে তারা অনেকদূর হেঁটেও যায় মাঝে মাঝে। পথে গঙ্গা-যমুনা খেলার জন্য ভালো পাথরের টুকরা বা কাচের টুকরা পেলে তা কুড়িয়ে জড়ো করে। 
চামেলি একদিন বলল কীভাবে তার মা তার বাবাকে ছেড়ে অন্য এক লোকের সাথে চলে গিয়েছিল। এটা ঘটেছিল যখন তার বাবা পূর্ব পাকিস্তানে বদলির জন্য দরখাস্ত করেছিল। চামেলির দুঃখ তার মা তাকে কোনোদিন একটি চিঠিও লেখেনি। চামেলির এমন ব্যক্তিগত দুঃখের কথাটুকু তাকে বলায় গালিবের ভেতরটা হুহু করে উঠল এবং তার আরো খারাপ লাগল এই দেখে যে চামেলিকে বলার মতো এমন কোনো কষ্টের কাহিনি তার নেই।
গালিব দিনে দিনে চামেলিকে আবেগের সাথে সাথে বুদ্ধির চোখেও দেখতে শিখেছে। তার সে চোখে চামেলি এখন পূর্ণরূপে প্রতিভাত। সে অনুভব করতে পারে চামেলি এখন আর শুধু বর্ণচ্ছটার কোনো রূপ নয়। অবশ্য তারপরও চামেলির সৌন্দর্য এখনও তাকে অবাক করে। তার দুই অনুপম কর্ণলতিকা, উচ্চহাসির সময় তার কণ্ঠের কম্প্রমান সাঙ্গীতিক মূর্ছনা, তার খোলা চুলে রোদের আলোর খেলা— সবই গালিবকে এখনো সমান আনন্দে অবাক করে। চামেলি এখন তার ভাবনায় এতটুকু কাছে পৌঁছেছে যে সে এখন কল্পনা করতে পারে সে চামেলিকে আদরে আবেগে কাছে টানছে এবং গভীর চুমু খাচ্ছে। এটি এখন আর তার কল্পনা নয়, বরং গভীর কামনা। তবে বয়সের প্রথম জোয়ারে দিনে রাতে শরীরজাত যে প্রচণ্ড অন্ধকার ভাবনাগুলো তাড়া করে অন্ধকারের সে ভাবনার জগৎ থেকে গালিব এখনো চামেলিকে অনেক দূরে রাখে। রক্তের এই তাড়নাকে শান্ত করতে যে নারী শরীরগুলো কল্পনায় দরকার হয় তার সে তালিকায় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ছাপা নায়িকারা আছে, এমনকি মাঝে মাঝে সেখানে কোনো বন্ধুর মা কিংবা টাবুর বোন বেচারীও উঁকি দেয়। কিন্তু সে কল্পনায় ভুলেও সে চামেলিকে আনে না। চামেলির সাথে তার স্বপ্নের সবটুকুই হল চুম্বন, শুধুই চুম্বন। 
গালিব মাঝে মাঝে ভাবে চামেলির সাথে তার যে চমৎকার বাঁধনটা তৈরি হয়েছে হঠাৎ একদিন একটা ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ম চুম্বন গালে বসিয়ে দিলে সে বাঁধনটা আবার কেটেকুটে যাবে না তো? এই ভাবনা তার ভিতরে এক হতাশার ভাব জাগিয়ে তোলে। তারপরও সে মাঝে মাঝে চামেলির সাথে বের হয় আর ভাবে অন্তরঙ্গতার ঐ নতুন উপত্যকায় আজ সে পা রাখবেই। কিন্তু সময়টা পার হয় এমন কোনো সুযোগ না দিয়েই। হয়তো কখনো বা দুয়েক মুহূর্তের জন্য এমন সুযোগ কাছে আসলেও অসাহস ও অপ্রস্তুতিতে সে সুযোগ চলে যায় আর শুধু আফসোসটা থেকে যায় মনে মনে।
এমনই একদিন চামেলি জিগ্যেস করলো— ‘তোমাকে আজ এত গম্ভীর লাগছে কেন?’
তখন পুরো শীত। চামেলির গায়ে একটি নীল গলাবন্ধ সোয়েটার। বিকালের নরম রোদ তাদের দুটো নরম নবীন কাঁধের ওপর আঁকিবুকি কাটছে। চামেলি হাত দুটো তার ছোট্ট বুকের ওপর বেঁধে হাঁটছে। তার ধীর পা ফেলা গালিবকেও শ্লথ করে দিল। গালিব ধীরে পা ফেলা সেই পথের দিকে তাকিয়েই বলল— ‘না তো, কোথায় গম্ভীর? আমি তো তোমার কথা শুনছিলাম।’
‘আমার তো মনে হয় তোমার মন আমার কথায় নয়, বরং তোমার মন তোমারই কোনো নিগুঢ় ভাবনায়’ চামেলি বলল। 
‘আরে না, আমি তোমার কথাই শুনছিলাম। মাঝে মাঝে শোনার জন্যই একটু নিশ্চুপ থাকা’। সে পুরোপুরি মেপে উঠতে পারল না চামেলি কতটুকু ধরতে পেরেছে। বরং ভাবনায় পড়ল— যাকে চাই তার এত কাছে দাঁড়িয়েও পুরোপুরি পেতে পারছি না— এ কী শাস্তি রে ভাই? তবে তার বিশ্বাস চামেলি তাকে মোটেও সন্দেহ করছে না। সন্দেহ করলে কি আর এত সাচ্ছন্দে তার সাথে এভাবে ঘোরে? এই সাচ্ছন্দ্য আছে বলেই চামেলির সবকিছুতে এমন অবারিত আনন্দ। রাস্তায় হঠাৎ পাওয়া একটি ময়ূরের পালক কিংবা জার্মানির এক আন্টির কাছ থেকে আসা এক চিঠি- এমন সবকিছুই তাকে সীমাহীন আনন্দে ভাসিয়ে তোলে। 
চামেলির কি তার মতো কোনো ভাবনা বা উৎকণ্ঠা নেই? হঠাৎ যদি সে একটি চুমু খেয়ে ফেলে আর চামেলি আতঙ্কে যদি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে তাহলে কী ঘটে যাবে? তখন চামেলি তার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকাবে তা কি গালিবের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হবে? এই শেষের ভাবনাটি গালিবের শত প্রার্থিত বাসনাটির পথে মারাত্মক একটি বাঁধা। ফলে অনেক দিন গালিবের মন থেকে এই চুম্বন বাসনা উধাও হয়ে যায়। এই চিন্তা মাথা থেকে সরাতে পারলে চামেলির সাথে সঙ্গ-আনন্দটা আরো স্বাদের সাথে চেখে নেয়া যায়। দিনগুলো তখন প্রথমদিকের দেখা হওয়ার উত্তেজনাকে আবার ফিরিয়ে আনে।
এই রকমের এক সময়ে এক সন্ধ্যায় গালিবের বাবা তাকে ডাইনিং রুমে ডেকে পাঠালেন। ঘরে অনেক মানুষ, অনেক অতিথি। এর মধ্যে তাকে ডেকে পাঠানো। সাধারণত এমন ডাকাডাকি কখনোই গালিবের জন্য সৌভাগ্যের হয়ে ওঠে না। স্কুল বন্ধ। সুতরাং ক্লাস বা পরীক্ষায় খারাপ মার্কসেরও কোনো প্রসঙ্গ না। বাড়িতে বাবার দেয়া যেসব নিয়মকানুন আছে তারও তো কোনোটা সম্প্রতি সে ভেঙ্গেছে বলে মনে হয় না। সে নিজের মশারি নিজেই টানায় এবং সন্ধ্যা গাঢ় হওয়ার আগেই বাড়ি ফেরে। বিড়ি খাওয়ার ঘটনাটি কি তাহলে জানাজানি হয়ে গেল? মালি অবশ্যই বলেনি। মালি ছাড়া আর দেখেছেই বা কে? তাহলে কি বাবুর্চি? সে তো বিড়ি টানার পর প্রত্যেকবারই অনেক কসরত করে মুখ পরিষ্কার করে। 
অনেক উৎকণ্ঠা নিয়ে ধীর পায়ে সে ডাইনিং রুমে ঢুকলো। গালিবের বাবা ছোট্ট ডাইনিং টেবিলটির একেবারে মাথায় বসা। আধখোলা দরজা দিয়ে পাশের রুমে বসা বাবার বন্ধুদের সিগারেটের ধোয়া আর কথার আওয়াজ আসছিল। বাবা তার দিকে পুরু চশমার কাচের ভেতর দিয়ে তাকালেন এবং একটু হাসলেন। মনে হল বাবা তার ওপর ক্ষিপ্ত নন। তবে ভয়ের অন্য কিছু আছে বলেও মনে হল। 
‘গালিব, বল, ইদানীং ফুটবল খেলছ না কেন’।
গালিব গম্ভীরভাবে বলল— ‘পায়ে ব্যথা পাই’।
‘আমরা তো আরো একটা এক্স-রে করলাম এবং ডাক্তার বলল, কোনো সমস্যা নেই’
‘তারপরও মাঝে মাঝে ব্যথা পাই। এছাড়া পড়াশোনাটায় আরো একটু বেশি সময় দিতে চাই’।
‘সে ভালো। তবে এক্সারসাইজটাও জরুরি বিষয়। তুমি তো জান শরীর ভালো থাকলে মনও ভাল থাকে’।
গালিব একটু অস্বস্তিতে পড়ল যখন দেখল বাবা অন্য কিছু বলতে চান। ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল বাবা ঠিক বই আর খেলাধুলা দিয়ে শরীর-মন ভালো করার বিষয়ে বলতে যাচ্ছেন না। সংসারের অর্থ উপার্জনের বিষয়টা গালিবের বাবা দেখতেন, বাকি সবটাই দেখতেন গালিবের মা। অর্থবিষয়ক ছাড়া দৈনন্দিন খুব কম বিষয়েই মা বাবার হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তাই এমন কোনো হস্তক্ষেপ কামনার মানেই হচ্ছে বিষয়টি গুরুতর এবং বাবা যথেষ্ট ধৈর্য হারিয়েই বিষয়টা হাতে নিয়েছেন।
কথাটা চলছিল আশপাশের বিষয় নিয়ে এবং বাবা ঠিক জানতেন না কীভাবে মূল কথাটায় ঢুকবেন। বাবা যখন অন্য কোনো ইস্যু ধরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন তখন গালিব অনেকটা তাৎক্ষণিক সংজ্ঞায় বুঝে ফেলল বাবা আসলে কী বলতে তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। গালিব টের পাচ্ছিল তার হাতপাগুলো অবশ হয়ে যাচ্ছে এবং সে কাঁপছে। অথবা সে কাঁপছে না বরং তার পায়ের নিচের মেঝেসহ পুরো রুমটা দুলছে এবং সে পড়ে যাচ্ছে। প্রবীণ হুজুর বা পাদ্রিরা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শুরুতে মন্ত্র আদি পড়ার সময় মুখমণ্ডলটাকে যেমন গম্ভীর এবং অচেনা করে তোলে বাবার মুখটা ধীরে ধীরে তেমন হয়ে উঠছে। সেই মুখ থেকে যা-সব বের হল তা থেকে গালিব শুনল মাত্র ‘পাঞ্জাবি’ শব্দটা এবং ‘এই সময়ে’ গলির ওধারের মেয়েটাকে না দেখার বা না দেখতে চাওয়ার বিষয়ে কিছু একটা কথা।
এই লোকটা কে আর কেনই বা সে এতক্ষণ তার সাথে বকবক করল? কেন সে এতদিনে বুঝতে পারল না যে তার বাবাটা এমন বুনো কিছু? এই লোকটার সাথে তার কী মিল আছে যে সে তার বাবা? এ তো পুরোই একটা ভিনগ্রহের প্রাণী! এর সাথে এক ঘরে কেন থাকা? তার কেমন যেন বমি বমি পাচ্ছে। সে কিছু বলল না তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা নিল চামেলির সাথে দেখা-ঘোরা সে চালিয়েই যাবে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাড়ি থেকে সে চলে যাবে। আপাতত নিজের রুমে গেল এবং রাতে খেল না। বাবার প্রতি যে ঘৃণা আজ সে অনুভব করল কোনোদিন কোনোকিছুর প্রতি এত প্রবল ঘৃণা আর সে অনুভব করেনি।
একদিন গেল। গালিব বুঝে উঠতে পারছিল না সে কীভাবে চামেলিকে বলবে যে তাদেরকে এখন থেকে আরো সাবধানী ও সুচতুর হতে হবে। এই বুঝে উঠতে না পারার কারণে সে চামেলির সাথে দেখাও করছে না। সামনের গলিটি এবং চামেলিদের বাসার গেটটি দুইই তাদের ড্রইংরুমের জানালার সামনে বরাবর। জানালা থেকে গালিব দেখল বিকেলে চামেলি গেট খুলে বের হয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করল। অবশ্যই সে ঘোরাঘুরি মানে গালিবের জন্য অপেক্ষা। সে গেটের ভিতরে গেল, আবার গেট থেকে বের হল। তারপর একেবারেই বাসায় চলে গেল। দুদিন পরে আবার দেখল চামেলি গেট থেকে বের হল। উড়ন্ত কিছু চুল টেনে কানের পেছনে আটকে দিল। কিছুক্ষণ গেটের সামনে হাঁটাহাঁটি করল। তারপর একাই লেকের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করল। তবে একবারও সে গালিবদের বাসার জানালার দিকে চোখ তুলে তাকাল না। 

সাতদিন পরে এক ভোরে গালিব ঘুম থেকে উঠল এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে যে সে আজ চামেলির সাথে দেখা করবেই। স্কুল বন্ধ ছিল বলে তার মা তাকে ঘরে পড়ার একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। মায়ের তত্ত্বাবধান বলেই বিষয়টা অত কড়াকড়ি ছিল না। সকালটা সে বীজগণিতীয় কিছু সমস্যার সমাধানে এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের জীবজন্তু সম্পর্কে পড়ে কাটাল। সে আরো শিখল বক্সাইট নামক খনিজ পদার্থটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় গিনিতে।
গালিব জানে এ সময়টায় শুধু পড়াশুনার ভান করলেই চলবে। চামেলি আর গালিবের একত্রের সময়টুকু সাধারণত বিকেলেই কাটত। হেঁটে হোক সাইকেলে হোক বাইরে বেরনোর এটাই ভালো সময়। কিন্তু আজ সে এক নতুন পরিকল্পনা আঁটল। লাঞ্চের পরই সে বলল সে একটু টাবুদের বাসায় যাবে এবং কারোর কিছু বলার অপেক্ষা না করেই সে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে বেরিয়ে সে গলিটি পার হল এবং উপরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিল বাসার জানালা দিয়ে কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে কি না। না, কেউ তাকিয়ে নেই। সে আস্তে আস্তে চামেলিদের বাসার গেটটি খুলল এবং বাসার নিচের পোর্টিকোতে গিয়ে দাঁড়াল।
বাসায় যদি চামেলির বাবা থাকেন তাহলে কেমন হবে? বাসায় থাকলে অবশ্যই মালির ডাক পড়ে যাবে কে এসেছে দেখতে। যাক এসব নিয়ে আর ভাবলে চলবে না। আর কলিংবেলও সে ইতোমধ্যে বাজিয়ে ফেলেছে। গালিব খেয়াল করল ফার্নের টবগুলো যেভাবে রাখা তাতে বোঝা যায় এ বাসার ঘরকন্নার পারিপাট্যে কারোর মন নেই। দরজাটা চামেলিই খুলল। তার গায় ফ্লোরাল কামিজ। বয়সটা শেষ যেদিন দেখেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হয়। গালিবকে দেখে খুশিতে ডগমগ।
‘আরে গালিব? ভিতরে আস’। মনে হল তাদের দেখা যে শুধু লেকের পাড়ে হওয়ার সেই অলিখিত পারস্পরিক সমঝোতার বিষয়টা যেন তার মনেই নেই। ‘লাঞ্চ হয়েছে? একটা স্যান্ডউইচ দেই?’
চামেলি তাকে সোজা ড্রইং রুমে নিয়ে গিয়ে বসাল। পোর্টিকোর চেহারার অপরিপাট্য ড্রইংরুম পর্যন্ত একইভাবে আছে। সোফার সাথে টেবিলের মিল নেই। রুমে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাবা-মেয়ের বিভিন্নরকম জিনিসপত্র— বই, ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট, অফিসফাইল ইত্যাদি। কাঠঢাকা দীর্ঘ সোফাটির এক কোণায় গালিব, অপর মাথায় চামেলি। চামেলি এখানে থাকে! গালিবের কষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে, চামেলির বাসায় তার মায়ের মতো কেউ নেই বলেই পরিপাট্যের কোনো হাতও নেই।
‘গত সপ্তাহে একদিনও বের হলে না কেন? কোথায় গিয়েছিলে?’
গালিব মিথ্যে করে বলল— ‘শরীরটা একটু খারাপ ছিল’।
‘তবে বেশি খারাপকিছু না। তাছাড়া আমার বাবা বর্তমান সময়টা নিয়েও বেশ উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন সময়টা খারাপ। প্রয়োজন ছাড়া এখন বাইরে বের না হওয়াই ভালো।’— গালিব বলে চলল।
‘এই গলিতে? না, না, এখানে কিছু হওয়ার নেই।’ চামেলি জোর দিয়ে বলতে চাইল। 
আসল সত্য কথাটির কাছে না আসতে পেরে গালিব বলল ‘আমারও তাই মনে হয়। তবে তুমি আমার বাবাকে জান না। তিনি অল্পতেই অনেক দুশ্চিন্তা করেন।’
‘আমার বাবা বললেন, আর্মি নামার সাথে সাথে সবকিছু ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।’
গালিব একটু চমকে উঠল এবং বলল ‘হয়তো। আসলে কেউই ঠিক বলতে পারে না কী ঘটবে।’
চামেলির সাথে বলার জন্য এগুলো আসলে তার কথা হওয়ার কথা না। তার রাগ লাগছিল বড়দের দুনিয়াটা এসে তাদের নিকোনো আঙিনাটায় উৎপাত শুরু করেছে। তারা সবকিছ্ইু নষ্ট করে দিয়েছে। নষ্ট করার কাজটাই তারা সবচেয়ে ভালো পারে। সে কোনোভাবেই চাচ্ছিল না তারা শেষ পর্যন্ত চামেলি আর গালিবের জগৎটায়ও ঢুকে যাক। গালিব মরিয়া হয়ে চাচ্ছিল তারা এই জগৎটায় আজ না ঢুকুক, কোনোদিন না ঢুকুক।
আহ, বাবার আদেশের বাইরে যাওয়া এত সহজ! এত সহজ কাজে সে এতদিন দেরি করল কেন? একটা সপ্তাহ সে ঘরে বসে কাটাল কেন? তারা এক অপরের বাসায় যেতেই বা এত দেরি করল কেন? রুমটা প্রায় অন্ধকার। বিকালের রোদের একটু আলো শুধু জানালার পর্দার ফাঁকা দিয়ে ভিতরে পথ পেয়েছে। চামেলিকে কিছুটা মলিন মনে হল। হঠাৎই মনে হল চামেলি তার নাগালের অনেক দূরে। তারপরও ভালো লাগছে চামেলি তার সামনে উপস্থিত। বাবার নির্দেশ জারির রাত থেকেই গালিব তার ভিতরে একটি বেসুরো বোধ অনুভব করছে। একটি হারানোর সুর মূল বাঁশিতে বেজে ওঠার আগেই সে অনুভব করছে। কিন্তু চামেলির সামনে বসে থেকে সে-বসা যত দীর্ঘ হচ্ছে ততই তার সেই বেসুরো অস্বস্তি সরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যাই হোক, চামেলির সাথে সে প্রতিদিন দেখা করতে আসবে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল।
চামেলি আজ গালিবকে তার পুরনো জীবনের গল্প শোনাচ্ছে। গল্পটা শোনাতে শোনাতেই সে ভিতরে তার দুর্দশার চেহারার নিজ রুমে গেল এবং একটি এলবাম নিয়ে ফিরে এল। এবার এলবাম নিয়ে চামেলি গালিবের একেবারে কাছ ঘেষে বসল। কাঁধে কাঁধ ছুঁয়ে যায় এমন বসা। গালিব কোনোভাবেই আর ছবি বা ছবির গল্পের মধ্যে ঢুকতে পারছে না। চামেলি বলেই যাচ্ছে। এই বাড়িতে যখন ছিলাম তখন মা-ও আমাদের সাথেই ছিল। ঐটা ছিল আমাদের কুকুর। কথার ধারায় যতবারই চামেলি গালিবের মাথার কাছাকাছি হচ্ছে ততবারই গালিবের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে যেন।
তাদের পা দুটো কফি টেবিলের সাথে ঠেস দেয়া। গালিব নীল জিন্স প্যান্ট পরা। সাদা মিহি সালওয়ারের ভিতরে চামেলির হাটুর উপরে পা দুখানার পূর্ণ লাবণ্যময় অবয়বটি বোঝা যায়। এলবামের এক পাশ গালিবের উরুর ওপর, অন্যপাশ চামেলির। গালিব উরুর ওপরের অংশটি হালকা করে হাতের ওপর ধরে রেখেছে। প্রতিটি পৃষ্ঠা ওল্টানো মানেই গালিবের হাতের সাথে চামেলির হাতের একটু করে ছোঁয়া।
ইনি আমার আন্টি, জার্মানিতে থাকেন। বিয়েও করেছেন এক জার্মানকে। গালিব কখনো চামেলির মুখটিকে এত কাছে পায়নি। কখনোই চামেলির কাপড়, ত্বক কিংবা চুলের ঘ্রাণ এত কাছ থেকে গালিব পায়নি। গালিব নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছিল কেন সে এখনও জানে না চামেলির গোলাপি চিবুকটুকু ছুঁয়ে দেখা এখনই উচিত কিনা। আজকের এত কাছের মুহূর্তগুলো এত দীর্ঘ সে আর কখনও পায়নি। অথচ সেইরকম অনেক মুহূর্ত দিয়ে গড়া বিকালটি এত দ্রুত শেষ হয়ে গেল! 
শীতকালে বিকালের আলোটা এত দ্রুত সরতে থাকে মনে হয় যেন পাহাড় গড়িয়ে নিচে নামছে। হঠাৎই রুমটি আরো অন্ধকার হয়ে উঠল। বাইরের পাখিগুলোও গান বন্ধ করে দিল। রান্নাঘরে থালাবাসনের শব্দ সময়ের নিস্তব্ধতাটি হঠাৎ ভেঙে দিল। চামেলি দেয়াল ঘড়ির দিকে হঠাৎ তাকাল এবং উঠে দাঁড়িয়ে বলল— ‘বাবার আসার সময় হয়ে গেছে’। এলবামটির একাংশ তার কোলের ওপর গালিব এখনো ধরে আছে। সে বলল না যে গালিব যেন আর না আসে। তবে গালিব বুঝল এখন যেতে হবে। চামেলি তার দরজায় দাঁড়াল। তার খোলা চুল কাঁধের ওপর পড়ে আছে। গালিবের জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল আবার কবে তারা এভাবে একসাথে বসতে পারবে। একটি সবুজ শীতের আলো চতুর্দিক ঢেকে দিতে শুরু করল। চামেলিদের গেট পর্যন্ত গিয়ে সে একবার পিছন ফিরে তাকাল। দেখল চামেলি এখনো দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে ইঙ্গিতে উঠে যেতে বলার রূঢ়তাটুকু মুছে ফেলতে চেষ্টা করছে।

সে রাতে শহরের অন্য সবের মতো গালিবেরও ঘুম ভাঙল মর্টারের গোলা আর ট্যাংকের ঘর্ঘর শব্দে। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্দুকের আওয়াজ শোনা গেল। কাছ থেকে দূরে থেকে বার বার। পরের দিন মালি এলো। তার পুরো মাথাঢাকা শক্ত টুপিটা ছাড়াই। চোখে পুরু কাচের চশমাটাও নেই। তার দিশাহারা চোখদুটোয় শুধুই আতঙ্ক। এলোমেলোভাবে বলে যাচ্ছিল শতশত লাশের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার লাশ, নিউমার্কেট এলাকার লাশ, রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ। তার নিজ চোখে দেখা লাশের কথা। গালিবের বাবার মতোই সে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
যে সমস্যার সমাধানের আশায় মাসের পর মাস আলোচনা চলল তা সমাধানের দিকে গেল না, বরং গেল যুদ্ধের দিকে। টাবুর বাবা— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক— আগের রাতে বাসায় ফেরেননি। তাঁর না-ফেরা বিষয়ে গালিবের বাবা ফিসফিস করে কথা বলছিল। সারাদিন তারা এই বাসা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পক্ষে বিপক্ষে কথা বলছিল। গালিব যতটা না ভয় পাচ্ছিল তার চেয়ে বেশি লজ্জা পাচ্ছিল। সে কতই না বুদ্ধি-না-হওয়া বাচ্চা! কতই না বাচ্চার মতো চতুর্দিককে মাথার বাইরে রেখেছে! নিজের রঙ্গিন কল্পনার মোহে কী ভীষণ আচ্ছন্ন হয়েই না ছিল!
পরের দিন গালিব এবং তার পরিবার শহর থেকে পালিয়ে গেল। এটি এত দ্রুত এবং এত নিরবে সম্পন্ন হল যে কারোর সাথেই দেখা সাক্ষাতের কোনো সুযোগই হল না। মালির সাথে দেখা করে কোনো খবর দিয়ে যাওয়ারও সুযোগ হল না। তারা প্রথমে তাদের মফস্বল শহরে গেল। সেখান থেকে এক গ্রামের বাড়ি। গ্রামের অন্যদের মতো তারাও ভারতে পালাতে থাকা মানুষদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধ্বংসযজ্ঞের কাহিনি শুনতে থাকল। বর্ষাকালের শেষ দিক থেকে শুনতে শুরু করল উত্তেজনাকর অনেক বিজয়ের গল্প। ইতোমধ্যে গালিব বুঝতে শুরু করেছে রাজনীতি এবং ইতিহাস। অন্যরা যা নিয়ে ভাবে তা এখন তাকেও ভাবিয়ে তোলে। নয় মাস পর যুদ্ধ শেষ হল। তারা ফিরে এল তাদের বাসায়। গলির ওপারের নীল বাড়িটা তখন ফাঁকা। যুদ্ধের আগের জীবনটা এখন তার কাছে রূপকথা বা জিনপরীর গল্পের মতো মনে হয়। চামেলি নামটি একটি কল্পজগতের চরিত্র বলে মনে হয়। কিন্তু সে টের পায় সেই চলে যাওয়া কল্পপরীটি তার বুকের মধ্যে রেখে গেছে একটি স্থায়ী অমোচনীয় ব্যথার ক্ষত। 


 

গল্পটি কাজী আনিস আহমেদের গুড নাইট মিস্টার কিসিঞ্জার এন্ড আদার স্টোরিজ  গ্রন্থের CHAMELI-এর বঙ্গানুবাদ।  

অলঙ্করণ : রাজিব রাজু

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।