রাত ১১:১১ ; শুক্রবার ;  ১৮ অক্টোবর, ২০১৯  

মারিও বার্গাস যোসার জীবন ও মিথ্যার সত্য

প্রকাশিত:

[গেলো সপ্তাহে মারিও বার্গাস যোসার জীবন ও সাহিত্যকর্মের উপর একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘মারিও বার্গাস যোসার জীবন ও মিথ্যার সত্য’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এটি অনুবাদ, সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন রাজু আলাউদ্দিন। এই গ্রন্থে যোসার শৈশবকাল-সহ জীবনের নানা পর্যায়ের ফটোগ্রাফ, সাহিত্য ভাবনা, রাজনীতি, প্রেম-যৌনতা নানাবিধ প্রসঙ্গ এসেছে। বলা যায় বাংলাদেশে যোসা চর্চায় এই গ্রন্থ অনন্য ভূমিকা রাখবে। কারণ ইতোপূর্বে যোসাকে নিয়ে এমন পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ বাংলাদেশে মূদ্রিত হয়নি। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সাক্ষাৎ প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন মিজানুর রহমান লিপু। মূল্য ১৬০০ টাকা। প্রকাশকাল : ফ্রেব্রুয়ারি, ২০১৫ । বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য এর অংশবিশেষ প্রকাশ করা হলো।]        

 

সীমাতিক্রমের মহাকাব্য
আলোন্সো কুয়েতো

১৯৩৬ সালের ২৮ মার্চে মারিও বার্গাস যোসা যে বাড়িতে জন্মেছিলেন সেখানে কাঠের বেড়া, সামনে এক টুকরো বাগান আর সাদা দুই থামের মাঝে একটা দরজা রয়েছে। আজ যে-কেউ তা দেখতে পাবেন, আরেকিপার প্লাসা দে আর্মাস-এ গেলে। এই বাড়ির দোতলায় থাকতেন তার নানা-নানী, দোন পেদ্রো যোসা ও দোনঞা কার্মেন উরেতা এবং এই বাড়ি থেকেই তাঁর মা দোরা বিয়ের দিন গিয়েছিলেন চার্চে।
যে-বার্গাস যোসা এই বাড়িতে বহুবার এসেছেন সে-বাড়ি নিয়ে তাঁর স্পষ্ট কোনো স্মৃতি নেই। তাঁর বয়স যখন মাত্র এক তখন তিনি পরিবারের সবার সাথে কোচাবাম্বায় চলে আসেন আর এখানেই পরবর্তী নয় বছর বাস করবেন। ১৯৪৬ সালে ফিরে আসেন পেরুতে, তবে লিমায় নয়, বরং পিউরাতে, কলেহিও সালেসিয়ানোস-এ পড়াশুনার জন্য। লিমায় যাবেন তিনি ১৯৪৭ সালে। তবে সেও কেবল ১৯৫২ সালে পিউরাতে ফিরে আসার জন্য এবং ফেরার পথে লিমায় কাটাবেন পরের বছর।
আরেকিপা, কোচাবাম্বা, পিউরা, লিমা : ভৌগলিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যসম্পন্ন ভিন্ন ভিন্ন চারটি শহরে ১৭ বছরে ছ’বার স্বল্পকালীন সময় কাটিয়েছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জীবন যাপন এবং কাজের বৈচিত্রকেই তুলে ধরে। স্থানান্তরের ফলে চিহ্নিত জীবনের এই সূচনা সবক্ষেত্রে এক নাটকীয় রূপান্তর ঘটায়। মা, নানা-নানী এবং মামা খালাদের সঙ্গে তার জীবন কাটছিলো এক স্বাভাবিক ছন্দে। দশ বছর বয়সে তিনি বাবার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন যাকে তিনি মৃত বলেই ধরে নিয়েছিলেন। ছবিতে নৌ-বাহিনীর টুপি পড়া, সহাস্য মাধুর্য্যমণ্ডিত রূপটিকে তিনি আদর্শ বলে ধরে নিয়েছিলেন তখন। কিন্তু ঐ ছবিটির জায়গায় যখন আসল মানুষটি এলেন তখন তাকে ভীষণ আলাদা মনে হলো। এই তুল্যমূল্যই হচ্ছে তার পরিণত হয়ে ওঠার স্মারকচিহ্ন। এই অসংগতিই বাস্তবকে আলাদা করে দিয়েছে অবাস্তব (Ficcion) থেকে। 
পিতার কর্তৃত্বপরায়ন এবং কখনো কখনো নিষ্ঠুর অস্তিত্বের প্রকাশ যোসা পরিবারের দেয়া সুরক্ষিত ও উষ্ণ শৈশব থেকে উন্মূল করে ফেলে মারিওকে। তখন থেকেই, মারিও এবং তাঁর মা লিমায় বারবার বাসা বদল করতে থাকেন। বাবা-মার ঝগড়াঝাটি ও মিটমাটের দ্বারা চিহ্নিত উপর্যুপরি এই বাড়ি বদল অস্থির ও অনিশ্চিত বাস্তবতার এক অনুভূতিকে ক্রমশ বাড়িয়ে তোলে। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে তিনি পাঠের সুস্থির ও ছন্দময় এক জগতে নির্বাসনকে বরণ করে নেন। সত্যিকারের এই পলায়ন- যাকে বলা যেতে পারে উপন্যাসের অবাস্তব (Ficcion)- ঘাতকের জগতকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সময়কে নিশ্চিহ্ন করার আহবান জানায়, অর্থাৎ ভ্রুণেই নষ্ট হওয়া এক বাস্তবের ঘাতক হয়ে ওঠেন তিনি। উপন্যাস-পাঠ, তার ক্ষেত্রে, বাবার শাসিত অগ্রহণযোগ্য বাস্তবতার বিপক্ষে এক প্রতিশোধে রূপান্তরিত হতে থাকে এবং একই কারণে তার জন্য জরুরী হয়ে ওঠে কল্পনার ডালপালা ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়োজন। শুরু হয় তাঁর পাঠক ও লেখক জীবন। আখ্যানের জগতে পলায়ন আর সন্ধানের ঘটে মেলবন্ধন।
কেবল ভৌগলিক স্থানান্তরই তাঁর লেখক জীবনকে চিহ্নিত করেনি, একই সঙ্গে শহর, দেশ এবং ভাষার বদল, এমন কি কাজ ও সাহিত্য শাখার বদলও এর সাথে অন্তর্ভুক্ত। যদিও তিনি জনগোষ্ঠীর ঔপন্যাসিক (এর কারণ, মনে হয়, উপন্যাস হচ্ছে এমন এক শাখা যা অন্যদের অনধিকার প্রবেশকে মেনে নেয়, আর যা সত্যিকার অর্থে কৃতজ্ঞতা জানায় বৈচিত্র্যের প্রতি), তবে বার্গাস যোসা অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ (নিঃসন্দেহে, তিনি শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিকদের একজন), নিবন্ধ (ফুটবল এবং অপেরাও এর মধ্যে রয়েছে) সাহিত্য সমালোচনাধর্মী মানদণ্ডসূচক (Canonicos) গ্রন্থ এবং মঞ্চ নাটকও লিখেছেন। এ ছাড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক পেশায়ও নিজেকে নিয়োগ করেছিলেন অর্থাৎ পেরুর রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রার্থিতা। অধিকৃত অবস্থায় ইরাকের পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন সংবাদ এবং পানামার দারিয়েন প্রদেশে উপস্থিত হন ধারাভাষ্যকার হিসেবে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের মতো তিনি নিজেও আকৃষ্ট হন বিপদ আর চ্যালেঞ্জের প্রতি, এগিয়ে যান বাস্তবের সীমান্তে। এই বিপদের মধ্যেই নিজেকে তিনি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তোলেন।

মানুষের সারি
মারিও বার্গাস যোসার চরিত্ররা আসে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে। বাথরুমের আয়নার সামনে এক মানুষের অনিশ্চয়তা (লোস কুয়াদের্নো দে দোন রিগোবের্তো), সৈন্যদের পরিচালনাকারী এক সামরিক নেতার দৃঢ়তা (লা গেররা দেল ফিন দেল মুন্দো), আদিম শিল্পকলার পুনরুদ্ধার যা এক শিল্পী তাহিতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে রচনা করেন (এল পারাইসো এন লা অত্রা এসকিনা), পেরুর জঙ্গলে বন্দী ও নির্যাতিত উরাকুশা দলপতির অপমান (লা কাসা বের্দে), টেবিলে অধস্তনের সামনে এক স্বৈরাচারীর তৃপ্তি (লা ফিয়েস্তা দেল চিবো)-এই সবই তাঁর বিচিত্র ধরণের চরিত্র সমূহের একটা অংশ মাত্র।
তাঁর বইগুলোতে যদি দৃশ্যমান হয়ে থাকে সকল মানুষ, তাহলে সকল ভাষাও তাতে উপস্থিত। তিনি পৃথিবীর হাতে গোনা লেখকদের একজন যার দখল রয়েছে বিভিন্ন রচনা শৈলীতে। এ সব তাঁর উপন্যাসে প্রায়শই পরস্পর আলিঙ্গনাবদ্ধ এবং পাশাপাশি উপস্থিত হয়। হোসে মারিয়া বালবের্দের নিশ্চয়তাসহ হোসে মিগেল ওবিয়েদো ঠিকই বলেন যে মারিও উনিশ শতকের উপন্যাসের আকর্ষণ এবং সম্ভাব্য ইতিহাসকে একসাথে গেঁথে দেন আধুনিক শিল্পকুশলতায়। সকল ভাষা, সকল নর-নারী এবং সকল পরিস্থিতিতেই আখ্যানের কাজ পৃথিবীর প্রতিফলন ঘটানো নয় বরং বাস্তবতার আদলে একটি নতুন পৃথিবী তৈরি করা।
বার্গাস যোসা একবার বলেছিলেন যে উপন্যাসগুলো লেখার আগে তিনি চরিত্রগুলোর গতিবিধির একটা রূপরেখা তৈরি করেন। তাছাড়া, তিনি জানাচ্ছেন যে যখন তিনি লিখতে শুরু করেন তখন টের পান চরিত্রগুলো নিজেদের পথে হাঁটতে শুরু করে এবং তাঁর নির্ধারিত রূপরেখাকে বদলে দিতে থাকে। বহুবার, যে-চরিত্রগুলোকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেগুলো প্রধান ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। 

ক্ষমতার কূটাভাস
মারিও বার্গাস যোসা হচ্ছেন ক্ষমতার ভেলকির আবিষ্কারক। অশুভের এক কবি। ক্ষমতার সন্ধান, ক্ষমতার বিরোধিতা এবং ক্ষমতা বজায় রাখার একমুখী মনোবিকারের আবিষ্টতা তার চরিত্রদের জীবনকে পথ দেখায়। লা গেররা দেল ফিন দেল মুন্দোর (১৯৮১) মতো সামাজিক ফ্রেস্কোতে, এলোহিও দে লা মাদ্রাস্ত্রা (১৯৮৮)-র মতো ব্যক্তিগত আলেখ্যে ক্ষমতার বিনাশ, অধিগ্রহণ, লঙ্ঘন কিংবা সন্ধান আসলে তার চরিত্রসমূহের মৌল প্রবৃত্তি, বেঁচে থাকার সংগ্রামে নিশ্চয়তার এক গুরুত্বপূর্ণ ইশারা।
ক্ষমতার সাথে তার চরিত্রসমূহের যে সম্পর্ক তা মুক্তিকে বাস্তবায়িত করার সন্ধান থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো নয়। ক্ষমতা যদি নিপীড়নমূলক কোনো জায়গা ও সময় প্রতিষ্ঠা করে, তা হলে ব্যক্তিও তার নিজের ক্ষমতার ভিত্তিকে খুঁজে বেড়ায়। ত্রাবেসুরা দে লা নিনঞা মালা (২০০৬)-র চরিত্রটি যখন নতুন নতুন পরিচয় এবং জাতীয়তা (চিলিয়, ফরাসী, ইংরেজ ইত্যাদি) তৈরি করে তখন সে আসলে একটা নতুন পরিচয় তৈরি করছে এবং নিজের জন্য সে একটি প্রেক্ষিত, একটি আলাদা পৃথিবী তৈরি করছে। এগুলোর মাধ্যমে সে বাস্তবায়িত করে প্রত্যাখ্যানের নিশ্চয়তা। জাগুয়ার কিংবা ফনসিতা বা ফ্লোরা ত্রিস্তাঁ বা কনসেলয়েইরোর বিদ্রোহ তেমন আলাদা কিছু নয়। কেবল দ্রোহের মাধ্যমেই ব্যক্তির মুক্তি ঘটতে পারে। দ্রোহের প্রথম ইঙ্গিত হচ্ছে ক্ষমতা কর্তৃক প্রদত্ত পরিচয়ের বিরোধিতা, অর্থাৎ নামের পরিবর্তন (জাগুয়ার) কিংবা দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন (খারাপ মেয়ে নানান রকম ছদ্মবেশ পরে) : এমন এক নতুন পরিচয় তৈরি করা যাকে বাস্তব মনে হবে। এই কর্মকাণ্ড আখ্যানের সম্ভাব্য জগতের স্রষ্টা ঔপন্যাসিকের কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা কিছু নয়।
দ্রোহের কূটাভাস হচ্ছে এই যে প্রায়শই তা নিজস্ব ক্ষমতার এক নতুন বৃত্ত গড়ে তোলে। লা গেররা দেল ফিন দেল মুন্দো-এ কনসেলএইরো নিজ ক্ষমতাকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং পরে তার চারপাশে গড়ে ওঠে এক ধর্মীয় সমাজ। অনুসারীদের দ্বারা দেবতায় রূপান্তরিত নেতা কনসেলএইরো তার অনুসারীদের মাধ্যমে বাইরের জগতকে শয়তানায়িত করার বিষয়টিকে নিশ্চিত করে। এই বহির্জগত হচ্ছে সেনাবাহিনী এবং ব্রাজিল রাষ্ট্র। লা গেররা দেল ফিন দেল মুন্দো-এর কনসেলএইরোর কর্মকাণ্ড লা সিউদাদ ই লোস পেররোস-এর জাগুয়ারের কর্মকাণ্ড থেকে মোটেই আলাদা নয়। জাগুয়ার এবং কনসেলএইরো হচ্ছে এমন দুই সামাজিক নেতা যারা নিজস্ব শক্তির ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্যে ভীতিকর বহির্শক্তির দ্বারা শৃঙ্খলাকে ভেঙে ফেলে। কলেজ কর্তৃপক্ষের সামনে শৃঙ্খলভঙ্গকারী জাগুয়ার কর্তৃত্বকে প্রতিরোধ করে। এই সেই জাগুয়ার যে সির্কুলোর মধ্যে কতৃর্ত্বেরও অবসান ঘটায়। এই কারণেই অন্য এক সীমালঙ্ঘনকারী কবি আলবের্তো ফের্নান্দেস কর্তৃক তার ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়ে। জাগুয়ার হচ্ছে এক দ্বৈত চরিত্র : একই সাথে সে বিদ্রোহী এবং নেতা, কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি এক সীমালঙ্ঘনকারী সন্তান এবং সির্কুলোর সদস্যদের কাছে এক চণ্ড পিতা। ক্যাডেটদের দ্বারা চোকলখোর বলে জাগুয়ারকে যখন লাঞ্চিত হতে দেখা যায় তখন সে যা বলে তা যেকোন কর্তৃত্বপরায়ণ বাপেরই কথা : “আমি তাদেরকে মানুষ হতে শিখিয়েছি।” অন্যদিকে, গামবোয়া ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার পক্ষে চলে আসে। শক্তিমান প্রশ্ন করতে পারে ক্ষমতাকে, আর বিদ্রোহী তা করে তুলতে পারে উদ্ভাসিত। এদের কেউ-ই নিজস্ব পরিমণ্ডলের (Redes) বাইরে নিজেদের অস্তিত্বের কথা কল্পনা করে না।

রাজু আলাউদ্দিন

দেহের ভুক্তি (Registro del cuerpo) 
‘ক্ষমতা’ ‘পিতা’ এবং ‘অধিকার’-এই অভিব্যক্তিগুলো একজন থেকে অন্যজনে জায়গা করে নেয়। রতিক্রিয়া বা বলাৎকারের মাধ্যমে যৌন অধিকৃত অবস্থা বা নির্যাতনের মাধ্যমে বলাৎকারমূলক অধিকার আসলে ক্ষমতারই আরেক রূপ। কিয়েন মাতো আ পালোমিনো মোলেরো (১৯৮৬)-এ দোনঞা আদ্রিয়ানার প্রতি সার্জেন্ট সিলভার যৌন আকাংখা একটা উদাহরণ।
সিলভা পাহাড়া দেয়, খুঁজে বেড়ায়, দূর থেকে দেখার জন্য বেঁচে থাকে। দৃষ্টির মাধ্যমে সে তা অধিকার করে। লিতুমার সাথে সে দোনঞা আদ্রিয়ানার শরীর নিয়ে কথা বলে। “সব সময় এই পাঁচটার দিকে চশমা পরে কেন অদৃশ্য হয়ে যাই, হোটেল রয়াল-এ গিয়ে কফি খেতে যাওয়ার গল্প করি কেন তোমার কাছে, জান? সৈকতের কাছে বিরাট পাথরের উপর কেন উঠি বলে তোমার মনে হয়? বুঝতে পারছো, লিতুমা? গোলাপী রংয়ের স্নানের পোশাক পড়া আমার স্বপ্নের প্রিয়াকে গোসল করতে দেখার জন্য।” সিলভা তার কাংখিত বিষয়ের বর্ণনায় উচ্ছসিত: “সুগঠিত নিতম্ব, সুগঠিত স্তন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরোপুরি মাংস।” লিতুমার সঙ্গে সিলভার কথাগুলো অধিকারের জন্য এক উপায় হিসেবে হাজির। শরীরকে অধিকারে না পাওয়ার হতাশাকে সে পুষিয়ে নেয় ভাষা আর দৃষ্টির অধিকারের মাধ্যমে।
ক্ষমতার লিখিত ভাষার বিরুদ্ধে অর্থাৎ লেওনসিও প্রাদ্রোর নিয়মকানুন, ব্রাজিলে সরকারের ঘোষণা বিরুদ্ধে আবির্ভূত হয় এক বিকল্প ভাষা, মৌখিক বুলি। পিউরায় লোস ইনকনকিস্তাবলেস- এর মাস্তানরা যে শ্লোগান উচ্চারণ করে তা ক্ষমতার লিখিত নিয়মকানুনের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ স্বরূপ। দমনমূলক যে সব আইনকানুন সির্কুলোকে সোজা রাখে, কনসেলএইরোর ধর্মীয় নিয়মকানুনের মাধ্যমে মৌখিক ক্ষমতাকে যা ধরে রাখে তা সবই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুনেরই বিকল্প। বিদ্রোহের ভাষার ভিত্তি হচ্ছে মুখের ভাষার শক্তি। এ হচ্ছে ক্ষমতা কর্তৃক লিখিত ভাষার বিরুদ্ধে নমনীয় ও সাম্প্রতিকতম এক উপস্থিতি। 
বার্গাস যোসার উপন্যাসে সমাজ, রাজনীতি, প্রেমের সম্পর্ক, প্রেম ও যৌন সম্পর্ক, পরিবার- এ সব ক্ষমতার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে প্রকাশিত। যে বাস্তবতার মধ্যে তারা বাস করে, সে বাস্তবতা তাদেরকে উভয় সংকটের দিকে ঠেলে দেয়: হয় তারা কর্তৃত্ব করবে নয়তো কর্তৃত্বের অধীনস্থ হবে (বা ‘গোয়া মারবে’ কিংবা ‘গোয়া মারা খাবে’, যেমনটা বলেছে ছাবালিতা)। এই উভয় সংকট তার চরিত্রদের গতি নির্ধারণ করে। বার্গাস যোসার কাছে সামাজিক জীবন চিড়িয়াখানার মতো এক জঙ্গল। লা সিউদাদ ই লোস পেররোস-এ ক্যাডেটদের নামগুলো (জাগুয়ার, সাপ), কিংবা লা কনবের্সাসিওন এন লা কাতেদ্রাল (বেসেররিতা, মানে বাছুর)-এ দলনেতার নাম, বইয়ের শিরোনাম (লোস কাচোররোস, লা সিউদাদ ই লোস পেররোস, লা ফিয়েস্তা দেল চিবো) প্রাণীময় জগত এবং শিকার ও শিকারীর এক বাস্তবতার উল্লেখ।
এই কারণে, লেয়নসিও প্রাদ্রোর মিলিটারী কলেজের ক্যাডেটরা দিনের বেলা আঙ্গিনায় লাইন ধরে দাঁড়ায় আর রাতের বেলা করে হস্তমৈথুনের প্রতিযোগিতা। তারা খোঁজে পছন্দের বণিতাদের, লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে পিয়েস দোরাদোসকে অন্যদের সামনে শক্তি প্রদর্শনের জায়গা বলে মনে করে। রিগোবের্তো আয়নার সামনে যৌবনের শরীরকে ধরে রাখার এক অনুপুঙ্খ আবেশে আক্রান্ত। কিয়েন মাতো আ পালোমিনো মোলেরোর শুরুতে পালোমিনো মোলেরোর হাত পা ও মুণ্ডুহীন দেহটি হচ্ছে অজ্ঞাত ক্ষমতার প্রকাশ যেখানে ঘাতকরা তাদের চিহ্ন রেখে যায়। লোস কাচোররোস (১৯৬৭)-এ পিচুলা কুয়েইয়ার শিশ্ন হারিয়ে আসলে সে গোত্রের শিশু পুরাণের ক্ষমতার প্রতীককেই হারিয়ে ফেলে।
শরীর বার্গাস যোসার লেখায় ক্ষমতা কিংবা ক্ষমতা হারানোর প্রকাশ হিসেবে উপস্থিত। ক্ষমতার শিকার হিসেবে শরীর লক্ষণীয়ভাবে প্রতিফলিত লা ফিয়েস্তা দেল চিবো-তে নির্যাতনের দৃশ্যগুলোতে এবং পরে ত্রুহিইয়োর মৃত্যুতে। একই কথা বলা যেতে পারে ব্যাপটাইজিংয়ের মতো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে যা লা সিউদাদ ই লোস পেররোস-এর মিলিটারি কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রদের অন্তভুর্ক্তির সময় ঘটে। লোস কাচোররোস-এ চরিত্রদের মুখমণ্ডলের দাগ এবং তলপেটও চূড়ান্ত অবনতির এক সংকেত। শরীর হচ্ছে ক্ষমতার এক পাঠ।
তবে শরীরও ব্যক্তির কল্পরাজ্য বাস্তবায়নের এক ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে কিংবা হতে পারে বাস্তব ক্ষমতা থেকে মুক্তির এক জায়গা। আদিম ধাঁচের শিল্পকর্ম দিয়ে গগাঁ শরীরকে বিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে যেভাবে গৌরান্বিত করে তা বাড়ির গোসলখানায় রিগোবের্র্তোর পুণ্য স্নানেরই এক ধারাবাহিকতা। ত্রাবেসুরাস দে নিনঞা মালা-তেও আত্মপরিচয়ের সংকেত হিসেবে শরীরের ধারণাকে বিকশিত হতে দেখি যখন বইয়ের প্রথম দিকের অধ্যায়গুলোতে গল্পের চরিত্রটি দৃষ্টিভঙ্গী এবং দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে ব্যক্তির পরিবর্তন ঘটায়। সবশেষে, রোগ বালাইয়ে বিধ্বস্ত ও আক্রান্ত শরীর তার কল্পনামধুর (Fantasia) জীবনের সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয়। যখন এক ঘটনায়, আখ্যানকার আবিস্কার করে “কপালের হাড়, চোয়ালের ও চিবুকের হাড্ডি বেরিয়ে পরেছে, চামড়া গেছে কুচকে, খুবই ফ্যাকাশে ও বিকৃত হয়ে গেছে ত্বক, তখন আমরা বুঝতে পারি খারাপ মেয়ে (Niñamala)-র পতনের শুরু হয়েছে যার ‘চাঁছা বোগলতলা’ থেকে ভালো ছেলের জন্য সুগন্ধি ছড়াতে থাকবে।
যে-পুঙ্খানুপুঙ্খতার সাথে বার্গাস যোসা তার চরিত্রদের দেহের ছবি আঁকেন তা শৃঙ্গারপূর্ণ (যা এলোহিও দে লা মাদ্রাস্ত্রা এবং লোস কুয়াদের্নোস দে দোন রিগোবের্তোর বেশির ভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে) দৃশ্যগুলোতে প্রকাশিত। লুক্রেসিয়ার শরীরের বর্ণনা বিধৃত হয়ে আছে রিগোবের্তোর অনুপুঙ্খ আবেগসহ। লা ফিয়েস্তা দেল চিবো-তে হেনরী চিরিনোস-এর দেহ এক সতর্কতাপূর্ণ নৈতিক চিত্রায়ন। দেহের অভিজ্ঞতাগুলো হচ্ছে আধ্যাত্মিক আত্মপরিচয়ের স্মারক। তাঁর লেখা আনন্দ ও বেদনার মাঝে এক অনুপুঙ্খ সম্ভোগের অংশ হয়ে ওঠে।

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।